সিলেট ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬:০৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩১, ২০২৫
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ৩১ অক্টোবর ২০২৫ : ‘নতুন গল্পের সন্ধানে’ শিরোনামে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি বিষয়ক জার্নাল প্রতিধ্বনি আয়োজন করেছে ‘প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫’। প্রতিধ্বনির এটি প্রথম আয়োজন। পুরস্কারটি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বাংলাভাষী লেখকদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। আমাদের পুরস্কারের লক্ষ্য মৌলিক ও সৃজনশীল গল্পকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বাংলা সাহিত্যকে বৈশ্বিক পর্যায়ে তুলে ধরা। শুধু লেখক নয়, প্রতিধ্বনির কাছে সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ লেখকের লেখা।
প্রতিধ্বনিতে দেশ-বিদেশের অসংখ্য গল্পকার তাদের সৃষ্টিশীল গল্প জমা দিয়েছেন, যা ছিল শৈল্পিক নৈপুণ্য ও বিষয় বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। গল্পগুলোর বিষয়বস্তুতে যেমন ফুটে উঠেছে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে আজকের গণঅভ্যুত্থান, মানব জীবনের নানা লৌকিকতা থেকে অলৌকিক সঙ্গ-প্রসঙ্গ, ঠিক তেমনি সমকালীন সমাজ বাস্তবতা থেকে রহস্যাশ্রয়ী পরাবাস্তব কল্পনা। তাদের ভাষায় ছিল প্রথা থেকে নিরীক্ষার নানা আঙ্গিকে বিন্যস্ত কাহিনির রচনাশৈলী। লেখকদের অভূতপূর্ব সাড়ায় আমরা অভিভূত ও অনুপ্রাণিত। অনেক সুন্দর সুন্দর গল্পপাঠের সুযোগ পেয়েছি। বিচিত্র ধরনের গল্পপাঠে পেয়েছি বিচিত্র কাহিনির দারুণ অভিজ্ঞতা।
প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এ গল্প জমা পড়েছে ৩ শতাধিক। সংবেদনশীল ইচ্ছা, নিবিড় শৈল্পিক আকাঙ্ক্ষা ও নিরপেক্ষ পদ্ধতিতে বিচারকগণ তিনটি স্তরে নামহীনভাবে গল্পগুলো বেশ কয়েকবার পাঠ করে প্রাক-বাছাইয়ে ১০৭টি গল্প নির্বাচন করেছেন। প্রাথমিক বাছাইয়ে ছিল ৫০টি গল্প। সেখান থেকে প্রাক-দীর্ঘ তালিকায় ছিল ২০টি গল্প। চূড়ান্তভাবে দীর্ঘ তালিকার জন্য ১০টি অনন্য গল্প বাছাই করেছেন বিচারকগণ। গল্পগুলোর শিরোনাম ও লেখকের নাম আমরা পাঠকের উদ্দেশ্যে তুলে ধরলাম।
প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এ যারা গল্প পাঠিয়ে, বিচার প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে, এবং নেপথ্যে-প্রকাশ্যে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন আমরা সবার কাছে অশেষ কৃতজ্ঞ। প্রত্যাশা করি, ভবিষ্যতেও আপনাদের সার্বিক সহযোগিতা ও ভালোবাসায় প্রতিধ্বনির যাত্রাপথ আরও সুদূর ও সুন্দর হবে। স্মর্তব্য যে, প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর চূড়ান্ত বিচারক ছিলেন লেখক, অনুবাদক ও সমালোচক পলাশ মাহমুদ।
প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কারের ৫টি গল্পের সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশিত হবে ২৮ নভেম্বর ২০২৫। পুরস্কারের চুড়ান্ত বিজয়ীর নাম ঘোষণা ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫। প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ করতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। প্রতিধ্বনির সঙ্গে থাকার জন্য সকল লেখক, নির্বাচিত গল্পকার ও পাঠকদের জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা। সবার আগামী সুন্দর হোক।
সাখাওয়াত টিপু
প্রকল্প পরিচালক
প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫
প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫ || দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ
লেখক পরিচিতি || প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরী
গল্পকার ও লেখক। জন্ম ১২ মে ১৯৮৬ সালে, সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগরে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। নিয়মিত লিখছেন গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও প্রবন্ধ। এখনো পর্যন্ত তার কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। কথাসাহিত্য তার প্রিয় বিষয়। বর্তমানে বসবাস করেন সিলেটে।
আরব আলীর ডুবসাঁতার || গল্পের সারাংশ
টাংঙ্গুয়ার হাওড়ের জলে-জঙ্গলে বেড়ে ওঠা এক চৌকষ মাছ ও পাখি শিকারীর জীবন সংগ্রামের গল্প ‘আরব আলীর ডুবসাঁতার’। তার যাপিত জীবনে মিশে আছে আদি লোকগাথা ও কিংবদন্তির সুর। এই গল্পে যাদু-বাস্তবতার নিপুণ ছোঁয়ায় ফুটে উঠেছে পরিযায়ী পাখি, পৌরাণিক কাছিম থেকে শুরু করে লোকজ সাপলুডু খেলার চক্রে সীমান্ত জীবনের অদম্য বাস্তবতা।
বিচারকের মন্তব্য
জীবনে আশ্চর্যের স্বাদ নিতে সবসময় গদ্য বা পদ্যের দিকে হাত না বাড়ালেও হয়। কেননা, কোনো কোনো মানুষের জীবনেই বাস্তবতার অঙ্গে অঙ্গে আশ্চর্যরাজি সানন্দে এসে ধরা দেয়। আরব আলীর ডুবসাঁতার-এর অনিন্দ্য সহজিয়া গদ্য পড়লে বোঝা যায়, জীবনের সকল যাদুময়তা কেবল মনগড়া কল্পনা নয়; বরং তা অনেক ক্ষেত্রে এক অনিবার্য বাস্তবতা। আমরা শুধু যথেষ্ট কাছ থেকে দেখি না, অথবা গভীরভাবে জানার চেষ্টা করি না।
লেখক পরিচিতি || রোমেল রহমান
গল্পকার ও লেখক। জন্ম ১১ নভেম্বর ১৯৮৯ সালে, খুলনায়। পড়াশোনা হিসাব বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত গ্রন্থ—কবিতা: বিনিদ্র ক্যারাভান, আরোগ্যবিতান, বর্ষামঙ্গল; গল্প/গদ্য: মহামারী দিনের প্যারাবল, প্রোপাগান্ডা, বাঘ, দাস্তান; নাটক: চম্পাকলি লেন ও অন্যান্য নাটক। নিয়মিত লেখেন বাংলাভাষার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং ওয়েবজিনে। গল্পে পেয়েছেন পেন ‘বাংলাদেশ সাহিত্য পুরস্কার ২০২০’। তিনি বসবাস করেন খুলনায়।
কুরছিয়ানা || গল্পের সারাংশ
বিত্তবান ও নিঃসন্তান দম্পতি আবুল কাশেম ও জোনাকির জটিল, বহুস্তরীয় জীবন-জালে হঠাৎ আবির্ভাব হয় দারিদ্র্যে ক্লিষ্ট শেফালীর। আর তারই সূত্র ধরে বদলে যায় গল্পের পুরো দৃশ্যপট। আবুল কাশেমের বংশধারার নিষ্ঠুর ইতিহাস পাঠককে কৃষ্ণগহ্বরের মতো টেনে নেয় এক গভীর আকর্ষণে। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে আয়নাল, জয়নাল, মিছরি বেগম, চিনি, মধু—এই সব চরিত্রের জীবন-আখ্যান। ব্যক্তিগত জীবনের সাথে সময়ের অমোঘ সংঘর্ষের এক মহাকাব্যিক আলেখ্যই হলো এই ‘কুরছিয়ানা’।
বিচারকের মন্তব্য
কুরছিয়ানা মানুষের সহজাত প্রকৃতি চাতুর্যতা-নির্বুদ্ধিতা, ক্রূরতা-উদারতা, জিঘাংসা-আত্মত্যাগ এবং মৃত্যুর ওপর জীবনের জয়গানকে প্রতিকৃত করেছে। ছোটগল্পে একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের বিচিত্র ধরনের চরিত্রের মাধ্যমে বিবিধ চমকপ্রদ কাহিনির সমাবেশ গল্পটি মহাকাব্যিক আমেজ সৃষ্টি করেছে। সামষ্টিক স্বরে লৌকিক বাংলা গদ্যে বলা গল্পটি হয়ে উঠেছে সাবলীল ও স্মরণীয়।
লেখক পরিচিতি || মহসিন আলী
গল্পকার ও লেখক। জন্ম ১২ ডিসেম্বর ১৯৭৪ যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাতবাড়িয়া গ্রামে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় কবিতা দিয়ে লেখালেখির শুরু। সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে অর্থাভাবে শেষ হয় স্কুলজীবন। প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বই—সেই তো জীবন (উপন্যাস), দ্য ক্রাইম এক্সপ্রেস (গল্প), তৃতীয় চোখের জলকামান (কবিতা) এবং অবক্ষয়ের সিঁড়ি (নাটক)। গণসাহায্য সংস্থা নাট্যকার ও পরিচালক পুরস্কারসহ পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। সম্পাদনা করেছেন আবির ও ভাঁজপত্র দুটো ছোট কাগজ। মূলত গল্প লিখতে পছন্দ করেন তিনি।
নাড়িসূত্র || গল্পের সারাংশ
এক মা তার পুত্রের সব স্বাদ, সব স্বপ্নপুরণ করতে গিয়ে স্বামীর লাঞ্ছনা সহ্য করে জরাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বহু বছর পরে, সেই পুত্রই মাতৃভক্তির কারণে নিজ স্ত্রীর কাছ থেকে অবহেলা ও ভর্ৎসনা সহ্য করে মর্ম-যাতনায় ভোগে। জরাগ্রস্ত পুত্র বৃদ্ধা মায়ের স্নেহময় সান্নিধ্য ও মমতাময় স্পর্শের জন্য অধীর আগ্রহে উৎকণ্ঠিত হয়ে থাকে।
বিচারকের মন্তব্য
মানুষের সহজাত আবেগ কিভাবে পরিবারের নির্মিত অনুশাসনকে দ্বন্দ্বমুখর করে তোলে তারই এক অনুপম গল্প ‘নাড়িসূত্র’। লেখক পুত্রপ্রেম আর মাতৃভক্তিকে কথ্য-বাংলার সহজ সংলাপে ফুটিয়ে তুলেছেন সহজাত ভঙ্গিতে।
লেখক পরিচিতি || ইমরান আল হাদী
গল্পকার ও কবি। জন্ম ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭ সালে, বরিশালের বাকেরগঞ্জ থানাধীন বোয়ালিয়া গ্রামে। পড়াশোনা ব্যবস্থাপনায় স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত কবিতার বই—হায়াতুননেছা (২০২১)। প্রকাশিতব্য পাণ্ডুলিপি—লাল বই নীল দরজা (গল্প), সওয়াল জওয়াব (কবিতা), দূর থেকে পৃথিবী দেখতে যেমন (কবিতা)। বর্তমানে তিনি বরিশালে বসবাস করেন।
নীল দরজা || গল্পের সারাংশ
জরিপের কাজে তিন সহকর্মী পৌঁছান প্রত্যন্ত তুলাতলা গ্রামে। প্রাচীন বটবৃক্ষের ছবি তোলার সূত্রে তিনজনই ছড়িয়ে পড়েন তিন দিকে। অন্ধকার নামার আগে, তারা একই নীল রঙের দরজা দিয়ে প্রবেশ করেন ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে। এরপরই শুরু হয় তাদের রহস্যময় যাত্রা—তিনজনই হয়ে পড়েন এক আশ্চর্য ও অশরীরী অতিপ্রাকৃত ঘটনার সম্মুখীন। গল্পের শেষ পর্বে রহস্যের কিছুটা উদ্ঘাটন ঘটলেও, সমাপ্তি হয় না; বরং তা পাঠকের মনে এক অনির্ণেয় রহস্যের জন্ম দেয়।
বিচারকের মন্তব্য
‘নীল দরজা’ গল্পটির জন্ম শুধুমাত্র গল্প বলার শিল্পের জন্য। গল্পের আখ্যানভাগে নিটোল ভাষার বিন্যাসের উপর নিখাদ ভাব চড়িয়ে দেয়াতে কাহিনি স্বচ্ছ জলের মতো বয়ে গেছে। গদ্যের গতি এখানে আশ্চর্যরকম পরিমিত ও নিয়ন্ত্রিত, আর প্লটের উপস্থাপনা এতটাই স্বচ্ছ যে পাঠকের মনে হতে পারে, এটি কোনো মানুষের রচনা নয়, বরং যেন কোনো অশরীরী সত্তার সৃজনশীল স্পর্শ লেগে আছে।
লেখক পরিচিতি || আদনান হাবিব
গল্পকার ও চিত্রনাট্যকার। জন্ম ১৪ আগস্ট ১৯৭৬ সালে, চট্টগ্রামে। পড়াশোনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে। লেখালেখি করেন নিজের তাগিদে, নিজের মত করে; কাছের বন্ধুরাই মূলত সেই লেখার পাঠক। চিত্রনাট্য, প্রযোজনা, সৃজনশীল নির্দেশনা তার কাজের ক্ষেত্র। অনুবাদ করেছেন আলেকজান্দ্রা কোলনতাইয়ের দ্য রেড লাভ।
ভাল চা বানানোর সঠিক রেসিপি || গল্পের সারাংশ
এক দিনের কালচক্রে আটকে থাকা আপাতত ছাপোষা এক চাকুরীজীবি নিজ ফ্ল্যাটে মুখোমুখি হয় দুজন গোয়েন্দার। নিজের মৃত্যুক্ষণকে পিছিয়ে নিতে তার স্ত্রী অস্ত্র হিসাবে সামনে নিয়ে আসে সুস্বাদু চা। এই চায়ের আবর্তনে হাত ধরাধরি করে ভেসে উঠে দাম্পত্য অবিশ্বাস আর রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের নানান খুঁটিনাটি। স্বামী-স্ত্রীর এই অসামান্য যৌথ-লড়াইয়ের পটভূমিতে রচিত এক নান্দনিক ও চমকপ্রদ গল্প, যা পাঠককে নিয়ে যায় সময়, বিশ্বাস ও ক্ষমতার এক জটিল জালে।
বিচারকের মন্তব্য
ভবিষ্যত কালের প্রথম পুরুষের বয়ানে রচিত এমন পরিমিত গদ্যের অপরিমেয় জটিল কাহিনি কাঠামোর সমন্বয় এক কথায় অসাধারণ। গল্পের মূল চরিত্র যেমন ক্ষমতা আর সময়ের চক্রে আটকে একই দিনে একই দৃশ্যকল্পে বারবার জেগে ওঠে, পাঠক তেমনি এই গল্পের প্রতি শব্দ, প্রতি বাক্য দিয়ে অদম্যভাবে আকর্ষিত হবেন। জীবনের অন্তর্নিহিত ভাবনাকে উপলব্ধি করার জন্য গল্পের পাতায় দ্বিতীয়বার ফিরে যেতে হবে।
লেখক পরিচিতি || আনিফ রুবেদ
লেখক ও গল্পকার। তিনি ১৯৮০ সালের ২৫ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার চামাগ্রাম নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এখন পর্যন্ত তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দশটি। উল্লেখযোগ্য গল্পের বই—মন ও শরীরের গন্ধ, দৃশ্যবিদ্ধ নরনারীগান, জীবগণিত; কাব্যগ্রন্থ—পৃথিবীর মৃত্যুদণ্ডপত্র, এসো মহাকালের মাদুরে শুয়ে পড়ি; এবং উপন্যাস—কালকাঠুরে। বর্তমানে থাকেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে।
মরাকান্দির বিল || গল্পের সারাংশ
মরাকান্দি বিলের পথে এক কিশোরী চারজন রিরংসায় নিমজ্জিত দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে চরম নৃশংসতার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে। এই ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একইসাথে নিষ্ক্রিয় সাক্ষী হয়ে থাকে একটি ইঁদুর, একটি শিয়াল এবং একজন পিতা। এই ট্র্যাজেডিকে কেন্দ্র করে বিলের লোককথা, পশুদের রূপক আখ্যান এবং পিতার মানবীয় আবেগের জগৎ মিলে তৈরি হয়েছে এক অনন্য সাহিত্যিক ভূমি।
বিচারকের মন্তব্য
কয়েক মুহূর্তের কিছু ঘটমান দৃশ্যকে অ-মানব দৃষ্টিকোণ থেকে বিবৃত মুহূর্তগুলোর বর্ণনা পাঠককে মানুষেরই বিরুদ্ধে দাঁড় করায় এক গভীর বিচারের কাঠগড়ায়। রূপক কাহিনির সাথে সামাজিক বাস্তবতার সূক্ষ্ম সন্ধিক্ষণটি মর্যাদার সাথে উতরে গিয়েছেন গল্পকার। শব্দের সাথে শব্দের এক জীবন্ত শতরঞ্জি খেলায় যেন মেতে উঠেছিলেন। ছন্দময় গদ্য লিখেও পদ্যের বন্ধন থেকে ছিলেন মুক্ত। এই শিল্প সার্থক রচনা পড়ার পরও মনে দীর্ঘস্থায়ী এক আবেশ রেখে যায়।
লেখক পরিচিতি || সালেহা ফেরদৌস
গল্পকার ও লেখক। জন্ম ২৮শে মার্চ, ১৯৮২ সালে টাংগাইল জেলার নাগরপুর উপজেলায়। পড়াশোনা প্রাণিবিদ্যায় স্নাতক ও ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর। প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ—আলো এনে দেবো। উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে—কাব্য ভাসে অন্য আকাশে, চাঁদ উঠেছে ওই, চান্দ্রজল ও এভিস। শখ ঘুরে বেড়ানো আর বই পড়া। বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করেন।
মহারাজের গ্রাম || গল্পের সারাংশ
ইছাপুর গ্রামে একের পর এক নবজাতকের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটতে থাকে। শারীরিক শোষণের শিকার হতে থাকে একের পর এক নববধূ। গ্রামের মেম্বার থেকে শুরু করে মসজিদের মোয়াজ্জিন—কেউই এই রহস্যের সমাধান করতে পারে না। এখানেই গ্রথিত রয়েছে লোক কাহিনির এক বিস্ময়: মানুষের গর্ভে জন্ম নেয়া এক অশরীরী সত্তা শতাব্দীকাল ধরে পাহারা দিচ্ছে এই গ্রাম। বাংলার লোকগাথার শিকড়ে প্রোথিত এই আখ্যান পাঠকদের জন্য নিয়ে আসবে এক শ্বাসরুদ্ধকর, রোমাঞ্চকর সাহিত্যিক অনুভূতি।
বিচারকের মন্তব্য
প্রথম পাঠে মনে হবে মহারাজের গ্রাম এক নিছক ভৌতিক গল্প। কিন্তু চিন্তার অতলে যেতে থাকলে বোঝা যাবে এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রতীকী গল্প। একান্তই আটপৌরে গদ্যের মাধ্যমে স্বল্প পরিসরে সৃষ্টি করেছেন বহু উপাখ্যানের এক আখ্যানবিশ্ব। জীবনযাপনের স্বাভাবিক প্রবাহে যে ভাষা ব্যবহার করি, তাকেই তিনি নির্মম নগ্নতায় উপস্থাপনের দুঃসাহস দেখিয়েছেন।
লেখক পরিচিতি || ফরিদ হাসান
কবি, গল্পকার ও গবেষক। জন্ম ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯২ সালে, চাঁদপুরে। পিএইচডি গবেষক। তার আগ্রহের বিষয় বাংলার চিত্রকলা, শ্রমিক আন্দোলন, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস। প্রকাশিত গ্রন্থ ৩১টি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ—মিথ্যুক আবশ্যক (কাব্য), অন্য শহরের গল্প (গল্প), সাহিত্যের অনুষঙ্গ ও অন্যান্য প্রবন্ধ (প্রবন্ধ), চিত্রকলার জগৎ (প্রবন্ধ), রবীন্দ্রনাথ ও চাঁদপুরের মানুষেরা (গবেষণা), শতবর্ষে চা শ্রমিক আন্দোলন: ডেডলাইন ২০ মে ১৯২১ (গবেষণা) এবং বিরুদ্ধ স্রোতের মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন (সম্পাদনাগ্রন্থ)। প্রবন্ধ-গবেষণায় পেয়েছেন ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার-২০২৪’। বর্তমানে চাঁদপুরে বসবাস করেন।
মুল্লুকযাত্রা || গল্পের সারাংশ
সময়টা ব্রিটিশ রাজের। কিশোর রমাপদ নিজ গ্রাম ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে পাহাড়-বনে ঘেরা একটি দুর্গম চা-বাগানে কাজ নেয়। কিন্তু লাট সাহেবদের শোষণে জর্জরিত শ্রমিকরা একদিন বিদ্রোহ করে। তাদের লক্ষ্য ফিরে যাওয়া নিজেদের গ্রামে। লাট সাহেব ও বড়বাবুদের নানা বাধা উপেক্ষা করে এই ‘মুল্লুকযাত্রা’ হয়ে ওঠে জল-স্থল পাড়ি দেওয়া এক সংগ্রামী অভিযান। এটি একটি দ্রোহভরা আখ্যান, যেখানে রমাপদের বিদ্রোহ এবং বিরহ নিরবতার গান গায়।
বিচারকের মন্তব্য
মুল্লুকযাত্রা এক প্রতিরোধ ও প্রত্যাবর্তনের গল্প। একই সাথে এটি বিদ্রোহ ও বিরহেরও গল্প। এটি দুই দশকের ঘটনাকে একসাথে বেঁধে শতাব্দীর বঞ্চনার কথা বলে। ছোট ছোট বাক্যের সহজ গদ্যের সাবলীল গতিময়তা পাঠককে এক কঠিন, কিন্তু করুণ বাস্তবতার মধ্যে নিমগ্ন করে।
লেখক পরিচিতি || আলতাফ শেহাব
গল্পকার ও কবি। জন্ম ৭ মে ১৯৮১ সালে, কুমিল্লায়। পড়াশোনা রাষ্ট্র বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। বিপ্লবী ধারার প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হন ১৯৯৯ সালে। তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘প্রেক্ষণ’ ও ‘কবিতাপত্র’। লেখালেখির শুরু তারও আগে, প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় সাহিত্যপত্রিকা ‘প্রভাত’-এ ১৯৯৭ সালে। ২০১০ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কবিতার বই—নুন আগুনের সংসার। বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করছেন।
লাশঘর || গল্পের সারাংশ
শুনশান লাশঘরের প্রহরী ওহাব আলীর দিনরাত কেটে যায় নিষ্প্রাণ দেহগুলোর স্মৃতি ও স্বপ্নের গলিপথে ঘুরে ঘুরে। হঠাৎ অস্বাভাবিক হারে নানা বয়সী মানুষের ক্ষতবিক্ষত লাশ আসতে শুরু করায় তারই মধ্যে জন্ম নেয় এক গভীর রূপান্তর। এক কিশোরের খোলা পেটে সে দেখতে পায় ক্ষুধার বিরুদ্ধে জমে থাকা অন্নের বিচিত্র সমারোহ। এক মধ্যবয়সী মানুষের পিঠের গুলির ছিদ্রে উঁকি দেয় আপনজনের জন্য মায়াভরা এক ঘর-সংসার। এই বিমূর্ত জগৎ থেকে যখন ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত ওহাব বেরিয়ে আসে, চেনা পৃথিবীটাই তখন তার কাছে হয়ে ওঠে সবচেয়ে বেশি অচেনা, সবচেয়ে বেশি বিমূর্ত। চোখের দেখা আর মনের জানার এক বিক্ষুব্ধ সংঘাতে আবির্ভূত হয় এক তৃতীয় জগৎ, যে জগৎ আস্তে আস্তে তাকে গ্রাস করে নেয়। শেষ পর্যন্ত ওহাব আলী লীন হয়ে যায় লাশকাটা ঘরের প্রতিটি নিঃশব্দের সঙ্গে।
বিচারকের মন্তব্য
গল্পের খোলা আঙ্গিনায় ইচ্ছেমতো সব বলে ফেলার অবকাশ থাকলেও লেখক সেই পথ পরিহার করে কাব্যিক অন্তঃসলীলায় সরাসরি কিছু না বলেও সবকিছু বলে দিয়েছেন। পরাবাস্তবতা ও যাদুবাস্তবতার মধ্যেকার সূক্ষ্ম পার্থক্যকে তিনি অত্যন্ত নৈপুণ্যের সাথে আলাদা করেছেন। গল্পে কিছু ঘটনা অবাস্তব মনে হয় কিন্তু ঘটে যায়। আবার, বাস্তবিকই যে ঘটনা ঘটবে বলে মনে হয় কিন্তু তা অবাস্তবই রয়ে যায়। এই ধরনের দৃশ্যাবলি সৃজনে পরাবাস্তবতার কৌশল প্রয়োগে লেখক সম্পূর্ণভাবে সফল হয়েছেন।
লেখক পরিচিতি || অরবিন্দ পান্তি
গল্পকার ও লেখক। জন্ম ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮ সালে, যশোর জেলায়। পড়াশোনা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত গ্রন্থ—আমার একজন আমলকী আছে (গল্প: ২০২১), নুন খুন ও প্রেমের গল্প (গল্প: ২০২৩), ঈশ্বরছেঁড়া (উপন্যাস:২০২৪) এবং লাল অশ্রু (উপন্যাস:২০২৫)। নিয়মিত লিখছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়।
সাধু নিবাস || গল্পের সারাংশ
এক শতাব্দী ধরে কার্পুর বাছড়া নামের এক নারীর জীবনের পরতে পরতে স্বজন হারানোর করুণ আখ্যান সাধু নিবাস। কিশোরী বেলার যৌন শোষণ, ক্লিষ্ট দাম্পত্য জীবনের টানাপড়েন এবং পুত্র বিয়োগের ধারাপাত এই ‘সাধু নিবাস’।
বিচারকের মন্তব্য
মানবিক অনুভূতি ও বৈশিষ্ট্যকে প্রাকৃতিক উপমার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন অসামান্য দক্ষতায়। কথকের চেতনা প্রবাহ ও উত্তর-আধুনিক বর্ণনাভঙ্গিতে দেশ, কাল ও এই নারীর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এক বৃহত্তর চক্রে আবদ্ধ হয়েছে। গল্পের নান্দনিক গতি ও গভীরতা পাঠককে মুগ্ধ করবে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি