সংখ্যালঘুদের অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনী অংশগ্রহণ নিশ্চিতে ৬ দফা সুপারিশ

প্রকাশিত: ২:১০ অপরাহ্ণ, জুন ১৩, ২০২৬

সংখ্যালঘুদের অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনী অংশগ্রহণ নিশ্চিতে ৬ দফা সুপারিশ

Manual1 Ad Code
  • শ্রীমঙ্গলে রূপসার প্রেস ব্রিফিং; তথ্যভিত্তিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ১৩ জুন ২০২৬ : বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তথ্যভিত্তিক, নিরাপদ ও সমঅধিকারভিত্তিক নির্বাচনী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মত দিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রূপসা।

সংগঠনটি বলছে, ২০২৬ সালের সংসদীয় নির্বাচন ও গণভোটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা সাধারণভাবে শান্তিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করতে পারলেও তথ্যপ্রাপ্তি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং নিরাপদ নির্বাচনী সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

শনিবার (১৩ জুন ২০২৬) সকালে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের রিজিক রেস্টুরেন্টের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের ফলাফল তুলে ধরে এসব তথ্য জানানো হয়।

প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠানে রূপসার নির্বাহী পরিচালক হিরন্ময় মন্ডল, কমিউনিকেশন অফিসার রবিউল শিকদার, প্রোগ্রাম অফিসার মোসাম্মৎ খাদিজা খাতুন, প্রোগ্রাম অফিসার পূজারিণী বিশ্বাস এবং অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট খাদিজা আক্তার কেয়া উপস্থিত ছিলেন।

৫০৯ ভোটকেন্দ্রে পর্যবেক্ষণ

প্রেস ব্রিফিংয়ে লিখিত বক্তব্যে রূপসার নির্বাহী পরিচালক হিরন্ময় মন্ডল জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়ন এবং ইউরোপিয়ান পার্টনারশিপ ফর ডেমোক্রেসি (EPD)-এর সহায়তায় পরিচালিত ‘সিভিক রাইটস অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইলেকশন অবজারভেশন’ উদ্যোগের আওতায় রূপসা দেশের ২৫টি সংসদীয় আসনের ৫০৯টি ভোটকেন্দ্রে ২০০ জন প্রশিক্ষিত নাগরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েন করে। পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে নির্বাচন-পূর্ব সময়, ভোটগ্রহণ দিবস এবং নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্ব ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা হয়।

তিনি বলেন, পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র সময়মতো খোলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় নির্বাচনী সামগ্রী যথাযথভাবে সরবরাহ করা হয়েছে এবং ভোটাররা উল্লেখযোগ্য বাধা ছাড়াই ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পেরেছেন। সামগ্রিকভাবে নির্বাচনী পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ ও প্রক্রিয়াগতভাবে সুশৃঙ্খল।

তবে প্রশাসনিক সাফল্যের পাশাপাশি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির মধ্যে এখনও একটি সুস্পষ্ট ব্যবধান বিদ্যমান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গণভোট সম্পর্কে তথ্য ঘাটতির চিত্র

রূপসার পর্যবেক্ষণে অন্যতম বড় উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে গণভোট সম্পর্কিত তথ্যের সীমিত প্রাপ্তি। অনেক সংখ্যালঘু ভোটার জানিয়েছেন, তারা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে প্রথমবারের মতো গণভোটের বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে পারেন।

হিরন্ময় মন্ডল বলেন, “এটি ভোটার শিক্ষা ও নাগরিক সচেতনতা কার্যক্রমের ঘাটতির প্রতিফলন। তথ্যভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সচেতনতামূলক উদ্যোগ প্রয়োজন।”

তার মতে, ভোটাধিকার প্রয়োগের পাশাপাশি ভোটারদের সচেতন ও তথ্যসমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করাও একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অপরিহার্য অংশ।

রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে সংখ্যালঘুদের অপ্রতুল উপস্থিতি

প্রতিবেদনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নির্বাচনী প্রার্থিতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সীমিত প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

রূপসার তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের ২৯৯টি আসনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মাত্র ৭৯ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে নির্বাচিত হন মাত্র ৪ জন, এবং তারা সবাই একই রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ছিলেন।

নারী প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও চিত্রটি উদ্বেগজনক। ৭৯ জন সংখ্যালঘু প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ১০ জন নারী ছিলেন, যা সংখ্যালঘু নারী নেতৃত্বের বিকাশে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত বহন করে।

Manual7 Ad Code

পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য কোনো কার্যকর আইনগত বা নীতিগত কাঠামো না থাকায় সমান রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক সংখ্যালঘু ভোটার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিলেও নিজেদের রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক মনে করছেন।

Manual4 Ad Code

নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল, তবু উদ্বেগ রয়ে গেছে

রূপসার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। তবে কিছু ক্ষেত্রে ভোটারদের ওপর চাপ প্রয়োগ, হয়রানি এবং চলাচলে বাধা দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পর্যবেক্ষণকৃত প্রায় ১১ দশমিক ৬ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে কোনো না কোনো ধরনের হয়রানি, চাপ প্রয়োগ বা ভোটার চলাচলে সীমাবদ্ধতার ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে।

বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় সম্ভাব্য নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিশোধের আশঙ্কায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রমে প্রকাশ্যে অংশগ্রহণে অনীহার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বিষয়টি নির্বাচনী পরিবেশে আস্থার ঘাটতির দিক নির্দেশ করে বলে মন্তব্য করেছে রূপসা।

“প্রশাসনিক শৃঙ্খলা অর্জিত হলেও প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি এখনও অধরা”

প্রেস ব্রিফিংয়ে হিরন্ময় মন্ডল বলেন, “২০২৬ সালের নির্বাচন দেখিয়েছে যে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও প্রক্রিয়াগত সুষ্ঠুতা অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ভোট দিতে পারলেও সবসময় সমান, তথ্যভিত্তিক এবং সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশে ভোট দিতে পারে না।”

তিনি আরও বলেন, “এই ব্যবধান দূর করতে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের জরুরি ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।”

অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিতে ৬ দফা সুপারিশ

Manual6 Ad Code

পর্যবেক্ষণ ফলাফলের ভিত্তিতে রূপসা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনী অংশগ্রহণ জোরদারে ছয়টি সুপারিশ তুলে ধরেছে। এগুলো হলো—

সংখ্যালঘু ভাষায় নির্বাচনী উপকরণ, সহজপ্রাপ্য অভিযোগ ব্যবস্থা এবং বহুভাষাভিত্তিক নাগরিক শিক্ষা কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত সংখ্যালঘু অন্তর্ভুক্তি কৌশল প্রণয়ন;

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চা-বাগানসহ ভৌগোলিকভাবে প্রান্তিক অঞ্চলে মোবাইল ভোটার নিবন্ধন সেবা সম্প্রসারণ এবং ভোটকেন্দ্রের প্রবেশগম্যতা বৃদ্ধি;

তথ্যভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ভোটার শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম আরও জোরদার করা;

রাজনৈতিক দলগুলোকে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে নারী, দলিত ও জাতিগত জনগোষ্ঠীর প্রার্থীদের মনোনয়ন বাড়াতে স্বেচ্ছা অঙ্গীকার গ্রহণে উৎসাহিত করা;

ভোটার আস্থা ও জবাবদিহিতা শক্তিশালী করতে সময়োপযোগী, গোপনীয় এবং সহজপ্রাপ্য অভিযোগ ও প্রতিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা;

নির্বাচন-পরবর্তী টেকসই সংলাপ, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নাগরিক সম্পৃক্ততা উন্নয়ন করা।

স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণের দাবি

প্রেস ব্রিফিংয়ে রূপসা পুনর্ব্যক্ত করে যে তাদের পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে।

সংগঠনটির মতে, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কার্যকর ও সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা শুধু নির্বাচনী সংস্কারের বিষয় নয়; বরং এটি নাগরিক অধিকার, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা এবং প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছে রূপসা

Manual1 Ad Code

রূপসা (গ্রামীণ ও নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামাজিক উন্নয়নের অংশীদার) বাংলাদেশে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে শাসনব্যবস্থা, নাগরিক সম্পৃক্ততা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিয়ে কাজ করছে। সংগঠনটির এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম ইউরোপিয়ান পার্টনারশিপ ফর ডেমোক্রেসির AHEAD প্রকল্পের আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট-এর বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান; সিনিয়র সাংবাদিক ইসমাইল মাহমুদ, দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার প্রতিনিধি শিমুল তরফদার, কালের কণ্ঠ-এর মাল্টিমিডিয়া প্রতিনিধি মো. আলামিন, সাপ্তাহিক দুর্বার সংবাদ-এর প্রতিনিধি নীরনেপুর তুলসী প্রসাদসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী।

রূপসার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ হলো—নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি থাকলেও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর পূর্ণাঙ্গ, নিরাপদ ও তথ্যসমৃদ্ধ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এখনও বহু ক্ষেত্রে কাঠামোগত ও নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এসব সুপারিশ বাস্তবায়নকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংগঠনটি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ