৫৭তম বিশ্ব মান দিবস আজ

প্রকাশিত: ১২:৫৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

৫৭তম বিশ্ব মান দিবস আজ

Manual7 Ad Code
  • সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহারে আন্তর্জাতিক মানের ওপর গুরুত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ : সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জ্বালানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বানের মধ্য দিয়ে আজ বুধবার (১৪ অক্টোবর ২০২৬) পালিত হবে ৫৭তম বিশ্ব মান দিবস।

Manual5 Ad Code

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি উপলক্ষে পণ্য ও সেবার মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং টেকসই উন্নয়নে মানের গুরুত্ব তুলে ধরা হবে।

এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য— “Shared Vision for a Better World – Spotlight on SDG 7: Affordable and Clean Energy”। বাংলায় এর ভাবার্থ, ‘অভিন্ন লক্ষ্য উন্নত বিশ্ব—সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি’।

Manual3 Ad Code

আন্তর্জাতিক মান সংস্থা (আইএসও), আন্তর্জাতিক ইলেকট্রোটেকনিক্যাল কমিশন (আইইসি) এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) যৌথভাবে এ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সপ্তম লক্ষ্য হচ্ছে সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্য অর্জনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদিত জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, প্রযুক্তির মান নিশ্চিতকরণ এবং অপচয় কমানো জরুরি। সৌরবিদ্যুৎসহ পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের গুরুত্বও বাড়ছে।

বাংলাদেশে দিবসটি পালনের কেন্দ্রীয় দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। প্রতিষ্ঠানটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, চার্জ কন্ট্রোলার ও ব্যাটারির জন্য ৭৯টি বাংলাদেশ মান প্রণয়ন করেছে। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব মান নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। বিএসটিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি মোট ৪ হাজার ৬৩১টি বাংলাদেশ মান প্রণয়ন করেছে।

সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তির মান যাচাইয়ে বিএসটিআইয়ের প্রধান কার্যালয়ে রয়েছে সোলার প্যানেল পরীক্ষণ গবেষণাগার। সেখানে জার্মান প্রযুক্তির আধুনিক ‘সান সিমুলেটর’ ব্যবহার করে সর্বোচ্চ এক হাজার ওয়াট ক্ষমতার সোলার প্যানেল পরীক্ষা করা যায়। আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুসরণ করে উন্নত আলোক উৎস ও ক্যালিব্রেটেড যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সোলার প্যানেলের কার্যক্ষমতা এবং গুণগত মান যাচাই করা হচ্ছে।

দিবসটি উপলক্ষে বিএসটিআইয়ের প্রধান কার্যালয়সহ বিভাগীয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়ে আলোচনা সভা এবং জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড স্থাপন করা হয়েছে। পণ্যের মান সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং উৎপাদক ও ভোক্তাদের আন্তর্জাতিক মান অনুসরণে উৎসাহিত করাই এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

মান নিয়ন্ত্রণে অভিযান, জরিমানা ও লাইসেন্স কার্যক্রম

Manual6 Ad Code

শিল্পপণ্যের মান নিশ্চিত করা এবং ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় বিএসটিআইয়ের কার্যক্রমের পরিধিও বাড়ছে। খাদ্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রী, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, পাট ও বস্ত্র এবং রাসায়নিক পণ্যের মান নির্ধারণ, পরীক্ষণ ও সনদ প্রদানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের শিল্পপণ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

বিএসটিআইয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্যের উৎপাদন-বিপণন বন্ধ এবং সঠিক ওজনে পণ্য বিক্রি নিশ্চিত করতে প্রায় তিন হাজার অভিযান ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমে মোট ৩ কোটি ৮০ লাখ ৩০ হাজার ১০০ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সময়ে বিভিন্ন অপরাধে ৩৩টি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়েছে এবং নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

Manual5 Ad Code

ওই অর্থবছরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৯২৪টি মামলা করা হয়, যার মধ্যে ৯২১টি নিষ্পত্তি হয়েছে। এ ছাড়া নজরদারি কার্যক্রমের আওতায় ৮৭টি মামলা করা হয়। এসব অভিযানে পণ্যের মানসংক্রান্ত অনিয়মের পাশাপাশি ওজন ও পরিমাপে কারচুপির বিষয়টিও যাচাই করা হয়েছে।

একই অর্থবছরে বিএসটিআই ৩ হাজার ৯১৬টি নতুন লাইসেন্স দিয়েছে এবং ৪ হাজার ৭১১টি লাইসেন্স নবায়ন করেছে। এ সময়ে ৮৩৫টি লাইসেন্সের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বাধ্যতামূলক মান সনদের আওতায় রয়েছে ৩৩৫ ধরনের পণ্য।

বাধ্যতামূলক মান সনদের আওতাভুক্ত পণ্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সনদ ছাড়া উৎপাদন, বাজারজাত বা বিক্রি করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের একটি পণ্যের লাইসেন্স থাকলেই তার সব পণ্য মানসম্মত বলে বিবেচিত হয় না। বাধ্যতামূলক তালিকাভুক্ত প্রতিটি পণ্যের জন্য প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী পৃথক মান সনদ নিতে হয়। আমদানিকৃত সংশ্লিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রেও নিয়ম অনুযায়ী মান যাচাই ও পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

পণ্যের মান যাচাইয়ে নিয়মিত কারখানা ও বাজার পরিদর্শন, নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে মান পরীক্ষা এবং লাইসেন্সের শর্ত প্রতিপালন পর্যবেক্ষণ করা হয়। অনিয়মের ধরন অনুযায়ী মামলা ও অর্থদণ্ডের পাশাপাশি পণ্য বিক্রি ও বিতরণ বন্ধ, কারখানা সিলগালা এবং লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

জ্বালানি ও পরিমাপের নির্ভুলতা নিশ্চিতের উদ্যোগ

পণ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ওজন ও পরিমাপে কারচুপি রোধেও কাজ করছে বিএসটিআই। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওজন ও পরিমাপক যন্ত্রের ক্যালিব্রেশন ও যাচাইয়ের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের পরিমাপ পরীক্ষা করা হয়েছে। পেট্রোল পাম্পে ব্যবহৃত জ্বালানি সরবরাহের যন্ত্রসহ বিভিন্ন পরিমাপক যন্ত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে অনিয়ম শনাক্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি খাতে মান নিশ্চিত করা ভোক্তার স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক দক্ষতা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পরিমাপ, মানসম্মত যন্ত্রপাতি এবং নির্ভরযোগ্য পরীক্ষণব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে জ্বালানির অপচয় কমানো ও সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার সহজ হবে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের মান যাচাই নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর মানুষের আস্থা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

পরীক্ষাগার আধুনিকায়নে বড় পরিকল্পনা

পণ্যের মান পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে বিএসটিআইয়ের পরীক্ষাগার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রায় ৮৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘বিএসটিআইয়ের পদার্থ ও রাসায়নিক পরীক্ষণ ল্যাবরেটরির সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, পরীক্ষাগারের অবকাঠামো উন্নয়ন, আঞ্চলিক পর্যায়ে পরীক্ষার সুবিধা সম্প্রসারণ এবং দক্ষ জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদন, পরীক্ষণ ও সনদ প্রদানের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে রপ্তানি বাজারে আস্থা অর্জন এবং দেশীয় বাজারে নিরাপদ পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হবে।

বিশ্ব মান দিবস মূলত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নিয়োজিত বিশেষজ্ঞদের অবদান স্মরণ করার পাশাপাশি পণ্য ও সেবার মান সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর উপলক্ষ। বিশ্বায়ন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের এ সময়ে মান নিয়ন্ত্রণ শুধু শিল্পোৎপাদনের বিষয় নয়; এটি ভোক্তা সুরক্ষা, জ্বালানি দক্ষতা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উৎপাদক, আমদানিকারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ভোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে মানসম্মত পণ্যের ব্যবহার ও উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজার তদারকি জোরদার করা গেলে নিরাপদ পণ্য সরবরাহের পাশাপাশি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।