সিলেট ২৭শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:১৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২৬
সিলেটের নাট্যচর্চার দীর্ঘ পথপরিক্রমার দলিল
নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ২৭ জুলাই ২০২৬ : সিলেটের নাট্যচর্চার ইতিহাসে সুদ্বীপ চৌধুরী একটি অনিবার্য নাম। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নাট্যরচনা, বেতার নাটক, মঞ্চনাটক ও পথনাটকের মধ্য দিয়ে তিনি যে সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন ‘নির্বাচিত মঞ্চনাটক’। ছয়টি মঞ্চনাটক ও চারটি পথনাটক নিয়ে প্রকাশিত ৩২৮ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থ শুধু একজন নাট্যকারের সৃজনকর্মের সংকলন নয়; এটি সিলেটের নাট্যচর্চার একটি সময়, সমাজ ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতারও দলিল।
প্রগতিপথের অগ্রপথিক, সুস্থ সংস্কৃতির জীবন্ত মশাল, আলোকিত মানুষ, সংস্কৃতিজন ও আবৃত্তিশিল্পী দেবাশীষ চৌধুরী রাজা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুদ্বীপ চৌধুরীকে নিয়ে লিখেছেন, ‘সিলেটের নাট্যভুবনে অনিবার্য নাম।’ তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সুদ্বীপ তাঁর অনুজ ও নিকটজন; ব্যক্তিগত পরিসরে তিনি সুদ্বীপকে ‘মান্না’ নামেই চেনেন। দীর্ঘদিনের পরিচয় ও সাংস্কৃতিক সহযাত্রার জায়গা থেকে করা এই মূল্যায়ন সিলেটের নাট্যাঙ্গনে সুদ্বীপ চৌধুরীর অবস্থানকে বুঝতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
১৯৬২ সালে জন্ম নেওয়া সুদ্বীপ চৌধুরী পেশাজীবনে ছিলেন একজন ব্যাংকার। একটি সরকারি ব্যাংকে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর ২০২১ সালে চাকরি থেকে অবসর নেন তিনি। তবে পেশাগত জীবনের ব্যস্ততা কখনোই তাঁর সাংস্কৃতিক চর্চাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। বরং কর্মজীবনের পাশাপাশি নাট্যরচনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে তিনি এগিয়ে নিয়েছেন নিরন্তর। বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রের এ-গ্রেডভুক্ত নাট্যকার হিসেবে তাঁর পরিচিতিও দীর্ঘদিনের।
বেতার ও মঞ্চ মিলিয়ে শতাধিক নাটক লিখেছেন সুদ্বীপ চৌধুরী। নাট্যরচনার এই বিপুল ভাণ্ডার তাঁর দীর্ঘ সৃজনশীল জীবনের পরিচয় বহন করে। তাঁর নাট্যচর্চার সূচনাও বেশ পুরোনো। ১৯৮০ সালে সিলেটের ঐতিহাসিক সারদা স্মৃতি ভবনে তাঁর প্রথম নাটক মঞ্চস্থ হয়। এর তিন বছর পর, ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয় তাঁর প্রথম নাটক। সেই শুরু। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে মঞ্চ ও বেতারের নাট্যজগতে তাঁর পদচারণা বিস্তৃত হয়েছে।
একজন নাট্যকারের সৃজনশীল পরিসর কেবল নাটকের পাণ্ডুলিপিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তাঁর লেখায় সময়ের সমাজ, মানুষের জীবন, সংকট, স্বপ্ন, অসঙ্গতি এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়। সুদ্বীপ চৌধুরীর নাট্যকর্মের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি যে সমাজ ও সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে এগিয়েছেন, তাঁর নাট্যরচনায় সেই বাস্তবতার নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে। ফলে তাঁর নাটকগুলোকে কেবল বিনোদনের উপাদান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এগুলোকে সময় ও সমাজ পাঠের একটি মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।
সুদ্বীপের নাট্যজীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ১৯৮৮ সাল। সে বছর সিলেট থিয়েটারের আয়োজনে বিভাগীয় মঞ্চনাটক পাণ্ডুলিপি প্রতিযোগিতায় তাঁর লেখা একটি নাটক প্রথম স্থান অর্জন করে। একজন নবীন নাট্যকারের জন্য এমন স্বীকৃতি ছিল নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এই অর্জন তাঁর নাট্যরচনার সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে এবং সিলেটের নাট্যাঙ্গনে তাঁর অবস্থানকে শক্তিশালী করে।
নাট্যচর্চার পাশাপাশি সুদ্বীপ চৌধুরী সম্পৃক্ত ছিলেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের কর্মকাণ্ডে। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ও খেলাঘর-এর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। এসব সংগঠন বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও গণমুখী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে সুদ্বীপের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পরিধি নাট্যরচনার বাইরেও বিস্তৃত। নাটক, আবৃত্তি, সংগঠনভিত্তিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং লেখালেখি—বিভিন্ন ধারার সমন্বয়ে তাঁর সাংস্কৃতিক জীবন গড়ে উঠেছে।
একসময় সিলেটের দুটি দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত কলামও লিখেছেন সুদ্বীপ চৌধুরী। সংবাদপত্রে লেখালেখির মধ্য দিয়ে তিনি সমকাল, সমাজ ও সংস্কৃতিকে ভিন্ন এক পরিসর থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। নাট্যরচনার পাশাপাশি সংবাদপত্রের কলাম তাঁর চিন্তা ও পর্যবেক্ষণের আরেকটি ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। একজন সাংস্কৃতিক কর্মীর জন্য এই বহুমাত্রিক চর্চা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
এই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য ফসল ‘নির্বাচিত মঞ্চনাটক’। ৩২৮ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে ছয়টি মঞ্চনাটকের পাশাপাশি চারটি পথনাটক স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ বইটি কেবল মঞ্চনাটকের সংকলন নয়, একই সঙ্গে পথনাটকের ধারাকেও ধারণ করেছে। বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় পথনাটকের রয়েছে আলাদা সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব। সাধারণ মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতার কারণে পথনাটক বরাবরই সচেতনতা তৈরি, সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং মানুষের সঙ্গে সাংস্কৃতিক যোগাযোগের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সেই ধারার কিছু নাট্যকর্ম এক মলাটে তুলে আনা ‘নির্বাচিত মঞ্চনাটক’-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
একজন নাট্যকারের সৃষ্টিকর্মের সংকলন প্রকাশের মধ্য দিয়ে শুধু তাঁর নিজের সাহিত্যকর্মই সংরক্ষিত হয় না, সংরক্ষিত হয় একটি সময়ের সাংস্কৃতিক স্মৃতিও। বিশেষ করে মঞ্চনাটকের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। মঞ্চনাটকের জীবন অনেক সময় মঞ্চায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। নাটক মঞ্চে অভিনীত হয়, দর্শক দেখে, প্রতিক্রিয়া জানায়; এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চায়নের স্মৃতি অনেকাংশে হারিয়ে যায়। কিন্তু পাণ্ডুলিপি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলে সেই নাটক ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পাঠযোগ্য হয়ে ওঠে। এই দিক থেকে সুদ্বীপ চৌধুরীর ‘নির্বাচিত মঞ্চনাটক’ তাঁর দীর্ঘ নাট্যজীবনের একটি স্থায়ী নথি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
গ্রন্থটি সুদ্বীপ চৌধুরী উৎসর্গ করেছেন সিলেটের সংস্কৃতিঅন্তপ্রাণ তাঁর অগ্রজ ও নিকটজন অঞ্জন চক্রবর্তীকে। এই উৎসর্গের মধ্য দিয়েও ফুটে ওঠে সিলেটের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ব্যক্তি-সম্পর্ক, অগ্রজ-অনুজের বন্ধন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার একটি ঐতিহ্য। সংস্কৃতির জগতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে সম্পর্ক ও সহযোগিতা গড়ে ওঠে, তারই একটি প্রতীকী প্রকাশ এই উৎসর্গ।
সিলেটের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে নাট্যচর্চার একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। মঞ্চনাটক, বেতার নাটক, পথনাটক, আবৃত্তি, সংগীত ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিসর দীর্ঘদিন ধরে বিকশিত হয়েছে। সেই ধারার সঙ্গে কয়েক দশক ধরে যুক্ত রয়েছেন সুদ্বীপ চৌধুরী। তাঁর নাট্যজীবনের শুরু যখন, তখন বাংলাদেশের নাট্যচর্চা আজকের মতো সহজলভ্য প্রযুক্তিনির্ভর ছিল না। মঞ্চ, মহড়া, পাণ্ডুলিপি, সংগঠন এবং দর্শকের সরাসরি যোগাযোগই ছিল নাট্যচর্চার প্রধান অবলম্বন। সেই সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত একজন নাট্যকার হিসেবে টিকে থাকা এবং নিয়মিত লিখে যাওয়া নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অর্জন।
সুদ্বীপ চৌধুরীর সৃষ্টিশীলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর ধারাবাহিকতা। ১৯৮০ সালে প্রথম নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পর চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে পেশাগত জীবনের দায়িত্ব, সামাজিক পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের রূপান্তর এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন—সবকিছুর মধ্য দিয়েই তিনি নাট্যরচনার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। বেতার ও মঞ্চ মিলিয়ে শতাধিক নাটক রচনা সেই ধারাবাহিকতারই প্রমাণ।
আজকের সময়ে যখন মঞ্চনাটকের পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ ও প্রকাশ একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তখন ‘নির্বাচিত মঞ্চনাটক’-এর মতো গ্রন্থ প্রকাশ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। নাট্যকর্মের মঞ্চায়ন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন তার লিখিত রূপ সংরক্ষণ। কারণ মঞ্চের আলো নিভে যায়, প্রযোজনা শেষ হয়, অভিনেতারা অন্য নাটকে চলে যান; কিন্তু একটি ভালো নাটকের পাণ্ডুলিপি থেকে যায়। নতুন নাট্যকর্মী, গবেষক, শিক্ষার্থী ও পাঠক সেই পাণ্ডুলিপির মধ্য দিয়ে একটি সময়কে নতুন করে আবিষ্কার করতে পারেন।
সুদ্বীপ চৌধুরীর এই গ্রন্থ তাই তাঁর ব্যক্তিগত সৃষ্টিশীলতার হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি সিলেটের নাট্যচর্চার ধারাবাহিকতারও একটি মূল্যবান সংযোজন। ছয়টি মঞ্চনাটক ও চারটি পথনাটক নিয়ে সাজানো ৩২৮ পৃষ্ঠার বইটি তাঁর দীর্ঘ নাট্যজীবনের নির্বাচিত কিছু কাজকে পাঠকের সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে এটি নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মীদের জন্যও হয়ে উঠতে পারে অতীতের নাট্যচর্চার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি মাধ্যম।
নাট্যকার সুদ্বীপ চৌধুরীর পথচলা শুরু হয়েছিল সিলেটের সারদা স্মৃতি ভবনের মঞ্চ থেকে। পরে বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্র, মঞ্চ, পথনাটক, পত্রিকার কলাম এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মকাণ্ড—বহু পরিসরে বিস্তৃত হয়েছে তাঁর সাংস্কৃতিক জীবন। সরকারি ব্যাংকের দায়িত্বশীল পেশাজীবন সামলে অবসর পর্যন্ত তিনি যে সাংস্কৃতিক সাধনা চালিয়ে গেছেন, তারই একটি সংহত প্রকাশ ‘নির্বাচিত মঞ্চনাটক’।
একজন মানুষের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক জীবনকে কেবল তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং তিনি কতটা সময়ের সঙ্গে থেকেছেন, কতটা মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, কতটা নতুন প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছেন এবং তাঁর সৃষ্টিকর্ম কতটা সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে—এসবও গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিচারে সুদ্বীপ চৌধুরীর নাট্যজীবন সিলেটের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
সংস্কৃতিজন দেবাশীষ চৌধুরী রাজার ভাষায়, সিলেটের নাট্যভুবনে সুদ্বীপ চৌধুরী ‘অনিবার্য নাম’। তাঁর চার দশকের বেশি সময়ের নাট্যচর্চার নির্বাচিত অংশ যখন গ্রন্থাকারে পাঠকের হাতে পৌঁছেছে, তখন তা নিঃসন্দেহে সিলেটের নাট্যসাহিত্যের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ‘নির্বাচিত মঞ্চনাটক’ সেই দীর্ঘ পথচলার একটি স্থায়ী স্মারক—যেখানে একজন নাট্যকারের সৃজনশীলতা, সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা এবং সময়ের সঙ্গে তাঁর নিরন্তর সংলাপ এক মলাটে ধরা পড়েছে।
‘নির্বাচিত মঞ্চনাটক’ গ্রন্থটি সিলেটের শ্রীমঙ্গল কলেজ সড়কের ভিক্টোরিয়া স্কুল মার্কেটের উত্তরণ পাঠাগারে বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে। নাট্যসংগঠন ও আগ্রহী পাঠকেরা সেখান থেকে বইটি সংগ্রহ করতে পারবেন।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি