সম্পাদনা: সাহসের সাহিত্য ও শত্রু অর্জনের শিল্প

প্রকাশিত: ৯:০৭ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২১, ২০২৬

সম্পাদনা: সাহসের সাহিত্য ও শত্রু অর্জনের শিল্প

Manual7 Ad Code

পাপড়ি রহমান |

বাংলা সাহিত্যে একটি পুরোনো কিন্তু পরীক্ষিত সত্য আছে—আপনি যদি নির্বিঘ্নে থাকতে চান, কবিতা লিখুন; নিরুপদ্রবে থাকতে চাইলে গল্প লিখুন; আর যদি নিশ্চিতভাবে শত্রু বাড়াতে চান, তবে একটি সাহিত্যগ্রন্থ সম্পাদনা করুন। বিশেষ করে গল্পের সংকলন। এই সত্য আমি নিজে বহু সম্পাদনার অভিজ্ঞতায় হাড়ে হাড়ে জেনেছি। এমনও সময় গেছে, সমালোচনার ঝড় সামলাতে না পেরে নীরবে সরে দাঁড়াতে হয়েছে—দেখেশুনে ক্ষেপে না গিয়ে উল্টো বেদনা নিয়ে ইস্তফা দিতে হয়েছে।

Manual5 Ad Code

এই প্রেক্ষাপটেই সম্প্রতি অন্তর্জালে ভেসে এলো একটি সংবাদের কথা—দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে ‘বাংলাদেশের পাঁচ দশকের গল্প’। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে বইটির স্পর্শ এখনো পাওয়া হয়নি; লেখক কপি হাতে পেলে কাউকে অনুরোধ করে আনাতে হবে। তবু বইয়ের নাম, সম্পাদকদের পরিচয় এবং লেখক তালিকা দেখেই বোঝা যায়—এটি কোনো সাধারণ সংকলন নয়।

আমার শ্রদ্ধাভাজন ও প্রিয় দুই লেখক, ওয়াসি আহমেদ ও ইমতিয়ার শামীম, এই বিপুল কর্মযজ্ঞের দায়িত্ব নিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি সাহসী ও পরিশ্রমলব্ধ উদ্যোগ। কারণ আমাদের দেশে লেখকের অভাব নেই—বরং লেখকের আধিক্যই প্রধান সমস্যা। খুন, গুম, ভূমিকম্প, মহামারি কিংবা পেটে ভাত থাকুক বা না থাকুক—লেখক পাওয়া যাবে হাজারে হাজারে। কিন্তু এই বিপুল লেখককুলের একটি বড় অংশ এমন, যাঁদের লেখা কুলায় ধরা যায় না—জলের মতো, জেলির মতো। দেবী সরস্বতীর আশীর্বাদ থাকলেও কেজি দরে বিক্রির যোগ্য হয়ে ওঠে না সেই রচনা।

এই বাস্তবতায় কষ্টিপাথরে যাচাই-বাছাই করে মাত্র ৬০টি গল্প নির্বাচন করা কোনো সহজ কাজ নয়। এটি শুধু সাহিত্যবোধ নয়, মানসিক দৃঢ়তা ও নৈতিক সাহসেরও পরীক্ষা। সম্পাদকদ্বয় সেই কঠিন কাজটি করেছেন বলেই তাঁদের জানাতে চাই আন্তরিক অভিনন্দন ও উষ্ণ শুভেচ্ছা।

Manual3 Ad Code

সম্পাদকদ্বয়ের লেখালেখির সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের পরিচয় আছে। সে অভিজ্ঞতা থেকে বলছি—তাঁদের সম্পাদনায় পাঠক দুই মলাটে অন্তত কিছু উৎকৃষ্ট গল্প পাবেন, এ বিষয়ে আমার আস্থা রয়েছে। লেখক তালিকা মনোযোগ দিয়ে দেখেও সেই ধারণাই জোরালো হয়েছে। যদিও দুই-তিনটি নাম দেখে খানিকটা দ্বিধা তৈরি হয়েছে—এঁরা কোন মানদণ্ডে বা কীভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ সংকলনে স্থান পেলেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে এটাও সত্য, সম্পাদকদের নির্বাচনের যুক্তি না বুঝেই ইটপাটকেল ছোড়া আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতির পুরোনো ব্যাধি। এমনকি অনেক সময় সেই ইটপাটকেল ছুরি বা মিছরির ছুরিতেও রূপ নেয়—যার ফলে একটি ভালো বই বাজারে জন্মের আগেই মাঠে মারা যায়।

দুই খণ্ডে প্রকাশিত বইটির প্রচ্ছদ চমৎকার। বিনিময় মূল্য জানা না থাকায় উল্লেখ করা গেল না। তবে প্রকাশক কথাপ্রকাশ এবং সম্পাদকদ্বয়—ওয়াসি আহমেদ ও ইমতিয়ার শামীম—এই উদ্যোগের জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রাপ্য।

Manual7 Ad Code

তবু একটি আশঙ্কা থেকেই যায়। এই গ্রন্থ প্রকাশের পর যাঁরা নিজেদের কুতুব বলে জাহির করেন—আসলে ক্ষমতা বা রাজনীতির ছায়াতলে থাকা গুপ্ত বা প্রকাশ্য লাঠিয়াল লেখক—তাঁদের রোষানলের তুমুল তুফান সম্পাদকদ্বয় কীভাবে সামলাবেন? সেই ভাবনায় আমি নিজেই খানিকটা ভীত। কারণ সম্পাদনা মানেই কারও না কারও বাদ পড়া, আর বাদ পড়া মানেই আমাদের সাহিত্যে শত্রুতা।

তবু বলতেই হয়—এই ঝুঁকি নিয়েই তো প্রকৃত সাহিত্যকর্ম। তাই ওয়াসিভাই ও শামীমভাইকে আবারও জানাই শ্রদ্ধা ও অফুরান ভালোবাসা। সাহসী সম্পাদনাই আমাদের সাহিত্যের ভবিষ্যৎকে কিছুটা হলেও নির্ভরযোগ্য করে তোলে।
#

পাপড়ি রহমান
লেখক, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক

Manual5 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ