বাজেটে প্রতিশ্রুতি, বরাদ্দে অনিশ্চয়তা: তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে ধোঁয়াশার অভিযোগ হক্কানীর

প্রকাশিত: ৬:৫৯ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০২৬

বাজেটে প্রতিশ্রুতি, বরাদ্দে অনিশ্চয়তা: তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে ধোঁয়াশার অভিযোগ হক্কানীর

Manual1 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | গঙ্গাচড়া (রংপুর), ১২ জুন ২০২৬ : ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও প্রকল্পটির জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দের খাত ও অর্থায়নের বিস্তারিত উল্লেখ না থাকায় উত্তরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি কমরেড নজরুল ইসলাম হক্কানী।

তিনি বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলেও প্রকল্পটির অর্থায়ন, অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ঘোষণা না আসায় তিস্তা অববাহিকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না।

শুক্রবার (১২ জুন ২০২৬) রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়াইবাড়ি স্কুল মিলনায়তনে তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের উপজেলা কমিটির বর্ধিত সভায় এসব বক্তব্য তুলে ধরা হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী।

‘প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু স্পষ্টতা নেই’

নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১০ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ের কাজের জন্য সরকারি কোষাগার থেকে কত অর্থ ব্যয় করা হবে কিংবা কোন খাত থেকে বরাদ্দ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, পরিবেশ ও নদী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট আর্থিক ও প্রশাসনিক রোডম্যাপ।”

Manual2 Ad Code

একনেক অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন

সভায় বক্তারা বলেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একনেক সভায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অর্থায়ন ও অনুমোদনের বিষয়টি বাজেট বক্তৃতায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু তিস্তা মহাপরিকল্পনা কবে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পাবে, সে বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত বা সময়সীমা দেওয়া হয়নি।

হক্কানী বলেন, “প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা, নকশা ও বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে চললেও এখনো অনুমোদনের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা না আসায় তিস্তা পাড়ের মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। বাজেট বক্তৃতায় যদি অনুমোদনের সম্ভাব্য সময় কিংবা বাস্তবায়নের ধাপগুলো তুলে ধরা হতো, তাহলে জনমনে আস্থার সৃষ্টি হতো।”

বিকল্প অর্থায়নের প্রস্তাব

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অর্থায়ন নিয়ে বিকল্প কিছু প্রস্তাবও তুলে ধরেন সংগঠনের নেতারা। নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, দেশের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে নতুন নতুন অর্থায়ন পদ্ধতি বিবেচনা করা হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় সরকার চাইলে সঞ্চয়পত্রের আদলে ‘তিস্তা বন্ড’ চালু করতে পারে।

তার মতে, দেশের নাগরিকদের অংশগ্রহণমূলক বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা গেলে তিস্তা মহাপরিকল্পনার অর্থায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তিস্তা নদী থেকে বৈধভাবে উত্তোলিত বালু ও পাথর বিক্রির আয় একটি পৃথক তহবিলে সংরক্ষণ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবহার করারও প্রস্তাব দেন তিনি।

তিস্তা অববাহিকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি

সভায় বক্তারা বলেন, তিস্তা নদীকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য গভীরভাবে নির্ভরশীল। নদীর নাব্যতা সংকট, ভাঙন, শুষ্ক মৌসুমে পানির স্বল্পতা এবং বর্ষা মৌসুমে আকস্মিক বন্যা দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা পাড়ের মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

Manual8 Ad Code

তাদের মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নদী ব্যবস্থাপনা উন্নত হওয়ার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে প্রকল্পটির দ্রুত বাস্তবায়ন এখন উত্তরাঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান দাবি হয়ে উঠেছে।

ধারাবাহিক কর্মসূচির ঘোষণা

গঙ্গাচড়া উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য আব্দুন নূর দুলালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আরও বক্তব্য দেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান, স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য মাহমুদুল আলম, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আশরাফুল ইসলাম এবং উপজেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ওমর ফারুকসহ স্থানীয় নেতারা।

Manual2 Ad Code

সভায় তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত একনেক অনুমোদন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা এবং সংগঠনের ঘোষিত ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী প্রতিটি ওয়ার্ড, হাট ও বাজারে ধারাবাহিক সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করা হবে।

উত্তরাঞ্চলে বাড়ছে প্রত্যাশা

Manual6 Ad Code

তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা বহুদিনের। বাজেট বক্তৃতায় প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি সেই প্রত্যাশাকে নতুন করে উজ্জীবিত করলেও সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ, অর্থায়নের উৎস এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে স্পষ্টতা না থাকায় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করা হলে জনমনে বিদ্যমান অনিশ্চয়তা অনেকটাই দূর হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ