সিলেট ২৩শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:২০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০২৫
বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা, ১০ অক্টোবর ২০২৫ : দেশের শিশুসাহিত্য, সাংবাদিকতা ও ছড়ার জগতে এক অনন্য নাম রফিকুল হক দাদুভাই। আজ তাঁর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। শিশুমন, ছড়া, সংগঠন ও সাংবাদিকতায় রেখে যাওয়া তাঁর অসামান্য অবদান আজও নবপ্রজন্মের কাছে প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
২০২১ সালের ১০ অক্টোবর সকাল পৌনে ১১টার দিকে রাজধানীর মুগদার নিজ বাসায় পরলোকগমন করেন এই কিংবদন্তি ছড়াকার ও সাংবাদিক। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। জন্ম ১৯৩৭ সালের ৮ জানুয়ারি, রংপুর জেলার কামালকাচনা গ্রামে। জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক, সাংবাদিক ও শিশু সংগঠক—সব মিলিয়ে এক প্রজন্মের সাংস্কৃতিক পথপ্রদর্শক।
‘দাদুভাই’ হয়ে ওঠার গল্প
সত্তরের দশকে দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় শিশুদের জন্য ‘চাঁদের হাট’ নামে একটি সাপ্তাহিক পাতা প্রকাশের মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার প্রিয় “দাদুভাই”। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শিশু-কিশোর সংগঠন ‘চাঁদের হাট’, যা দেশের শিশু আন্দোলনের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক সংযোজন। সেই সময়ের অসংখ্য শিশু আজ দেশের বিশিষ্ট লেখক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, যারা দাদুভাইয়ের হাত ধরে লেখালেখি ও সৃজনশীলতার পথে পা রেখেছিলেন।
সাংবাদিকতার পথচলা
রফিকুল হক দাদুভাইয়ের সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা ষাটের দশকে। তিনি কাজ করেছেন দেশের খ্যাতনামা বহু দৈনিকে—আজাদ, লাল-সবুজ, বাংলাদেশ অবজারভার, জনতা, রূপালী ও যুগান্তর-এ।
দৈনিক রূপালী পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক এবং পরবর্তীতে দৈনিক জনতা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
নব্বইয়ের দশকে প্রতিষ্ঠিত দৈনিক যুগান্তর-এর ফিচার এডিটর হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এবং পত্রিকাটির ফিচার পাতাগুলোকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
ছড়া, কবিতা ও নাটকে অবদান
ছড়ার সহজ অথচ গভীর বাণী ছিল তাঁর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য। বঙ্গবন্ধুর লন্ডন থেকে দেশে প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে ১৯৭২ সালে পূর্বদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর কবিতা ‘ঘরে ফিরা আইসো বন্ধু’ দেশব্যাপী আলোড়ন তোলে।
আশির দশকে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য লিখেছিলেন জনপ্রিয় নাটক ‘নিধুয়া পাথার কান্দে’, যা ব্যাপক প্রশংসিত হয়। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা সাতটি, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘বর্গি এলো দেশে’ এবং ‘চাঁদের হাটের ছড়া’।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
বাংলা শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য রফিকুল হক দাদুভাই ২০০৯ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। একই বছর তিনি পান বাংলাদেশ শিশু একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, চন্দ্রাবতী একাডেমি পুরস্কার ও নিখিল ভারত শিশুসাহিত্য পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশের নানা সম্মাননা।
ব্যক্তিজীবনে
রফিকুল হক দাদুভাই ছিলেন এক অনাড়ম্বর, বিনয়ী ও শিশুসুলভ প্রাণের অধিকারী মানুষ। তাঁর দুই পুত্র ও এক কন্যা রয়েছে; বড় ছেলে বর্তমানে দেশের বাইরে বসবাস করছেন।
শিশুদের নিয়ে তাঁর আগ্রহ ও ভালোবাসা তাঁকে করে তুলেছিল ‘দাদুভাই’—একটি প্রজন্মের প্রিয় নাম, যিনি সবার কাছেই ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাগুরু ও পরামর্শদাতা।
বিনম্র শ্রদ্ধা
তাঁর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন দেশের নানা অঙ্গনের মানুষ।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নূর আহমদ বকুল এক যৌথ বিবৃতিতে দাদুভাইয়ের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জ্ঞাপন করেছেন।
যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার প্রকাশক অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এবং যুগান্তর-এর সম্পাদক আব্দুল হাই শিকদারও এক বিবৃতিতে দাদুভাইয়ের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
এছাড়া দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথা-র বিশেষ প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, “রফিকুল হক দাদুভাই ছিলেন শিশুপ্রাণ এক যুগপুরুষ, যাঁর ছড়ায় ও কর্মে বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য পেয়েছে নতুন দিকনির্দেশনা।”
শেষ কথা
রফিকুল হক দাদুভাইয়ের জীবন ছিল শিশুর হাসির মতো নির্মল ও সৃজনশীলতার দীপ্তিতে উজ্জ্বল। তাঁর ছড়া, তাঁর ‘চাঁদের হাট’ এবং তাঁর সাংবাদিকতা চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে নতুন প্রজন্মের কাছে।
শিশুপ্রাণ এই মানুষটির প্রতি আজ জাতির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা—
চাঁদের হাটের দাদুভাই, তুমি থাকবে চিরদিন শিশুদের হৃদয়ে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি