সিলেট ১৪ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৮:৪০ অপরাহ্ণ, জুন ১৩, ২০২৬
অংশীজন সভায় দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান, পর্যটন ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবের প্রত্যাশা
নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ১৩ জুন ২০২৬ : দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র ও ‘চায়ের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রস্তাবিত বাইপাস বা নতুন সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের পক্ষে সর্বসম্মত মত দিয়েছেন স্থানীয় অংশীজনরা।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত এক অংশীজন সভায় প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য সুফল, ভূমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।
শনিবার (১৩ জুন ২০২৬) সকালে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, পরিবহন খাতের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের সদস্য এবং সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, শ্রীমঙ্গল শহরে প্রতিনিয়ত যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে পর্যটকদের আগমনও বছরজুড়ে বেড়েই চলেছে। ফলে শহরের অভ্যন্তরীণ সড়ক এবং জাতীয় মহাসড়কের যানবাহনের চাপ একত্রিত হয়ে প্রায় প্রতিদিনই তীব্র যানজটের সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প সংযোগ সড়ক বা বাইপাস নির্মাণ সময়ের দাবি।
অনুমোদন প্রক্রিয়ায় প্রকল্প
সওজের মৌলভীবাজার সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান সভায় জানান, “মিরপুর-শ্রীমঙ্গল-মৌলভীবাজার-শেরপুর (এন-২০৭) সড়কের ২১তম কিলোমিটারে শ্রীমঙ্গল শহরের যানজট নিরসন ও পর্যটকদের যাতায়াত সহজীকরণের লক্ষ্যে নতুন সংযোগ সড়ক (এন-২১৫) নির্মাণ” শীর্ষক উন্নয়ন প্রকল্প বর্তমানে সরকারি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
তিনি বলেন, গত ১২ মে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে অনুষ্ঠিত প্রকল্প যাচাই কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ওই সভায় স্থানীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য জটিলতা, ভূমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিষয়সমূহ পর্যালোচনার জন্য অংশীজন সভা আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এছাড়া সভার কার্যবিবরণী, অংশগ্রহণকারীদের মতামত, আলোকচিত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি)-এর সঙ্গে সংযুক্ত করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়।
যানজটের স্থায়ী সমাধানের প্রত্যাশা
সভায় বক্তারা বলেন, শ্রীমঙ্গল শহর বর্তমানে দেশের অন্যতম ব্যস্ত পর্যটন নগরীতে পরিণত হয়েছে। চা-বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, সাতরঙা চা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে সারা বছরই পর্যটকদের ভিড় থাকে। সরকারি ছুটি, ঈদ, পূজা ও অন্যান্য উৎসবকেন্দ্রিক মৌসুমে এ চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
স্থানীয়দের মতে, জাতীয় মহাসড়ক শহরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করায় দূরপাল্লার যানবাহন, পণ্যবাহী ট্রাক এবং স্থানীয় যানবাহন একই সড়ক ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। ফলে ভানুগাছ সড়ক মোড়, চৌমুহনা এলাকা, কলেজ রোড সংযোগস্থলসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে প্রায়ই দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।
পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, শ্রীমঙ্গলকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজার, কমলগঞ্জ, হবিগঞ্জ এবং সিলেট অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক পরিচালিত হয়। এ কারণে শহরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা মোকাবিলায় বাইপাস সড়ক নির্মাণের বিকল্প নেই।
জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে বহুপক্ষীয় আলোচনা
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান চৌধুরী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, শ্রীমঙ্গলের উন্নয়ন, জনদুর্ভোগ হ্রাস এবং পর্যটন খাতের সম্প্রসারণে সরকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। বাইপাস সড়ক নির্মাণ প্রকল্পও সেই ধারাবাহিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা কামনা করেন।
সভায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ বিভাগ, ভূমি অধিগ্রহণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক সংগঠন, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকরা অংশ নেন।
পর্যটন ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
সওজ কর্মকর্তাদের মতে, প্রস্তাবিত সংযোগ সড়ক নির্মিত হলে শহরের ভেতর দিয়ে ভারী যানবাহনের চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। এতে যানজট কমার পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে এবং পর্যটকদের যাতায়াত আরও দ্রুত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা শ্রীমঙ্গলের পর্যটন শিল্পকে নতুন গতি দেবে। একই সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা কার্যক্রম এবং বিনিয়োগ পরিবেশেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তাদের মতে, একটি কার্যকর বাইপাস সড়ক শুধু যানজট কমাবে না; বরং বৃহত্তর মৌলভীবাজার অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করে তুলবে। এতে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমবে এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে।
ভূমি অধিগ্রহণ ও পরিবেশগত বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে
প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ প্রদান, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং স্থানীয় জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সভায় জানানো হয়।
অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রকল্প প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। তারা আশা করছেন, অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রকল্পটির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করবে।
দীর্ঘদিনের দাবির বাস্তবায়নের পথে
স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রীমঙ্গলের যানজট সমস্যা দীর্ঘদিনের। শহরের সম্প্রসারণ, পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং যানবাহনের চাপ বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। এ অবস্থায় বহুদিন ধরে আলোচিত বাইপাস সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা শহরের যোগাযোগব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অংশীজন সভাটি প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এর মাধ্যমে স্থানীয় বাস্তবতা, সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
সভা শেষে উপস্থিত ব্যক্তিরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে অল্প সময়ের মধ্যেই বাইপাস সড়ক নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে। তাদের প্রত্যাশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শ্রীমঙ্গলের দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার টেকসই সমাধান নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি