মাগুড়ছড়া ও টেংরাটিলায় যে গ্যাস নষ্ট হয়েছে শুধু তা দিয়ে দেড়বছরের পুরো দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব

প্রকাশিত: ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৪, ২০২৬

মাগুড়ছড়া ও টেংরাটিলায় যে গ্যাস নষ্ট হয়েছে শুধু তা দিয়ে দেড়বছরের পুরো দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব

Manual2 Ad Code

আনু মুহাম্মদ |

“২৯ বছর আগে ১৯৯৭ সালের ১৪ই জুন তারিখে সিলেটের মাগুড়ছড়া গ্যাসক্ষেত্রে বড় বিস্ফোরণে পুরো গ্যাসক্ষেত্র নষ্ট হয়ে যায়। এলাকায় অনেক সম্পদের পাশাপাশি প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হয়। বাংলাদেশের আবিষ্কার করা এই গ্যাসব্লক দেয়া হয়েছিল মার্কিন কোম্পানি অক্সিডেন্টালকে। বিদেশি বড় কোম্পানিকে গ্যাসব্লক দিলে আরও উন্নত প্রযুক্তি আসবে, দক্ষতা বাড়বে, দেশের অর্থনীতির অভূতপূর্ব উন্নতি হবে সেইসব বহুলপ্রচারিত যুক্তিতে এসব চুক্তি করা হয়েছিল। উল্টো বড় দুটি গ্যাসক্ষেত্র নষ্ট হয়েছে প্রথমে মার্কিন ও পরে কানাডীয় কোম্পানির দায়িত্বহীনতা এবং খরচ কমিয়ে মুনাফা বাড়ানোর চেষ্টায়। তারা কি এর জন্য ক্ষতিপূরণ দিয়েছে? না। অক্সিডেন্টাল কোম্পানি ক্ষতিপূরণ না দিয়ে পুরো গ্যাসব্লক আরেকটি মার্কিন কোম্পানি ইউনোকালকে দিয়ে চলে গেছে। ইউনোকাল এসে গ্যাস রপ্তানির অনেক ধান্দা করেছে। না পেরে ব্যবসা আরেকটি মার্কিন কোম্পানি শেভ্রনকে দিয়ে তারাও চলে গেছে। শেভ্রনের হাতে এখন বৃহৎ গ্যাসব্লক। তারাও এখনও ক্ষতিপূরণ দেয় নাই।
মাগুড়ছড়া ও টেংরাটিলায় যে পরিমাণ গ্যাস এসব কোম্পানির গাফিলতিতে নষ্ট হয়েছে শুধু তা দিয়ে প্রায় দেড়বছরের পুরো দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব ছিল। এর মধ্যে অনেক সরকার গেছে, কেউ এনিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি বরং হিসাবের ফাঁকি দিয়ে ক্ষতি কম দেখাতে চেষ্টা করেছে। বিশ্বব্যাংক আইএমএফ এদেশে দক্ষতা আর আয় বাড়ানো নিয়ে বহুরকম নির্দেশনা দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের এই বিপুল পরিমাণ পাওনা আদায়ে তারা একটা বাক্যও ব্যয় করেনি। অনেক সরকার পার করে এখন অন্তর্বর্তী সরকার, পরিবর্তনের অনেক অঙ্গীকার তাদের। তাদের দায়িত্ব এখন এই বিষয়ে কথা বলা এবং এই পাওনা আদায়ের পথ তৈরি করা। এটা সংস্কারের অংশ।”
#
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ
অর্থনীতিবিদ, সর্বজনকথার সম্পাদক ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য।
[][][] [][]
মাগুরছড়া ব্লো-আউটের ২৯ বছর উপলক্ষে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা—

“মাগুরছড়া ব্লো-আউট”

—সৈয়দ আমিরুজ্জামান
চৌদ্দই জুন, গভীর রাতে, নিস্তব্ধ অরণ্যপথ,
ঘুমিয়ে ছিল লাউয়াছড়া, চা-বাগানের নীরব রথ।
পাহাড়-টিলা, ছড়া-বিলে জোনাক জ্বালা ক্ষীণ আলো,
হঠাৎ যেন অগ্নিদানব আকাশজোড়া খুলল পালো।
মাটির নিচে গোপন রাখা যুগের সঞ্চিত ধন,
জ্বলে উঠল অগ্নিশিখায় কেঁপে উঠল বনভূমি-মন।
গ্যাসের গর্ভ বিদীর্ণ হয়ে আগুন হলো দিগ্বিজয়ী,
প্রকৃতিরই বুকের ভেতর শুরু হলো ক্ষয়ের বই।
কে দায়ী সেই আগুনখেলায়, কে করেছিল অবহেলা?
কার অদক্ষ খননযজ্ঞ মৃত্যুর ডঙ্কা বাজায় বেলা?
প্রশ্নগুলো আজও ঘোরে সিলেটজুড়ে, বাংলাজুড়ে,
উত্তর খোঁজে মানুষ এখন ইতিহাসের ভস্ম কুড়ে।
মাগুরছড়া—নামটি শুধু একটি স্থানের নাম নয়,
এটি যেন রাষ্ট্রের বুকে জমে থাকা দীর্ঘ ক্ষয়।
এটি যেন সম্পদহারা জনগণের কান্নাধ্বনি,
এটি যেন লুণ্ঠিত স্বপ্ন, পোড়া বনের শোকগাথা ধ্বনি।
আগুন তখন ছুটে উঠেছে শত শত ফুট আকাশে,
রাত্রি যেন দিন হয়ে যায় দাউদাউ জ্বালা প্রকাশে।
রেলপথ কাঁপে, গাছের ডালে ছাইয়ের কণা ঝরে পড়ে,
পাখিরা সব উড়ে বেড়ায় মৃত্যুভয়ের কালো ঘোরে।
চা-বাগানের সবুজ পাতা দগ্ধ হলো আগুনচুম্বে,
অরণ্যেরও বহু প্রহর নিঃশেষ হলো এক নিমেষে।
যে গাছগুলো বেড়ে উঠতে লেগেছিল অর্ধশতাব্দী,
সেগুলো সব পুড়ে গিয়ে রেখে গেল নিঃশ্বাস-শূন্য ভূমি।
ছড়ার জলে কাঁপন ধরে, প্রাণের স্রোত হয় বিষণ্ণ,
ভূগর্ভস্থ জলও যেন আতঙ্কিত, নীরব, ক্ষীণ।
হরিণ কোথায়, বানর কোথায়, কোথায় পাখির কূজনধারা?
আগুন যখন বন গিলেছে, কেঁদেছে কি লাউয়াছড়া?
শুধু কি বন? শুধু কি গাছ? শুধু কি কিছু পাখি-মৃগ?
জাতির ভবিষ্যৎ শক্তির ভাণ্ডারও হয়েছিল নিঃস্ব নিঃসঙ্গ।
যে গ্যাস হতে জ্বলতে পারত সহস্র প্রদীপের আলো,
সেই সম্পদ ধোঁয়া হয়ে আকাশপানে গেল ভেসে কালো।
বাংলার মাটি প্রশ্ন করে—
“আমার ধন কে নিল কেরে?
কোন হিসাবের খাতায় লেখা
পোড়া গ্যাসের দীর্ঘ ফেরা?”
প্রতিবেদন, তদন্তপত্র, অগণিত সব নথির ভাষা,
ত্রুটি ছিল, অবহেলা ছিল—উঠেছে তেমন বহু আশা।
কারিগরি সব সিদ্ধান্তে ছিল নাকি ভুলের রেখা,
সেই অভিযোগ ঘুরে ফিরে আজও মানুষের মুখে লেখা।
বহু বছর কেটে গেলেও ক্ষত শুকোয়নি আজও তবু,
আগুন নেভে, প্রশ্ন নেভে না, বেদনা থাকে রক্তরব।
প্রজন্ম পরে প্রজন্ম জিজ্ঞাসে—
“কোথায় গেল ন্যায়ের দিশা?
ক্ষতিপূরণের দাবির পথে
কেন আজও অন্ধ নিশা?”
যে বন পুড়ে ছাই হয়েছিল, তার কি আছে মূল্য কম?
একটি গাছের ছায়ার ভেতর কত শত প্রাণের সম।
মাটির নিচে জলের ধারা, উপরেতে পাখির গান,
এসব মিলেই প্রকৃতির যে অমূল্য জীবনের দান।
বনের ক্ষতি কেবল সংখ্যা নয়, কেবল টাকার হিসাব নয়,
একটি বাস্তুতন্ত্র ভাঙলে শতাব্দীরও পূরণ হয়?
শেকড় পুড়ে গেলে মাটির বুকে শুকিয়ে আসে প্রাণের ঢেউ,
নদী, ছড়া, কেঁচো, পাখি—সবাই যেন হারায় নৌ।
যারা সেদিন আগুন দেখে প্রাণ বাঁচাতে ছুটেছিল,
খাসিয়া পল্লী, শ্রমিক পরিবার, কতজন যে কেঁদেছিল।
পানের বরজ, বসতভিটা, জীবিকার সব ক্ষুদ্র স্বপ্ন,
আগুনখেকো সেই দুর্যোগে হয়েছিল কতখানি ক্ষতবিক্ষত।
মাগুরছড়া শুধু অতীত নয়, এটি বর্তমানের পাঠ,
জ্বালানি আর সম্পদরক্ষার ভবিষ্যতের শক্ত হাত।
যে জাতি তার সম্পদরক্ষায় হতে পারে না সচেতন,
তার স্বাধীনতার ভিতরেও জেগে থাকে পরাধীন মন।
গ্যাস যদি হয় জনগণের, জনগণই মালিক তার,
তবে কেনই বা প্রশ্ন উঠবে সিদ্ধান্ত নেবে অন্য কার?
চুক্তিপত্রের গোপন ভাষা, অস্পষ্টতার অন্ধ ঘর,
গণতন্ত্রের স্বচ্ছ আলোয় দেখতে চায় জনতার পর।
বাপেক্স যদি পারে খুঁজতে নতুন ক্ষেত্রের গ্যাসধারা,
কেন তবে সে শক্তি পাবে না দেশের ভরসা হতে সারা?
দেশের মেধা, দেশের শ্রমে, দেশের তরুণ প্রকৌশলী,
তাদের হাতেই গড়তে হবে আগামী দিনের সম্ভাবনা চলি।
বিদেশি হোক, দেশি হোক, আইন সবার জন্য সমান,
দায় থাকিলে জবাবদিহি হবে এটাই সভ্য জ্ঞান।
প্রকৃতিকে যে ক্ষতি করে, সম্পদ নষ্ট করে যায়,
তার বিরুদ্ধে ন্যায়ের দাবি মানবতার ভাষা চায়।
মাগুরছড়ার আগুন যেন আর না জ্বলে কোনোখানে,
অবহেলার পুনরাবৃত্তি না ঘটুক আর বাংলাদেশে।
প্রতিটি কূপ, প্রতিটি খনি, প্রতিটি বন, প্রতিটি জল,
জাতির কাছে অর্পিত যেন ভবিষ্যতের পবিত্র ফল।
আজ উনত্রিশ বছরের পরে দাঁড়িয়ে আমরা প্রশ্ন তুলি—
“কোথায় গেল সেই প্রতিশ্রুতি, কোথায় ন্যায়ের শপথগুলি?”
যে ক্ষতির কথা বলা হয়েছিল, যে দাবির কথা উঠেছিল,
তার কতখানি পূরণ হলো, কতখানি পথ বাকি রইল?
ইতিহাসের পাতা খুলে আগুন এখনো কথা কয়,
“সম্পদ রক্ষা করো আগে, নইলে ভবিষ্যৎ শূন্য হয়।”
লাউয়াছড়ার পাতা নড়ে, বাতাস বয়ে আনে বার্তা—
“ভুলে যেও না, মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকে জাতির অর্থ।”
চৌদ্দই জুন এলে আবার স্মৃতির প্রদীপ জ্বলে ওঠে,
অগ্নিদাহের কালো ছবি ভেসে আসে জনমতেতে।
কেউ লেখে গান, কেউ লেখে শোক, কেউবা লেখে প্রতিবাদ,
কেউ খোঁজে ন্যায়ের সম্ভাবনা, কেউ তোলে জনগণের সাধ।
আমিও তাই কলম ধরি এই বাংলার মাটির তরে,
যে মাটির নিচে গ্যাস লুকানো, যে মাটিতে শস্য ঝরে।
যে বনের সবুজ নিশ্বাস বাঁচিয়ে রাখে জীবনধারা,
সেই বন, সেই জল, সেই মানুষ—সবার নামই মাগুরছড়া।
যতদিন না ন্যায় প্রতিষ্ঠা, ততদিন এ কবিতা জাগে,
যতদিন না উত্তর মেলে, প্রশ্ন থাকে হৃদয়ভাগে।
আগুন পুড়ায় গাছের দেহ, কিন্তু পুড়ায় না স্মৃতির শিখা,
জনগণের অধিকার আর ন্যায়ের দাবি থাকে লিখা।
তাই হে বাংলা, মনে রেখো—
সম্পদ মানে শুধু ধন নয়,
প্রকৃতি, মানুষ, ভবিষ্যৎও
একই মালার অমূল্য জয়।
মাগুরছড়া, তোমার নামে
শপথ নিক আজকের দিন—
দেশের মাটি, দেশের সম্পদ
রক্ষাই হোক জাতির ঋণ।
আগুন থেকে শিক্ষা নিয়ে
সতর্ক হোক প্রতিটি ক্ষণ,
যেন আর কোনো মাগুরছড়া
না হয় বাংলার ভবিষ্যৎ-গণনা-শোকগাথার কারণ।
আর যদি কখনো ইতিহাস
আবার লেখে নতুন পাতা,
সেখানে থাকুক জয়ের কথা—
ন্যায় পেয়েছে মাগুরছড়া।
সেখানে থাকুক সবুজ বনের
ফিরে পাওয়া প্রাণের গান,
সেখানে থাকুক জনগণের
অধিকারী বাংলাদেশের মান।
—(মাগুরছড়া ব্লো-আউট,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ