নারীর অদেখা শ্রম, নাগরিক শক্তি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের গল্প

প্রকাশিত: ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২১, ২০২৬

নারীর অদেখা শ্রম, নাগরিক শক্তি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের গল্প

Manual3 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২১:জানুয়ারি ২০২৬ : বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ গড়ে উঠেছে এমন এক শ্রমভিত্তির ওপর, যা জাতীয় পরিসংখ্যানে প্রায় অদৃশ্য। দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমশক্তি নিয়োজিত অনানুষ্ঠানিক খাতে—আর এই অদৃশ্য শ্রমের বড় অংশই নারীদের। গৃহকর্মী, চা বাগানের শ্রমিক, ঘরে বসে পোশাক তৈরি করা নারী, মৎস্যজীবী নারী—তাঁরা কাজ করেন, কিন্তু অধিকাংশ সময়ই তাঁদের কাজের কোনো লিখিত স্বীকৃতি নেই, সামাজিক সুরক্ষা নেই, সিদ্ধান্ত গ্রহণে কণ্ঠ নেই।

এই বাস্তবতার পটভূমিতে প্রকাশিত হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্র ও গল্পভিত্তিক প্রকাশনা—‘From Shadows to Leadership: Women’s Voices, Civil Society Strength & Inclusive Governance in Bangladesh’। ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ প্রকাশিত এই বইটি বাংলাদেশের প্রান্তিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীদের অদেখা জীবনসংগ্রাম ও নেতৃত্বে উত্তরণের গল্প তুলে ধরেছে।

অদৃশ্য শ্রম থেকে দৃশ্যমান নেতৃত্ব

বইটির মূল শক্তি হলো—এটি কেবল নারীদের ভুক্তভোগিতার গল্প বলে না, বরং দেখায় কীভাবে সংগঠিত উদ্যোগ, নাগরিক সমাজের সহায়তা এবং ফেমিনিস্ট নেতৃত্বের চর্চা নারীদের ক্ষমতায়নের পথ তৈরি করতে পারে।

Manual7 Ad Code

এই প্রকাশনার পেছনে রয়েছে Empowering Women through Civil Society Actors (EWCSA) প্রকল্প, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহ-অর্থায়নে এবং অক্সফামের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ৩৩টি নাগরিক সমাজ সংগঠনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ৪৫ হাজারের বেশি নারী সরাসরি যুক্ত হয়েছেন—যাঁদের অনেকেই শুরুতে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অবগত ছিলেন না এবং কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসরে প্রবেশাধিকার পাননি।

গল্পে গল্পে রূপান্তর

বইটিতে স্থান পাওয়া আলোকচিত্র ও বর্ণনাগুলো দেখায় রূপান্তরের সবচেয়ে মানবিক চিত্র—

গৃহকর্মীরা প্রথমবারের মতো লিখিত চুক্তি নিয়ে দরকষাকষি করছেন,
চা বাগানের নারী শ্রমিকরা নিজেদের নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব দিচ্ছেন,
মৎস্যজীবী নারীরা বহুদিনের বঞ্চনার পর জাতীয় পরিচয়পত্র ও নাগরিক স্বীকৃতি অর্জন করছেন,
ঘরে বসে কাজ করা নারী শ্রমিকরা নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে সংগঠিত হচ্ছেন।

এই প্রতিটি গল্পই দেখায়, যখন নারীরা সংগঠিত হন এবং তাঁদের কণ্ঠ শোনা হয়, তখন প্রান্তিকতা রূপ নেয় ক্ষমতায়নে।

নেতৃত্বের অর্জন, তবে পথ এখনও কণ্টকাকীর্ণ

তবে বইটি কেবল অর্জনের গল্পেই থেমে থাকেনি। এতে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে কিছু কঠিন বাস্তবতা—

নারীদের সংগঠন ও নেতৃত্ব টেকসই রাখা এখনো চ্যালেঞ্জ,
নীতিমালা থাকলেও কার্যকর বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে,
প্রান্তিক ও বহুবিধ পরিচয়ের নারীদের (জাতিগত সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের নারী) অন্তর্ভুক্তি এখনও অসম্পূর্ণ,
নারীর অগ্রগতির বিপরীতে সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাকল্যাশ বিদ্যমান,
অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত নারীদের অর্জনকে ভঙ্গুর করে তুলছে।

এই প্রেক্ষাপটে বইটি জোর দিয়ে বলছে—নারীর নেতৃত্বের অর্জনকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান এবং অব্যাহত নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা।

সম্মান ও আহ্বান

Manual7 Ad Code

‘From Shadows to Leadership’ মূলত একটি সম্মাননামা—সেই সব নারীর প্রতি, যাঁরা নিজেদের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে অন্যদের জন্য পথ খুলে দিয়েছেন। তাঁদের নেতৃত্ব কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের আহ্বান।

এই বই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নারীরা যখন ছায়া থেকে আলোয় আসেন, তখন শুধু তাঁদের জীবনই বদলায় না, বদলে যায় সমাজ ও রাষ্ট্রের শক্তির ভিত্তি।

Manual4 Ad Code

প্রকাশনা দেখা যাবে:
https://asia.oxfam.org/latest/publications/shadows-leadership

#

ছায়া থেকে নেতৃত্বে

— সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

এই দেশে আলো জ্বলে ঘরের কোণে,
ঘাম ঝরে নীরব নারীর কাঁধে—
কিন্তু হিসাবের খাতায় নামে না নাম,
রাষ্ট্র দেখে না, সমাজও বাঁধে।

ভোর নামে না সূর্য উঠেই শুধু,
নারীর ভোর শুরু হয় অন্ধকারে—
চুলোর ধোঁয়া, চায়ের বাগান,
জালের টান, সুঁইয়ের ধারাতে।

গৃহকর্মী সে—নাম নেই চুক্তিতে,
কাজ আছে, মজুরি অনিশ্চিত,
চা-পাতা তোলে, হাতে ফোস্কা,
তবু সে নাগরিক? প্রশ্নচিত।

ঘরে বসে সেলাই করে স্বপ্ন,
রাত পেরোয়, চোখে জমে ব্যথা,
তাঁর শ্রমে চলে শহরের ফ্যাশন,
নিজের জীবনে নেই নিরাপত্তা।

এই সব নারী—সংখ্যায় কোটি,
কিন্তু রাষ্ট্রে তাঁরা অদৃশ্য,
পরিসংখ্যানে শূন্য রেখা,
অর্থনীতিতে ছায়ার দৃশ্য।

ছায়া বলেই কি তারা ক্ষীণ?
না—ছায়া মানেই আলো আছে,
কারণ আলো যার পিঠে পড়ে,
সে-ই তো ছায়ার জন্ম দেয় কাছে।

এই ছায়া থেকেই উঠল গল্প,
ক্যামেরার চোখে, শব্দের স্রোতে,
ছায়া থেকে নেতৃত্বে যাত্রা,
বাংলার নারীর নতুন নোটে।

কেউ প্রথম বলল—“আমার অধিকার”,
কেউ চুক্তি লিখল কাগজে,
কেউ নেতৃত্ব নিল বাগানের দলে,
কেউ দাঁড়াল নাগরিক সাজে।

জাল হাতে মৎস্যজীবী নারী,
এনআইডি পেল বহু লড়াইয়ে,
রাষ্ট্র চিনল—তুমি নাগরিক,
নাম উঠল পরিচয়ের খাতায়।

সংগঠনের হাত ধরেই শিখল তারা,
ভয় ভাঙে, কণ্ঠ পায় ভাষা,
নাগরিক সমাজ পাশে দাঁড়ালে,
অদেখা শ্রম পায় প্রকাশা।

ফেমিনিস্ট নেতৃত্ব—শব্দ নয়,
এ এক চর্চা, এ এক অনুশীলন,
যেখানে শোনে একে অপরকে,
ক্ষমতা মানে সম্মিলন।

ইউরোপের সহায়, অক্সফামের পথ,
তেত্রিশ সংগঠনের দৃঢ় জোট,
পঁয়তাল্লিশ হাজার নারীর কণ্ঠ,
বদলে দিল নীরবতার ভোট।

তবু পথ কি সহজ? না—একেবারেই নয়,
ব্যাকল্যাশ আসে সমাজের ঘর থেকে,
নীতির ফাঁকে ফাঁকে পড়ে যায় নারী,
বাস্তবায়ন দূরে থাকে পথ থেকে।

জাতিগত সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী নারী,
উপকূলের ঝুঁকিতে থাকা জীবন,
সবাই এখনো সমান নয়,
অন্তর্ভুক্তি রয়ে গেছে অসম্পূর্ণ।

জলবায়ুর ঝড়, অর্থনীতির ধাক্কা,
অর্জনগুলো করে তোলে নড়বড়ে,
তবু তারা দাঁড়ায়—কারণ জানে,
নেতৃত্ব মানে হার না মানা জোরে।

এই বই তাই শুধু ছবি নয়,
এ এক দলিল, এক রাজনৈতিক ডাক,
নারীর ক্ষমতায়ন মানে কেবল উন্নয়ন নয়,
এ গণতন্ত্রের মেরুদণ্ডের বাঁক।

এ সম্মান—ঘাম ঝরানো হাতে,
এ আহ্বান—নীতিনির্ধারকের কাছে,
ছায়া নয়, আলোয় রাখো নারীকে,
রাষ্ট্র গড়ো অন্তর্ভুক্তির আঁচে।

কারণ নারী যখন উঠে দাঁড়ায়,
শুধু তার জীবন বদলায় না,
রাষ্ট্রের ভিত শক্ত হয় তখন,
গণতন্ত্র পায় নতুন ভাষা।

Manual6 Ad Code

ছায়া থেকে আলো—এই যাত্রাপথ,
বাংলাদেশের আগামী গল্প,
নারীর নেতৃত্বে লেখা হবে,
ন্যায্য রাষ্ট্রের উজ্জ্বল

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ