শ্রীমঙ্গলে `আমরা পারব’ চা বাগানের নারী ও কিশোর সংঘের বার্ষিক সম্মেলন

প্রকাশিত: ৪:১৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৭, ২০২৫

শ্রীমঙ্গলে `আমরা পারব’ চা বাগানের নারী ও কিশোর সংঘের বার্ষিক সম্মেলন

Manual2 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ২৭ এপ্রিল ২০২৫ : শ্রীমঙ্গলে `আমরা পারব’ চা বাগানের নারী ও কিশোর সংঘের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আজ সোমবার (২৭ এপ্রিল ২০২৫) সকাল সাড়ে ৯টায় শ্রীমঙ্গলের ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারের হল রুমে সংগঠনটির এ সম্মেলনে দুই বছর মেয়াদী কমিটি গঠনের নিমিত্তে কার্যকরী পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে মূখ্য আলোচক হিসেবে ‘আমরা পারব’ চা বাগানের নারী ও কিশোর সংঘের বাৎসরিক সম্মেলনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বক্তব্য দেন ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ তারেকুজ্জামান।

প্রকল্প সমন্বয়কারী ফরহাদ আহমেদের সঞ্চালনায় স্বাগত ও শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ এর জেন্ডার জাস্টিস ও সোশ্যাল ইনক্লুশন প্রোগ্রামের সমন্বয়ক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান তারেক আজিজ, অক্সফামের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার মো. ইউসুফ এবং আমরা পারবো নারী ও কিশোরী সংঘের সভাপতি সন্ধ্যা রানী ভৌমিক।

অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, সাপ্তাহিক নতুন কথার বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান; বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি পংকজ এ কন্দ ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী ও সহসভাপতি জেসমিন আক্তার।

সংগঠনের কার্যনির্বাহী সদস্য ও কমিটির রূপরেখা তুলে ধরেন বিটিএসের কো-অর্ডিনেটর ফরহাদ আহমেদ, সংগঠনের নির্বাচন সংক্রান্ত আলোচনা, নিয়ম-কানুন ও করণীয় সম্পর্কে তুলে ধরেন প্রজেক্ট অফিসার প্রভাষ নায়েক।

আরো বক্তব্য দেন বাহুবলের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. সাদিকুর রহমান, কমলগঞ্জ ও রাজনগরের মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মধুছন্দা দাস।

সম্মেলনে বলা হয়, চা বাগানের নারী ও কিশোরীদের সামাজিক সুরক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি প্রশ্নাতীত। দেশের নাগরিক ও শ্রমিক হিসেবে ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টি বিশেষ করে চা বাগানের জনগোষ্ঠীর জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। একই সাথে শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবে চা বাগানের জনগোষ্ঠীর অধিকার সচেতনতার জায়গাটিও বেশ নাজুক এবং সামাজিক নানা কুসংস্কার ও প্রথা বিশেষ করে নারী ও কিশোরীদের বিকাশ, মতপ্রকাশ ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রতিবন্ধক। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে অদ্যবধি চা বাগানের নারীরা সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার প্রয়াস থেকে ব্যর্থ। যদিও বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন চা বাগানের জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে। তারপরও চা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ও বৈচিত্রময় প্রেক্ষাপটের বিবেচনায় তা অপ্রতুল। আর নারীদের জন্য স্বতন্ত্র একটি সংগঠন গঠন প্রায় একদশকের দাবী। চা বাগানে সরকার ও চা বাগান মালিকপক্ষসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংগঠন কাজ করলেও নারীদের জন্য স্বতন্ত্র একটি সংগঠন তৈরি করা একটি সময়ের দাবী।
অক্সফ্যাম ও ব্রেকিং দ্যা সাইলেন্স (বিটিএস)-এর চা বাগানের কাজের অভিজ্ঞতা ও ২৫টি বাগানের নারী ও কিশোরী দলের সাথে কাজ করার প্রেক্ষাপটে চা বাগানের নারী শ্রমিক, অন্য নারী ও কিশোরীদের জন্য একটি সংগঠন চা বাগানের প্রেক্ষাপটে বেশ বড় ভূমিকা রাখছে বলে দাবী করা হচ্ছে, যা একইসাথে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। উক্ত বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপটের বিবেচনায়, অক্সফ্যাম ও ব্রেকিং দ্যা সাইলেন্সের উদ্যোগে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শ্রীমঙ্গলে ‘আমরা পারব’ সংগঠনের আত্নপ্রকাশ ঘটে।
চা বাগানের সকল স্তরে নারী ও কিশোরীদের নির্যাতনমুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন প্রতিষ্ঠা এই সংঘের মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কয়েকটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে সংঘটি তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

– নারীর বিরুদ্ধে যেখানেই কোন অপরাধ হচ্ছে বা হবে সে বিষয়ে নিজ অবস্থান থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করা,
– নিজ বাগানে নারী ও কিশোরীদের নিয়ে ছোট দল তৈরী করে তাদেরকে অধিকার সচেতন করা এবং দলের সদস্যদের নেতৃত্বের বিকাশ ঘটানো,
– নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নির্যাতন প্রতিরোধে চা বাগানে যে সকল সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান এবং কমিটি কাজ করছে তাদের সাথে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা,
– চা বাগানে পিছিয়ে পড়া নারী ও কিশোরীদের উন্নয়নে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা,
– চা বাগানে নারী শ্রমিকদের জন্য নিরপাদ ও ন্যায্য কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করতে কাজ করা,
– চা বাগানের শিশু ও কিশোরীদের শতভাগ শিক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করা,
– চা বাগানে বাল্য বিবাহ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি ও বাল্য বিয়ে প্রতিরোধ কাজ করা,
– চা বাগানে শ্রমিক ও বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সর্বস্তরের নারীর সম-মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করা।

Manual4 Ad Code

Manual2 Ad Code

উল্লেখ্য যে, সিলেট বিভাগের ৩টি জেলার ১১টি উপজেলার ২৫টি চাবাগানে উক্ত কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করার লক্ষ্যে আমরা পারবো নারী ও কিশোরী সংগঠনের বিষয়ে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি অন্যান্য অংশীজনদের উপস্থিতিতে একটি ত্রিপক্ষীয় সভা করা হয়।

Manual8 Ad Code

সম্মেলনে আমরা পারবো নারী ও কিশোরী সংগঠনের গঠনতন্ত্রের পুনরালোচনা, চা বাগানের নারী ও শিশুদের বর্তমান সমস্যাসমহূ চিহ্নিতকরণ ও সমস্যা সমাধানে করনীয়, সংগঠনের কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন বিষয়ে আলোচনা এবং সংগঠনের কাজের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়।

উক্ত সম্মেলনে ২৫ টি চা বাগানের ১০০ জন নারী ও কিশোরী অংশগ্রহণ করেন।

উক্ত প্রকল্পের সিলেট বিভাগের দায়িত্বে থাকা প্রকল্প সমন্বয়কারী ফরহাদ আহমেদ বলেন, প্রকল্পটির উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে কয়েকটি কাজ হলো সক্ষমতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা, আমরা পারবো-নারী ও কিশোরী সংঘ গঠন, কমিউনিটির চা বাগানের নারী শ্রমিক এবং কিশোরী দলে নিয়মিত মাসিক সভা আয়োজন, চা বাগানের নারী ও কিশোরী মেয়েদের জন্য জীবন দক্ষতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ আয়োজন, জেন্ডার টক বা নারী পুরুষের বৈষম্য বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান, সমঝোতা, যোগাযোগ এবং নেতৃত্ব উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান, জেন্ডার বিষয়ে সচেতনতাবৃদ্ধির জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, সরকারি কর্তৃপক্ষ, চাবাগান মালিক ও বাচাশ্রই-এর মধ্যে ডায়ালগ সেশন আয়োজন করা, স্টেকহোল্ডারদের সাথে লার্নিং শেয়ারিং মিটিং আয়োজন করা ইত্যাদি।
উল্লেখ্য যে, প্রকল্পটি সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার এবং সিলেট জেলার ২৫টি চাবাগান নিয়ে কাজ করছে।
তিনি আরো বলেন, অক্সফ্যাম ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সহায়তায় এবং ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের উদ্যোগে গঠিত এই সংগঠনটি ইতোমধ্যেই বেশ সাড়া ফেলেছে।
তিনি উক্ত সংগঠনের কার্যপরিধি আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ুক এবং এর সাথে জড়িত সকল সমমনা ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করেন।

Manual3 Ad Code

সম্মেলনে বলা হয়, অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ এর সহায়তায় এবং ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের উদ্যোগে সিলেট বিভাগের ৩টি জেলার ১১টি উপজেলায় ২৫টি চা বগানের নারী চা শ্রমিক ও কিশোরদের সংঘ `আমরা পারব’। ২৫টি চা বাগানে ২৫টি দল রয়েছে, প্রতিটি দলে ১৫ জন নারী চা শ্রমিক ও ১০ জন করে চা শ্রমিক সন্তান কিশোরীরা আছে।
সম্মেলনের প্রস্তুতি শুরু হয় ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে সংঘের দ্বিমাসিক সভায়, এর পরবর্তীতে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারন সম্পাদক নিপেন পালকে নির্বাচন কমিশনের প্রধান সমন্বয়ক করে ৫ সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। যার অন্য সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী, সহসভাপতি জেসমিন আক্তার। বাকি দুইজন সদস্য হলেন ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের প্রকল্প কর্মকর্তা সুবর্না গোস্বামী, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স ও আমরা পারব নেটওয়ার্কের কিশোর সদস্য হ্যাপি রাজবংশী।

সকাল ১১টা থেকে শুরু হয়ে ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া চলে দুপুর ১ টা পর্যন্ত। ২৫টি চা বাগানের ১০০ জন চা শ্রমিক নারী ও কিশোরী প্রত্যক্ষ ভোটে ০৮টি পদে আগামী ২ বছরের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করেন।

নির্বাচনে সভাপতি হিসেবে জয় লাভ করেন রাধিকা বাক্তি (মাধবপুর চা বাগান), সহ-সভাপতি পদে পাপিয়া বাক্তি (মৌলভী চা বাগান), সাধারণ সম্পাদক বৈশাখী রাউতিয়া (হাবিব নগর চা বাগান), সহ-সাধারণ সম্পাদক পপি রানী পাল (সোনা রুপা চা বাগান), সাংগঠনিক সম্পাদক সন্ধ্যা রায় (রাজনগর চা বাগান), অনুষ্ঠান বিষয়ক সম্পাদক রুপা দাস (চাতলাপুর চা বাগান), অর্থ সম্পাদক রিপা কুর্মী (দেওরাছড়া চা বাগান, তথ্য ও লিঁয়াজো সম্পাদক রিপা তাঁতী (চান্দপুর চা বাগান)।

এর আগে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ০৭ জন সদস্য কার্যনির্বাহী সদস্য পদে নির্বাচিত হোন। তারা হলেন- মুন্নি রবিদাস (মির্জাপুর চা বাগান), আরতি চাষা (মির্জাপুর চা বাগান), আফিয়া বেগম (রত্না চা বাগান), সবিতা রবিদাস (সাঁতগাঁও চা বাগান), সোনালি বাড়াইক (সাঁতগাঁও চা বাগান), সঞ্জা ভূঁইয়া (রাজনগর চা বগান), আরতি বাউরি (কাপনা পাহাড় চা বাগান)।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ