সিলেট ২০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৫:০০ অপরাহ্ণ, জুন ২০, ২০২৬
চা শিল্পের আধুনিকায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ ও শ্রমিক কল্যাণে গুরুত্বারোপ
নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ২০ জুন ২০২৬ : “চা শিল্পের উন্নতি, সবুজ হোক অর্থনীতি”— এই শ্লোগান ও প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দেশের চা শিল্পের প্রাণকেন্দ্র মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে ৬ষ্ঠ জাতীয় চা দিবস।
দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভা, জাতীয় চা পুরস্কার প্রদান, সম্মাননা অনুষ্ঠান, চা প্রদর্শনী এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।
শনিবার (২০ জুন ২০২৬) সকালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ চা বোর্ডের সহযোগিতায় শ্রীমঙ্গল শহরের জেলা পরিষদ পরিচালিত অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হলে জাতীয় চা দিবসের মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দেশের বিভিন্ন চা বাগানের মালিক, চা ব্যবসায়ী, শ্রমিক প্রতিনিধি, রপ্তানিকারক, সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়।
উদ্বোধনী আয়োজন
পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে জাতীয় চা দিবসের উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ।
আধুনিকায়নের ওপর জোর
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের চা শিল্পকেও এগিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের চা বিশ্ববাজারে একটি সম্ভাবনাময় পণ্য। উন্নত জাতের চা উৎপাদন, গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, আধুনিক কারখানা স্থাপন, উন্নত প্যাকেজিং, কার্যকর ব্র্যান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে চা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।”
তিনি আরও বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ইতোমধ্যে কৃষি ও চা শিল্পে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তাই পরিবেশবান্ধব চা চাষ এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।”
চা শিল্পের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
সভাপতির বক্তব্যে বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান বলেন, দেশের চা শিল্প শুধু একটি কৃষিভিত্তিক খাত নয়; এটি কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। সরকারের নীতি সহায়তা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমে এ শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে চায়ের উৎপাদন ও ভোগ দুই-ই বাড়ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চায়ের অবস্থান শক্তিশালী করতে গুণগত মান উন্নয়ন, গবেষণা এবং ক্ষুদ্র চা চাষিদের সহায়তার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অংশীজনদের মতামত
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি কামরান টি রহমান, টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি শাহ মঈনুদ্দিন হাসান, এম আর খান চা বাগানের মালিক ও টি প্ল্যান্টার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আলহাজ্ব সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (হারুন), শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব আলী, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল, বাংলাদেশ বটলিফ টি ফ্যাক্টরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. নিয়াজ আলী চিশতী এবং চা শ্রমিক নেত্রী সনতকি রায়।
বক্তারা চা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে শ্রমিক কল্যাণ, ন্যায্য মজুরি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, ক্ষুদ্র চা চাষিদের প্রণোদনা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জাতীয় চা পুরস্কার প্রদান
জাতীয় চা দিবস উপলক্ষে চা শিল্পে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট আট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় চা পুরস্কার ও সম্মাননা প্রদান করা হয়।
পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন—
একরপ্রতি সর্বোচ্চ উৎপাদন : শ্রীগোবিন্দপুর চা বাগান,
সর্বোচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন চা উৎপাদন : মধুপুর চা বাগান,
শ্রেষ্ঠ চা রপ্তানিকারক : দ্য কনসলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানি,
শ্রেষ্ঠ ক্ষুদ্রায়ন চা উৎপাদনকারী : মো. মতিউর রহমান,
শ্রমিক কল্যাণে শ্রেষ্ঠ চা বাগান : মির্জাপুর চা বাগান,
দৃষ্টিনন্দন ও মানসম্পন্ন মোড়ক এবং বৈচিত্র্যময় চা পণ্য বাজারজাতকরণ : কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট,
শ্রেষ্ঠ চা পাতা চয়নকারী (চা উত্তোলন) : নেপচুন চা বাগানের শ্রমিক জেসমিন আক্তার,
শ্রেষ্ঠ বটলিফ চা কারখানা (বিশেষ স্বীকৃতি) : সুপ্রিম টি লিমিটেড।
পুরস্কার বিতরণ শেষে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে ফটোসেশন অনুষ্ঠিত হয়।
চা প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীদের ভিড়
দিনব্যাপী আয়োজনে দেশের বিভিন্ন চা কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদিত নানা ধরনের চা, বিশেষ ব্লেন্ড, অর্গানিক চা, হারবাল চা এবং মূল্য সংযোজিত চা পণ্য প্রদর্শন করে। প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই বিভিন্ন স্টল ঘুরে চায়ের স্বাদ গ্রহণ করেন এবং উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করেন।
বিশিষ্টজনদের উপস্থিতি
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক, আরাফাত রহমান কোকো মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কো-অর্ডিনেটর ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক সরফরাজ আহমেদ সরফু; শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির আহ্বায়ক সৈয়দ আবু জাফর সালাউদ্দিন ও সদস্য সচিব রুবেল আহমেদ, বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক, চা শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
দেশের অর্থনীতিতে চা শিল্পের গুরুত্ব
বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে চা খাত দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানি আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও চা শিল্পের সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গবেষণা, প্রযুক্তি, ব্র্যান্ডিং এবং শ্রমিক কল্যাণকে সমান গুরুত্ব দেওয়া গেলে বাংলাদেশের চা আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
জাতীয় চা দিবসের এবারের আয়োজন সেই সম্ভাবনাকে নতুন করে তুলে ধরেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি