সিলেট ১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ, জুন ১২, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১২ জুন ২০২৬ : আজ ১২ জুন আন্তর্জাতিক বা বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি বিভিন্ন কর্মসূচি, আলোচনা সভা, মানববন্ধন, সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে পালন করা হচ্ছে।
শিশুশ্রম নির্মূল এবং শিশুদের শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ শৈশব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দিবসটি প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী পালিত হয়।
এ বছরের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— “শিশুশ্রমকে লাল কার্ড: শিশুদের জন্য ন্যায্যতা, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কাজ”। অন্যদিকে জাতীয়ভাবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় প্রতিপাদ্য ঘোষণা করেছে— “শিশুশ্রমকে না বলি, শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করি”।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুশ্রম শুধু একটি অর্থনৈতিক বা সামাজিক সমস্যা নয়; এটি মানবাধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি বৈশ্বিক সংকট। শিশুদের বিদ্যালয়ে থাকার কথা থাকলেও বিশ্বের কোটি কোটি শিশু এখনও জীবিকার তাগিদে বা পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে।
বিশ্ব পরিস্থিতি উদ্বেগজনক
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ইউনিসেফের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু বিভিন্ন ধরনের শ্রমে জড়িত। এর মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক কাজে নিয়োজিত, যা তাদের শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।
বিশেষ করে কৃষি, নির্মাণশিল্প, গৃহস্থালি কাজ, ক্ষুদ্র শিল্প, খনি, পরিবহন এবং অনানুষ্ঠানিক খাতগুলোতে শিশুশ্রমের হার বেশি। উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে এই সমস্যা সবচেয়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে।
আইএলওর মতে, শিশুশ্রমের ফলে শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে এবং ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ হারায়। ফলে জাতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে
বাংলাদেশে বিগত কয়েক দশকে শিশুশ্রম কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হলেও এখনও লাখ লাখ শিশু বিভিন্ন খাতে শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। বিশেষত নগর বস্তি, গ্রামীণ দরিদ্র পরিবার, ইটভাটা, ওয়ার্কশপ, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন খাত, গৃহকর্ম এবং ঝুঁকিপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রমের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগ, জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম হ্রাসে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন প্রণয়ন নয়, তার কার্যকর বাস্তবায়ন, শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং পরিবারভিত্তিক দারিদ্র্য দূরীকরণ ছাড়া শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব নয়।
শিশুশ্রমের প্রধান কারণ
সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ মতামত অনুযায়ী শিশুশ্রমের প্রধান কারণগুলো হলো—
দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা;
শিক্ষার সুযোগ ও মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া;
সামাজিক বৈষম্য ও প্রান্তিকতা;
পরিবারে উপার্জনক্ষম সদস্যের অভাব;
অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বিস্তার;
আইন প্রয়োগে দুর্বলতা;
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন ও বাস্তুচ্যুতি;
শিশু অধিকার সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সমাজের সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তোলা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের প্রতিক্রিয়া
বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “শিশুশ্রম একটি সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনক বাস্তবতা। যে বয়সে শিশুদের বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার কথা, সে বয়সে তাদের অনেকেই জীবিকার তাগিদে কঠোর শ্রমে নিয়োজিত হতে বাধ্য হচ্ছে। এটি শিশুদের মৌলিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।”
তিনি বলেন, “দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য এবং শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা শিশুশ্রমের মূল কারণ। তাই শিশুশ্রম নির্মূলে শুধু শিশুদের শ্রম থেকে সরিয়ে আনাই যথেষ্ট নয়; তাদের পরিবারকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।”
কমরেড আমিরুজ্জামান আরও বলেন, “শিশুশ্রম বন্ধে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ব্যবসায়ী সমাজ এবং নাগরিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো শিশুকে জীবিকার জন্য শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে না হয়।”
তিনি বলেন, “টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য শিশুশ্রম নির্মূল অপরিহার্য। একটি মানবিক, বৈষম্যহীন ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব, শিক্ষা এবং বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।”
সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশুশ্রম নির্মূলের জন্য শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং পরিবারভিত্তিক দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণ, বিনামূল্যে ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, শ্রম পরিদর্শন জোরদার এবং সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।
তাদের মতে, শিশুশ্রম বন্ধ করা কেবল শিশুদের সুরক্ষার বিষয় নয়; এটি একটি দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত।
বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসে দেশের বিভিন্ন মহল শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয়ে নতুন করে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। শিশুদের হাতে বই, কলম ও স্বপ্ন তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়েই একটি সমৃদ্ধ, মানবিক ও উন্নত সমাজ নির্মাণ সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি