কমরেড জাহেদুল হক মিলু শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পথপ্রদর্শক: রতন

প্রকাশিত: ৯:৩০ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৫, ২০২৬

কমরেড জাহেদুল হক মিলু শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পথপ্রদর্শক: রতন

Manual8 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১৫ জুন ২০২৬ : বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন বলেছেন, “শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কমরেড জাহেদুল হক মিলুর জীবন ও রাজনৈতিক ভূমিকা নিপীড়িত মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস এবং পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁর আজীবন সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের কর্মীদের জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।”

Manual6 Ad Code

কমরেড জাহেদুল হক মিলুর ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এক স্মরণসভায় তিনি এসব কথা বলেন।

রবিবার (১৪ জুন ২০২৬) বিকেল ৫টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচাস্থ ভ্যানগার্ড মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক, শ্রমিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।

সভায় সভাপতিত্ব করেন বাসদ কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ এবং সঞ্চালনা করেন দলের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কমরেড নিখিল দাস।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কমরেড আব্দুল কুদ্দুস, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড আব্দুর রাজ্জাক, অধ্যক্ষ ওয়াজেদ পারভেজ, কমরেড শম্পা বসুসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

শ্রমিক আন্দোলনের নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক

বক্তারা বলেন, কমরেড জাহেদুল হক মিলু ছিলেন বাংলাদেশের বামপন্থী আন্দোলনের একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক এবং শ্রমিক শ্রেণির অকৃত্রিম বন্ধু। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না; বরং শ্রমজীবী মানুষের জীবন-সংগ্রামের সঙ্গে নিজেকে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করেছিলেন। ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা, আরাম-আয়েশ কিংবা ক্ষমতার মোহকে পাশ কাটিয়ে তিনি জনগণের মুক্তির আন্দোলনকে নিজের জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন মেধাবী, সংস্কৃতিমনা ও সমাজসচেতন। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শোষণ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে ধারণ করে তিনি সত্তরের দশকে তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং জাসদ ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দেন।

বাসদ গঠনের শুরু থেকেই সক্রিয়

Manual1 Ad Code

নেতৃবৃন্দ স্মরণ করেন, ১৯৮০ সালে বিপ্লবী রাজনৈতিক দল হিসেবে বাসদের আত্মপ্রকাশের পর থেকেই কমরেড মিলু সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংগঠন গড়ে তোলা, শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে শক্তিশালী করা এবং বামপন্থী রাজনীতির ভিত্তি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বক্তারা বলেন, সংগঠক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ পরিবর্তনের মূল শক্তি শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষ। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি দেশের বিভিন্ন শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাজ করেছেন এবং তাদের সংগঠিত করার চেষ্টা চালিয়েছেন।

কুড়িগ্রামে শ্রমিক সংগঠন গঠনে বিশেষ অবদান

স্মরণসভায় বক্তারা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, কুড়িগ্রাম জেলায় শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কমরেড মিলুর অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সেখানে টেক্সটাইল মিল শ্রমিকদের ইউনিয়ন গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন, স-মিল শ্রমিক ইউনিয়ন, রিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন, হোটেল শ্রমিক ইউনিয়ন এবং নির্মাণশ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা এবং শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিনি দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করেন। শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)-এর কেন্দ্রীয় দায়িত্ব পালন করে তিনি শ্রমিক আন্দোলনের জাতীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

Manual4 Ad Code

আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি গড়ার প্রয়াস

বক্তারা বলেন, কমরেড মিলু শুধু দেশের অভ্যন্তরে শ্রমিক আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিশ্ব ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন (ডব্লিউএফটিইউ)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে তিনি আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ও সংহতিকে বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন।

এছাড়া তিনি কুড়িগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবেও তিনি সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল চেতনা বিকাশে কাজ করেছেন।

দুর্ঘটনায় আহত হয়ে মৃত্যু

স্মরণসভায় বক্তারা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তাঁর জীবনের শেষ সময়ের ঘটনাও। ২০১৮ সালে সাংগঠনিক কাজে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন কমরেড মিলু। এরপর দীর্ঘ ৩২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২০১৮ সালের ১৩ জুন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যু দেশের বামপন্থী আন্দোলন, শ্রমিক সংগঠন এবং প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্যেই প্রকৃত শ্রদ্ধা

স্মরণসভায় বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে যখন বৈষম্য, শ্রমিক শোষণ এবং সামাজিক বঞ্চনা নতুন নতুন রূপে বিস্তার লাভ করছে, তখন কমরেড জাহেদুল হক মিলুর আদর্শ ও সংগ্রামের তাৎপর্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাঁর রাজনৈতিক সততা, ত্যাগ, নিষ্ঠা এবং সংগ্রামী জীবন নতুন প্রজন্মকে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার প্রেরণা জোগাবে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, কমরেড মিলুকে স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় হলো তাঁর স্বপ্নের শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই জোরদার করার মধ্য দিয়েই তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করা সম্ভব।

স্মরণসভা শেষে উপস্থিত নেতাকর্মীরা কমরেড জাহেদুল হক মিলুর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

Manual2 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ