শ্রীমঙ্গলে হবিগঞ্জ-সিলেট বিরতিহীন বাসের যাত্রাবিরতি পুনর্বহালের দাবি

প্রকাশিত: ২:৩০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৩, ২০২৬

শ্রীমঙ্গলে হবিগঞ্জ-সিলেট বিরতিহীন বাসের যাত্রাবিরতি পুনর্বহালের দাবি

Manual5 Ad Code
  • পরিবহন মালিকদের বিরোধে ভোগান্তিতে যাত্রী, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়ে সংবাদ সম্মেলন

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ১৩ আগস্ট ২০২৬ : হবিগঞ্জ-সিলেট এক্সপ্রেস (বিরতিহীন) ও এসএমএস—এই দুই বাস পরিবহন সার্ভিসের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধের প্রভাব পড়েছে সাধারণ যাত্রীদের ওপর। এর ফলে শ্রীমঙ্গল শহর থেকে হবিগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ ও মিরপুরগামী যাত্রীরা আগের মতো সরাসরি বিরতিহীন বাসে ওঠানামার সুযোগ পাচ্ছেন না। এতে শিক্ষার্থী, রোগী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী, নারী, শিশু, বয়স্ক ও পর্যটকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করে বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

Manual6 Ad Code

এ অবস্থায় শ্রীমঙ্গল শহরে হবিগঞ্জ-সিলেট এক্সপ্রেস (বিরতিহীন) বাস পরিবহন সার্ভিসের পূর্বের যাত্রাবিরতি অবিলম্বে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সর্বস্তরের জনগণ ও ভুক্তভোগী যাত্রীরা। একই সঙ্গে পরিবহন মালিকদের বিরোধের দায় যেন সাধারণ যাত্রীদের বহন করতে না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপেরও দাবি জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকাল ১১টায় শ্রীমঙ্গল শহরের গ্র্যান্ড তাজ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড পার্টি সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।

শ্রীমঙ্গলের ভুক্তভোগী যাত্রী ও সর্বস্তরের জনগণের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংস্কৃতিকর্মী ও সংগীতশিল্পী মো. তারেক ইকবাল চৌধুরী। তিনি শ্রীমঙ্গলের স্থায়ী বাসিন্দা এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, মৌলভীবাজার কর্তৃক মনোনীত শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন হবিগঞ্জ উন্নয়ন সংস্থার শ্রীমঙ্গল শাখার সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ পরিদর্শক নীহার রঞ্জন নাথ, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির আহ্বায়ক সৈয়দ আবু জাফর সালাউদ্দিন ও সদস্য সচিব রুবেল আহমেদ, শ্রীমঙ্গল অনলাইন প্রেসক্লাবের সভাপতি ও আমার সিলেট (amarsylhet24.com)-এর সম্পাদক মো. আনিছুল ইসলাম আশরাফী, সিনিয়র সাংবাদিক কাওছার ইকবাল এবং উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বিকুল চক্রবর্তী।

এ ছাড়া ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথার বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান, সিনিয়র সাংবাদিক ইসমাইল মাহমুদ, শফিকুল ইসলাম রুম্মন, রাজেশ ভৌমিক, মিজানুর রহমান আলম, আবুজার রহমান বাবলা, সৈয়দ ছায়েদ আহমেদ, কাজী গোলাম কিবরিয়া জুয়েল, শামসুল ইসলাম শামীম, দৈনিক মানবজমিন-এর প্রতিনিধি জামাল, দৈনিক নিরপেক্ষ-এর প্রতিনিধি মো. কাওছার আহমেদ, শ্রীমঙ্গল অনলাইন প্রেসক্লাবের সদস্য আবদাল মিয়াসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মো. তারেক ইকবাল চৌধুরী বলেন, হবিগঞ্জ-সিলেট সড়কপথে শ্রীমঙ্গল একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। প্রতিদিন শ্রীমঙ্গল থেকে হবিগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ, মিরপুর ও সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, পারিবারিক প্রয়োজন ও পর্যটন—বিভিন্ন কারণে এ অঞ্চলের মানুষের আন্তঃজেলা যোগাযোগের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে।

তিনি বলেন, পূর্বে হবিগঞ্জ-সিলেট বিরতিহীন বাস সার্ভিস শ্রীমঙ্গল শহরে নিয়মিত যাত্রাবিরতি দিত। এতে শ্রীমঙ্গলের যাত্রীরা সরাসরি বাসে হবিগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় যাতায়াত করতে পারতেন। কিন্তু বর্তমানে যাত্রাবিরতি না থাকায় যাত্রীদের একাধিকবার বাস পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এতে যাতায়াতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে।

তারেক ইকবাল চৌধুরীর প্রশ্ন, দুটি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক বিরোধের দায় কেন সাধারণ যাত্রীদের বহন করতে হবে? একটি পরিবহন-সংক্রান্ত বিরোধের কারণে শ্রীমঙ্গলসহ আশপাশের এলাকার হাজার হাজার মানুষ কেন স্বাভাবিক যাতায়াতের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন—এ প্রশ্নও তিনি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য বারবার যানবাহন পরিবর্তন করে গন্তব্যে পৌঁছানো অত্যন্ত দুর্ভোগের। পরিবার-পরিজন নিয়ে যাতায়াতকারী যাত্রীদের ক্ষেত্রেও এ পরিস্থিতি বাড়তি বিড়ম্বনা তৈরি করছে।

শ্রীমঙ্গল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিদিন পর্যটকরা এ এলাকায় আসেন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ জনপদের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী জেলা ও উপজেলাগুলোর সরাসরি সড়ক যোগাযোগ আরও সহজ ও যাত্রীবান্ধব হওয়া প্রয়োজন। পরিবহনসংশ্লিষ্ট বিরোধের কারণে এ যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সংবাদ সম্মেলন থেকে তিন দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—হবিগঞ্জ-সিলেট বিরতিহীন বাস সার্ভিসের শ্রীমঙ্গল শহরে পূর্বের যাত্রাবিরতি অবিলম্বে পুনর্বহাল করে যাত্রী ওঠানো ও নামানোর সুযোগ নিশ্চিত করা; কোনো পরিবহন ব্যবসায়িক বিরোধের কারণে কোনো এলাকার সাধারণ যাত্রীদের পরিবহন সুবিধা বন্ধ না করা এবং শ্রীমঙ্গল থেকে হবিগঞ্জগামী যাত্রীদের জন্য নিয়মিত, নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব বিরতিহীন বাস সার্ভিস নিশ্চিত করা।

এ সময় জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), সংশ্লিষ্ট পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়।

জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি

শুধু সংবাদ সম্মেলন নয়, এর আগেও একই দাবিতে সাধারণ জনগণের পক্ষে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন মো. তারেক ইকবাল চৌধুরী। এ দাবির সমর্থনে বর্তমানে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযানও অব্যাহত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, মিরপুর, শায়েস্তাগঞ্জ ও হবিগঞ্জ এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ ব্যবসা, চাকরি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পারিবারিকসহ নানা প্রয়োজনে নিয়মিত এসব এলাকার মধ্যে যাতায়াত করেন। দীর্ঘদিন ধরে হবিগঞ্জ-সিলেট বিরতিহীন বাস সার্ভিস এ অঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

Manual2 Ad Code

তবে হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস (বিরতিহীন) ও এসএমএস সার্ভিসের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণে শ্রীমঙ্গলের যাত্রীদের এ বাসে ওঠানামার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে বলে স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়।

এর ফলে শ্রীমঙ্গল থেকে মিরপুর, শায়েস্তাগঞ্জ বা হবিগঞ্জগামী যাত্রীদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করে বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসা, শিক্ষা, চাকরি কিংবা ব্যবসায়িক কাজে যাতায়াতকারী মানুষের জন্য এ পরিস্থিতি বাড়তি ভোগান্তি সৃষ্টি করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, হবিগঞ্জ-সিলেট বিরতিহীন বাস শ্রীমঙ্গলের ওপর দিয়ে চলাচল করলেও শ্রীমঙ্গল থেকে যাত্রী ওঠানো কিংবা ফেরার পথে যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার সুযোগ না থাকায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে চলাচলকারীরা সমস্যায় পড়ছেন। বিষয়টিকে অমানবিক ও যাত্রীস্বার্থবিরোধী উল্লেখ করে দ্রুত সমাধানের দাবি জানানো হয়েছে।

‘বিরোধের প্রভাব পড়ুক না যাত্রীদের ওপর’

স্থানীয়দের ভাষ্য, হবিগঞ্জ বিরতিহীন ও এসএমএস সার্ভিসের মধ্যকার বিরোধ যাই হোক না কেন, তার প্রভাব যেন সাধারণ যাত্রীদের ওপর না পড়ে। একটি রুটে পরিবহন চলাচল করার পরও মাঝপথের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ শ্রীমঙ্গল থেকে যাত্রী ওঠানামার সুযোগ না থাকা স্বাভাবিক আন্তঃজেলা যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

Manual6 Ad Code

তাদের মতে, পরিবহন মালিক বা শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে কোনো বিরোধ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান করা। কিন্তু বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের চলাচল বন্ধ বা সীমিত রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

Manual3 Ad Code

স্মারকলিপিতে জেলা প্রশাসনকে জেলার অভিভাবক হিসেবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে হবিগঞ্জ বিরতিহীন ও এসএমএস সার্ভিসের মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ যাত্রীরা যাতে নির্বিঘ্নে, নিরাপদে ও স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করতে পারেন, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

স্মারকলিপিতে স্বাক্ষরকারী মো. তারেক ইকবাল চৌধুরী বলেন, সাধারণ মানুষের যাতায়াতের অধিকার ও ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনা করে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ জরুরি। পরিবহনসংশ্লিষ্টদের বিরোধের কারণে সাধারণ যাত্রীরা কেন দুর্ভোগ পোহাবেন—এ প্রশ্নের সমাধানও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে করতে হবে।

আঞ্চলিক যোগাযোগের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ

স্থানীয়দের মতে, শ্রীমঙ্গল শুধু মৌলভীবাজার জেলার একটি উপজেলা নয়; এটি বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও বাণিজ্যিক জনপদ। চা-বাগান, পর্যটনকেন্দ্র ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন এখানে মানুষের আগমন ঘটে। একই সঙ্গে শ্রীমঙ্গল ও হবিগঞ্জের মধ্যে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক মানুষের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।

এ কারণে শ্রীমঙ্গল থেকে হবিগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ ও মিরপুরের সঙ্গে সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা শুধু স্থানীয় মানুষের স্বার্থেই নয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের প্রত্যাশা, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করে বিরোধের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা হবে। একই সঙ্গে শ্রীমঙ্গল শহরে হবিগঞ্জ-সিলেট বিরতিহীন বাসের পূর্বের যাত্রাবিরতি পুনর্বহাল করে যাত্রী ওঠানামার সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।

স্থানীয়দের দাবি, পরিবহন খাতের ব্যবসায়িক স্বার্থের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকারকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বিরোধ যার সঙ্গেই থাকুক, তার খেসারত যেন শ্রীমঙ্গলসহ এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে দিতে না হয়—এটাই এখন তাদের মূল প্রত্যাশা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ