সৈয়দ আমিরুজ্জামান |
জ্বালানি আধুনিক সভ্যতার অন্যতম চালিকাশক্তি। শিল্পকারখানার উৎপাদন, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, পরিবহন, যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির প্রয়োজন। কিন্তু জ্বালানির সহজলভ্যতা, সাশ্রয়ী মূল্য ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশের সুরক্ষা এবং জ্বালানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা আজ বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তন, জীবাশ্ম জ্বালানির সীমাবদ্ধতা, বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারের অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে এ চ্যালেঞ্জ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানের ভূমিকা অপরিসীম।
১৪ অক্টোবর বিশ্ব মান দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য— “Shared Vision for a Better World – Spotlight on SDG 7: Affordable and Clean Energy”। বাংলায় এর ভাবার্থ, ‘অভিন্ন লক্ষ্য উন্নত বিশ্ব—সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি’। প্রতিপাদ্যটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক স্লোগান নয়; বরং জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার সুস্পষ্ট বার্তা।
বিশ্ব মান দিবসের মূল তাৎপর্য হলো—পণ্য ও সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নত করা, শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎ নির্মাণে সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করা। বর্তমান বিশ্বে মান কোনো পণ্যের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য বা বাজারজাতকরণের বিষয়মাত্র নয়; এটি নিরাপত্তা, দক্ষতা, নির্ভরযোগ্যতা, জবাবদিহি ও ভোক্তার আস্থার অন্যতম ভিত্তি।
বিশ্ব মান দিবসের তাৎপর্য ও আন্তর্জাতিক মানের ভূমিকা
প্রতিবছর ১৪ অক্টোবর বিশ্ব মান দিবস পালিত হয়। আন্তর্জাতিক মান সংস্থা—ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন (আইএসও), আন্তর্জাতিক ইলেকট্রোটেকনিক্যাল কমিশন (আইইসি) এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) দিবসটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বব্যাপী বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, গবেষক, নীতিনির্ধারক ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিভিন্ন পণ্য, সেবা, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তর্জাতিক মান প্রণীত হয়।
আন্তর্জাতিক মানের মূল উদ্দেশ্য হলো পণ্য ও সেবার নিরাপত্তা, গুণগত মান, কার্যকারিতা এবং পারস্পরিক সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে উৎপাদনব্যবস্থায় অপচয় কমানো, প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অভিন্ন নিয়ম ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি তৈরি করাও এর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
বিশ্বায়নের যুগে একটি দেশে উৎপাদিত পণ্য অন্য দেশে বাজারজাত হচ্ছে। এক দেশের প্রযুক্তি অন্য দেশের শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে পণ্যের মান যাচাই, পরীক্ষণ, পরিমাপ এবং সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। মানদণ্ডের অভিন্নতা না থাকলে পণ্যের নিরাপত্তা, কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, রপ্তানিতে বাধা সৃষ্টি হয় এবং ভোক্তাদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মান তাই শুধু উৎপাদকের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক, বিক্রেতা এবং ভোক্তা—সবার সম্মিলিত স্বার্থের বিষয়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও জ্বালানির অধিকার
জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সপ্তম লক্ষ্য হলো—সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিত করা। ২০৩০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিদ্যুৎ ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রাপ্যতা বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি দক্ষতা উন্নত করা অপরিহার্য।
জ্বালানি উন্নয়নকে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। উৎপাদিত জ্বালানি কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে, সঞ্চালন ও বিতরণে কতটা অপচয় হচ্ছে, শিল্পকারখানায় কতটা জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে জ্বালানি থাকছে কি না—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। উৎপাদনব্যবস্থা নির্ভরযোগ্য হতে হবে, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রতিটি পর্যায়ে অপচয় কমাতে হবে। পাশাপাশি জ্বালানির মূল্য এমন পর্যায়ে রাখতে হবে, যাতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ পায়।
এখানে আন্তর্জাতিক মান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। জ্বালানি উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানসম্মত প্রযুক্তি এবং পরীক্ষিত পদ্ধতি প্রয়োগ করা গেলে ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় সাশ্রয় হয়।
সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি কেন অপরিহার্য
বিশ্বের অধিকাংশ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো বিভিন্ন মাত্রায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এসব জ্বালানির দহন থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। এর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, জলবায়ুর পরিবর্তন, বায়ুদূষণ এবং পরিবেশগত নানা সমস্যা তীব্রতর হচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশের জন্য এ পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, লবণাক্ততা, নদীভাঙন, তাপপ্রবাহ এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো সমস্যা কৃষি, অবকাঠামো, জনস্বাস্থ্য ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলছে। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনায় জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণকে একই সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি—বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে অন্যান্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের জন্য শুধু যন্ত্রপাতি স্থাপন করলেই হবে না। এসব যন্ত্রের মান, কার্যক্ষমতা, স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা এবং রক্ষণাবেক্ষণের উপযোগিতাও নিশ্চিত করতে হবে।
একটি নিম্নমানের সোলার প্যানেল প্রত্যাশিত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারলে বিনিয়োগের সুফল কমে যায়। নিম্নমানের ব্যাটারি দ্রুত নষ্ট হলে নতুন ব্যাটারি কেনার ব্যয় বাড়ে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ তৈরি হয়। অনিরাপদ ইনভার্টার বা বৈদ্যুতিক উপকরণ অগ্নিকাণ্ড ও বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ফলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সম্প্রসারণের সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত।
জ্বালানি দক্ষতা: উৎপাদনের পাশাপাশি অপচয় রোধ
জ্বালানি খাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো দক্ষতা। নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন কিংবা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান জ্বালানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে একই পরিমাণ সম্পদ দিয়ে বেশি উৎপাদন ও সেবা পাওয়া সম্ভব।
শিল্পকারখানায় দক্ষ মোটর, বয়লার, পাম্প, কম্প্রেসর ও তাপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যবহার করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় করা যায়। ভবন নির্মাণে উন্নত তাপ নিরোধক, প্রাকৃতিক আলো ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী আলোকসজ্জা ব্যবহার করলে বিদ্যুতের চাহিদা কমানো সম্ভব। একইভাবে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, স্মার্ট নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ায়।
আন্তর্জাতিক মানের মাধ্যমে এসব যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা পরিমাপ, পরীক্ষণ এবং তুলনামূলক মূল্যায়নের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি তৈরি করা যায়। এর ফলে ক্রেতা জানতে পারেন, কোন যন্ত্র কতটা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং প্রত্যাশিত সেবা দিতে কতটা সক্ষম।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জ্বালানি সাশ্রয়ের নামে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাবে না। বরং প্রাথমিক ক্রয়মূল্যের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়, স্থায়িত্ব, মেরামতের প্রয়োজন এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করতে হবে। কোনো যন্ত্রের প্রাথমিক মূল্য কম হলেও সেটি যদি বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে বা অল্প সময়ে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত তার ব্যয় বেশি হতে পারে।
সুতরাং মানসম্মত পণ্য নির্বাচন, দক্ষ প্রযুক্তি প্রয়োগ এবং নিয়মিত কার্যক্ষমতা যাচাই—এই তিনটি বিষয় জ্বালানি সাশ্রয়ের কার্যকর ভিত্তি।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় মান নিশ্চিতকরণ
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কৃষি সেচ, শিল্পকারখানা এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনা, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুতের সুযোগ সম্প্রসারণে সৌরশক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে এর বিভিন্ন উপাদানের মান ও পারস্পরিক সামঞ্জস্যের ওপর। সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, চার্জ কন্ট্রোলার, ব্যাটারি, সংযোগব্যবস্থা এবং সুরক্ষামূলক উপকরণ—প্রতিটি অংশের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, চার্জ কন্ট্রোলার ও ব্যাটারির জন্য ৭৯টি বাংলাদেশ মান প্রণয়ন করেছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব মান নিয়মিত হালনাগাদ করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিএসটিআইয়ের প্রধান কার্যালয়ে স্থাপিত সোলার প্যানেল পরীক্ষণ গবেষণাগারে জার্মান প্রযুক্তির ‘সান সিমুলেটর’ রয়েছে। এ যন্ত্রের সাহায্যে সর্বোচ্চ এক হাজার ওয়াট ক্ষমতার সোলার প্যানেল পরীক্ষা করা যায়। উন্নত আলোক উৎস ও ক্যালিব্রেটেড যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সোলার প্যানেলের কার্যক্ষমতা ও গুণগত মান যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এ ধরনের পরীক্ষাগার শুধু পণ্যের মান যাচাইয়ের জন্য নয়; দেশীয় বাজারে নির্ভরযোগ্য সৌরপ্রযুক্তির প্রসার এবং ভোক্তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানো, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষণপদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহৃত ব্যাটারি ও ইলেকট্রনিক বর্জ্যের নিরাপদ সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশসম্মত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রযুক্তি যেন নতুন পরিবেশগত সংকট তৈরি না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
বাংলাদেশে বিএসটিআইয়ের ভূমিকা ও দায়িত্ব
বাংলাদেশে পণ্যের মান নির্ধারণ, পরীক্ষণ, সনদ প্রদান এবং ওজন ও পরিমাপে সঠিকতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিএসটিআই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। শিল্প ও উৎপাদন খাতে গুণগত মান বজায় রাখা, ভোক্তার অধিকার সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের গুরুত্ব অপরিসীম।
বিএসটিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ৬৩১টি বাংলাদেশ মান প্রণয়ন করেছে। খাদ্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রী, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, পাট ও বস্ত্র, রাসায়নিক পণ্যসহ বিভিন্ন খাতের পণ্যের মান নির্ধারণ ও পরীক্ষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি শিল্পপণ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
বাজারে কোনো পণ্যের গায়ে মানচিহ্ন থাকলেই শুধু যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সনদ বৈধ কি না, পণ্যটি নির্ধারিত মান পূরণ করছে কি না এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সনদের শর্ত অনুসরণ করছে কি না—এসব বিষয়ও নিশ্চিত করা জরুরি।
বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক মান সনদের আওতাভুক্ত পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সনদ ছাড়া উৎপাদন, বাজারজাত বা বিক্রির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের একটি পণ্যের লাইসেন্স থাকলেই তার সব পণ্য মানসম্মত বলে বিবেচিত হয় না। বাধ্যতামূলক তালিকাভুক্ত প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সনদ গ্রহণ করতে হয়। আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসারে মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে নিয়মিত কারখানা ও বাজার পরিদর্শন, নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে পরীক্ষা, সনদের শর্ত প্রতিপালন পর্যবেক্ষণ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও হয়রানিমুক্ত রাখতে হবে, যাতে সৎ উদ্যোক্তারা মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত হন।
নজরদারি, আইন প্রয়োগ ও ভোক্তা সুরক্ষা
বাজারে ভেজাল, নিম্নমানের ও অনিরাপদ পণ্যের বিস্তার জনস্বাস্থ্য, ভোক্তা অধিকার এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। নিম্নমানের খাদ্যপণ্য মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে; অনিরাপদ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে; আর নির্মাণসামগ্রীর মানে ত্রুটি থাকলে অবকাঠামোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। একইভাবে ওজন ও পরিমাপে কারচুপি সরাসরি ভোক্তার আর্থিক ক্ষতি ঘটায়।
বিএসটিআইয়ের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় তিন হাজার অভিযান ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমে মোট ৩ কোটি ৮০ লাখ ৩০ হাজার ১০০ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সময়ে বিভিন্ন অপরাধে ৩৩টি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়েছে এবং নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিসংখ্যান অনুসারে, ওই অর্থবছরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৯২৪টি মামলা করা হয়, যার মধ্যে ৯২১টি নিষ্পত্তি হয়েছে। এ ছাড়া নজরদারি কার্যক্রমের আওতায় ৮৭টি মামলা করা হয়। একই সময়ে ৩ হাজার ৯১৬টি নতুন লাইসেন্স দেওয়া এবং ৪ হাজার ৭১১টি লাইসেন্স নবায়নের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। ৮৩৫টি লাইসেন্সের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বর্তমানে বাধ্যতামূলক মান সনদের আওতায় রয়েছে ৩৩৫ ধরনের পণ্য।
এসব পরিসংখ্যান বাজার তদারকির গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে কেবল অভিযান, মামলা বা জরিমানার সংখ্যা দিয়ে মান নিয়ন্ত্রণের সাফল্য পুরোপুরি মূল্যায়ন করা যায় না। কতটি অনিয়ম পুনরাবৃত্তি বন্ধ হয়েছে, বাজারে নিম্নমানের পণ্যের প্রবেশ কতটা কমেছে, পরীক্ষাগারের ফলাফলের ভিত্তিতে কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভোক্তার অভিযোগ কতটা কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে—এসব সূচকও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে মান সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া এবং মানসম্মত উৎপাদনের সুফল সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অনিয়ম দমনে গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে মানসম্মত উৎপাদনের সংস্কৃতি গড়ে তোলাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা
বর্তমান বিশ্ববাণিজ্যে পণ্যের মূল্য ও নকশার পাশাপাশি মান, নিরাপত্তা, পরিবেশগত প্রভাব এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পণ্যের গুণগত মান, উৎপাদনব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল এবং বৈদ্যুতিক পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণে মান ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পরীক্ষণ, পরিদর্শন ও সনদ প্রদানের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে রপ্তানিকারকদের জন্য বিদেশি বাজারে পণ্যের মান প্রমাণ করা সহজ হবে।
মান ব্যবস্থাপনা দুর্বল হলে পণ্য প্রত্যাখ্যাত হতে পারে, রপ্তানি ব্যয় বাড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে স্বীকৃত মান অনুসরণ, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাগার এবং কার্যকর সনদব্যবস্থা থাকলে ক্রেতার আস্থা বাড়ে এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়।
তবে আন্তর্জাতিক সনদ অর্জনকে শুধু ব্যবসায়িক প্রচারণার বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। পণ্যের প্রকৃত মান, উৎপাদনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা এবং সনদের শর্ত প্রতিপালনের মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জন করতে হয়। এ জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, শিল্পসংগঠন ও বেসরকারি পরীক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, প্রযুক্তি ও মানের বিবর্তন
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, রোবোটিকস, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন এবং তথ্যবিশ্লেষণ শিল্প ও সেবাব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনছে। এসব প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, ত্রুটি শনাক্ত করতে এবং জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা উন্নত করতে পারে।
স্মার্ট মিটার, ডিজিটাল মনিটরিং, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং তথ্যভিত্তিক রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে শিল্পকারখানায় কোথায় অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় হচ্ছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব। বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণ করে যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন এবং অপ্রয়োজনীয় অপচয় কমানোর সুযোগও তৈরি হয়।
কিন্তু প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগের জন্য তথ্যের নির্ভুলতা, যন্ত্রপাতির পারস্পরিক সামঞ্জস্য, সাইবার নিরাপত্তা এবং পরিমাপের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়।
বাংলাদেশে শিল্পের ডিজিটাল রূপান্তর, স্মার্ট উৎপাদনব্যবস্থা এবং জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগে মান ব্যবস্থাপনাকে শুরু থেকেই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নতুন প্রযুক্তি স্থাপনের পর মান যাচাইয়ের পরিবর্তে পরিকল্পনা, নকশা, ক্রয়, স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিটি পর্যায়ে মানের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ওজন ও পরিমাপে সঠিকতা: মান ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক
পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি সঠিক ওজন ও পরিমাপ নিশ্চিত করাও ভোক্তা অধিকার রক্ষার অপরিহার্য অংশ। কোনো পণ্যের গুণগত মান ভালো হলেও নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম সরবরাহ করা হলে ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হন। একইভাবে জ্বালানি বিক্রির ক্ষেত্রে পরিমাপে কারচুপি হলে ক্রেতা তার অর্থের যথাযথ মূল্য পান না।
বিএসটিআই ওজন ও পরিমাপক যন্ত্রের ক্যালিব্রেশন, যাচাই এবং জ্বালানি সরবরাহের পরিমাপ পরীক্ষা করে থাকে। পেট্রোল পাম্পের ডিসপেন্সিং যন্ত্রসহ বিভিন্ন পরিমাপক যন্ত্রের নির্ভুলতা যাচাইয়ের মাধ্যমে অনিয়ম শনাক্ত করা সম্ভব।
জ্বালানি ব্যবস্থায় পরিমাপের নির্ভুলতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যুৎ, গ্যাস, তরল জ্বালানি ও অন্যান্য শক্তির ব্যবহার সঠিকভাবে পরিমাপ করা না গেলে প্রকৃত চাহিদা, অপচয় এবং ব্যয়ের হিসাব নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে জ্বালানি ব্যবহারের সঠিক তথ্য থাকলে দক্ষতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়। আর সাধারণ ভোক্তার ক্ষেত্রে সঠিক পরিমাপ ন্যায্য লেনদেন নিশ্চিত করে।
অতএব, মান ব্যবস্থাকে শুধু পণ্যের পরীক্ষাগারভিত্তিক মূল্যায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিমাপের নির্ভুলতা, জ্বালানি দক্ষতা এবং সেবার স্বচ্ছতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
পরীক্ষাগারের আধুনিকায়ন ও গবেষণার সক্ষমতা বৃদ্ধি
মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে পরীক্ষাগারের সক্ষমতার ওপর। আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল, যথাযথ ক্যালিব্রেশন, মানসম্মত পরীক্ষণপদ্ধতি এবং নির্ভরযোগ্য ফলাফল ছাড়া পণ্যের গুণগত মান সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।
বিএসটিআইয়ের পরীক্ষাগার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের জন্য প্রায় ৮৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘বিএসটিআইয়ের পদার্থ ও রাসায়নিক পরীক্ষণ ল্যাবরেটরির সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পণ্যের পরীক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো এবং উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে অবকাঠামো নির্মাণ বা আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনাই যথেষ্ট নয়। যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ক্যালিব্রেশন, পরীক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে হবে। পরীক্ষার ফলাফল যেন নির্ভুল, নিরপেক্ষ ও পুনরুৎপাদনযোগ্য হয়, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকার বাইরের শিল্পাঞ্চল ও আঞ্চলিক পর্যায়ে পরীক্ষার সুবিধা সম্প্রসারণ করা গেলে উদ্যোক্তাদের সময় ও ব্যয় কমবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানও সহজে পণ্যের মান যাচাইয়ের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পকারখানার সঙ্গে যৌথ গবেষণার মাধ্যমে দেশীয় প্রযুক্তি ও উৎপাদনব্যবস্থার উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব।
মান সচেতনতা ও ভোক্তার দায়িত্ব
মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নয়। ভোক্তার সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল আচরণও বাজারে মানসম্মত পণ্যের চাহিদা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পণ্য কেনার সময় ভোক্তাদের পণ্যের লেবেল, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, উপাদান, ব্যবহারবিধি, নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মানচিহ্ন ও সনদের বৈধতা যাচাই করা উচিত। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, ব্যাটারি, সোলার প্যানেল ও অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্য কেনার ক্ষেত্রে শুধু কম দাম বিবেচনা না করে নিরাপত্তা, কার্যক্ষমতা, স্থায়িত্ব এবং বিক্রয়োত্তর সেবার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।
পণ্যে অসংগতি দেখা দিলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানো প্রয়োজন। এতে বাজারের অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হয় এবং দায়িত্বশীল উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা উৎসাহিত হন।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীদেরও ভোক্তার আস্থা অর্জনকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার, মিথ্যা লেবেল, বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন এবং সনদের অপব্যবহার সাময়িকভাবে মুনাফা বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও বাজার ক্ষতিগ্রস্ত করে।
মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন, সঠিক তথ্য প্রকাশ এবং অভিযোগের দ্রুত সমাধান—এসব চর্চা ব্যবসা ও ভোক্তার মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলে।
জ্বালানি রূপান্তরে নীতিগত সমন্বয় জরুরি
বাংলাদেশে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিদ্যুৎ উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিল্পনীতি, পরিবেশ সংরক্ষণ, ভোক্তা অধিকার এবং মান নিয়ন্ত্রণের নীতিগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
প্রথমত, সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির উপযোগী প্রযুক্তির মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি এসব প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর বিধিব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিল্পকারখানায় জ্বালানি নিরীক্ষা বা এনার্জি অডিটের চর্চা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। কোন যন্ত্র কতটা জ্বালানি ব্যবহার করছে, কোথায় অপচয় হচ্ছে এবং কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যয় কমানো যায়—এসব তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, জ্বালানি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা যাচাই এবং লেবেলিংয়ের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা দরকার। এতে ভোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান যন্ত্রপাতির জ্বালানি দক্ষতা সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
চতুর্থত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মানসম্মত প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রাথমিক বিনিয়োগের বাধা দূর করা গেলে অনেক প্রতিষ্ঠান দক্ষ যন্ত্রপাতি ও পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে সক্ষম হবে।
পঞ্চমত, মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা, পরীক্ষার ফলাফল সংরক্ষণ, লাইসেন্স যাচাই এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে হবে। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
ষষ্ঠত, সরকারি ক্রয় ও উন্নয়ন প্রকল্পে পণ্যের মান, জ্বালানি দক্ষতা, স্থায়িত্ব এবং জীবনচক্রভিত্তিক ব্যয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কেবল সর্বনিম্ন ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে দীর্ঘমেয়াদে বেশি ব্যয় এবং পরিবেশগত ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
টেকসই উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন
জ্বালানি ও মান ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ কোনো একক দেশের পক্ষে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রযুক্তি, গবেষণা, অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন।
উন্নত প্রযুক্তি ও পরীক্ষণপদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান বিনিময়, গবেষণাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জাতীয় মান প্রণয়ন এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনের প্রতিফলন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জলবায়ু, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, শিল্পের কাঠামো এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর পার্থক্য বিবেচনায় রেখে মান বাস্তবায়নের কার্যকর পথ তৈরি করতে হবে।
মানের প্রয়োগ যেন ক্ষুদ্র উৎপাদক ও উদ্যোক্তাদের জন্য অপ্রয়োজনীয় বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য ধাপে ধাপে সক্ষমতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে মানের ক্ষেত্রে ছাড় না দিয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
বাংলাদেশের সামনে এখন একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রয়োজন। এ দুই লক্ষ্য অর্জনের জন্য মান ব্যবস্থাপনাকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অংশে পরিণত করতে হবে।
বিএসটিআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরীক্ষাগার আধুনিকায়ন, দক্ষ জনবল তৈরি, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা এবং বাজার তদারকি জোরদার করার পাশাপাশি উৎপাদকদের মানসম্মত উৎপাদনে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভোক্তা সচেতনতা, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সঠিক ওজন ও পরিমাপ নিশ্চিত করার কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বও গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণাগার এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ে জ্বালানি সাশ্রয়ের বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ভবন নির্মাণ, পরিবহন, কৃষি ও শিল্পে দক্ষ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সাফল্য পরিমাপের জন্য নির্দিষ্ট সূচক নির্ধারণ করা প্রয়োজন। জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা কতটা বাড়ছে, নিম্নমানের পণ্যের অভিযোগ কতটা কমছে, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা কতটা উন্নত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা কতটা বাড়ছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করা হলে অগ্রগতি মূল্যায়ন সহজ হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানকে কেবল আইনগত বাধ্যবাধকতা হিসেবে না দেখে জাতীয় উন্নয়ন, অর্থনৈতিক দক্ষতা এবং জনস্বার্থ রক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করা।
উপসংহার
বিশ্ব মান দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি উন্নত বিশ্ব নির্মাণের জন্য শুধু বেশি উৎপাদন বা দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানসম্মত পণ্য ও সেবা, দক্ষ প্রযুক্তি, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং মানুষের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী জীবনব্যবস্থা।
সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের গুরুত্ব তাই বহুমাত্রিক। এটি জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার বাড়ায়, প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করে, অপচয় কমায়, ভোক্তার অর্থ সাশ্রয় করে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় সহায়তা করে। একই সঙ্গে মানসম্মত উৎপাদন ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষণব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন মান প্রণয়ন থেকে শুরু করে পরীক্ষণ, সনদ প্রদান, বাজার তদারকি এবং ভোক্তা সচেতনতা—প্রতিটি পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা। বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্পোদ্যোক্তা, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য জ্বালানির উৎপাদন যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি উৎপাদিত জ্বালানির প্রতিটি ইউনিটের সর্বোত্তম ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি, মানসম্মত পণ্য এবং দায়িত্বশীল ভোগের সমন্বয়েই সম্ভব একটি নিরাপদ, দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তোলা।
বিশ্ব মান দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য আমাদের সেই অভিন্ন লক্ষ্যেই এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়—যেখানে জ্বালানি হবে সাশ্রয়ী, প্রযুক্তি হবে নির্ভরযোগ্য, উৎপাদন হবে মানসম্মত এবং উন্নয়নের সুফল পৌঁছাবে সবার কাছে। মানের চর্চাকে জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিণত করতে পারলেই বাংলাদেশ একটি অধিক প্রতিযোগিতামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ভবিষ্যতের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে পারবে।
#
লেখক পরিচিতি
সৈয়দ আমিরুজ্জামান, এলএল.বি
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি; ’৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য;
বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য;
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি; বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশনের প্রাক্তন সভাপতি।
ই-মেইল: syedzaman.62@gmail.com
Post Views:
৩,১২৬