বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস আজ: সুন্দরবন রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

প্রকাশিত: ১২:১১ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৬, ২০২৬

বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস আজ: সুন্দরবন রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

Manual1 Ad Code
  • অস্তিত্ব সংকটে সুন্দরবন, বাড়ছে লবণাক্ততা ও শিল্পদূষণের চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৬ জুলাই ২০২৬ : ম্যানগ্রোভ শুধু একটি বন নয়, উপকূলীয় জনপদের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল এবং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন। অথচ জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, শিল্পদূষণ, অপরিকল্পিত পর্যটন, বনজ সম্পদ আহরণ, বন্যপ্রাণী শিকার এবং নদীপথে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলের মতো বহুমুখী চাপে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এখন অস্তিত্বের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ রোববার পালিত হচ্ছে বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস।

ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি, এর পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক মূল্য তুলে ধরা এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানাতে প্রতিবছর ২৬ জুলাই দিবসটি পালিত হয়। ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনে ২০১৫ সালে দিনটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবসে বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের আহ্বান—সুন্দরবনকে শুধু একটি বন হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু সহনশীলতা এবং দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য সরাসরি যুক্ত। তাই বন রক্ষায় বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।

সংকুচিত হয়েছে সুন্দরবনের পরিধি

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মোগল আমল থেকেই সুন্দরবনের বিস্তৃতির উল্লেখ পাওয়া যায়। ষোড়শ শতাব্দীতে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আবুল ফজল তাঁর ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে সুন্দরবনের সীমানা কুষ্টিয়া ও যশোর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে উল্লেখ করেন। ১৭৭৬ সালেও বাংলাদেশের অংশে সুন্দরবনের আয়তন ছিল প্রায় ১৭ হাজার বর্গকিলোমিটার।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জনবসতি, কৃষি সম্প্রসারণ, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ভূমি ব্যবহার এবং বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডে সুন্দরবনের পরিধি ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে। ২০১৬ সালের পরিমাপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের সুন্দরবনের আয়তন ৬ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটারে নেমে আসে। বন বিভাগের হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার।

আয়তনের পাশাপাশি বনের গুণগত পরিবর্তন নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ম্যানগ্রোভের প্রকৃত শক্তি শুধু এর আয়তনে নয়, বরং এর জীববৈচিত্র্য, নদী-খাল, মাটি, জলাভূমি, উদ্ভিদ ও প্রাণীর পারস্পরিক নির্ভরশীলতায়। এসব উপাদানের যেকোনো একটির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হলে পুরো বাস্তুতন্ত্রই ঝুঁকিতে পড়ে।

শিল্পায়নের চাপে বিপন্ন বন

সুন্দরবনের আশপাশে অপরিকল্পিত শিল্পায়নকে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশগত হুমকি হিসেবে দেখছেন পরিবেশবিদরা। তাঁদের অভিযোগ, বনের নিকটবর্তী এলাকায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিল্প-কারখানা, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বাণিজ্যিক রিসোর্টের কারণে সুন্দরবনের ওপর দূষণ ও মানবিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরীর ভাষ্য, সরকারের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণার পরও গত এক দশকে সুন্দরবনের পাশে সিমেন্ট কারখানা, এলপিজি গ্যাস প্লান্ট, অয়েল রিফাইনারিসহ অন্তত ৫০টি ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তাঁর অভিযোগ, এমনকি সরকারি খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকেও বনের কাছাকাছি বিশালাকার গুদামঘর নির্মাণ করা হয়েছে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের বিধান অনুযায়ী, ইসিএ ঘোষিত এলাকায় পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে ইসিএ ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে সেখানে শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

নদীতে বর্জ্য, জোয়ার-ভাটায় ছড়িয়ে পড়ছে দূষণ

Manual6 Ad Code

অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে পরিশোধন না করা রাসায়নিক ও তরল বর্জ্য নদীতে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। জোয়ার-ভাটার প্রবাহের কারণে এসব দূষিত পদার্থ নদী থেকে ছোট ছোট খাল হয়ে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে। এতে মাটি ও পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি উদ্ভিদ ও জলজ প্রাণীর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

তাঁর মতে, বনের অনেক এলাকায় নতুন চারা গজানোর হার কমে যাওয়া এবং পানিতে তেলের উপস্থিতি বেড়ে যাওয়া জলজ প্রাণী ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য উদ্বেগের বিষয়। দূষণের মাত্রা দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

রামপাল নিয়ে উদ্বেগ

সুন্দরবনের পরিবেশগত নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র অন্যতম বিতর্কিত বিষয়। ব্যাপক গণআপত্তি ও পরিবেশবাদীদের সমালোচনার মধ্যেও ২০২২ সালের ২৩ ডিসেম্বর কেন্দ্রটি চালু হয়।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরীর অভিযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত বর্জ্য ও দূষিত পানির কারণে সুন্দরবনের আশপাশের নদ-নদী ও জলজ পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। তাঁর দাবি, মইদারা ও পশুর নদে বর্জ্যযুক্ত পানি যাওয়ার ফলে বন ও জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধোঁয়া, কয়লা পরিবহন, নদীপথে জাহাজ চলাচল ও শিল্পকার্যক্রমের সামগ্রিক পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে পরিবেশবিদদের মধ্যে।

বন অপরাধ কমেছে, বলছে বন বিভাগ

তবে সুন্দরবনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বন বিভাগের বক্তব্য তুলনামূলকভাবে আশাবাদী। প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বন-সংক্রান্ত অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানে সুন্দরবনের গাছপালা ও প্রাণীর সামগ্রিক বৃদ্ধির চিত্র দেখা যাচ্ছে।

তাঁর ভাষ্য, শুধু বাঘের সংখ্যা নয়, বাঘের শিকারযোগ্য প্রাণীর বংশবৃদ্ধিও হয়েছে। ফলে বনের খাদ্যশৃঙ্খল ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের কিছু লক্ষণ রয়েছে।

বন বিভাগ সুন্দরবনের সুরক্ষায় নিয়মিত টহল ও নজরদারির পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে ‘কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা বলয়’ গড়ে তুলছে। ভবিষ্যতে বন রক্ষায় আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান প্রধান বন সংরক্ষক।

বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা

জীববৈচিত্র্যের অসাধারণ বৈচিত্র্য ও পরিবেশগত গুরুত্বের কারণে সুন্দরবন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ১৯৯২ সালে সুন্দরবন রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পরে ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে।

বন বিভাগের তথ্যমতে, সুন্দরবনে রয়েছে ৫২৮ প্রজাতির উদ্ভিদ ও ৫০৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী। এর মধ্যে ৪৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৮৭ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৪ প্রজাতির উভচর এবং ৩৫৫ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এ ছাড়া ২১০ প্রজাতির মাছ ও ছয় প্রজাতির ডলফিনের আবাস এই বনে।

সুন্দরীসহ ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল এবং ১৩ প্রজাতির অর্কিড সুন্দরবনের উদ্ভিদ বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অন্যতম প্রধান আবাসস্থল এই বন। হরিণ, কুমির, কিং কোবরা, বন্য শূকরসহ অসংখ্য প্রাণীরও নিরাপদ আশ্রয়স্থল সুন্দরবন।

মোট আয়তনের উল্লেখযোগ্য অংশ জলাভূমি হওয়ায় সুন্দরবন একই সঙ্গে একটি বিশাল জলজ বাস্তুতন্ত্র। নদী, খাল, খাঁড়ি, চর ও জলাভূমি মিলিয়ে গড়ে ওঠা এই জটিল প্রাকৃতিক ব্যবস্থা উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রাকৃতিক ঢাল

বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ো হাওয়ার শক্তি কমাতে ম্যানগ্রোভ বন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

উপকূল সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী ও সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, “সুন্দরবন আমাদের মায়ের মতো আগলে রাখে। প্রতিটি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে এ বনই প্রথম আঘাত নেয়, ফলে উপকূলের মানুষ রক্ষা পায়। সুন্দরবনের টিকে থাকা মানেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকা।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন দুর্যোগের সময় ঢাল হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি উপকূলীয় মাটি ক্ষয় কমায়, কার্বন ধারণ করে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে সুন্দরবন ধ্বংস হলে শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তাও বিপন্ন হবে।

সবচেয়ে বড় হুমকি লবণাক্ততা

বর্তমানে সুন্দরবনের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে লবণাক্ততার বিস্তারকে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ এবং উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের পানির ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে।

বিশেষ করে কম লবণসহিষ্ণু সুন্দরীসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ প্রজাতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মিঠা পানির প্রবাহ কমে গেলে বনের মাটি ও পানির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তিত হয়। এর প্রভাব পড়ে উদ্ভিদের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম, মাছ ও জলজ প্রাণীর প্রজনন এবং পুরো খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর।

পূর্ণিমা ও অমাবস্যার জোয়ারে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরবনের তুলনামূলক উঁচু এলাকাও অনেক সময় প্লাবিত হচ্ছে। এতে বিভিন্ন প্রাণীর ডিম ও প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কমছে পাখির সংখ্যা

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপের আরেকটি ইঙ্গিত পাখির সংখ্যা কমে যাওয়া। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একসময় সুন্দরবনে প্রায় ৪০০ প্রজাতির পাখির উপস্থিতি ছিল। বর্তমানে তা প্রায় ২৭০ প্রজাতিতে নেমে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাখির আবাসস্থল পরিবর্তন, খাদ্যের সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, পর্যটনের চাপ এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। পাখির সংখ্যা ও প্রজাতির পরিবর্তন একটি বাস্তুতন্ত্রের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবেও বিবেচিত হয়।

বিষ দিয়ে মাছ শিকার, পাচার ও শিকার

শিল্পদূষণের পাশাপাশি সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ অপরাধও বনটির জন্য বড় হুমকি। নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার, মাত্রাতিরিক্ত বনজ সম্পদ আহরণ, গাছ কাটা, আগুন দেওয়া, কাঠ পাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং বন্যপ্রাণী শিকারের মতো কর্মকাণ্ডের প্রভাব পড়ছে বনের মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর।

বিশেষ করে বিষ দিয়ে মাছ ধরার ঘটনা শুধু মাছকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এর মাধ্যমে পানির ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য জলজ প্রাণীও ক্ষতির মুখে পড়ে। খাদ্যশৃঙ্খলের এক স্তরে বিষক্রিয়া তৈরি হলে তার প্রভাব ধাপে ধাপে অন্য প্রাণীর ওপরও পড়তে পারে।

অন্যদিকে বনজ সম্পদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত না করা গেলে বন অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পর্যটনের চাপও কমাতে হবে

সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি নতুন পরিবেশগত চাপও তৈরি করছে। অপরিকল্পিত পর্যটন, প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার, শব্দদূষণ, নৌযানের চলাচল এবং পর্যটনকেন্দ্রিক অবকাঠামো নির্মাণ বনের স্বাভাবিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, পর্যটনের নামে সুন্দরবনের সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোতে অতিরিক্ত মানুষের প্রবেশ সীমিত করা দরকার। পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট রুট, নির্দিষ্ট সময়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব নৌযান ব্যবস্থার ওপর জোর দিতে হবে।

নৌপথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে পণ্যবাহী নৌযান চলাচলও পরিবেশবিদদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। জাহাজডুবি বা তেলজাতীয় পদার্থ নদীতে ছড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব দ্রুত বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। অতীতে বিভিন্ন দুর্ঘটনার পর সুন্দরবনের নদী ও জলাভূমিতে তেল দূষণের পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি সামনে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের সংবেদনশীল নদীপথে নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে আরও কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ড, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা প্রয়োজন।

৫২ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য

Manual2 Ad Code

সুন্দরবন রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে এর ৫২ শতাংশ অঞ্চলকে অভয়ারণ্য এবং বনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ ঘোষণা করা হয়েছে।

তবে কাগজে-কলমে সুরক্ষা ঘোষণার পাশাপাশি বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় নতুন শিল্প স্থাপন, দূষণকারী কর্মকাণ্ড এবং অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি ও আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন।

কী করণীয়

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস উপলক্ষে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সুন্দরবন রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

তাঁর মতে, সুন্দরবনের ওপর থেকে পর্যটনের চাপ কমানো, বনের আশপাশে শিল্প-কারখানা নির্মাণ বন্ধ করা, অভয়ারণ্য এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, চোরাশিকার ও বনজ সম্পদ পাচার বন্ধ এবং বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন রক্ষায় অন্তত কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি—

* বনের চারপাশে শিল্পায়ন ও দূষণকারী কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ;
* শিল্পবর্জ্য নদী-খালে ফেলা সম্পূর্ণ বন্ধ এবং নিয়মিত পরিবেশগত অডিট;
* সুন্দরবনের নদীপথে নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ রুট পুনর্বিবেচনা;
* তেল বা রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো;
* বিষ দিয়ে মাছ ধরা ও বন্যপ্রাণী শিকারের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান;
* বনজীবীদের জন্য বিকল্প ও টেকসই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা;
* পর্যটকদের সংখ্যা ও প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করা;
* প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে কার্যকর নজরদারি;
* সুন্দরবনের ভেতর ও আশপাশে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো;
* উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা;
* জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সুন্দরবনকেন্দ্রিক বিশেষ অভিযোজন পরিকল্পনা।

প্রকৃতিই সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় রক্ষক

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষণ দপ্তর সূত্রে বলা হয়েছে, সুন্দরবন প্রকৃতিগতভাবেই সৃষ্টি এবং প্রকৃতিই এর রক্ষক। তবে বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলেও দাবি বন বিভাগের।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুন্দরবনের মতো বিশাল ও জটিল বাস্তুতন্ত্রকে শুধু আইন প্রয়োগ বা বন বিভাগের নজরদারি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পরিবেশবিদ, গবেষক, প্রশাসন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পর্যটন ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষকে যুক্ত করতে হবে।

শুধু দিবস পালন নয়, চাই সামাজিক আন্দোলন

বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবসের মূল তাৎপর্য কেবল একটি দিবস পালন নয়; বরং ম্যানগ্রোভের গুরুত্বকে জাতীয় নীতি ও জনজীবনের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা। সুন্দরবন রক্ষা করতে হলে প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ বন্ধ, পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন, বনের ওপর মানুষের অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ একসঙ্গে নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ একটি ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস হয়ে গেলে শুধু গাছ লাগিয়ে আগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। ম্যানগ্রোভের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নদী, খাল, মাটি, জলাভূমি, মাছ, পাখি, বন্যপ্রাণী ও মানুষের জীবন-জীবিকার পুরো ব্যবস্থাটিই রক্ষা করতে হবে।

সুন্দরবন রক্ষা মানে শুধু একটি বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষা নয়। এর অর্থ উপকূলের লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা, দেশের জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু সহনশীলতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তাই বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবসে সুন্দরবনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বার্তা একটাই—সুন্দরবন বাঁচলে উপকূল বাঁচবে, উপকূল বাঁচলে বাঁচবে মানুষ।

বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবসে সুন্দরবনের জন্য লেখা এক কবিতা—

“মানুষের দায়”
—সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

আজ ছাব্বিশে জুলাই, বিশ্ব ম্যানগ্রোভের দিন,
সাগরের বুকজুড়ে জেগে ওঠে ঋণ।
জোয়ারের জলে লেখা কাদামাটির গান,
বনের পাতায় পাতায় বাংলাদেশের প্রাণ।
বাঘের চোখে জ্বলে যে অরণ্যের আলো,
কুমিরের নিঃশ্বাসে নদী থাকে ভালো,
সুন্দরী গাছের শিকড় আঁকড়ে ধরে দেশ—
সেই বন বাঁচানোর আজ এসেছে রেশ।

শুধু কি বন?—না, এ মানুষের ঢাল,
ঝড় এলে যে নেয় বুক পেতে কাল।
ঘূর্ণির উন্মত্ততা, জলোচ্ছ্বাস-ঢেউ,
সুন্দরবন দাঁড়িয়ে বলে—“ভয় পেও না কেউ।”
নিজের বুকের ওপর নেয় মৃত্যুর ঘা,
তবু উপকূলবাসী পায় বাঁচার ছায়া।
বনের সবুজ রক্তে দেশের শ্বাস চলে,
তার ছায়া পড়ে মানুষের ঘরে ঘরে।

তাই আজ প্রশ্ন জাগে, মানুষ, বলো তবে—
কেন আগুন ধরাও নিজেরই প্রহরে?
কেন নদীর জলে বিষ ঢেলে দাও?
কেন গাছের শিরা কেটে ঘর সাজাও?
কেন লোভের কাছে হার মানে প্রাণ,
কেন বনের বুকেই গড়ে ওঠে কারখানার টান?
কেন মুনাফার কাছে নদী হয় ক্ষত,
কেন সবুজের নামে বাজে মৃত্যুর রথ?

Manual7 Ad Code

আবুল ফজলের সেই পুরোনো পুঁথি,
ইতিহাসের পাতায় আজও তার স্মৃতি—
সুন্দরবনের সীমানা ছিল বহুদূর,
কুষ্টিয়া-যশোর ছুঁয়ে সবুজের নূর।
ষোড়শ শতকের সেই বিস্তৃত বন,
ছিল যেন বাংলার শ্বাসের স্পন্দন।
সতেরো শ ছিয়াত্তর সালেও ছিল বিস্তার,
সতেরো হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তন তার।

সময়ের কাস্তে কেটে গেছে কত,
লোভের দাঁতে ক্ষয়ে গেছে কত শত।
আজ তার বিস্তার কমে এসেছে,
বুকের সবুজ কতখানি হারিয়ে গেছে!
সংখ্যা শুধু সংখ্যা নয়—তার ভেতরে ক্ষয়,
একটি নদী শুকায়, একটি পাখি নয়।
একটি গাছ পড়ে গেলে মাটিরও কান্না,
একটি খাল মরে গেলে থেমে যায় প্রাণনা।

হাজার বছরের নদী বলে ধীর স্বরে,
“মানুষ, আমাকে রেখো না বিষের ঘোরে।
আমি তো তোমারই রক্তের মতো জল,
আমার স্রোত থামলে থামবে তোমার চল।”
কাদামাটি বলে—“আমায় দিও না বিষ,
আমার বুকেই জন্ম নেয় শেকড়ের নিশ্বাস।”
শ্বাসমূল মাথা তোলে জোয়ারের কালে,
বনের প্রাণ জেগে থাকে লবণাক্ত জলে।

ম্যানগ্রোভ মানে শুধু গাছের সারি নয়,
ম্যানগ্রোভ মানে জীবন—অদৃশ্য আশ্রয়।
শিকড় তার মাটিকে শক্ত করে ধরে,
ঢেউয়ের উন্মাদনা থামায় ঘোর ঝড়ে।
জলের সঙ্গে মাটির যে গভীর বন্ধন,
তারই মাঝে বেঁচে থাকে অসংখ্য জীবন।
পাখি আসে, মাছ আসে, কাঁকড়া আসে,
জোয়ারের ঢেউ এসে গোপন কথা হাসে।

সুন্দরী, গেওয়া, গোলপাতার বন,
কেওড়া, পশুর, ধুন্দুলের ক্ষণ—
পাতার আড়ালে কত জন্মের গল্প,
কত প্রাণ বেঁচে থাকে নির্ভর-অল্প।
বাঘের পদচিহ্ন পড়ে ভেজা বালিতে,
হরিণ চমকে ওঠে দূরের ঝোপঝাড়িতে।
কুমিরের চোখ জ্বলে নদীর কালো জলে,
কিং কোবরা নীরব থাকে গহন ছায়াতলে।

পাখির ডানায় ভোর, পাখির ডানায় সন্ধ্যা,
বনের বুকজুড়ে কত প্রাণের বন্ধ্যা—
না, বন্ধ্যা নয়, জীবন এখানে অগণন,
প্রকৃতির নিজস্ব এক মহাগ্রন্থি-বন।
স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, উভচর, পাখি,
জলজ প্রাণের কত অজানা আঁখি;
ডলফিনের ভেসে ওঠা নদীর নীল ঢেউ—
সবাই যেন বলে, “আমাদের মেরো না কেউ।”

একদিন এই বনকে চিনেছে বিশ্ব,
জীবনের বৈচিত্র্যে হয়েছে সে বিশিষ্ট।
রামসার সাইটের মর্যাদা পেয়েছে,
বিশ্ব ঐতিহ্যের মুকুটও নিয়েছে।
ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে উঠেছে নাম,
মানবসভ্যতার কাছে হয়েছে সম্মান।
কিন্তু কাগজের মুকুট কি রক্ষা করে বন?
সনদ কি থামাতে পারে মানুষের ক্ষণ?

বিশ্ব ঐতিহ্য যদি সত্যিই হয়,
তবে কেন তার বুক আজও ক্ষয়ে ক্ষয়ে রয়?
কেন নদীর শরীরে কালো তেলের দাগ,
কেন শিল্পবর্জ্যে মরে জলজ অনুরাগ?
কেন বনের পাশে কংক্রিটের ঘর,
কেন রিসোর্টের আলোয় অন্ধকার ভোর?
কেন পর্যটকের হাতে প্লাস্টিকের বিষ,
কেন নদীর বুক দিয়ে চলে পণ্যবাহী নিশ্বাস?

আইনের পাতায় লেখা—রক্ষা করো বন,
ইসিএর সীমানায় দিও না দূষণ।
বনের চারপাশে সংকটাপন্ন অঞ্চল,
শিল্প বসানো নাকি নিষিদ্ধ—এটাই বল।
অভয়ারণ্য হয়েছে বনের অনেক ভাগ,
নিরাপত্তার নামে উঠেছে কত ফাঁক।
কিন্তু কাগজের দেয়াল কাকে ঠেকায়?
লোভী হাত এলে সে দেয়াল কোথায় যায়?

ঘোষণার পাশে কেন কারখানা দাঁড়ায়?
নিষেধের পাশেই কেন ধোঁয়া উড়ায়?
বিধির চোখ বেঁধে কে রাখে রাতে?
কোন অদৃশ্য হাত চুক্তি লেখে হাতে?
সিমেন্টের ধুলো এসে বসে পাতায়,
তেলের গন্ধ মেশে নদীরই মাতায়।
এলপিজির আগুন, রিফাইনারির ধোঁয়া—
সবুজের বুকজুড়ে কে লিখে ক্ষয়-ছোঁয়া?

অন্তত পঞ্চাশ ভারী শিল্পের ভার,
বনের নিশ্বাসে আজ কত অন্ধকার।
খাদ্যের গুদামও যদি আসে বনের কাছে,
তবে বন যাবে কোথায়, মানুষই বা বাঁচে?

কারখানার বর্জ্য যদি নদীতে যায়,
জোয়ার এসে বিষ নিয়ে বনে ঢুকে যায়।
পশুরের স্রোতে মেশে কালো তরল,
মইদারার জলে নামে বিষাক্ত অনল।
খাল থেকে খালে যায় দূষণের ঢেউ,
কোনো শ্বাসমূল বলে—“আমায় বাঁচাও কেউ।”
জোয়ারে আসে বিষ, ভাটায় যায় ক্ষত,
জলের সঙ্গে মাটিও হয়ে পড়ে নত।

নতুন চারা ওঠে না কোনো কোনো স্থানে,
মৃত্যুর ছায়া নামে কাদার গোপন গানে।
জলে যদি তেল বাড়ে, মাছ কোথা যায়?
ডলফিনের শ্বাস তখন কোন নদী চায়?
কাঁকড়ার গর্তে যদি বিষ ঢুকে পড়ে,
কোন প্রাণ বাঁচবে আর সেই অন্ধ ঘরে?
মানুষ যে মাছ খায়, সেই মাছ যদি মরে,
মানুষেরই বিষ ঢোকে মানুষের ঘরে।

আরেক পাশে জেগে ওঠে তাপের কারখানা,
বনের গা ঘেঁষে তার ধোঁয়ারই ঠিকানা।
যে বিদ্যুৎ আলো জ্বালে নগরের ঘরে,
তার ছায়া কেন পড়ে ম্যানগ্রোভের পরে?
উন্নয়ন যদি হয় জীবনের বিনাশ,
তবে সে উন্নয়নের কোথায় অবকাশ?
আলো যদি আসে আর অরণ্য হয় ক্ষয়,
সে আলো কি সত্যিই মানুষের জয়?

প্রশ্নটি কঠিন—তবু করতে হবে,
সত্যকে সত্য বলার সাহস নিতে হবে।
বনকে যদি বলি দেশেরই সম্পদ,
তবে তার বিনাশে কার দায়, কার অপরাধ?
শুধু প্রতিবাদ নয়, চাই জবাবও আজ,
কার হাতে রক্ষাকবচ, কার হাতে সাজ?

শুধু শিল্প নয়, মানুষও ভুল করে,
বিষ ঢেলে মাছ ধরে নদীর গভীরে।
এক রাতের লাভে বিষ ঢোকে জলে,
তার বিষের হিসাব কে রাখে পরে?
আজ যে মাছ মরে, কাল তার সন্তান,
পরশু শুকিয়ে যাবে নদীরই প্রাণ।
কাঠ চুরি যায়, গাছ পড়ে যায়,
বনের নিঃশব্দ বুক রক্তে ভেসে যায়।

আগুনের লেলিহান শিখা যখন ওঠে,
হরিণ দৌড়ে পালায় আতঙ্কের পথে।
পাখির বাসা পুড়ে, ডিম যায় ছাই,
বনের কান্না শোনে না মানুষ—হায়!
চোরাশিকারির হাতে বন্যপ্রাণী মরে,
লোভী হাত ঢুকে পড়ে অভয়ারণ্য ঘরে।
বাঘের জন্য বন, না বাঘেরই ভয়—
মানুষের লোভে আজ প্রশ্নটি ক্ষয়।

লবণাক্ততা বাড়ে—নদীর শরীর জ্বলে,
সমুদ্রের নোনা জল উঠে আসে কূলে।
জলবায়ু বদলায়, বদলায় ঋতুর রীতি,
বৃষ্টির অঙ্কে নামে অনিশ্চিত ক্ষতি।
উজানের মিঠা জল আসে কমে কম,
নদীর বুক শুকিয়ে হয় নোনা নির্জন।
সুন্দরীর শিকড়ে তখন নোনা জলের চাপ,
সবুজের কপালে নামে অদৃশ্য অভিশাপ।

সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়ে—জোয়ার ওঠে বেশি,
পূর্ণিমার রাতে জল হয় আরও উচ্ছ্বসিত, রেশি।
অমাবস্যার ঢেউ এসে ভাসায় বনভূমি,
ডিম নষ্ট হয়, ভাঙে প্রাণেরই ভূমি।
যে উঁচু জমি ছিল প্রাণের আশ্রয়,
সেটিও জলের নিচে ডুবে যেতে চায়।
প্রকৃতি যখন বদলায় মানুষের ভুলে,
মানুষ তখন কাঁদে নিজেরই ভুলে।

১০

একদিন চারশো পাখির ডাক ছিল বনে,
আজ তাদের কত নাম হারিয়ে যায় ক্ষণে।
আকাশের সেই পুরোনো নীল ডানাগুলো,
কোথায় গেল তাদের সকালের আলো?
পাখি কমে যাওয়া শুধু পাখির ক্ষয় নয়,
তার সঙ্গে বনের ভারসাম্যও ক্ষয়।
একটি প্রজাতি গেলে শূন্য হয় জাল,
খাদ্যশৃঙ্খল ভাঙে, বদলে যায় কাল।

প্রকৃতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘর নয়,
একটি প্রাণের সঙ্গে অন্য প্রাণের পরিচয়।
মাছ আছে বলে পাখি আসে নদীর ধারে,
পাখি আছে বলে বীজ ছড়ায় বনের দ্বারে।
গাছ আছে বলে মাটি থাকে বাঁধা,
মাটি আছে বলে জন্ম নেয় প্রাণসাধা।
সবাই মিলে গড়ে জীবনের সংসার,
একটিকে মারিলে কাঁপে অন্য সবার।

১১

বনজীবী মানুষও তো এই বনের সন্তান,
মধু তার জীবিকা, মাছ তারই প্রাণ।
গোলপাতা, কাঠ, কাঁকড়া, নদীরই দান,
সুন্দরবন ঘিরেই চলে তাদের সংসার-জ্ঞান।
বনকে যদি রক্ষা চাই সত্যিকারভাবে,
বনজীবীর জীবনও রাখতে হবে তবে।
বিকল্প কর্ম চাই, চাই নিরাপদ পথ,
ক্ষুধার কাছে হারলে আইন হয় ব্যর্থ।

যে মানুষ বনে যায় পেটের দায়ে,
তাকে শুধু অপরাধী করলে সমাধান কোথায়?
তার হাতে কাজ দাও, জীবনের নিশ্চয়তা,
তবেই সে রক্ষা করবে বনের পবিত্রতা।
বন আর মানুষকে মুখোমুখি নয়,
সহাবস্থানের পথেই ভবিষ্যতের জয়।

Manual5 Ad Code

১২

পর্যটক এসো—কিন্তু এসো মিতব্যয়ে,
বনের নীরবতা রেখো নিজের হৃদয়ে।
প্লাস্টিকের বোতল ফেলে যেও না কূলে,
চিপসের প্যাকেট রেখো না জোয়ারের জলে।
বাঘ দেখতে এসে বাঘের ঘর ভেঙো না,
ছবি তুলতে গিয়ে প্রাণের ভয় রেখো না।
বনেরও অধিকার আছে নিস্তব্ধ থাকার,
নদীরও অধিকার আছে নিজের মতো বহার।

রিসোর্টের আলো যদি রাতকে করে ক্ষত,
তবে সেই আনন্দ কি সত্যিই মহৎ?
শব্দের আঘাতে পাখি যদি উড়ে যায়,
তবে সে ভ্রমণ কাকে আনন্দ দেয়?
পর্যটন হোক প্রকৃতির বন্ধু হয়ে,
বনকে ভালোবেসে, বনকে ছুঁয়ে নয় ক্ষয়ে।

১৩

সুন্দরবনের বুকে নদী বহে ধীর,
তার স্রোতে লুকিয়ে আছে বাংলার নীর।
পশুর, শিবসা, রায়মঙ্গল, কত নদী,
জীবনের সুরে তারা গায় নিরবধি।
কিন্তু নদীপথে যখন জাহাজের ভিড়,
জল কাঁপে, পাড় কাঁপে, কাঁপে বনের নীড়।
পণ্যবাহী নৌযান কাটে জলের বুক,
তেলের কালো দাগে নষ্ট হয় সুখ।

কখনো জাহাজ ডোবে—বিষ নামে জলে,
সেই বিষ ছড়িয়ে পড়ে অরণ্যের কোলে।
একটি দুর্ঘটনা শুধু দুর্ঘটনা নয়,
তার ঢেউ বহু প্রাণের জীবনে ক্ষয়।
নদীকে যদি পথ বলো, পথেরও নিয়ম চাই,
বনের বুকের ভেতর বেপরোয়া চলা নাই।

১৪

তবু আশার আলো নিভে যায়নি আজ,
বনকর্মীর চোখে আছে দায়িত্বের সাজ।
পাঁচ বছরের হিসাব বলে—কিছুটা উন্নতি,
গাছপালা, প্রাণীতে ফিরছে জীবনীশক্তি।
বাঘের সংখ্যা বাড়ে, বাড়ে শিকার,
অরণ্য যেন পায় নতুন অঙ্গীকার।
অপরাধ কমেছে—যদি সত্যিই হয়,
তবে সেই সাফল্যকে শক্ত করে রাখাই জয়।

কমিউনিটির হাতে দাও বনের প্রহর,
স্থানীয় মানুষ হোক অরণ্যের কণ্ঠস্বর।
যারা জানে নদী, জানে কাদা, জানে পথ,
তাদের জ্ঞানেই গড়ে উঠুক নিরাপদ রথ।
ডিজিটাল চোখ থাকুক বনের আকাশে,
অপরাধীর পদচিহ্ন ধরা পড়ুক নিঃশ্বাসে।
প্রযুক্তি হোক প্রহরী, মানুষ হোক মন,
দুই মিলে রক্ষা পাক সুন্দরবন।

১৫

কিন্তু প্রহরী যতই থাকুক পথে,
আইন যদি ঘুমায় ক্ষমতারই রাতে,
তবে সবুজের স্বপ্ন কোথায় গিয়ে রয়?
আইন সবার জন্য—এটাই হোক জয়।
শিল্প যদি নিষিদ্ধ হয় সংকটের ঘরে,
নিষেধ মানতে হবে বাস্তবের ভুবনে।
আইনের শাসন যদি কেবল কাগজে,
তবে বন বাঁচবে কীভাবে এই সমাজে?

প্রশ্ন করো, উত্তর চাও, ভয় কোরো না,
বনের পক্ষে দাঁড়ালে মাথা নত কোরো না।
যে নদী বাঁচায় তোমায়, তাকে বাঁচাও আগে,
যে বন আগলে রাখে, তাকে রেখো জাগে।
দেশপ্রেম শুধু পতাকা ওড়ানো নয়,
দেশপ্রেম মানে নদী-বন রক্ষারও দায়।

১৬

সুন্দরবন কোনো এক জেলার সম্পদ নয়,
এ বাংলাদেশের বুকের অনন্ত পরিচয়।
দক্ষিণ-পশ্চিমের মাটি, মানুষের ঘ্রাণ,
তার পাতায় লেখা দেশেরই প্রাণ।
যে বন ঝড় থামায়, সে বনই তো দেশ,
তার প্রতিটি শ্বাসে ভবিষ্যতের রেশ।
সুন্দরবন বাঁচলে বাঁচবে উপকূল,
বাঁচবে কৃষকের ঘর, বাঁচবে নদীর কূল।

ঘূর্ণিঝড় এলে যে সবুজ দেয়াল,
হাজার প্রাণ বাঁচায়, থামায় মৃত্যুকাল।
তার কাছে আমাদের ঋণ অশেষ,
তার বিনিময়ে চাই না কোনো রৌপ্য-রেশ।
শুধু চাই তাকে থাকতে দাও তার মতো,
শেকড় মেলতে দাও, হতে দাও সতত।

১৭

একটি গাছ মানে শুধু কাঠ নয়,
একটি গাছ মানে শত প্রাণের পরিচয়।
একটি নদী মানে শুধু পানি নয়,
তার ভেতরে অগণিত জীবনের স্রোত বই।
একটি কাঁকড়া মানে খাদ্যশৃঙ্খল,
একটি পাখি মানে বীজের সম্বল।
একটি বাঘ মানে বনের সুস্থতা,
তার অস্তিত্বে থাকে অরণ্যের পূর্ণতা।

তাই বাঘ বাঁচাও মানে বনকে বাঁচানো,
বন বাঁচাও মানে নদীকে বাঁচানো।
নদী বাঁচাও মানে মানুষকে বাঁচানো,
মানুষ বাঁচাও মানে ভবিষ্যৎ গড়ানো।
এই সত্য আজ পৃথিবী জানুক স্পষ্ট,
প্রকৃতিকে হারিয়ে মানুষ কখনো নয় শ্রেষ্ঠ।

১৮

ম্যানগ্রোভ দিবস তাই উৎসবের দিন নয়,
এ দিন নিজের কাছে নিজেরই পরিচয়।
আমরা কতটা নিয়েছি প্রকৃতির কাছ থেকে,
কতটা ফিরিয়েছি তাকে ভালোবেসে?
প্রশ্নটি আজ উঠুক প্রতিটি প্রাণে,
শিশুর চোখে, কৃষকের ঘামে, শ্রমিকের গানে।
শহরের মানুষ জানুক—দূরের এই বন,
তারও নিঃশ্বাসে রাখে নিজের জীবন।

ঢাকার বাতাসে যদি ধোঁয়া ওঠে আজ,
সুন্দরবনের পাতায় তারই পড়ে সাজ।
উপকূলের লবণ যদি শহরে আসে,
তার খবর পৌঁছায় বাজারের শস্যে।
প্রকৃতি কোনো সীমানায় বাঁধা নয়,
এক প্রান্তের ক্ষতি অন্য প্রান্তে ক্ষয়।

১৯

তাই আজ কবি নয়, নদী কথা বলুক,
শ্বাসমূলের ভেতর থেকে শব্দ জাগুক।
গেওয়ার পাতারা বলুক—“আর কত ক্ষয়?”
সুন্দরীর ডালে বসা পাখি বলুক—“জয়
চাই না তোমার, চাই বাঁচার অধিকার,
চাই না মুনাফা, চাই নদীর স্বাভাবিক ধার।”
বাঘের চোখ বলুক—“আমার বন রেখো,”
হরিণের পায়ের শব্দ বলুক—“পথ রেখো।”

কুমির বলুক—“নদী আমারও ঘর,”
ডলফিন বলুক—“জল রেখো স্বচ্ছতর।”
মাছ বলুক—“বিষ দিও না জলে,”
কাঁকড়া বলুক—“মাটি রেখো তলে।”
পাখি বলুক—“আমার আকাশ রেখো,”
গাছ বলুক—“আমার শিকড় রেখো।”
সবাই মিলে এক কণ্ঠে উঠুক গান—
“প্রকৃতি বাঁচলেই বাঁচবে প্রাণ।”

২০

বনের পাশে আর শিল্প চাই না,
বর্জ্যের বিষে নদী মরে যাক—তা চাই না।
অপরিকল্পিত পর্যটনের ভার নয়,
প্লাস্টিকের পাহাড়ে সবুজ হারাক—নয়।
চোরাশিকার, কাঠ পাচার, বিষে মাছ ধরা,
আগুন দিয়ে বনের বুক ছাই করে দেওয়া—
এসবের বিরুদ্ধে উঠুক মানুষের দল,
আইনের হাতে ফিরুক ন্যায়েরই বল।

বনজীবীর হাতে বিকল্প কাজ দাও,
ক্ষুধার কাছে আইনকে দুর্বল কোরো না।
অভয়ারণ্যে প্রবেশে নিয়ম থাক,
প্রকৃতির নিজস্ব ঘর প্রকৃতিরই থাক।
পর্যটন হোক সীমিত, হোক সচেতন,
মানুষের পদচিহ্নে না মরুক বন।

২১

সুন্দরবন রক্ষার শপথ নাও আজ,
লোভের বিরুদ্ধে জ্বালো বিবেকেরই সাজ।
শিশুকে শেখাও—গাছ মানে প্রাণ,
নদী মানে জীবন, বন মানে টান।
বিদ্যালয়ের পাঠে থাকুক সবুজের কথা,
ঘরে ঘরে হোক পরিবেশের ব্যথা।
প্লাস্টিক হাতে নিয়ে নদীর কাছে গেলে,
নিজেকেই প্রশ্ন করো—“আমি কী ফেলব জলে?”

একটি বোতল যদি নদীতে না যায়,
একটি প্যাকেট যদি কূলে না ঠাঁই পায়,
একটি গাছ যদি কেটে না ফেলা হয়,
একটি পাখি যদি শিকারির হাত থেকে রয়—
ছোট ছোট কাজেই বড় পরিবর্তন,
মানুষের হাতে তাই ভবিষ্যৎ-গঠন।

২২

প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে কেউ জেতে না,
সমুদ্রের ঢেউকে আদেশ দিয়ে থামাতে পারে না।
বাতাসকে শিকলে বাঁধা যায় না কোনোদিন,
নদীকে কাগজে আটকে রাখা যায় না ক্ষণ।
প্রকৃতির নিয়ম যদি ভাঙো অহংকারে,
প্রকৃতি ফিরিয়ে দেবে হিসাব একদিন ঝড়ে।
তাই তাকে জয় নয়—চাই সহাবস্থান,
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের হোক চিরবন্ধন।

বনের কাছে মানুষ আজ মাথা নত করুক,
লোভের বদলে ভালোবাসার হাত ধরুক।
যে মাটি আমাদের, সে মাটিরই ঋণ,
যে জল আমাদের, সে জলেরও দিন।
যে গাছের ছায়ায় শিশুরা পায় প্রাণ,
সে গাছ কেটে কেমন করে বলি—“আমার দেশ মহান”?

২৩

সুন্দরবন আজ যেন মায়ের মতো বলে—
“তোমাদের রেখেছি কত বিপদের কূলে।
ঝড়ের রাতে বুক পেতে দিয়েছি ঢাল,
জলোচ্ছ্বাস থামিয়ে করেছি তোমাদের কালো রাত লাল।
তোমাদের ঘরে যখন শিশুরা ঘুমায়,
আমার গায়ে তখন ঘূর্ণিঝড় ঝাঁপায়।
তোমরা শুধু ভোর দেখো, দেখো না রাত,
আমার ক্ষতগুলোয় লেগে থাকে লবণাক্ত হাত।”

“তবু আমি রাগিনি, এখনো দাঁড়িয়ে,
শেকড় দিয়ে মাটিকে রেখেছি আঁকড়ে ধরে।
তোমরা যদি আজ আমার পাশে থাকো,
আমি আবার সবুজ হব—শুধু আমাকে রাখো।
আমার নদী পরিষ্কার করো, বিষ ঢালো না,
আমার প্রাণীদের হত্যা করে উল্লাস কোরো না।”

২৪

সুন্দরবন, তোমার কাছে আজ অঙ্গীকার—
লোভের চেয়ে বড় হবে জীবনের অধিকার।
কারখানার ধোঁয়ার চেয়ে বড় হবে বন,
মুনাফার চেয়ে বড় হবে মানুষের জীবন।
আইনের পাতার অক্ষর হবে বাস্তব,
দূষণের বিরুদ্ধে হবে জনতার প্রতিবাদ।
বনের প্রহরী হবে গ্রামের মানুষও,
রক্ষার কাজে থাকবে দেশের প্রতিটি শ্বাসও।

শুধু সরকারের নয়, দায়িত্ব সবার,
শুধু বিশেষজ্ঞ নয়, দায়িত্ব জনতার।
শুধু বন বিভাগের হাতে নয় বন,
এ দেশের প্রতিটি মানুষেরই আপন।
একটি সম্মিলিত শপথ উঠুক আজ—
“সুন্দরবন বাঁচাব, বাঁচাব তার সমাজ।”

২৫

আজ বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস—তাই
পৃথিবীর কাছে এই বাংলার প্রার্থনা ভাই—
“ম্যানগ্রোভকে রেখো, রেখো সবুজ করে,
নদীকে রেখো তার আপন স্রোতের ঘোরে।
সমুদ্রের সঙ্গে বনের বন্ধন থাক,
জোয়ারের গানে জীবনের স্পন্দন থাক।
শিশুরা যেন আগামী দিনের ভোরে
বাঘের গল্প শোনে সত্যিকার ঘোরে।”

তারা যেন দেখে হরিণের দৌড়,
ডলফিনের ভেসে ওঠা নদীরই কৌতুক-ঝড়।
তারা যেন দেখে পাখির মেলা,
গোলপাতার ছায়ায় দুপুরের খেলা।
তারা যেন বলে—“এই বন আমাদের,”
“এই বন বাঁচুক”—এই হোক তাদের স্বর।

২৬

যদি কোনোদিন আবার ইতিহাস লেখা হয়,
যদি কোনো কবি এসে এই সময়টাকে কয়—
“একদা মানুষ ছিল লোভের অন্ধতায়,
তবু একদিন ফিরেছিল প্রকৃতির মমতায়”—
সেই ইতিহাসে আমাদের নাম থাক,
ধ্বংসের নয়, রক্ষার পরিচয় থাক।
লিখুক ভবিষ্যৎ—“মানুষ থেমেছিল,
সুন্দরবনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।”

লিখুক—কারখানা নয়, নদী আগে,
মুনাফা নয়, প্রাণের অধিকার জাগে।
লিখুক—আইন শুধু দেয়ালে নয়,
বাস্তবের মাটিতে তার প্রয়োগ হয়।
লিখুক—বনজীবীর মুখে হাসি ফুটেছে,
বনের প্রাণীরা নিরাপদে ছুটেছে।

২৭

আজকের এই দিন তাই রাখুক বাণী—
সবুজের কাছে মানুষ যেন হয় ঋণী।
বনের কাছে মাথা নত হোক,
নদীর কাছে হৃদয় স্বচ্ছ হোক।
শিকড়ের মতো গভীর হোক মায়া,
পাতার মতো নির্মল হোক ছায়া।
জোয়ারের মতো ফিরে আসুক প্রাণ,
বনের মতো দীর্ঘ হোক বাংলাদেশের গান।

ম্যানগ্রোভ শুধু উপকূলের বন নয়,
এ পৃথিবীর বুকের এক জীবন্ত পরিচয়।
সমুদ্র, নদী, মাটি, মানুষ, প্রাণ—
সবাই মিলে তার অস্তিত্বের গান।
তাকে হারালে হারাবে জীবনের সুর,
তাকে বাঁচালে ভবিষ্যৎ হবে ভরপুর।

২৮

তাই এসো, আজ আমরা হাতে হাত রাখি,
সবুজের নামে নতুন শপথ আঁকি।
বিষের বিরুদ্ধে দাঁড়াক নদীর ঢেউ,
বনের বিরুদ্ধে আর উঠবে না কেউ।
গাছের বিরুদ্ধে উঠবে না কুঠার,
প্রাণের বিরুদ্ধে উঠবে না শিকার।
লোভের বিরুদ্ধে জাগুক বিবেক,
প্রকৃতির পাশে থাকুক মানবতার একেক।

সুন্দরবনের শ্বাসে আমাদের শ্বাস,
তার জোয়ারে জাগে দেশেরই বিশ্বাস।
তার কাদায় লেখা ভবিষ্যতের নাম,
তার পাতায় পাতায় স্বাধীনতার গান।
তার বুকের বাঘ যেন বনে থাকে বাঘ,
তার নদী যেন বহে নির্মল অনুরাগ।
তার আকাশে পাখি ফিরে ফিরে আসুক,
তার সবুজে আগামী প্রজন্ম বাসুক।

২৯

যেদিন ঝড় আসবে বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে,
কালো মেঘ নামবে আকাশের গায়ে ছড়িয়ে,
সেদিনও সুন্দরবন দাঁড়াবে যদি,
মানুষের ঘরে ফিরবে বেঁচে থাকার নদী।
তাই আজ তাকে বাঁচানো মানে আগামীর দিন,
তাকে বাঁচানো মানে শিশুর হাসি ঋণ।
তাকে বাঁচানো মানে কৃষকের ঘর,
জেলেদের জাল, উপকূলের ভোর।

তাকে বাঁচানো মানে দেশেরই মান,
তাকে বাঁচানো মানে মানুষের প্রাণ।
তাকে বাঁচানো মানে পৃথিবীর ভারসাম্য,
তাকে বাঁচানো মানে ভবিষ্যতের সাম্য।
তাকে বাঁচানো মানে—এই সত্য জানি,
সুন্দরবন বাঁচুক, বাঁচুক বাংলাদেশখানি।

৩০

আজ ছাব্বিশে জুলাই, উঠুক এক স্বর—
“সুন্দরবন বাঁচাও, বাঁচাও সাগর!”
বাঁচাও ম্যানগ্রোভ, বাঁচাও নদী,
বাঁচাও মাটির গন্ধ, বাঁচাও জীবনী।
বাঁচাও সুন্দরী, গেওয়া, গোলপাতা,
বাঁচাও কেওড়া, বাঁচাও অরণ্যের কথা।
বাঁচাও বাঘ, হরিণ, কুমিরের ঘর,
বাঁচাও পাখির নীল আকাশের পর।

বাঁচাও বনজীবীর স্বপ্নের সংসার,
বাঁচাও উপকূলের মানুষের অধিকার।
বাঁচাও জোয়ার, বাঁচাও ভাটার টান,
বাঁচাও মাটির গভীরে শেকড়ের প্রাণ।
বাঁচাও আজকের পৃথিবীর সবুজ মানচিত্র,
বাঁচাও আগামী দিনের নির্মল চরিত্র।

৩১

কোনো পতাকা নয়, কোনো মিছিল নয় শুধু,
কাজের ভেতরেই থাকুক অঙ্গীকারের বীজ বোনা।
কথার চেয়ে বড় হোক নদী পরিষ্কার,
স্লোগানের চেয়ে বড় হোক গাছের অধিকার।
ছবির চেয়ে বড় হোক বাস্তবের বন,
প্রতিশ্রুতির চেয়ে বড় হোক রক্ষার পণ।
দিবস শেষ হলেও যেন না শেষ হয় দায়,
ম্যানগ্রোভের প্রতি ভালোবাসা প্রতিদিন বেঁচে যায়।

আজকের দিন কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা নয়,
আজকের দিন ভবিষ্যৎ রক্ষারই সময়।
যে শিশু আজ পৃথিবীর দিকে তাকায়,
তার চোখে আগামী সুন্দরবন কি জেগে যায়?
সে কি দেখবে কেবল গল্পের বইয়ে বাঘ?
নাকি সত্যি দেখবে সবুজের অনুরাগ?

৩২

হে সুন্দরবন, তুমি থেকো—
জোয়ারের জলে শিকড় মেলে রেখো।
ঝড়ের মুখে বুক পেতে থেকো,
ক্লান্ত পৃথিবীকে ছায়া দিয়ে রেখো।
আমরা এবার তোমার পাশে দাঁড়াব,
তোমার ক্ষতগুলো ভালোবাসায় সারাব।
লোভের কাছে আর তোমাকে দেব না,
বিষের হাতে নদী তুলে দেব না।

হে সুন্দরবন, তুমি থেকো—
বাঘের চোখে আগুন হয়ে থেকো।
হরিণের পায়ে ছন্দ হয়ে থেকো,
পাখির ডানায় গন্ধ হয়ে থেকো।
ডলফিনের জলে হাসি হয়ে থেকো,
মাটির শিরায় আশ্বাস হয়ে থেকো।
বাংলার বুকের সবুজ প্রাণ হয়ে,
মানুষের পাশে অনন্তকাল হয়ে।

৩৩

শেষ কথা নয়—এ কেবল শুরু,
বনের ডাক শুনে ফিরুক মানুষ দূর।
যে হাতে কুঠার, সে হাতে চারা,
যে হাতে বিষ, সে হাতে নদীধারা।
যে চোখে মুনাফা, সে চোখে মমতা,
যে মনে লোভ, সে মনে মানবতা।
যে শহর বনকে ভুলে গেছে আজ,
সে শহরই হোক বনের নতুন সমাজ।

সুন্দরবনের কাছে আজ এ আমাদের ঋণ—
সবুজ রাখব মাটি, স্বচ্ছ রাখব দিন।
জীবনের সঙ্গে জীবন বাঁধা যে সূত্র,
সেই সূত্রেই লেখা হোক আগামী মন্ত্র।
মানুষ আর প্রকৃতি মুখোমুখি নয়—
সহযাত্রী হয়ে চলুক দুজনেই নির্ভয়।

৩৪

যতদিন বঙ্গোপসাগর ঢেউ তুলে যায়,
যতদিন রায়মঙ্গল জোয়ারে গান গায়,
যতদিন পশুর নদী বহে অবিরাম,
যতদিন গেওয়া পাতায় পড়ে রৌদ্রের নাম,
যতদিন সুন্দরী শ্বাস নেয় কাদার তলে,
যতদিন হরিণ ছুটে যায় গোপন পথ চলে,
যতদিন বাঘ হাঁটে অরণ্যের ঘাসে—
ততদিন বাংলাদেশ থাকবে তার আশে।

আর যদি কোনোদিন মানুষ ভুলে যায়,
সুন্দরবন তখন কাঁদবে জোয়ারের হাওয়ায়।
সেই কান্না যেন আর না শুনি আমরা,
প্রকৃতির বুক যেন না হয় শ্মশানধারা।
আজ তাই শেষ নয়—শুরু হোক পথ,
সবুজের পক্ষে উঠুক মানুষের শপথ।

৩৫

বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবসে এই হোক গান—
“বন বাঁচাও, বাঁচাও প্রাণ।”
“নদী বাঁচাও, বাঁচাও দেশ।”
“প্রকৃতি বাঁচাও, বাঁচুক অবশেষ।”
সুন্দরবনের প্রতিটি গাছের পাতায়,
লিখে দাও ভালোবাসা মানুষের হাতায়।
প্রতিটি শ্বাসমূলে দাও জীবনের মান,
প্রতিটি নদীতে ফিরুক স্বচ্ছতার গান।

যে বন ঝড়ের সামনে দাঁড়ায় নির্ভীক,
তার প্রতি হও মানুষ, হও মানবিক।
তার জন্য আইন হোক কঠোর, নির্মল,
তার জন্য জনতা হোক সচেতন, সরল।
তার জন্য রাজনীতি হোক দায়বদ্ধ,
তার জন্য উন্নয়ন হোক প্রকৃতিসম্মত।

৩৬

শেষে শুধু এই কথা—মনে রেখো সবাই,
সুন্দরবন কোনো দূরের গল্প নয় ভাই।
তার শ্বাসে আমাদের ফুসফুসের ঋণ,
তার জলে আমাদের ভবিষ্যতের দিন।
তার মাটিতে আমাদের সন্তানদের পা,
তার ছায়ায় আমাদের আগামী দিনের চাওয়া।
তাই তাকে রক্ষা করা কোনো দয়া নয়,
এ আমাদের অস্তিত্বেরই চূড়ান্ত পরিচয়।

যে বন বাঁচে, সে দেশ বাঁচে,
যে নদী বাঁচে, সে জীবন বাঁচে।
যে ম্যানগ্রোভ থাকে সবুজের ঘোরে,
মানুষ নিরাপদ থাকে তারই কূলে।
তাই আজ বিশ্বকে বলুক বাংলা—
“সবুজের মৃত্যু নয়, চাই সবুজের জাগরণ।”

সুন্দরবন বাঁচুক—
জোয়ারে, ভাটায়, বৃষ্টিতে, ঝড়ে;
সুন্দরবন বাঁচুক—
শিশুর হাসিতে, মানুষের ঘরে।
সুন্দরবন বাঁচুক—
বাঘের পদচিহ্নে, পাখির গানে;
সুন্দরবন বাঁচুক—
বাংলার মাটি, নদী, মানুষের প্রাণে।

আর মানুষ আজ শপথ করুক—
যে বন আমাদের বাঁচায় প্রতিদিন,
সেই বনকে বাঁচাব আমরা—
আজ, আগামীকাল, অনন্তদিন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ