পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান

প্রকাশিত: ৩:৪০ অপরাহ্ণ, জুন ২০, ২০২৬

পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান

Manual8 Ad Code
  • রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হলো ডিএসসিই পরিবেশ কার্নিভাল ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক |ঢাকা, ২০ জুন ২০২৬ : বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ডিএসসিই পরিবেশ কার্নিভাল ২০২৬।

ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবীইং বাংলাদেশ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকস পরিবেশ ক্লাবের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ কার্নিভালে পরিবেশবিদ, গবেষক, শিক্ষার্থী, উন্নয়নকর্মী, নীতিনির্ধারক ও সচেতন নাগরিকদের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, পরিবেশগত সংকট এখন আর শুধু পরিবেশবিদদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।

কার্নিভালে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. ফজলে রাব্বি সাদেক আহমেদ, ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবীইং বাংলাদেশের পরিচালক গাওস পিয়ারী এবং ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের পরিচালক অধ্যাপক রেহানা পারভীন।

Manual6 Ad Code

পরিবেশ সুরক্ষা উন্নয়ন ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ

Manual4 Ad Code

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ড. ফজলে রাব্বি সাদেক আহমেদ বলেন, বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ সংরক্ষণকে বিচ্ছিন্ন কোনো কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয় সরাসরি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানুষের জীবনমানকে প্রভাবিত করছে।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও লবণাক্ততার মতো সমস্যাগুলো দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ, সবুজ বিনিয়োগ এবং তরুণদের সম্পৃক্ততা আরও বাড়াতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, পরিবেশ সচেতনতা যদি সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়, তাহলে একটি সহনশীল ও টেকসই সমাজ গঠন করা সম্ভব হবে। এজন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মানুষের সুস্থতা ও পরিবেশগত ভারসাম্য একে অপরের পরিপূরক

ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবীইং বাংলাদেশের পরিচালক গাওস পিয়ারী বলেন, মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, নিরাপদ পানির সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মানুষের জীবনমানকে ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

তিনি বলেন, “পরিবেশ রক্ষাকে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক দিবস কিংবা বিশেষ আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। এটিকে দৈনন্দিন জীবনযাপন, সামাজিক সংস্কৃতি এবং নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে হবে।”

তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব জীবনধারা গ্রহণ, অপচয় কমানো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

শিক্ষা ও গবেষণাকে পরিবেশগত দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান

Manual5 Ad Code

ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের পরিচালক অধ্যাপক রেহানা পারভীন বলেন, পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় শিক্ষা ও গবেষণার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করলেই হবে না; পরিবেশ বিষয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে বাস্তবভিত্তিক সমাধান তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, “বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নতুন নতুন প্রযুক্তি, নীতি এবং সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।”

পরিবেশ সচেতনতার বহুমাত্রিক আয়োজন

দিনব্যাপী কার্নিভালে পরিবেশ বিষয়ক আলোচনা, সচেতনতামূলক কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন উপস্থাপনা, প্রদর্শনী এবং পরিবেশবান্ধব নানা উদ্ভাবনী উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। অংশগ্রহণকারীরা পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তি পর্যায়ে করণীয়, জলবায়ু অভিযোজন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং সবুজ নগরায়ন নিয়ে মতবিনিময় করেন।

Manual4 Ad Code

আয়োজকদের মতে, এ ধরনের আয়োজন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত সংকট নিয়ে উদ্বেগ

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়ন, বায়ুদূষণ, প্লাস্টিক দূষণ, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার দেশের পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।

তারা উল্লেখ করেন, পরিবেশগত সমস্যাগুলো শুধু প্রকৃতির জন্য নয়; বরং অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে।

টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে ছয় দফা সুপারিশ

অনুষ্ঠান থেকে অংশগ্রহণকারীরা পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেন। সেগুলো হলো—

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিবেশ শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা;

নগর পরিকল্পনায় পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করা;

প্লাস্টিক দূষণ কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রিসাইক্লিং অবকাঠামো শক্তিশালী করা;

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন করা;

তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণে স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা;

জলবায়ু সহনশীল ও টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

সম্মিলিত উদ্যোগেই সম্ভব পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ

অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, ব্যক্তি, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠবে।

তাদের মতে, পরিবেশ রক্ষা কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়; এটি একটি চলমান দায়িত্ব। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ