জর্জ গ্রিফিন: সিআইএ’র যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু হত্যার অভিযোগ

প্রকাশিত: ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০২৫

জর্জ গ্রিফিন: সিআইএ’র যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু হত্যার অভিযোগ

Manual1 Ad Code

প্রশান্ত কুমার |

বঙ্গবন্ধুর হত্যা শুধুই কি অভ্যন্তরীণ বিষয়, না এর পেছনে আছে পরাশক্তির ভূমিকা তা নিয়ে লেখালেখি মোটামুটি খুব কমই হয়েছে। দেশের লেখকদের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তর লেখা পাওয়া যায় না। বিদেশি লেখকদের মধ্যে মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ ব্যক্তিগত উদ্যোগে একাই করে চলেছেন তথ্যানুসন্ধান। তাঁর বই “বাংলাদেশ: দি আনফিনিশড রিভলিউশনে” উঠে এসেছে কিছু চমকপ্রদ তথ্য। যদিও প্রকৃত তথ্যের জন্য এখনও প্রচুর গবেষণা বাকি।

Manual6 Ad Code

“বাংলাদেশ: দি আনফিনিশড রিভলিউশনে” দুটি ভাগের দ্বিতীয়ভাগে আছে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষয়ে। এই অংশটা লরেন্স লিফশুলজ এবং কাই বার্ড দুইজনে মিলে লিখেছেন।
তাঁরা দুইজনই প্রথম যে রহস্যময় চরিত্রকে টার্গেট করেছেন তিনি হলেন জর্জ জিবি গ্রিফিন। ভারতে তিনি মার্কিন রাজনৈতিক পরামর্শক (Political Counselor) ছিলেন। এটা ইউএসএ’র কূটনৈতিক পদগুলোর মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ।

১৯৮১ সালে জর্জ গ্রিফিনকে পুনরায় ভারতে পলিটিক্যাল কাউন্সেলর করে পাঠাতে চাইলে ভারত বিরোধিতা করে। সেসময় দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের বেশ অবনতি ঘটে। ইউএসএ-ও ভারতের একজন কূটনীতিক পার্সোনা-নন-গ্রাটা ঘোষণা করে।

২০১০ সালে ৯৪ বছর বয়সে জর্জ গ্রিফিন মৃত্যুবরণ করেন। মার্কিন কথ্য ইতিহাস সংগ্রহ প্রকল্পে তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয় ২০০২ সালে। লাইব্রেরি অফ কংগ্রেসে তাঁর এই সাক্ষাৎকারটি পাওয়া যাবে। আগ্রহী কেউ পড়ে নিতে পারেন। তাঁর সাক্ষাৎকারটিতে মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য তথ্য পাওয়া যায়।

জর্জ গ্রিফিন মূলত মার্কিন দূতাবাসে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন সিআইএ স্পাই। যদিও এটা স্বীকার করা হয়নি কোনোদিনই। ১৯৬৯-৭২ সালের কোন এক সময়ে ইন্দিরা গান্ধীর সুইজারল্যান্ড সফরের কয়েক ঘন্টা আগে তাঁর বিমানে মেকানিক্যাল ত্রুটি ধরা পড়ে। তদন্ত করে দেখা যায় বিমানের কিছু তার ছেড়া। সন্দেহ করা হয় জর্জ গ্রিফিনকে। ধারণা করা হয় জর্জ গ্রিফিন নিজেই এই কাজটা করেছেন। তাছাড়া, বিহারে ইউসিসের আন্ডারে ত্রাণ কার্যক্রম হঠাৎ করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বন্ধ করে দেন। কারণ হিসেবে শুধু এটুকুই বলেন, আপনারা অনেক করেছেন। আপনাদের ধন্যবাদ।

১৯৬২-৬৪ সালে জর্জ গ্রিফিন শ্রীলঙ্কায় ছিলেন। সেসময় শ্রীলঙ্কার বামপন্থী সরকার শ্রীলংকান ফ্রিডম পার্টি (SLFP)কে সরানোর ষড়যন্ত্র ধরে ফেলে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি। শ্রীলঙ্কায় কিছুদিন বেকার থাকার পরে তাঁকে নাইজেরিয়া পাঠানো হয়। এবং সেখানেও দুই বৃহৎ দলের প্রধানকে হত্যার পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তীতে ফিরে আসে ভারতে।

১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট বলয়ভুক্ত পূর্ব-জার্মানি থেকে বের হয় সাড়া জাগানো বই “হু ইজ ইন দ্যা সিআইএ”। রাশিয়ার প্রাভদা পত্রিকা এবং ভারতের মুম্বাইভিত্তিক বামপন্থী পত্রিকা ব্লিজ দাবি করে মার্কিন দূতাবাসের এই কূটনীতিক একজন সিআই-এর স্পাই।

কলকাতাতে তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের কিছু উচ্চপদস্থ প্রতিনিধির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে বলে মোটামুটি একটা তথ্য আমাদের জানা। প্রবাসী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিল খন্দকার মোশতাক। দেখতে ছোটখাটো ব্যক্তিত্বহীন দক্ষিণপন্থী এই লোককে খুঁজে বের করে কলকাতার মার্কিন কনস্যুলেট। তখন কনস্যুলার জেনারেল ছিলেন হার্ব গর্ডন। আর কলকাতার কনস্যুলেটে পলিটিক্যাল কাউন্সেলর ছিলেন জর্জ গ্রিফিন। কিসিঞ্জার জর্জ গ্রিফিনের মাধ্যমে প্রবাসী সরকারের সাথে একটা যোগাযোগের চেষ্টা করেন। ভারত সরকার জর্জ গ্রিফিনকে আগে থেকেই সিআই-এর এজেন্ট হিসেবে জানত কিন্তু অফিসিয়ালি কখনও প্রকাশ কিংবা স্বীকার করেনি। প্রবাসী সরকারের সাথে গোপনে মার্কিন কর্মকর্তাদের যোগাযোগের বিষয়টা যেকোনোভাবে ভারত সরকার বুঝে ফেলে এবং জর্জ গ্রিফিনকে সার্বক্ষণিক পুলিশ এবং গোয়েন্দা প্রহরায় রাখা হয়। জর্জ গ্রিফিন তাঁর সাক্ষাৎকারে সেটা স্বীকার করেছেন।

কিসিঞ্জার তাঁর “হোয়াইটহাউস ইয়ার্স” আত্মজীবনীতে স্বীকার করেছেন তাঁরা কলকাতার মার্কিন কনসাল জেনারেল হার্ব গর্ডনকে পাশ কাটিয়ে কেন জর্জ গ্রিফিনকে দিয়ে প্রবাসী সরকারের সাথে যোগাযোগ করেছেন। কিসিঞ্জার চেয়েছিলেন যোগাযোগটা আনঅফিসিয়াল হোক।

জর্জ গ্রিফিন মোশতাক আহমদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ না করে কুমিল্লার আরেকজন নেতা কাজী জহিরুল কাইয়ুমের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। ভারত, সোভিয়েতের গোয়েন্দা তৎপরতা এবং প্রবাসী সরকারের বিচক্ষণতায় সেবারের মতো মার্কিন ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচা যায়। এই ষড়যন্ত্রের সাথে মোশতাক আহমদের সাথে আর যে দুইজন লোক ছিল তারা হলো মাহবুবুল আলম চাষী আর তাহেরউদ্দিন ঠাকুর।

Manual2 Ad Code

১৯৭১ সালে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান ছিলেন জেনারেল জেএফআর জ্যাকব। ১৬ ই ডিসেম্বরের কয়েকদিন আগে জেনারেল জ্যাকব কলকাতার কূটনীতিকদের নিয়ে একটা নৈশভোজের আয়োজন করেন। সেখানে জর্জ গ্রিফিন আমন্ত্রিত ছিলেন। জেনারেল জ্যাকবের বাথরুম ইউজ করার নাম করে তিনি জ্যাকবের বেডরুমে প্রবেশ করে একটা বড়ো মানচিত্র দেখতে পান। জর্জ গ্রিফিন বলেছেন, তাঁর কাছে ক্যামেরা ছিল না কিন্তু তাঁর স্মৃতিশক্তি প্রখর। তিনি খুব তাড়াতাড়ি মানচিত্রের ওপর চোখ বুলিয়ে মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের অবস্থান বুঝে ফেলেন। মিত্রবাহিনীর সৈন্য তখন ব্রহ্মপুত্র নদ পার হয়ে গেছে। জর্জ গ্রিফিন কনস্যুলেটে এসে খুব দ্রূত সেটা পাকিস্তানে মার্কিন দূতাবাসে এবং ইউএসএর স্টেট ডিপার্টমেন্টে জানিয়ে দেন।

Manual3 Ad Code

মুক্তিযুদ্ধের পরে তিনি কিছুদিন পাকিস্তানে ছিলেন। তারপর স্টেট ডিপার্টমেন্টে নিয়োগ পান। ধারণা করা হয় মুক্তিযুদ্ধকালে ষড়যন্ত্রকারী মোশতাক আহমদ, মাহবুবুল আলম চাষী এবং তাহের উদ্দিন ঠাকুর পরবর্তীতেও জর্জ গ্রিফিনের সাথে যোগাযোগ করে আসছিল।

সিআইএ পৃথিবীর দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে একটা। চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে হত্যার পরে সিআইএ অনেক বেশি সাবধান হয়ে যায়। কারণ ইউএসএ-তেও এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের সমর্থন হারাচ্ছিল। সে কারণে তৎপরবর্তী সিআইএ কর্তৃক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর ডকুমেন্ট এরা সংরক্ষণ করে না।

Manual7 Ad Code

অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা মুজিবহত্যা ইউএসএর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ছিল না। কিন্তু হেনরি কিসিঞ্জার এবং নিক্সন প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে মুজিবহত্যায় জড়িত হতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশের স্বাধীনতা হেনরি কিসিঞ্জারের জীবনে সবচেয়ে বড়ো ব্যর্থতা।

পরবর্তী লেখায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

তথ্যসূত্র:
মার্কিন দলিলে মুজিবহত্যা, মিজানুর রহমান খান
বাংলাদেশ: দি আনফিনিশড রিভলিউশনে, লরেন্স লিফশুলজ এবং কাই বার্ড
জর্জ গ্রিফিনের সাক্ষাৎকার
হেনরি কিসিঞ্জারের “হোয়াইট হাউস ইয়ার্স” এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ