তিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মুখ থেকে ময়লার ভাগাড় সরাতে ও রিসাইক্লিং প্লান্ট স্থাপন নিয়ে মতবিনিময়

প্রকাশিত: ৬:৩০ অপরাহ্ণ, জুন ১৮, ২০২৬

তিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মুখ থেকে ময়লার ভাগাড় সরাতে ও রিসাইক্লিং প্লান্ট স্থাপন নিয়ে মতবিনিময়

Manual7 Ad Code
  • শ্রীমঙ্গলে আধুনিক রিসাইক্লিং প্লান্ট স্থাপন নিয়ে এলাকাবাসীর মতামতের ওপর গুরুত্বারোপ

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ১৮ জুন ২০২৬ : মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজসহ তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মুখ থেকে পৌরসভার ময়লার ভাগাড় স্থানান্তর এবং বিকল্প স্থানে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (রিসাইক্লিং) প্লান্ট স্থাপনকে কেন্দ্র করে একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ বৈঠকে বিরোধপূর্ণ বিষয়টির একটি গ্রহণযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন ২০২৬) শ্রীমঙ্গলের কলেজ রোড ও উত্তর ভাড়াউড়া এলাকার নেতৃবৃন্দ, সামাজিক ব্যক্তিত্ব এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উপস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ মুজিবুর রহমান চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান।

Manual6 Ad Code

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘদিনের দাবি

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ, দি বাডস রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, গাউছিয়া শফিকিয়া সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসা এবং আবাসিক এলাকার সামনে দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভার বর্জ্য ফেলার কারণে দুর্গন্ধ, পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো সংবেদনশীল স্থানের সামনে বর্জ্য ভাগাড় থাকায় শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

Manual4 Ad Code

এ প্রেক্ষাপটে ময়লার ভাগাড় স্থানান্তরের দাবি দীর্ঘদিন ধরে তিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় এলাকাবাসী দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলন করে আসছিল। পৌরসভার উদ্যোগে জেডি রোড এলাকায় একটি আধুনিক রিসাইক্লিং প্লান্ট স্থাপনের প্রস্তাব সামনে এলে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়। প্রস্তাবিত স্থানের আশপাশের বাসিন্দারা পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তের নির্দেশনা

গোলটেবিল বৈঠকে জানানো হয়, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নজরে আনা হলে তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সকল পক্ষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে আইনগত ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।

সভায় উপজেলা প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়, জেডি রোড এলাকায় যে রিসাইক্লিং প্লান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে, তা হবে সম্পূর্ণ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর। এ ধরনের প্লান্টে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা হবে এবং দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

ইউএনও মো. জিয়াউর রহমান এবং পৌর প্রশাসনের প্রতিনিধিরা সভায় বলেন, পরিকল্পিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আশপাশের পরিবেশে দুর্গন্ধ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকবে না। বর্জ্য থেকে নির্গত তরল পদার্থও আধুনিক শোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধবভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে।

রিসাইক্লিং প্লান্ট পরিদর্শনের প্রস্তাব

বৈঠকে বক্তব্য দেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক, আরাফাত রহমান কোকো মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কো-অর্ডিনেটর এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক সরফরাজ আহমেদ সরফু।

তিনি বলেন, দেশে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি আধুনিক বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে যদি এ বিষয়ে কোনো সংশয় থাকে, তাহলে তাদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত রিসাইক্লিং প্লান্ট সরেজমিনে পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে। বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে জনগণ প্রকল্পটির কার্যকারিতা ও পরিবেশগত নিরাপত্তা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পেতে পারবেন।

এলাকাবাসীর উদ্বেগ ও প্রশাসনের আশ্বাস

বৈঠকে অংশগ্রহণকারী স্থানীয় বাসিন্দারা সম্ভাব্য পরিবেশগত ঝুঁকি, দুর্গন্ধ, যানবাহনের চাপ এবং আবাসিক এলাকার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তারা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত মূল্যায়ন, জনমত গ্রহণ এবং স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি জানান।

জবাবে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেন যে, জনগণের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কোনো পক্ষের উদ্বেগ উপেক্ষা করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে না বলেও সভায় উল্লেখ করা হয়।

সমঝোতা ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান

সভায় সমাপনী বক্তব্যে প্রধান অতিথি আলহাজ মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক রিসাইক্লিং প্লান্ট সম্পর্কে এলাকাবাসীকে বিস্তারিতভাবে অবহিত করা প্রয়োজন। তিনি স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে জনগণের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকল্পের সুবিধাসমূহ তুলে ধরার আহ্বান জানান।

Manual5 Ad Code

তিনি বলেন, “সবার মতামত ও জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। এলাকাবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে আপনারা যে মতামত দেবেন, সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।”

সভায় উপজেলা বিএনপি এবং দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দও বক্তব্য রাখেন। তারা পরিবেশ সংরক্ষণ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনমতের সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

Manual5 Ad Code

টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে নজর

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে দেশের পৌর এলাকাগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে আধুনিক রিসাইক্লিং প্লান্ট স্থাপন পরিবেশ সুরক্ষা, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং সম্পদের পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন, পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা সমানভাবে জরুরি।

শ্রীমঙ্গলের এ উদ্যোগকে ঘিরে এখন স্থানীয় বাসিন্দা, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সকল পক্ষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে এমন একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে, যা একদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনবসতির পরিবেশ রক্ষা করবে, অন্যদিকে আধুনিক ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পথও সুগম করবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ