৭ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৩৬৪ জন শিক্ষার্থী নিহত

প্রকাশিত: ১১:৪১ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০২৬

৭ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৩৬৪ জন শিক্ষার্থী নিহত

Manual1 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৮ জুলাই ২০২৬ : দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী নিহতের মাত্রা খুবই উদ্বেগজনক। ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত সাড়ে ৭ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৩৬৪ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ১৫.১১%। উল্লিখিত সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহত হয়েছে ৪৮,৭১৩ জন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত ও গণমাধ্যমে প্রেরিত বিগত সাত বছরের দুর্ঘটনার চিত্র প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী স্কুল ও মাদরাসা শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে ৩,৩২৮ জন (৪৫.১৯%)। ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে ৪,০৩৬ জন (৫৪.৮০%)।

দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী নিহতের ধরন:

১. শিক্ষার্থীরা পথচারী হিসেবে যানবাহনের চাপা/ধাক্কায় নিহত হয়েছে ১,৯২৩ জন (২৬.১১%)
২. যানবাহনের যাত্রী হিসেবে নিহত হয়েছে ৯২৭ জন (১২.৫৮%)
৩. মোটরসাইকেরলের চালক ও আরোহী হিসেবে নিহত হয়েছে ৩,৮৪১ জন (৫২.১৫%)
৪. বাইসাইকেল ও রিকশা আরোহী হিসেবে নিহত হয়েছে ৫১৯ জন (৭.০৪%)
৫. অটোরিকশার চাকায় ওড়না/পোশাক পেঁচিয়ে নিহত হয়েছে ১৫৪ জন (২.০৯%)।

সড়কভিত্তিক মোট নিহতের চিত্র:

Manual4 Ad Code

মহাসড়কে ১,৪৮২ জন (২০.১২%),
আঞ্চলিক সড়কে ২,১৪৯ জন (২৯.১৮%),
শহরের সড়কে নিহত হয়েছে ১,৭৮৬ জন (২৪.২৫%),
গ্রামীণ সড়কে নিহত হয়েছে ১,৯৪৭ জন (২৬.৪৩%)।

সড়কভিত্তিক পথচারী নিহতের চিত্র:

জাতীয় মহাসড়কে ২৫১ জন (১৩.০৫%),
আঞ্চলিক সড়কে ৪০৯ জন (২১.২৬%),
শহরের সড়কে- ৫৩৭ জন (২৭.৯২%),
গ্রামীণ সড়কে- ৭২৬ জন (৩৭.৭৫%)।

Manual7 Ad Code

দুর্ঘটনা পর্যালোচনা:

৫ থেকে ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী স্কুলে যাওয়া-আসার পথে, বাড়ির আশপাশে খেলার সময় অটোরিকশা, বাইক ও পণ্যবাহী যানবাহনের ধাক্কায়/চাপায় নিহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনা গ্রামীণ সড়কে বেশি ঘটেছে।

১৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা বাইকের চালক ও আরোহী হিসেবে বেশি নিহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনা আঞ্চলিক ও মহাসড়কে বেশি ঘটেছে।

বাইসাইকেল আরোহীরা থ্রি-হুইলার, মোটরসাইকেল এবং অনিরাপদ মালবাহী যানবাহনের ধাক্কায় গ্রামীণ এবং আঞ্চলিক সড়কে বেশি নিহত হয়েছে।

অটোরিকশার চাকায় ওড়না বা পোশাক পেঁচিয়ে দুঘটনার জন্য ব্যক্তিগত অসতর্কতা দায়ী।

সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী নিহতের বছরভিত্তিক চিত্র:

বছর — নিহত
২০১৯—৬৯৩

২০২০—৭১৯

২০২১—৯৩৬

২০২২—১৩৮৫

২০২৩—১১৫৩

২০২৪—১০৭৩

২০২৫—১০১৪

Manual5 Ad Code

২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত—৩৯১ জন।

গত সাড়ে ৭ বছরে অসাবধানে রেল লাইন পারাপারের সময় এবং কানে হেড ফোন ব্যবহার করে রেললাইন ধরে হাঁটার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে ১,২৩৭ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী নিহতের কারণসমূহ:

১. ত্রুটিপূর্ণ সড়ক এবং অনিরাপদ যানবাহন;
২. নিরাপদে সড়ক ব্যবহার বিষয়ে সচেতনতার অভাব;
৩. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকা;
৪. সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা না থাকা;
৫. শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেপরোয়া বাইক চালানোর মানসিকতা;
৬. ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা;
৭. অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

সুপারিশসমূহ:

১. শিক্ষ প্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে বছরে একবার ক্যাম্পেইনের আয়োজন করতে হবে;
২. সরকারি উদ্যোগে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে;
৩. ক্লাস পরীক্ষায় সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশ্ন থাকতে হবে;
৪. গণমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় জীবনমুখি প্রচারণার মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে;
৫. অনিরাপদ যানবাহন বন্ধ করতে হবে;
৬. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশের সড়কে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে;
৭. কোনোভাবেই যেন অপ্রাপ্ত বয়স্করা বাইক চালাতে না পারে সেজন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং পারিবারিক সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

Manual8 Ad Code

মন্তব্য: ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের বেপরোয়া বাসের চাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ২জন শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় ঢাকা-সহ সারা দেশের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে অভূতপূর্ব অহিংস আন্দোলন করেছিল। এরপর ৮ বছর পেরিয়ে গেলেও সড়ক পরিবহনখাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সড়ক দুর্ঘটনাও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘমেয়দী কোনো টেকসই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে তা অনেকটা অবৈজ্ঞানিক ও সমন্বয়হীন। সড়ক পরিবহন আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সড়ক পরিবহন খাতের স্বার্থবাদী গোষ্ঠী নিজেদের দুর্নীতি এবং চাঁদাবাজির স্বার্থে সড়কে বিশৃঙ্খলা বজায় রাখে। মাঝে-মধ্যে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য কমিটি গঠন এবং সুপারিশ তৈরি করা হয়। কিন্তু কোনো সুপারিশই আলোর মুখ দেখে না। মূলত কমিটি গঠন ও সুপারিশ তৈরির মধ্যেই সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ঘুরপাক খাচ্ছে। বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি নেই।

কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের প্রতিক্রিয়া ও সুপারিশ :

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, সাপ্তাহিক নতুন কথা’র বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “দুর্ঘটনার এই চিত্র বাংলাদেশের সড়কে নিরাপত্তাহীনতা ও সীমাহীন অব্যবস্থার চিত্রই প্রকাশ পেয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গাড়ি চালনার প্রাথমিক শিক্ষা কোর্স (ব্যবহারিক সহ) চালু করাসহ দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি করা, চালকের বেতন ও কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করা, বিআরটিএ’র সক্ষমতা বৃদ্ধি করা,পরিবহনের মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা পার্শ্ব রাস্তা (সার্ভিস রোড) তৈরি করা, সকল সড়ক-মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করা, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার করা, গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, রেল ও নৌ-পথ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে সড়ক পথের উপর চাপ কমানো, গণপরিবহন উন্নত, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করে মোটরসাইকেল ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা, সড়ক, নৌ ও রেলপথে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করাসহ
সড়ক পরিবহন আইন ও বিধিমালা যথাযথ বাস্তবায়নে নতুন নতুন কৌশল ও ডিজিটালাইজড উদ্ভাবনকে কাজে লাগাতে হবে। সর্বোপরি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও ডিজিটাইজড করতে হবে। এ বিষয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে প্রায় দুই বছর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উন্নয়ন প্রজেক্ট পাঠানো হয়েছে, তা বাস্তবায়ন জরুরি।
যাত্রী ও পথচারীদের ব্যক্তি নিরাপত্তা ও বিধি-বিধান প্রতিপালনে সচেতন হতে হবে। নাগরিকদের মধ্যে আইন ও শৃঙ্খলা মানার সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে হবে। সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা, শ্রমিক নেতা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যথাযথ আইন প্রয়োগে সহায়তা প্রদান করতে হবে।
প্রশাসন, পুলিশ, বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ, মালিক, চালক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব। সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জাতীয়ভাবে সেল তৈরি করে এবং প্রতি বিভাগ ও জেলায় একইভাবে সেল গঠন করে নিয়মিত মনিটরিং ও পরামর্শ প্রদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং এ সেলকে সর্বদাই সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এভাবেই সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করা সম্ভব।”