কথাসাহিত্যিক ও কবি সৈয়দ মোতাকাব্বিরের ৬৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১:০৬ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২০, ২০২৬

কথাসাহিত্যিক ও কবি সৈয়দ মোতাকাব্বিরের ৬৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Manual1 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | হবিগঞ্জ, ২০ জানুয়ারি ২০২৬ : তরফ রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবারে জন্ম নেওয়া কথাসাহিত্যিক, কবি ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব সৈয়দ আব্দুল মোতাকাব্বির আবুল হোসেনের ৬৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ (২০ জানুয়ারি)।

Manual4 Ad Code

হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর পশ্চিম হাবিলীর এই কৃতী সন্তান বাংলা সাহিত্য, শিক্ষা বিস্তার ও সামাজিক উন্নয়নে যে অবদান রেখে গেছেন, তা আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণকারী সৈয়দ মোতাকাব্বির ছিলেন সৈয়দ মোজাম্মেল হোসেন ও সৈয়দা সামসুন্নেছার সন্তান। তিনি একাধারে ছিলেন একজন প্রগতিশীল জমিদার, শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক এবং সাহিত্যস্রষ্টা। তৎকালীন সমাজ বাস্তবতা ও মানবিক দায়বদ্ধতাকে কেন্দ্র করে তাঁর চিন্তা-চেতনা গড়ে উঠেছিল।

শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা

শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি শায়েস্তাগঞ্জ হাই স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। শিক্ষার আলো গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে দিতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করেন। তাঁর উদ্যোগেই লস্করপুর পোস্ট অফিস ও লস্করপুর রেলওয়ে জংশন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সে সময় এ অঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সাহিত্যকর্ম ও সৃজনশীলতা

সৈয়দ মোতাকাব্বিরের সাহিত্যকর্মের মধ্যে উপন্যাস ‘কল্পতরু’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ উপন্যাসে সংযোজিত ‘জীবনের কর্তব্য’ শীর্ষক একটি সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা বাংলা সাহিত্যে একটি ব্যতিক্রমী নিদর্শন। কবিতাটির প্রতিটি পংক্তির প্রথম অক্ষর সংযুক্ত করলে তাঁর নাম ও পরিচয় ফুটে ওঠে—যা তাঁর সাহিত্যিক নৈপুণ্য ও সৃজনশীলতার পরিচায়ক।

Manual5 Ad Code

সামাজিক নেতৃত্ব

১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আঞ্জুমান ইত্তিহাদুল মুসলেমীন নামে একটি সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন এবং দীর্ঘদিন এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি সমাজ সংস্কার, শিক্ষা প্রসার ও মুসলমান সমাজের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখেন।

পারিবারিক উত্তরাধিকার

২০ জানুয়ারি ১৯৬০ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি নয় পুত্র ও ছয় কন্যা সন্তানের জনক ছিলেন। তাঁর সন্তানদের মধ্য থেকে দেশের বিচারব্যবস্থায় একাধিক গুণী ব্যক্তিত্ব উঠে এসেছেন। তাঁর এক সন্তান বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেন স্বাধীন বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নাতি বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি ছিলেন।

এছাড়া মরহুমের আরেক পুত্র সৈয়দ মুমিদুল হোসেনের সন্তান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শ্রদ্ধা নিবেদন

মহান এই ব্যক্তিত্বের ৬৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আমিরুজ্জামান। তিনি বলেন, “সৈয়দ মোতাকাব্বির ছিলেন এমন একজন মনীষী, যাঁর জীবন ও কর্ম আজকের সমাজের জন্যও অনুকরণীয়।”

শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজকল্যাণে তাঁর অবদান ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর আদর্শ ও কর্মধারা নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করবে—এ প্রত্যাশাই করছেন গুণীজনরা।

#
কথাসাহিত্যিক ও কবি সৈয়দ মোতাকাব্বিরকে উৎসর্গ করে ও তাঁর স্মরণে কবিতা —

সাহিত্যের প্রদীপ

— সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

লস্করপুরের মাটি আজও নীরবে কয় কথা,
তরফ রাজ্যের বুকে ইতিহাসের ব্যথা।
হাবিলীর পথে পথে ঝরে স্মৃতির রেণু,
নামে নামে জেগে ওঠে এক আলোকধেনু।

Manual3 Ad Code

সেই আলোয় লিখেছিল সময়ের পাঠ,
জমিদার হয়েও যিনি ছিলেন মানববাদ।
কলমে কলমে গাঁথা জীবনের দায়,
সেই নাম—সৈয়দ মোতাকাব্বির—চির অক্ষয়।

১৮৭৯—এক জন্ম, জ্ঞানের দীপ জ্বলে,
সৈয়দ মোজাম্মেলের ঘরে আলো নামে ফলে।
মাতা সামসুন্নেছার দোয়ার ছায়াতলে,
মানুষ গড়ার স্বপ্ন শৈশবেই জ্বলে।

শিক্ষা ছিল তার সাধনা, ব্রত,
অজ্ঞতার সাথে আজীবন রত।
শায়েস্তাগঞ্জে গড়লেন বিদ্যালয়,
আলোর মিনার, অন্ধকার ক্ষয়।

রেলপথ এল, ডাকঘর দাঁড়াল,
লস্করপুরে সভ্যতার দ্বার খুলে গেল।
নিজের জন্য নয়, সমাজের তরে,
সব কর্ম তার মানবকল্যাণ ঘিরে।

কলমে যখন ধরলেন কথার ধনু,
জেগে উঠল ‘কল্পতরু’—সাহিত্যের বনু।
উপন্যাসের ভেতর লুকানো যে গান,
‘জীবনের কর্তব্য’—নৈতিক আহ্বান।

চতুর্দশ পঙ্‌ক্তির সনেটখানি,
নামে নামে বাঁধা আত্মপরিচয়খানি।
প্রথম অক্ষরে খোদ নিজের নাম,
সাহিত্য আর জীবনের একাকার ধাম।

১৯০৯—সময়ের ডাকে সাড়া দিয়ে,
গড়লেন সংগঠন সমাজ জাগিয়ে।
ইত্তিহাদুল মুসলেমীন—ঐক্যের মঞ্চ,
সভাপতির আসনে দায়িত্বের সঞ্চ।

Manual7 Ad Code

বহু বছর ধরে বহাল সেই ভার,
ন্যায়, শিক্ষা, মানবতা—ছিল যার সার।
জমিদার হয়েও অহংকারহীন,
মানুষের পাশে সদা অবিচলীন।

ঘরে ঘরে ছিল সন্তানের হাসি,
নয় পুত্র, ছয় কন্যা—জীবনের চাষি।
তাঁদের মধ্যেই ইতিহাসের ধারা,
ন্যায়ের আসনে উঠেছে যারা।

এবি মাহমুদ—ন্যায়বিচারের কণ্ঠ,
স্বাধীন বাংলার প্রধান বিচারপতির মণি।
তার উত্তরসূরি দস্তগীর হোসেন,
হাইকোর্টে বহন করলেন সেই ধ্যান।

মুমিদুল হোসেনের রক্তধারা বয়ে,
জে আর মোদাচ্ছির ন্যায়ের পতাকা নয়ে।
বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হয়ে,
পিতৃপুরুষের স্বপ্ন পূর্ণতা পেয়ে।

১৯৬০—বিশ জানুয়ারি, থেমে গেল শ্বাস,
কিন্তু থামেনি কর্ম, থামেনি ইতিহাস।
মৃত্যুবার্ষিকী আসে, যায় প্রতিবার,
নামটি থাকে দীপ্ত, অম্লান, অমর।

আজ ছেষট্টি বছর পর দাঁড়িয়ে আমরা,
শ্রদ্ধার পুষ্পে ভরি স্মৃতির কুম্ভরা।
জাতির পত্রে ছাপা এই বিনম্র গান,
এক মহামানবের প্রতি কৃতজ্ঞতার দান।

সৈয়দ মোতাকাব্বির—নামটি শুধু নয়,
এ এক শিক্ষা, এক দায়, এক সময়।
যতদিন কলম থাকবে সত্যের পক্ষে,
ততদিন তিনি থাকবেন ইতিহাসের রক্ষে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ