সিলেট ২৮শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬:০৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০২৬
বিউটি পাল আমাদের ব্যাচমেট। ২০০৪-২০০৫ ব্যাচে আমরা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হই। আমরা ছিলাম ৬০ জন। ২০১২ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করে বর্তমানে বাংলাদেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ০৮ জন। যুক্তরাষ্ট, কানাডার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ০৫, বিসিএস ক্যাডার ৭, নন ক্যাডার ০৫। বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি ব্যাংক, বেসরকারি ব্যাংক মিলিয়ে সবাই দেশের সেবায় নিয়োজিত।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে অবহেলিত যে স্তর, সেটি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। সেখানে কাজ করছে দুই জন- বিউটি পাল এবং Masudul Islam Rana। তাদের মেধা ছিল যোগ্যতাও ছিল। দুজনের রেজাল্ট ফার্স্ট ক্লাস। কিন্তু তারা স্বপ্নবাজ। তাই তারা কাজ করছে সিলেট শহরের আভিজাত্য ছেড়ে, ভার্সিটির বড় বড় এসি বিল্ডিং এর ক্লাস রুম ছেড়ে, জাঁকজমকপূর্ণ লাইব্রেরীর সুযোগ সুবিধা ছেড়ে, প্রত্যন্ত গ্রামে। যেখানে শিক্ষকদের বইকেনার জন্য ২০০ টাকাও প্রণোদনা নেই। ৫০ টাকা ইন্টারনেট ভাতাও নেই। তবু শিক্ষকরা নিজ টাকা খরচ করে বাচ্চাদের পড়াচ্ছে।
মাসুদুল হক রানা চাকুরি করে কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের পাওন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আমরা একবার রানার স্কুল দেখার জন্য পাওন গ্রামে যাচ্ছিলাম। তখন ছিল অক্টোবর মাস। হাওরের আফালের সময়। বিশাল বড় বড় ঢেউ। নৌকা ডুবে আর ভাসে। সেইবার আমরা আয়তুল কুরসি পড়তে পড়তে নৌকা ডুবি থেকে বেঁচেছিলাম। তার বাড়িতে অনেক ভালো মন্দ রান্নাও হয়েছিল। কিন্তু আমাদের বন্ধুদের যারা ঢাকা শহর থেকে গিয়েছিলাম তাদের পিত্ত শুকিয়ে গিয়েছিল। তারা আতংকে খাওয়া দাওয়াও করতে পারিনি। রানার কথা বললেই চলে আসে সেইদিনের ট্রমাটিক মূহূর্তগুলো।
এবার আসি আলো জ্বলমলে শহরের বিপরীতে ২০২৬ সালের রানার গ্রামে, ১২ থেকে ১৬ ঘন্টার লোডশেডিংয়ের গ্রামে। যেখানে গ্রীষ্মের গরমের চাইতে প্রবাসীদের টাকার গরম বেশি, সেইসব গ্রামে। সেইসব গ্রামে যেইখানে মানুষ নিজের কল্যাণের চাইতে অন্যের অকল্যাণ ভাবে। সেইসব গ্রামে যেখানে আপনার ভাষণ নয়, ভূষণই মূখ্য। সেইসব গ্রামে যেখানে সবাই ইহকালের চেয়ে পরকালের কথা একটু বেশিইভাবে। তবে সেইসব গ্রামে যেখানে সুদের ব্যবসা হালাল হয়েছে বহু আগেই। সেইসব গ্রামে যেখানে ধর্ম এখন আর আধ্যাত্মিকতা নয় বরং লৌকিকতা। সেইসব গ্রামে যেখানে শিক্ষকরা অনেক আগেই মাস্টর হয়েছে, অবহেলায় আর অবজ্ঞায়।
পাবলিক ভার্সিটিতে স্নাতকোত্তর করা রানা আর বিউটিরা ক্লাস নিচ্ছে উপরে ফিটফাট, তবে ভিতরে ছালবাকলহীন রুমে। ফলাফল তারা ভুলে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা একসময় আর্টসেল, শিরোনামহীন, মাইলসের কনসার্টে নেচেছিল, প্রতি বৈশাখে তারা নাচতো বিশ্ববিদ্যালয়ের “নোঙর” নামক সাংস্কৃতিক সংগঠনের অনুষ্ঠানে। সেইসব গ্রামের সাদাকালো জীবনে বিউটি পাল এর অপরাধ নীল রংয়ের শাড়ি পরা। বিউটি পালের অপরাধ, আমাদের জরাজীর্ণ মলিন শিক্ষা ব্যবস্থায় বিউটি পাল তার সিল্কি চুল বাতাসে উড়িয়েছিল। বিউটি পাল আর মাসুদুল হক রানার অপরাধ, বিনিয়োগী শিক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগে অসমর্থ গ্রামের শোষিত বাচ্চাদের টুইংকেল টুইংকেল লিটিল স্টার পড়ায়, এগুলোতো পড়বে শহরের ভদ্রনোকের সন্তানেরা। গ্রামের বাচ্চারা সারাজীবন ইংরেজিতে দুর্বল থাকবে। ফেল করতে করতে কোন রকমে পাস করে ২৫ বছর বয়স হবে, বিয়ে করবে, সংসার করবে। জগতের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল কাজ- মানব সন্তান জন্ম দিবে। আমাদের একমাত্র রপ্তানি পন্য- আদম সন্তান রপ্তানি করে সরকারের কোষাগার সমৃদ্ধ করবে। GDP এগিয়ে যাবে, কিন্তু Happiness Index শূন্য হবে। স্বামী বিদেশে, বউ স্বদেশে। ফলাফল উগ্র বিকারগ্রস্থ সন্তান।
বিউটি পাল আর মাসুদুল হক রানার অপরাধ, গ্রামের সুবিধা বঞ্চিত বাচ্চাদের স্বপ্ন দেখায় দূর অজানায় হারানোর। সাহিত্যের ভাষায় আমরা যাকে বলি “এসকেপিজম”, তারা রিয়েলিটি মানতে চায় না। তারা সিস্টেমকে বদলাতে চায়। কিন্তু সমাজের চাপে একসময় তারা বদলে যায়। মাস্টার্স এর সিলেবাসে আমরা মিশেল ফুকোর “ম্যাডনেস এন্ড সিভিলাইজেশন” বইটি পড়েছিলাম। সেই বই পড়েছিলাম বলেই বাংলাদেশের সংস্কৃতির বর্তমান অস্থিরতায়, শিক্ষকদের উপর শতচাপ সত্ত্বেও বিউটি পাল এর মতো শিক্ষকরা নেচে গেয়ে বাচ্চাদের শিক্ষা দিতে পারছে।
স্যালুট বিউটি পাল এবং তোমার মতো শত শত স্বপ্নবাজকে।
আমি অধম নিজেও একজন শিক্ষক। তবে পাগলামি আছে, তের বছরের শিক্ষকতা জীবনে রুটিনের কোন ক্লাস আজ পর্যন্ত মিস করি নি। স্ট্রাকচারালিজম এর বিপরীতে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে এলোমেলো চুল রেখেছি। বদলাতে চাই বাংলাদেশকে।
#
মোঃ বদরুজ্জামান বাপ্পি
সহকারী অধ্যাপক (বিসিএস শিক্ষা)

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি