বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ

প্রকাশিত: ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৫, ২০২৬

বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ

Manual4 Ad Code
  • শিক্ষকতাকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলা জরুরি

বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা, ০৫ অক্টোবর ২০২৬ : আজ ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষা ও সমাজ বিনির্মাণে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি, তাদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষকতা পেশার উন্নয়নে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর এ দিবসটি পালিত হয়। ১৯৯৪ সাল থেকে ইউনেস্কোর উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে বিশ্বের ১৬৭টি দেশে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।

শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না; একটি প্রজন্মের জ্ঞান, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক চেতনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান, সামাজিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সক্ষমতার সঙ্গে শিক্ষকতার মান ও মর্যাদা সরাসরি সম্পর্কিত। এ কারণে শিক্ষকতা পেশাকে আরও আকর্ষণীয়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও পেশাগতভাবে স্বাধীন করে তোলার দাবি দীর্ঘদিনের।

এবারের প্রতিপাদ্য

Manual3 Ad Code

এ বছর বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য— “Standing with Teachers: Sixty Years of Protecting the Profession, Advancing its Status, Shaping Our Futures”। বাংলায় যার ভাবার্থ— “শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াই: পেশা সুরক্ষার ৬০ বছর, মর্যাদা উন্নত করা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।”

Manual6 Ad Code

প্রতিপাদ্যটির মধ্য দিয়ে শিক্ষকতা পেশার সুরক্ষা, পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণে শিক্ষকদের ভূমিকার প্রতি নতুন করে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের পেশাগত অধিকার, কর্মপরিবেশ, প্রশিক্ষণ, চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং শিক্ষা নীতি প্রণয়নে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

গত বছরের প্রতিপাদ্য ছিল “Recasting teaching as a collaborative profession”, অর্থাৎ “শিক্ষকতাকে একটি সহযোগী পেশা হিসেবে পুনর্গঠন”। বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার, শিক্ষাক্রম পরিবর্তন এবং শ্রেণিকক্ষে সহযোগিতামূলক ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষণ পদ্ধতি বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে গত বছরের এই আহ্বানও ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ছয় দশকের ঐতিহাসিক অঙ্গীকার

বিশ্ব শিক্ষক দিবসের সঙ্গে ১৯৬৬ সালের একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ গভীরভাবে যুক্ত। ওই বছর প্যারিসে অনুষ্ঠিত শিক্ষকদের মর্যাদা সংক্রান্ত আন্তঃসরকার সম্মেলনে ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা—আইএলও—যৌথভাবে শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব ও মর্যাদা বিষয়ে একটি যুগান্তকারী সুপারিশমালা প্রণয়ন করে।

এই সুপারিশমালায় শিক্ষকতার মর্যাদা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, নিয়োগ ও পদোন্নতি, চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্য কর্মপরিবেশ, পেশাগত স্বাধীনতা এবং শিক্ষা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে শিক্ষকদের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় ওই সুপারিশমালা আজও আন্তর্জাতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ সম্মেলনে ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তৎকালীন ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ড. ফ্রেডারিক এম. মেয়রের ঘোষণার মধ্য দিয়ে ওই বছর প্রথমবারের মতো বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন ও অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইএলও-ইউনেস্কোর যৌথ বিশেষজ্ঞ কমিটির সভায় নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষকতার মানোন্নয়ন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষানীতি প্রণয়নে শিক্ষকদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা।

Manual7 Ad Code

বাংলাদেশে নানা কর্মসূচি

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশেও সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের সম্মাননা প্রদান, আলোচনা সভা, র‌্যালি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিক্ষার্থী-শিক্ষক মতবিনিময়সহ বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু আনুষ্ঠানিকতা বা একদিনের শুভেচ্ছা জানানোর মধ্যে শিক্ষক দিবসের তাৎপর্য সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং শিক্ষকদের বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের জন্য নিয়মিত ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ, আধুনিক শিক্ষা উপকরণের সহজলভ্যতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ, পর্যাপ্ত জনবল, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

শিক্ষা সংস্কারে শিক্ষকের অংশগ্রহণ জরুরি

বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় একের পর এক পরিবর্তন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শিক্ষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এসব উদ্যোগের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন বলে মনে করেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

একজন শিক্ষকই শিক্ষাক্রমের বাস্তব প্রয়োগকারী। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, শ্রেণিকক্ষে তার বাস্তব রূপ দেন শিক্ষক। ফলে শিক্ষা নীতি, শিক্ষাক্রম প্রণয়ন, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষা সংস্কারের পরিকল্পনায় মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে নতুন শিক্ষাক্রম বা নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় সময় ও উপকরণ এবং পেশাগত সহায়তা না দিলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।

সহযোগিতামূলক শিক্ষণ পদ্ধতিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক এককভাবে জ্ঞান বিতরণের পরিবর্তে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সহকর্মী ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও সামাজিক মূল্যবোধ বিকাশের সুযোগ বাড়ে।

শিক্ষকতার মর্যাদা বাড়ানো কেন জরুরি

একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর, আর শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্রে রয়েছেন শিক্ষকরা। প্রকৌশলী, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, প্রশাসক, অর্থনীতিবিদ কিংবা রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্ব—প্রত্যেকের পেশাগত বিকাশের পেছনে কোনো না কোনো শিক্ষকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অবদান থাকে।

অথচ অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকতা পেশা সামাজিক মর্যাদা, কর্মপরিবেশ, পেশাগত স্বাধীনতা কিংবা আর্থিক নিরাপত্তার দিক থেকে প্রত্যাশিত অবস্থানে নেই—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। শিক্ষকতার প্রতি মেধাবী তরুণদের আকৃষ্ট করতে হলে পেশাটিকে প্রতিযোগিতামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বেতন-ভাতা বাড়ালেই শিক্ষকতার মর্যাদা নিশ্চিত হবে না। একই সঙ্গে প্রয়োজন পেশাগত স্বাধীনতা, গবেষণার সুযোগ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ।

‘শিক্ষক সমাজ জাতির মেরুদণ্ড’

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথা-এর বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “শিক্ষক সমাজ একটি জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু তাদের সহযোগিতা, মর্যাদা ও নীতি-নির্ধারণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।”

তিনি বলেন, “এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য শিক্ষকতা পেশার সুরক্ষা ও মর্যাদার বিষয়টিকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। শিক্ষক সমাজকে আরও ঐক্যবদ্ধ, সৃজনশীল, মর্যাদাপূর্ণ ও প্রভাবশালী করে তুলতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অভিভাবক—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”

তার মতে, শিক্ষা সংস্কারের প্রতিটি পর্যায়ে শিক্ষকদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষকদের শুধু নির্দেশনা বাস্তবায়নকারী হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং শিক্ষা নীতি ও শিক্ষাক্রম উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে তাদের ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা

বিশ্ব শিক্ষক দিবসকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে নানা আয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে তাদের প্রিয় শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। কেউ পুরোনো ছবি ও স্মৃতিচারণ করছেন, কেউ বা শিক্ষাজীবনে কোনো শিক্ষকের বিশেষ অবদানের কথা তুলে ধরছেন।

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ কলেজের পদার্থবিজ্ঞান (সম্মান) প্রথম বর্ষের পরীক্ষার্থীনী সৈয়দা হাজেরা সুলতানা গত বছর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লিখেছিলেন—

“I’m truly blessed with my teacher’s prayers, love and wisdom. Thank you for inspiring me, believing in me when I doubted myself.

With all my love, respect, and gratitude to those beautiful souls who turned knowledge into inspiration and lessons into life.

Happy Teacher’s Day!”

তার এই বক্তব্যে ফুটে উঠেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের আবেগ ও গভীরতা। একজন ভালো শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না; অনেক সময় তিনি শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেন, স্বপ্ন দেখান এবং জীবনের কঠিন সময়ে পথ দেখান।

বৈশ্বিক শিক্ষকসমাজের সংহতি

বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল এবং এর সহযোগী সদস্য সংগঠনগুলো। সংগঠনটির সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শত শত শিক্ষক সংগঠন যুক্ত রয়েছে। শিক্ষকতার অধিকার, পেশাগত মর্যাদা, ন্যায্য কর্মপরিবেশ ও শিক্ষার মানোন্নয়নে বৈশ্বিক পর্যায়ে শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করছে এসব সংগঠন।

বিশ্বজুড়ে শিক্ষক সংকট, শিক্ষকদের কর্মপরিবেশ, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব, মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ এবং শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা—এসব বিষয় এখন আন্তর্জাতিক শিক্ষা আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শিক্ষক সংকটও বড় চ্যালেঞ্জ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যোগ্য শিক্ষক সংকট বর্তমানে শিক্ষার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও অনেক দেশে সেই অনুপাতে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে না। ফলে বিদ্যমান শিক্ষকদের ওপর বাড়ছে অতিরিক্ত কর্মভার।

বাংলাদেশেও বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, প্রশাসনিক দায়িত্বের চাপ এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব নিয়ে নানা সময়ে আলোচনা হয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান না হলে শুধু নতুন শিক্ষাক্রম বা আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি চালু করলেই শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ উন্নয়ন, শিক্ষা উপকরণের প্রাপ্যতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিক্ষকের ভূমিকা

ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ শিক্ষার প্রচলিত ধারণাকেও বদলে দিচ্ছে। শিক্ষার্থীরা এখন খুব সহজেই ইন্টারনেট ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারছে। ফলে শিক্ষককে শুধু তথ্য সরবরাহকারী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বর্তমান যুগে শিক্ষকের ভূমিকা আরও বিস্তৃত। একজন শিক্ষককে শিক্ষার্থীর সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

প্রযুক্তি শিক্ষকের বিকল্প নয়; বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে প্রযুক্তি শিক্ষকের কাজকে আরও কার্যকর করতে পারে। এ জন্য শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।

শুধু ফুল-শুভেচ্ছা নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে শিক্ষককে ফুল দেওয়া, শুভেচ্ছা জানানো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা উচিত নয়। শিক্ষকতার প্রকৃত মর্যাদা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ।

শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা, মানসম্মত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং নীতি প্রণয়নে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সমাজের সম্মানজনক আচরণও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর

একজন শিক্ষক একটি শ্রেণিকক্ষে কয়েক ডজন শিক্ষার্থীকে পড়ান। কিন্তু তার প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকে না ওই শ্রেণিকক্ষে। একজন শিক্ষার্থীর চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ পেশাজীবনের ওপর একজন শিক্ষকের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সেই শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখে। এভাবেই একজন শিক্ষক প্রজন্মের পর প্রজন্ম সমাজকে প্রভাবিত করেন।

তাই শিক্ষকতার প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষককে শুধু কর্মচারী হিসেবে নয়, জাতি নির্মাণের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কেবল একটি দিবস নয়, প্রতিদিনই শিক্ষকের মর্যাদা

বিশ্ব শিক্ষক দিবস মূলত কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপলক্ষ হলেও এর তাৎপর্য এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। দিবসটি শিক্ষকতার ভবিষ্যৎ, শিক্ষকদের অধিকার এবং একটি মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সম্মিলিত অঙ্গীকারের দিন।

শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু তাদের প্রশংসা করা নয়; বরং তাদের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা, পেশাগত স্বাধীনতা দেওয়া, মতামতের মূল্য দেওয়া এবং তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা নিশ্চিত করা।

এবারের প্রতিপাদ্যের মূল বার্তাও তাই—শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে, শিক্ষকতা পেশাকে সুরক্ষিত করতে হবে, এর মর্যাদা বাড়াতে হবে এবং শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়েই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে।

Manual3 Ad Code

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, মানবিক ও আধুনিক করতে হলে শিক্ষক সমাজকে কেন্দ্রীয় অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া বিকল্প নেই। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হচ্ছে শিক্ষা, আর সেই বিনিয়োগের প্রধান কারিগর হলেন শিক্ষক।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই শুধু শুভেচ্ছা নয়—শিক্ষকতার মর্যাদা, অধিকার ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কার্যকর অঙ্গীকারই হোক সময়ের দাবি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ