ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে শহীদ হয়েছিলেন ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ

প্রকাশিত: ২:৪৮ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৭, ২০২৬

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে শহীদ হয়েছিলেন ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ

Manual6 Ad Code

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে শহীদ হয়েছিলেন ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ। আজ তাঁর ১৬৮তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা।
ঝাঁসির রাণী তার সহজাত সৌন্দর্য্য, বুদ্ধিমত্তা এবং অসাধারণ অধ্যবসায়ের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। যদিও জেনারেল হিউজ রোজের মতে, “তিনি ছিলেন বিদ্রোহী সকল নেতা-নেত্রীর তুলনায় সবচেয়ে বিপজ্জনক।”

১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুন ভারতের গোয়ালিয়রে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে শহীদ হন ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের অন্যতম পথিকৃত তিনি।
ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিপ্লবী নেতা এবং ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের অন্যতম পথিকৃত হিসেবে চিরস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব লক্ষ্মী বাঈ। অন্যায়-অবিচার আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক নারীর অসাধারণ প্রতীক হয়ে আছেন ঐতিহাসিক নারী চরিত্র ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ। ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিপ্লবী নেতা হিসেবে চিরস্মরণীয় কিংবদন্তি হয়ে রয়েছেন। এছাড়াও তিনি ঝাঁসীর রাণী বা ঝাঁসী কি রাণী হিসেবেও সর্বসাধারণের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত।
ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের অন্যতম প্রতিমূর্তি ও পথিকৃৎ হয়ে রয়েছেন তিনি।
মারাঠা শাসনাধীন ঝাঁসী ভারতের উত্তরাংশে অবস্থিত।
জন্মকালীন সময়ে তার প্রকৃত নাম ছিল মণিকর্ণিকা তামবে এবং ডাক নাম মনু। তিনি মহারাষ্ট্রের মারাঠী করাডে ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯ নভেম্বর, ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে কাশী (বারানসী) এলাকায় তার জন্ম। তার বাবার নাম ‘মরুপান্ত তাম্বে’ এবং মা ‘ভাগীরথী বাঈ তাম্বে’। চার বছর বয়সেই তিনি মাতৃহারা হন। পারিবারিক পরিবেশে বাড়িতে শিক্ষালাভ করেন লক্ষ্মী বাঈ। বিথুরের পেশোয়া আদালতে কর্মজীবন অতিবাহিত করেন তার পিতা। সেখানে পরবর্তীতে নিজ কন্যাকে মনের মতো করে গড়ে তুলতে থাকেন মরুপান্ত তাম্বে। লক্ষ্মী বাঈকে ছাবিলি নামে ডাকতেন পেশোয়া, যার অর্থ “ক্রীড়াপ্রেমি সুন্দরী কন্যা”।
বাবা কোর্টের কাজ-কর্মে জড়িত থাকায় রাণী লক্ষ্মী বাঈ ঐ সময়ের অধিকাংশ নারীদের তুলনায় অধিক স্বাধীনতা ভোগ করতে পেরেছিলেন। আত্মরক্ষামূলক শিক্ষালাভের পাশাপাশি ঘোড়া চালনা, আর্চারী শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন তিনি। এছাড়াও তিনি তার বান্ধবীদেরকে নিয়ে নিজস্ব একটি বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন।
১৮৪২ সালে ঝাঁসীর মহারাজা গঙ্গাধর রাও নিওয়াকরের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন লক্ষ্মী বাঈ। এভাবেই তিনি ঝাঁসীর রাণী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বিয়ের পরই তার নতুন নামকরণ হয় লক্ষ্মী বাঈ হিসেবে। ১৮৫১ সালে তাদের একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। নাম রাখা হয় দামোদর রাও। চার মাস পর সন্তানটি মারা যায়। পুত্র শোক ভুলতে রাজা এবং রাণী উভয়েই আনন্দ রাওকে দত্তক নেন। আনন্দ রাও ছিলেন গঙ্গাধর রাওয়ের জ্যেঠাতো ভাইয়ের ছেলে। জীবিত থাকা অবস্থায় ঝাঁসীর রাজা তার পুত্রের মৃত্যু রহস্য কখনো উদ্‌ঘাটন করতে পারেননি। ঝাঁসীর মহারাজা গঙ্গাধর রাও ২১ নভেম্বর, ১৮৫৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
আনন্দ রাওকে দত্তক নেয়ায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসী’র দখল স্বত্ত্ব বিলোপ নীতির কারণে তার সিংহাসন আরোহণে প্রতিবন্ধকতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ডালহৌসী জানান যে, ঝাঁসীর সিংহাসনে প্রকৃত উত্তরাধিকারী নেই এবং ঝাঁসীকে কোম্পানীর নিয়ন্ত্রণাধীনে নেয়া হবে। মার্চ, ১৮৫৪ সালে ঝাঁসীর রাণীর নামে বার্ষিক ৬০,০০০ ভারতীয় রূপি ভাতা হিসেবে মঞ্জুর করা হয় এবং ঝাঁসীর কেল্লা পরিত্যাগ করার জন্য হুকুম জারী হয়।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ
ঊনবিংশ শতাব্দীর কালীঘাট চিত্রকলায় লক্ষ্মীবাঈ
১০ মে ১৮৫৭ সাল। ঐদিন মিরাটে ভারতীয় বিদ্রোহের সূচনা ঘটে। চারদিকে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, লি ইনফিল্ড রাইফেলের আচ্ছাদনে শুকরের মাংস এবং গরুর চর্বি ব্যবহার করা হয়। এরপরও ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী রাইফেলে শুকরের মাংস এবং গরুর চর্বির ব্যবহার অব্যাহত রাখে। তারা বিবৃতি দেয় যে, যারা উক্ত রাইফেল ব্যবহারে অসম্মতি জানাবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এবং আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও শুরু করে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। এই বিদ্রোহে সিপাহীরা অনেক ব্রিটিশ সৈন্যসহ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীতে নিযুক্ত কর্মকর্তাদেরকে হত্যা করে।
ঐ সময়ে লক্ষ্মী বাঈ তার বাহিনীকে নিরাপদে ও অক্ষত অবস্থায় ঝাঁসী ত্যাগ করাতে পেরেছিলেন। সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী প্রবল গণআন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এই চরম মুহুর্তে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ অন্যত্র মনোযোগের চেষ্টা চালায়। লক্ষ্মী বাঈ একাকী ঝাঁসী ত্যাগ করেন। তার নেতৃত্বে ঝাঁসী শান্ত ও শান্তিপূর্ণ অবস্থা বজায় রয়েছিল। হলদী-কুমকুম অনুষ্ঠানে ঝাঁসীর রমণীরা শপথ গ্রহণ করেছিল যে, যে-কোন আক্রমণকেই তারা মোকাবেলা করবে এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণকে তারা ভয় পায় না।
এ প্রেক্ষাপটে তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনায় দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়েন।
৮ জুন, ১৮৫৭ সালে জোখন বাগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীতে কর্মরত কর্মকর্তাসহ স্ত্রী-সন্তানদের উপর গণহত্যার বিষয়ে তার ভূমিকা নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। অবশেষে তার দ্বিধাগ্রস্থতা কেটে যায় যখন ব্রিটিশ সৈন্যরা স্যার হিউজ রোজের (লর্ড স্ট্রাথনায়র্ন) নেতৃত্বে ঘাঁটি গেড়ে বসে এবং ২৩ মার্চ, ১৮৫৮ তারিখে ঝাঁসী অবরোধ করে। লক্ষ্মী বাঈ তার বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেন এবং এ অবরোধের প্রেক্ষাপটে তিনি প্রচণ্ডভাবে ক্রুদ্ধ হয়ে পড়েন। ঝাঁসী এবং লক্ষ্মী বাঈকে মুক্ত করতে বিশ হাজার সৈনিকের নিজস্ব একটি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অন্যতম বিদ্রোহী নেতা তাতিয়া তোপে। তবে, ব্রিটিশ সৈন্যদলে সৈনিকের সংখ্যা ছিল মাত্র ১,৫৪০জন। স্বল্প সৈনিক থাকা স্বত্ত্বেও তাতিয়া তোপে ব্রিটিশ সৈন্যদের অবরোধ ভাঙ্গতে পারেননি। ব্রিটিশ সৈনিকেরা ছিল প্রশিক্ষিত এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ যা প্রতিপক্ষের আনাড়ী ও অনভিজ্ঞ সৈনিকেরা তাদের ৩১ মার্চের আক্রমণে টিকতে পারেনি। লক্ষ্মী বাঈয়ের নিজস্ব বাহিনী এ আক্রমণ সহ্য করতে পারেনি। আক্রমণের তিন দিন পর ব্রিটিশ সৈন্যদল দুর্গের দেয়ালে ফাটল ধরায় এবং ঝাঁসী শহরটি করায়ত্ব করে নেয়। এর পূর্বেই এক রাতে দুর্গের দেয়াল থেকে সন্তানসহ লাফ দিয়ে লক্ষ্মী বাঈ প্রাণরক্ষা করেন। ঐ সময় তাকে ঘিরে রেখেছিল তার নিজস্ব একটি দল, যার অধিকাংশই ছিল নারী সদস্য।
আনন্দ রাওকে সাথে নিয়ে রাণী তার বাহিনী সহযোগে বাণিজ্যিক বিনিয়োগের উর্বর ক্ষেত্র কাল্পীতে যান। সেখানে তিনি অন্যান্য বিদ্রোহী বাহিনীর সাথে যোগ দেন। তাতিয়া তোপের নেতৃত্বেও একটি বিদ্রোহী দল ছিল। এরপর রাণী লক্ষ্মী বাঈ এবং তাতিয়া তোপে গোয়ালিয়রের দিকে রওনা দেন। সেখানে তাদের যৌথবাহিনী গোয়ালিয়রের মহারাজার দলকে পরাজিত করে। পরাজিত বাহিনীর সদস্যরা পরবর্তীতে যৌথবাহিনীর সাথে একত্রিত হয়। তারপর কৌশলগত অবস্থানে থাকা গোয়ালিয়রের কেল্লা দখল করে বাঈ এবং তোপের সম্মিলিত বাহিনী। ১৭ জুন, ১৮৫৮ সালে ফুল বাগ এলাকার কাছাকাছি কোটাহ-কি সেরাইয়ে রাজকীয় বাহিনীর সাথে পূর্ণোদ্দম্যে যুদ্ধ চালিয়ে শহীদ হন রাণী। পরবর্তীতে আরো তিনদিন পর ব্রিটিশ সেনাদল গোয়ালিয়র পুণর্দখল করে। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের পক্ষে জেনারেল হিউজ রোজ তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে,”রাণী তার সহজাত সৌন্দর্য্য, চতুরতা এবং অসাধারণ অধ্যবসায়ের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। এছাড়াও, তিনি বিদ্রোহী সকল নেতা-নেত্রীর তুলনায় সবচেয়ে বিপজ্জনক ছিলেন। ”
কীর্তিগাথা
রাণী লক্ষ্মী বাঈ ভারতবর্ষের ‘জাতীয় বীরাঙ্গনা’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পান। তাকে ভারতীয় রমণীদের সাহসী প্রতীক ও প্রতিকল্প হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। সুভাষ চন্দ্র বসু’র নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম নারী দলের নামকরণ করেন রাণী লক্ষ্মী বাঈকে স্মরণপূর্ব্বক।
ভারতীয় মহিলা কবি সুভদ্রা কুমারী চৌহান (১৯০৪-১৯৪৮) রাণী লক্ষ্মী বাঈকে স্মরণ করে একটি কবিতা লিখেন। কবিতার নামকরণ করা হয় ঝাঁসী কি রাণী, যাতে জাতীয় বীরাঙ্গনা হিসেবে তাকে উল্লেখ করেছেন তিনি।
১৮৭৮ সালে কর্ণেল ম্যালসন লিখিত “দ্য হিস্ট্রি অব দ্য ইন্ডিয়ান মুটিনি” পুস্তকে লক্ষ্মী বাঈ বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি লিখেন, “ … তার জনগণ সর্বদাই তাঁকে স্মরণ করবে। তিনি নিষ্ঠুরতাকে বিদ্রোহের পর্যায়ে উন্নীত করার মাধ্যমে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি জীবিত আছেন এবং স্বীয় মাতৃভূমির জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। ”
সাম্প্রতিককালে, ২১ জুলাই, ২০১১ তারিখে লক্ষ্মী বাঈকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ জন ডানপিটে রমণীদের একজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা তাদের স্বামীদের কাছ থেকে সক্রিয় সহযোগিতা পেয়েছিলেন। টাইম ম্যাগাজিনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। তালিকায় ঝাঁসীর রাণীর অবস্থান ছিল ৮ম।
ব্রোঞ্জ মূর্তিতে খচিত ভাস্কর্য্যে রানী লক্ষ্মী বাঈকে ঝাঁসী এবং গোয়ালিয়র – উভয় শহরেই ঘোড়ায় আরোহিত অবস্থায় অঙ্কিত করা হয়েছে।
সাহিত্য কর্মে
জর্জ ম্যাকডোনাল্ড ফ্রেজার রচিত “ফ্ল্যাশম্যান ইন দ্য গ্রেট গেম” শীর্ষক ঐতিহাসিক ও কাল্পনিক উপন্যাসে ভারতীয়দের আন্দোলন সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে ফ্ল্যাশম্যান এবং রাণী লক্ষ্মী বাঈয়ের মধ্যে অনেকগুলো বৈঠকের কথা তুলে ধরা হয়।
মাইকেল ডি গ্রেস কর্তৃক ফরাসী ভাষায় লিখিত “লা ফ্যামে সেক্রি” উপন্যাসে ঝাঁসীর রাণীর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তুলে ধরা হয়। এতে রাণী এবং একজন ইংরেজ আইনজীবির মধ্যেকার ঘনিষ্ঠতা তুলে ধরা হয়।
২০০৭ সালে জয়শ্রী মিশ্র ইংরেজি ভাষায় “রাণী” নামে একটি উপন্যাস রচনা করেন।
জন মাস্টার লিখিত নাইটরানার্স অব বেঙ্গল উপন্যাসে রডনি স্যাভেজ নামীয় এক ব্রিটিশ অফিসার এবং রানী লক্ষ্মী বাঈয়ের সম্পর্ককে ঘিরে রচিত হয়েছে।
জানুয়ারী, ১৯৫১ তে প্রকাশিত বইটি অ্যামেরিকান লিটারেরি গিল্ড’সে মাসের সেরা বই হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বইটি বেশ কিছু সমালোচনার সম্মুখীন হয়। এটি ছিল ঐতিহাসিক উপন্যাসের একটি ধারা যা ভারতে একটি ব্রিটিশ পরিবারের অংশগ্রহণ নিয়ে রচিত।
অগ্নিশিখার অমর গাথা, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে শহীদ ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাঈ স্মরণে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা—

“ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাঈ”

আজও জুনের সতেরো তারিখ এলে মনে পড়ে,
গোয়ালিয়রের রণপ্রান্তর রক্তে ওঠে ঝরে।
ধূলির বুকে ঘোড়ার ক্ষুরের বজ্রনিনাদ বাজে,
এক বীরাঙ্গনা ইতিহাসের দীপ্ত অগ্নি সাজে।
তিনি শুধু রাণী নন, ছিলেন যুগের ডাক,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে যিনি তুলেছিলেন ফাঁক।
শৃঙ্খলভাঙা স্বাধীনতার প্রথম জাগরণ,
তাঁরই হাতে পেয়েছিল এক অগ্নিময় চরণ।
কাশীর পুণ্য ঘাটের কাছে জন্ম নিল মনু,
শৈশব জুড়ে সাহস ছিল নক্ষত্রসম ধনু।
মরুপান্তের স্নেহের ছায়া, মায়ের কোমল গান,
চার বছরেই হারালেন মা, তবু হারেনি প্রাণ।
বিথুর নগর সাক্ষী আছে সেই দুরন্ত দিন,
ঘোড়ার পিঠে উড়ত মনু, ছিল না কোনো ঋণ।
তরবারির ঝলক দেখে চমকাত আকাশ,
ধনুক হাতে লক্ষ্যভেদে পেতেন অনাবিল আশ।
ছাবিলি নাম দিয়েছিলেন পেশোয়া আদরে,
দেখেছিলেন দীপ্ত ভবিষ্যৎ শিশুর অন্তরে।
ক্রীড়াপ্রিয় সেই কন্যাটি বেড়ে উঠল ধীরে,
ঝড়ের মুখে দাঁড়াবারই শিক্ষা নিল নীরে।
ঝাঁসির রাজার সঙ্গে পরে বিবাহবন্ধন হয়,
লক্ষ্মীবাঈ নামটি তখন পেল নব পরিচয়।
রাজপ্রাসাদ আলো করে এলেন মহীয়সী,
জনতারও হৃদয়জুড়ে হলেন তিনি বসি।
দামোদর নাম পুত্র এলো আশার প্রদীপ হয়ে,
চার মাস পরে নিভে গেল সে অশ্রুর স্রোতে বয়ে।
পুত্রশোকে রাজপ্রাসাদ হলো নিঃস্ব নীরব,
তবু জীবনের সংগ্রামে ছিলেন সদা গরব।
আনন্দ রাও দত্তক নিলেন উত্তরাধিকারে,
কিন্তু তখন কোম্পানি দাঁড়াল হিংস্র দ্বারে।
ডালহৌসির দখলনীতির নিষ্ঠুর কালো হাত,
ঝাঁসির উপর নামিয়ে দিল শোষণ-অন্ধ রাত।
বলল তারা—“উত্তরাধিকার নেই তো সিংহাসনে,”
লোভের বিষে ডুবিয়ে দিল ন্যায়ের সব ভাষণে।
রাণী তখন দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন,
“আমার ঝাঁসি আমি দেব না”—শপথ বুকে নিলেন।
আঠারো শত সাতান্নর সেই অগ্নিবর্ষা কাল,
মিরাট থেকে ছড়িয়ে পড়ে বিদ্রোহের জ্বলাল।
সিপাহিদের ক্রোধে কাঁপে সাম্রাজ্যের ভিত,
ভারতজুড়ে জেগে ওঠে স্বাধীনতার রীত।
গরুর চর্বি, শুকরের চর্বি কার্তুজে অপমান,
ধর্মে আঘাত, মর্যাদাহানি, ক্ষুব্ধ সমগ্র প্রাণ।
জমে থাকা শত বঞ্চনা আগুন হয়ে জ্বলে,
শৃঙ্খল ভাঙার মন্ত্র তখন মুখে মুখে চলে।
ঝাঁসির নারী শপথ নিল হলুদ-কুমকুম মেখে,
শত্রু এলে রুখবে সবাই মৃত্যুকে কাছে ডেকে।
রাণীর ডাকে কৃষক, সৈন্য, জনতা একসার,
দেশরক্ষার অঙ্গীকারে প্রস্তুত বারবার।
হিউজ রোজের সেনাবাহিনী এগিয়ে এল শেষে,
কামানের মুখ তাক করা ঝাঁসির দুর্গদেশে।
তেইশে মার্চ অবরোধে ঘিরল চারি দিক,
তবু রাণীর কণ্ঠে ছিল অদম্য দৃঢ় ঠিক।
প্রাচীর জুড়ে আগুন ঝরে, কাঁপে নগরবাসী,
তবু ভয়ের কাছে মাথা নত করেননি রাণী।
যুদ্ধমুখী প্রতিটি ক্ষণ বজ্রের মতো কঠিন,
দুর্গের ভেতর প্রতিরোধে জেগে ওঠে দিন।
তাতিয়া তোপে এগিয়ে এলেন বিশাল সৈন্য লয়ে,
বন্ধু হয়ে দাঁড়ালেন তিনি মুক্তির স্বপ্ন বয়ে।
তবু শত্রুর প্রশিক্ষিত বাহু, কামান, বল,
রুখতে গিয়ে বিদ্রোহীদের রক্তে ভিজল চল।
দুর্গপ্রাচীর ভাঙল শেষে কামানেরই ঘায়ে,
ঝাঁসি নগর দখল নিল সাম্রাজ্যবাদী ছায়ে।
রাত্রির বুকে সন্তান নিয়ে প্রাচীর ডিঙিয়ে,
রাণী গেলেন ইতিহাসের নতুন পথটি নিয়ে।
সঙ্গে ছিল নারীযোদ্ধা, সাহসী অনুচর,
মৃত্যুকে যে তুচ্ছ করেছে বারবার নির্ভর।
কাল্পীর পথে মিলল গিয়ে বিদ্রোহীদের দল,
স্বাধীনতার স্বপ্ন তখন আরও হলো টল।
তাতিয়া তোপে, রাণী মিলল এক পতাকার তলে,
গোয়ালিয়রের দুর্গ তখন ডাকল নতুন ছলে।
যৌথবাহিনী ঝড়ের মতো আঘাত হানে গিয়ে,
রাজশক্তির দুর্গ দখল নেয় সংগ্রামে জিতে।
কৌশলগত সেই বিজয় কাঁপাল শত্রুশিবির,
মুক্তির আশা ছড়িয়ে পড়ে জনমানসে ধীর।
কিন্তু সামনে অপেক্ষাতে আরও কঠিন ক্ষণ,
ইতিহাসের পাতায় লেখা রক্তাক্ত সেই বন।
ফুলবাগেরই অদূরেতে কোটাহ-কি-সেরাই,
সেখানে এক মহাযুদ্ধে বাজল মৃত্যুশঙ্খ তাই।
সতেরোই জুন, আঠারো শত আটান্নর দিন,
রাণী তখন রণাঙ্গনে প্রজ্বলিত অগ্নিচিন।
তরবারির ঝলক নাচে বিদ্যুতেরই মতো,
শত্রুসেনা দেখল যেন দুর্জয় দেবী যত।
ঘোড়ার পিঠে বজ্রবেগে ছুটে চলেন তিনি,
মাতৃভূমির মুক্তির তরে উৎসর্গিত ঋণী।
রক্ত ঝরল, তবু চোখে পরাজয়ের ছাপ নেই,
অগ্নিশিখার মতো জ্বলে শেষ নিঃশ্বাস সেই।
শহীদ হলেন, কিন্তু তাতে নিভল না তাঁর নাম,
ভারতমাতার কপালজুড়ে জ্বলে অমর ধাম।
তিন দিন পরে শত্রুবাহিনী পুনরায় দখল নেয়,
তবু রাণীর অমরগাথা কেড়ে নিতে কে চায়?
হিউজ রোজও স্বীকার করে লিখেছিল প্রতিবেদনে—
“সবচেয়ে বিপজ্জনক নেতা”—শ্রদ্ধা মিশ্রিত বচনে।
যে শত্রুও সম্মান করে প্রতিপক্ষের তেজ,
বোঝা যায় কত দুর্লভ ছিল সেই সংগ্রামী রেজ।
সৌন্দর্য আর বুদ্ধিমত্তা, অধ্যবসায় দীপ্ত,
তাঁরই মাঝে একাকার হয়েছিল মহাশক্ত।
আজাদ হিন্দ ফৌজ যখন স্বাধীনতার গান,
নারীবাহিনীর নাম রেখেছিল তাঁরই সম্মান।
সুভাষবাবুর স্বপ্নসেনা বহন করে স্মৃতি,
লক্ষ্মীবাঈ জাগিয়ে রাখেন সাহসের অমৃতি।
সুভদ্রা কুমারী চৌহান লিখেছিলেন কবিতা,
“খুব লড়ি মর্দানি”—সেই অমর উচ্চারিতা।
লোককথাতে, গাথাগীতে, গ্রন্থের পর গ্রন্থে,
রাণীর নাম অম্লান হয়ে জেগে থাকে অন্তে।
মহাশ্বেতার কলম জুড়ে তাঁর ইতিহাস জাগে,
গবেষণার আলোকরেখা ছড়ায় অনুরাগে।
চলচ্চিত্রে, উপন্যাসে, নাট্যরূপের মাঝে,
ঝাঁসির রাণী বারবারই ফিরে আসেন সাজে।
কিন্তু শুধু কিংবদন্তি নন তিনি কোনোদিন,
অধিকারহারা মানুষেরই প্রতিবাদের ঋণ।
নারী মানে অবলা শুধু—এই মিথ্যের শেষ,
তাঁরই জীবন লিখে গেছে প্রতিরোধের দেশ।
যেখানে আছে শোষণ, লুণ্ঠন, অবিচার,
সেখানে রাণী লক্ষ্মীবাঈ জাগান অগ্নিধার।
যেখানে মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে ধরে,
সেখানে তাঁর অশ্বধ্বনি আজও বাজে ঘরে।
জাতি, ধর্ম, বর্ণ পেরিয়ে তিনি সংগ্রামের গান,
তিনি সাহস, তিনি শপথ, তিনি জাগ্রত প্রাণ।
তিনি বলেন—“মাথা নত নয় অত্যাচারীর তরে,”
তিনি বলেন—“স্বাধীনতা জন্মাধিকারে ভরে।”
আজ তাঁরই শাহাদাতের শতবর্ষ পেরিয়ে,
শ্রদ্ধার ফুল রাখি আমরা ইতিহাসের নীড়ে।
গোয়ালিয়রের রক্তমাটি, ঝাঁসির দুর্গপ্রাচীর,
স্মরণ করে অগ্নিকন্যা, সংগ্রামের সেই নক্ষত্র।
যতদিন অন্যায় দেখে মানুষ রুখে দাঁড়ায়,
যতদিন মুক্তির স্বপ্ন দিগন্তজুড়ে গায়,
ততদিন রাণী লক্ষ্মীবাঈ বেঁচে থাকবেন ধ্রুব,
স্বাধীনতার মহাকাব্যে উজ্জ্বল অনির্বচনীয় শুভ।
শহীদেরা মরে না কখনও, বদলায় শুধু রূপ,
জনতারই চেতনার মাঝে জ্বালে আলোর ধূপ।
ঝাঁসির রাণী, অগ্নিবীণা, ইতিহাসের বাণী—
অমর তুমি, অম্লান তুমি, ভারতভূমির রাণী।
অমর তুমি, সংগ্রামেরই দীপশিখা মহান,
শতাব্দী পেরিয়েও তুমি স্বাধীনতার প্রাণ।
—(ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাঈ,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)
ঐতিহাসিক গ্রন্থ
মহাশ্বেতা দেবী “ঝাঁসী কি রাণী” নামে একটি বই লিখেছেন। বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন সাগরী এবং মন্দিরা সেনগুপ্তা। উক্ত বইয়ে রাণী লক্ষ্মী বাঈ সম্বন্ধে ব্যাপক ও বিস্তৃতভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। এতে ঐতিহাসিক দলিলপত্রাদি, প্রচলিত লোকগাঁথা, কবিতাসমগ্র এবং মুখে মুখে চলে আসা বিভিন্ন তথ্যাবলী সমন্বয় করার মাধ্যমে গবেষণা করা হয়। ঐতিহাসিক দলিলগুলোর অধিকাংশই ঝাঁসীর রাণীর নাতি জি.সি. তাম্বের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। বাংলা ভাষায় লিখিত মূল বইটি ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয়, যার আইএসবিএন নং হলোঃ ৮১-৭০৪৬-১৭৫-৮।
চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন ধারাবাহিকে
দ্য টাইগার এণ্ড দ্য ফ্লেম (বাঘ এবং শিখা) ১৯৫৩ সালে ভারতে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম টেকনিকালার চলচ্চিত্রের একটি। ছবিটির পরিচালক ও নির্দেশক ছিলেন চলচ্চিত্রকার সোহরাব মোদী।
ঝাঁসী কি রাণী, টেলিভিশন সিরিজ।
কেতন মেহতা নির্মিত ছবি দ্য রেবেল বা বিদ্রোহী। মঙ্গল পান্ডেঃ দ্য রাইজিং ছবির একটি সহযোগী চলচ্চিত্র এটি। ফারুখ ধোন্দী’র চন্দ্র প্রকাশ দিবেদী পুস্তক অবলম্বনে এর চিত্রনাট্য রচিত হয়েছে।
২০১৮ সালে রাধা কৃষ্ণ ও জগরলামুদি মণিকর্ণিকাঃ দ্যা কুইন অফ ঝাঁসি নির্মাণ করেন।
#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ