স্তন ক্যান্সার সচেতনতা দিবস আজ: নারীর জীবনের সুরক্ষায় আগাম সতর্কতা জরুরি

প্রকাশিত: ১২:১২ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০২৫

স্তন ক্যান্সার সচেতনতা দিবস আজ: নারীর জীবনের সুরক্ষায় আগাম সতর্কতা জরুরি

Manual4 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা, ১০ অক্টোবর ২০২৫ : আজ ১০ অক্টোবর, স্তন ক্যান্সার সচেতনতা দিবস। বাংলাদেশে এ দিবসটি পালন করছে বাংলাদেশ স্তন ক্যান্সার সচেতনতা ফোরাম, যার মূল লক্ষ্য নারীদের মধ্যে ক্যান্সার প্রতিরোধ, প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।

প্রতি বছর অক্টোবর মাসজুড়ে বিশ্বজুড়ে পালন করা হয় ব্রেস্ট ক্যান্সার অ্যাওয়ারনেস মান্থ বা স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাস। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা সংস্থা এবং অসংখ্য এনজিও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে এই মাসে নারীদের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসে।

বাংলাদেশে ভয়াবহ চিত্র: প্রতি বছর ১৩ হাজার আক্রান্ত, ৬ থেকে ৮ হাজার মৃত্যু

গ্লোবোক্যান ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১৩ হাজার নারী নতুন করে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং মারা যান ৬ থেকে ৮ হাজার নারী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৃত্যুহার এত বেশি হওয়ার প্রধান কারণ হলো—

রোগটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাব,

নারীদের সামাজিক সংকোচ ও ভয়,

দেরিতে চিকিৎসা গ্রহণ,

এবং ক্যান্সার নির্ণয় ও চিকিৎসা ব্যবস্থার অপ্রতুলতা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, “বাংলাদেশে অধিকাংশ স্তন ক্যান্সার রোগী চিকিৎসকের কাছে আসেন দেরিতে, যখন টিউমার ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই চিকিৎসা সম্ভব।”

বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ২৫ লাখ নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং মারা যান প্রায় ৭ লাখের বেশি।
২০২১ সালে স্তন ক্যান্সার বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ক্যান্সার হিসেবে ফুসফুস ক্যান্সারকেও ছাড়িয়ে গেছে। উন্নত দেশগুলোতে স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির কারণে মৃত্যুহার কমছে, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে, এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে নারী জনগোষ্ঠী।

Manual7 Ad Code

গোলাপি ফিতা: আশার প্রতীক

গোলাপি রঙের ফিতা এখন বিশ্বজুড়ে স্তন ক্যান্সার সচেতনতার প্রতীক।
এভেলিন লাউডার, একজন অস্ট্রিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান নারী উদ্যোক্তা, ১৯৯৯ সালে এই প্রতীকটি তৈরি করেন। তার লক্ষ্য ছিল— বিশ্বজুড়ে নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে আলোচনার সূচনা করা। আজ সেই গোলাপি ফিতা হয়ে উঠেছে সাহস, সমর্থন ও আশার প্রতীক।

ঢাকায় আজ সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতীকী গোলাপি শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। পরে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দেবেন দেশের খ্যাতনামা চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও নারীস্বাস্থ্য গবেষকরা।

Manual1 Ad Code

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং নীতি বা কর্মসূচি নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে নারীরা ক্যান্সার শনাক্তকরণ পরীক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় মেশিন ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে।

ডা. হালিদা হানুম আক্তার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, বলেন—
“নারীরা নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে লজ্জা ও ভয় কাটাতে পারেন না। সচেতনতার অভাবের কারণে অনেকেই নিয়মিত স্ব-পরীক্ষা করেন না, যা প্রাথমিক শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।”

তিনি আরও বলেন, “স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে মেয়েদের জন্য স্বাস্থ্য শিক্ষা ও ব্রেস্ট সেল্ফ-এক্সামিনেশন শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।”

Manual5 Ad Code

উন্নয়ন ও আশার দিক: প্রযুক্তি ও চিকিৎসা অগ্রগতি

গত কয়েক বছরে দেশে চিকিৎসা ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে ক্যান্সার নির্ণয় ও চিকিৎসায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এখন রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে ম্যামোগ্রাফি ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে।
কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিও বিনামূল্যে স্ক্রিনিং ক্যাম্প আয়োজন করছে, যার ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তের হার বাড়ছে।

অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, বলেন—
“স্তন ক্যান্সার শনাক্ত ও চিকিৎসা এখনো ব্যয়বহুল। সরকারি পর্যায়ে ভর্তুকি বৃদ্ধি ও স্ক্রিনিংকে জাতীয় কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।”

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বাংলাদেশ স্তন ক্যান্সার সচেতনতা ফোরাম ২০১৩ সাল থেকে জাতীয় পর্যায়ে দিবসটি পালন করছে। বর্তমানে এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে প্রায় ৫০টি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অলাভজনক সংগঠন।
ফোরামটি ইতিমধ্যে WHO ও UICC (Union for International Cancer Control)-এর সঙ্গে যৌথভাবে ক্যান্সার প্রতিরোধ নীতি প্রণয়নে কাজ করছে।

অধ্যাপক মোজাহেরুল হক, স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য, বলেন—
“এখন সময় এসেছে স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধকে জাতীয় অগ্রাধিকারভুক্ত করার। যেমনভাবে টিকাদান কর্মসূচি সফল হয়েছে, তেমনভাবেই নারীর জীবন বাঁচাতে একটি সমন্বিত ক্যান্সার স্ক্রিনিং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।”

Manual2 Ad Code

জনসচেতনতার মূলমন্ত্র: আগাম শনাক্ত, দ্রুত চিকিৎসা

স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো আগাম শনাক্তকরণ (Early Detection)।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি মাসে নারীরা নিজেরাই ব্রেস্ট সেল্ফ-এক্সামিনেশন (BSE) করে স্তনে অস্বাভাবিক গাঁট বা পরিবর্তন আছে কিনা তা পরীক্ষা করতে পারেন। ৪০ বছর বয়সের পর প্রতি বছর একটি করে ম্যামোগ্রাফি টেস্ট করানো উচিত।

ঢাকায় আয়োজিত আজকের সভার মূল বার্তা ছিল:
“নিজেকে জানুন, পরীক্ষা করুন, সচেতন থাকুন— কারণ আগাম পদক্ষেপই জীবন বাঁচাতে পারে।”

উপসংহার

বাংলাদেশে প্রতি বছর বাড়ছে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা। নারীর স্বাস্থ্য রক্ষায় কেবল চিকিৎসা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা, ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
গোলাপি ফিতার এই প্রতীক আমাদের মনে করিয়ে দেয়— স্তন ক্যান্সার কোনো লজ্জার নয়, বরং প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ।
আজকের দিবসটি হোক নারীর স্বাস্থ্যের প্রতি দায়িত্বশীল সমাজ গঠনের নতুন অঙ্গীকার।