৯১ বছর পর সীমানা বাড়ছে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার

প্রকাশিত: ১:২০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

৯১ বছর পর সীমানা বাড়ছে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার

Manual3 Ad Code
  • আয়তন ২.৫৮ থেকে ৯.৫২ বর্গকিলোমিটার করার প্রস্তাব, জনসংখ্যা হতে পারে এক লাখ

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ১৪ অক্টোবর ২০২৬ : প্রতিষ্ঠার ৯১ বছর পর সীমানা সম্প্রসারণের পথে এগোচ্ছে মৌলভীবাজারের পর্যটননগরী শ্রীমঙ্গল পৌরসভা।

পৌরসভার আয়তন ২ দশমিক ৫৮ বর্গকিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৫২ বর্গকিলোমিটার করার প্রস্তাবে খসড়া গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার।

প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হলে আশপাশের তিন ইউনিয়নের একাধিক মৌজা ও চা-বাগান এলাকা পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হবে। এতে পৌর এলাকার সম্ভাব্য জনসংখ্যা প্রায় এক লাখে উন্নীত হওয়ার পাশাপাশি নাগরিকসেবা ও নগর অবকাঠামো সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

Manual5 Ad Code

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌর-১ শাখা থেকে গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত অতিরিক্ত গেজেটে শ্রীমঙ্গল সদর, আশিদ্রোন ও কালিঘাট ইউনিয়নের নির্দিষ্ট মৌজা ও দাগকে শহর এলাকার অন্তর্ভুক্ত করার অভিপ্রায় জানানো হয়েছে। স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এর ৩ ধারার সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব ড. শাহেদ মোস্তফা।

প্রস্তাবিত এলাকার মধ্যে রয়েছে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের রূপসপুর, শ্রীমঙ্গল, ভাড়াউড়া, সুনগইড় ও উত্তরসুর মৌজার নির্দিষ্ট দাগ; আশিদ্রোন ইউনিয়নের সুনগইড় ও রামনগর মৌজার নির্দিষ্ট দাগ এবং কালিঘাট ইউনিয়নের ভুড়ভুড়িয়া টি এস্টেট এলাকার নির্দিষ্ট দাগ। তবে কোন কোন অংশ পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হবে, তা গেজেটে উল্লেখ করা দাগের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে।

৯১ বছরেও বাড়েনি পৌরসভার আয়তন

১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রীমঙ্গল পৌরসভার আয়তন দীর্ঘ ৯১ বছরেও বাড়েনি। ২০০২ সালে ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত হলেও এর সীমানা রয়ে গেছে আগের অবস্থায়। এ সময়ে শহরের জনসংখ্যা, ব্যবসা-বাণিজ্য, যানবাহন চলাচল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। শহরের সঙ্গে কার্যত একীভূত হয়ে পড়া আশপাশের এলাকাগুলো ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে থাকায় নাগরিকসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠাকালে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার জনসংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। নয়টি ওয়ার্ডের এ পৌরসভায় রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ হোল্ডিং। বছরে নিজস্ব রাজস্ব আয় প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। পৌরসভার অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২৮ কিলোমিটার সড়ক, ৩৫ কিলোমিটার ড্রেন, ৬৭৫টি সড়কবাতি ও ২ হাজার ৩০০টি পানির সংযোগ।

সীমিত আয়তনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষকে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে, পৌরসভার সীমানাসংলগ্ন এলাকায় বসবাস করেও অনেক পরিবার পৌরসভার আওতাভুক্ত নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এরআগে নেওয়া উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি

শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের উদ্যোগ এবারই প্রথম নয়। পৌরসভা সূত্র জানায়, ১৯৮১ সালে এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে নানা কারণে সেসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

সর্বশেষ চলতি বছরের ১৫ মার্চ মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ মুজিবুর রহমান চৌধুরী সীমানা সম্প্রসারণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দেন। এরপর স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ে। গত ১৯ জুলাই সম্প্রসারণের প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পরে তা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে ২১ সেপ্টেম্বর খসড়া গেজেট প্রকাশ করা হয়।

শ্রীমঙ্গল পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে পৌরসভার আয়তন ২ দশমিক ৫৮ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৫২ বর্গকিলোমিটার হবে। জনসংখ্যা প্রায় এক লাখে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ওয়ার্ডের সংখ্যা বর্তমানের নয়টি থেকে বেড়ে ১২ থেকে ১৪টি হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সীমানা সম্প্রসারণ হলে পৌরসভার রাজস্ব আহরণের পরিধি বাড়বে। পাশাপাশি নতুন অন্তর্ভুক্ত এলাকায় সড়ক, ড্রেনেজ, পথবাতি, পানি সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নাগরিকসেবা পরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।’

Manual1 Ad Code

আপত্তি নিষ্পত্তির পর চূড়ান্ত গেজেট

খসড়া গেজেটে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এর ৩ ধারার ৩ উপধারা অনুযায়ী, প্রজ্ঞাপন প্রকাশের তারিখ থেকে অনূর্ধ্ব এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা প্রস্তাবিত এলাকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সরকারের কাছে লিখিত আপত্তি বা মতামত জানাতে পারবেন। আইনের ৩ ধারার ৪ উপধারা অনুযায়ী, উত্থাপিত আপত্তি ও পরামর্শ পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। আপত্তি ও পরামর্শ নিষ্পত্তি এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে নতুন সীমানা কার্যকর হতে পারে।

Manual2 Ad Code

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠাকালে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার জনসংখ্যা ছিল মাত্র দুই হাজার, যা বর্তমানে ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে। কিন্তু আয়তন সেই ২ দশমিক ৫৮ বর্গকিলোমিটারে আটকে থাকায় সঠিক নাগরিকসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। সার্বিকভাবে নাগরিকসেবা নিশ্চিত ও সুবিধা সম্প্রসারণের প্রয়োজন থেকেই দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভার সীমানা বাড়ানোর দাবি ছিল। অবশেষে মন্ত্রণালয় থেকে খসড়া গেজেট প্রকাশ হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘খসড়া গেজেট পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন পর্যন্ত তাঁদের কাছ থেকে কোনো আপত্তির কথা জানা যায়নি।’

আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সরকার চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন সীমানা কার্যকর করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পরিকল্পিত নগরায়ণের প্রত্যাশা

Manual5 Ad Code

সীমানা সম্প্রসারণের খসড়া গেজেট প্রকাশের খবরে প্রস্তাবিত এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তাঁদের প্রত্যাশা, প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং অন্যান্য নাগরিকসেবা নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়বে।

তবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, শুধু পৌরসভার সীমানা বাড়ালেই প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না। নতুন অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোতে পর্যায়ক্রমে কার্যকর নাগরিকসেবা পৌঁছে দেওয়া, পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত করা, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নত করা এবং সড়ক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।

সীমানা সম্প্রসারণের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ায় স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একই সঙ্গে তাঁরা দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।

দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়িত হলে শ্রীমঙ্গলের নগর ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের সুযোগ তৈরি হবে। তবে সেই সম্ভাবনা কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেবে, তা নির্ভর করছে আপত্তি নিষ্পত্তি, চূড়ান্ত অনুমোদন এবং সম্প্রসারিত এলাকায় কার্যকর নাগরিকসেবা নিশ্চিত করার ওপর।