সিলেট ৫ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৮:০০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০২৬
নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগ, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক-ব্যবসায়ী ও পর্যটন খাত
নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ০৪ অক্টোবর ২০২৬ : দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকা মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার পিচেরমুখ–গ্র্যান্ড সুলতান–রাধানগর–মোহাজিরাবাদ সড়কের নির্মাণকাজ অবিলম্বে পুনরায় শুরু ও দ্রুত শেষ করার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একই সঙ্গে সড়কের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ অংশ জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার এবং নির্মাণকাজের মান ও অগ্রগতি যথাযথভাবে তদারকির দাবি জানিয়েছেন তারা।
রোববার (৪ অক্টোবর ২০২৬) দুপুরে শ্রীমঙ্গলের পিচেরমুখ এলাকায় গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গল্ফের সম্মুখে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
মানববন্ধন শেষে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কার্যালয়ে পাঁচ দফা দাবি সংবলিত একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়। তবে স্মারকলিপি দেওয়ার সময় ইউএনও কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না। পরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে স্মারকলিপিটি পৌঁছে দেওয়া হয়।
দ্বারিকাপাল মহিলা ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক অনিরুদ্ধ সেনগুপ্তের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে সঞ্চালনা করেন আহসানুল্লাহ সুমন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, পিচেরমুখ থেকে গ্র্যান্ড সুলতান, রাধানগর – মোহাজিরাবাদ পর্যন্ত সড়কটি শ্রীমঙ্গলের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা ও খানাখন্দে পরিণত হয়ে আছে। বর্ষা ও বৃষ্টির পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। কোথাও বড় বড় গর্ত, কোথাও কাদা ও পানি জমে থাকায় যানবাহন চলাচল যেমন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, তেমনি পথচারীদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু হলেও কিছু অংশের কাজ করার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ হয়নি। গত ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও সড়কের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ না করেই সড়কের বিভিন্ন অংশে সোলিং ও প্লাস্টারের কাজ করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন সড়কের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বৃষ্টির পানি ও কাদায় সড়কের বিভিন্ন অংশ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, রোগী, কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
রোগী ও শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ
স্থানীয়দের ভাষ্য, সড়কটির বর্তমান অবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন জরুরি রোগী, শিক্ষার্থী ও বয়স্ক মানুষ। কোনো রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হলে দ্রুত শ্রীমঙ্গল শহর কিংবা হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। খানাখন্দ ও কাদাযুক্ত সড়কে যানবাহনের গতি কমে যাওয়ায় জরুরি রোগী পরিবহনে অতিরিক্ত সময় লাগছে।
শিক্ষার্থীদেরও প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়, কলেজ ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। বর্ষাকালে সড়কের গর্তে পানি জমে থাকায় কোথায় গর্ত আর কোথায় সমতল—তা বোঝাও কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানান স্থানীয়রা।
কৃষিপণ্য পরিবহনেও বড় ক্ষতি
এলাকাবাসীর দাবি, পিচেরমুখ–মোহাজিরাবাদ সড়কটি শুধু স্থানীয় মানুষের চলাচলের পথ নয়; এটি শ্রীমঙ্গলের কৃষি ও পর্যটন অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক।
গ্র্যান্ড সুলতান–পিচেরমুখ–মোহাজিরাবাদ এলাকায় রয়েছে অসংখ্য চা-বাগান, ফলের বাগান ও পর্যটনকেন্দ্র। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত লেবু, আনারস, কাঁঠাল, কলা, চা পাতাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য এ সড়ক দিয়ে শ্রীমঙ্গলসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে পরিবহন করা হয়।
সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারছে না বলে অভিযোগ করেছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘ সময় যানজটে বা সড়কে আটকে থাকায় পচনশীল পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
স্থানীয়রা বলেন, কৃষিপণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ দুটিই বেড়েছে। বিশেষ করে লেবু, আনারস ও অন্যান্য পচনশীল ফল দ্রুত বাজারজাত করা প্রয়োজন হলেও সড়কের দুরবস্থার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
পর্যটনশিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব
শ্রীমঙ্গল দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। গ্র্যান্ড সুলতানসহ আশপাশের বিভিন্ন রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্রে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। ফলে এ সড়কের গুরুত্ব স্থানীয় যোগাযোগের সীমা ছাড়িয়ে পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকদের মতে, সড়কের বেহাল দশা পর্যটকদের স্বাভাবিক চলাচলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একটি পর্যটননির্ভর এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ সড়কের এমন অবস্থা স্থানীয় পর্যটন ব্যবসার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তারা বলেন, পর্যটনকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না থাকলে পর্যটকদের ভোগান্তি বাড়ে এবং একটি এলাকার পর্যটন সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সড়কটির নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা শুধু স্থানীয় মানুষের দাবি নয়, শ্রীমঙ্গলের পর্যটন ও কৃষি অর্থনীতির স্বার্থেও জরুরি।
পাঁচ দফা দাবি
মানববন্ধন শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে দেওয়া স্মারকলিপিতে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—গ্র্যান্ড সুলতান–রাধানগর–মোহাজিরাবাদ সড়কের নির্মাণকাজ অবিলম্বে পুনরায় শুরু করা; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ মানসম্মত ও টেকসইভাবে সম্পন্ন করা; নির্মাণকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সড়কের গর্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশ জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করে জনসাধারণের চলাচলের উপযোগী রাখা; নির্মাণকাজের মান ও অগ্রগতি যথাযথভাবে তদারক করা এবং কাজ পুনরায় শুরু ও শেষ করার বিষয়ে এলাকাবাসীকে নির্দিষ্ট সময়সূচি জানিয়ে তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
স্মারকলিপি প্রদানকালে স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও এলাকাবাসীর পক্ষে মো. জামাল খান, তাজুল ইসলাম, আয়নাল হাসান, নাজির মিয়া, নূরুল আলম সোহাগ, মো. আলাউদ্দিন, মো. মামুনুর রশীদ, মো. সালাহউদ্দিনসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
দ্রুত কাজ শুরুর দাবি
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিশ্রুতি ও অপেক্ষার পর সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হলেও তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। দ্রুত কাজ শুরু না হলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
তারা বলেন, সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধু ওপরের অংশ সংস্কার করলেই হবে না; পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বৃষ্টির সময় পানি জমে নতুন করে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
বক্তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দ্রুত সড়ক সংস্কার ও নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু না হলে এলাকাবাসী আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন।
এদিকে সড়কটির নির্মাণকাজ বন্ধ থাকার কারণ এবং কাজ পুনরায় শুরু ও শেষ করার বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি