সিলেট ৮ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৭, ২০২৬
তরুণ শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিতে গণতন্ত্র ও সংগঠনের শক্তি জরুরি
বিশেষ প্রতিবেদন | ঢাকা, ০৭ অক্টোবর ২০২৬ : আজ ৭ অক্টোবর বিশ্ব শোভন কর্ম দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘ভবিষ্যতের জন্য তরুণ কর্মীদের সংগঠিত করা’ (Young workers organising for the future)।
তরুণ শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা, জীবনযাত্রার উপযোগী মজুরি, নিরাপদ ও স্থায়ী কর্মসংস্থান এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের কণ্ঠস্বর ও নেতৃত্ব জোরদারের ওপর এবারের দিবসে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন (আইটিইউসি) বলছে, গত এক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণরা পরিবর্তনের দাবিতে রাজপথে নেমেছে। দেশভেদে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন হলেও তাদের অনেকের দাবিতে মিল রয়েছে—উচ্চ যুব বেকারত্ব, কম মজুরি, অনিরাপদ ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। এসব বাস্তবতায় তরুণরা নিজেদের জীবন ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা চাইছে।
আইটিইউসির মতে, কর্মক্ষেত্রে তরুণদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সম্মিলিতভাবে নিজেদের দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ, নেতৃত্ব দেওয়ার পরিবেশ এবং নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার অধিকার নিশ্চিত করা শুধু শোভন কাজের জন্য নয়, গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যও জরুরি।
আইটিইউসি মহাসচিব লুক ট্রায়াঙ্গল বলেন, “তরুণ শ্রমিকরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে যে প্রচলিত ব্যবস্থা তাদের প্রাপ্য ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারছে না। অনিরাপদ চাকরি, কম মজুরি এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নতুন প্রজন্মের শ্রমিকদের জন্য স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন, তরুণ শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার মাধ্যমে এসব পরিস্থিতি পরিবর্তনের সম্মিলিত শক্তি তৈরি হয়। ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে তরুণদের সংগঠিত হওয়া, নেতৃত্ব দেওয়া এবং নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার জন্য আরও বেশি জায়গা তৈরি করতে হবে। তাদের শোভন কাজের লড়াই একই সঙ্গে একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের লড়াই।
শোভন কাজের বৈশ্বিক অঙ্গীকার
শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং কর্মক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে প্রতিবছর ৭ অক্টোবর বিশ্ব শোভন কর্ম দিবস পালিত হয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ১৯৯৯ সালে ‘ডিসেন্ট ওয়ার্ক’ বা শোভন কাজের ধারণাকে বৈশ্বিক শ্রম এজেন্ডার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সামনে আনে। পরবর্তী সময়ে এটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৮ নম্বর লক্ষ্যেরও অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে—‘শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি’।
শোভন কাজ বলতে শুধু একটি চাকরি বোঝায় না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কাজের সুযোগ, উৎপাদনশীল ও ন্যায্য কর্মসংস্থান, কর্মক্ষেত্রে সমতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা, সামাজিক সুরক্ষা, শ্রমিকের অধিকার এবং শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে কার্যকর সামাজিক সংলাপ।
আইএলওর শোভন কাজের কর্মসূচির চারটি প্রধান স্তম্ভ হলো—কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, সামাজিক সংলাপ এবং শ্রম অধিকার। সংগঠন করার স্বাধীনতা, যৌথ দর-কষাকষির অধিকার, শিশুশ্রম ও জোরপূর্বক শ্রম নির্মূল এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের বড় অংশই শ্রমনির্ভর। তৈরি পোশাক, নির্মাণ, পরিবহন, কৃষি, গৃহকর্ম, ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে শুরু করে ক্রমবর্ধমান গিগ ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করছেন। তবে কর্মসংস্থানের বড় অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে হওয়ায় শ্রমিকদের একটি বড় অংশ আইনগত সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক শ্রম অধিকার থেকে বঞ্চিত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের শ্রমশক্তি প্রায় ৭ কোটি ৫৬ লাখ। এর বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণও আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে নারীদের কর্মক্ষেত্রে মজুরি বৈষম্য, নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, যৌন হয়রানি এবং নেতৃত্বে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এখনো নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম শ্রমমান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে শ্রম আইন সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বিভিন্ন কনভেনশন অনুসমর্থনের উদ্যোগ বাংলাদেশের শ্রম অধিকার পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধে আইএলও কনভেনশন ১৯০ বাস্তবায়নও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রযুক্তির পরিবর্তনে নতুন চ্যালেঞ্জ
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, স্বয়ংক্রিয়তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ কর্মক্ষেত্রের ধরন বদলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের কাজ—আইটি, ই-কমার্স, প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজ, ফ্রিল্যান্সিং ও গিগ ইকোনমি। ফলে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হলেও চাকরির স্থায়িত্ব, মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার নিয়ে নতুন প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।
আইএলও ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) যৌথ গবেষণায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কাজের ধরন বদলে যাওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে। ফলে তরুণ শ্রমিকদের জন্য নতুন দক্ষতা অর্জন, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
গণতন্ত্র ও শোভন কাজের যোগসূত্র
গত বছরের বিশ্ব শোভন কর্ম দিবসের প্রতিপাদ্যে গণতন্ত্র ও শোভন কাজের সম্পর্ককে বিশেষভাবে সামনে আনা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের তরুণ শ্রমিকদের সংগঠিত করার আহ্বানও শ্রমিকদের অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
শ্রমিকের কথা বলার অধিকার, সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং যৌথ দর-কষাকষির সুযোগ না থাকলে কর্মক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কঠিন। রাষ্ট্র, মালিক ও শ্রমিক—এই তিন পক্ষের মধ্যে অর্থবহ সামাজিক সংলাপ থাকলেই শ্রমনীতি আরও কার্যকর ও বাস্তবসম্মত হতে পারে।
তরুণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কর্মজীবনের শুরুতেই তারা যদি অনিরাপদ, কম মজুরি ও অধিকারহীন কর্মসংস্থানের মধ্যে প্রবেশ করে, তাহলে তা শুধু তাদের ব্যক্তিগত জীবন নয়, ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও সমাজের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
সামনে যে কাজগুলো জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের জন্য শোভন কাজ নিশ্চিত করতে শুধু নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেই হবে না; সেই কাজ হতে হবে নিরাপদ, ন্যায্য মজুরিভিত্তিক এবং শ্রম অধিকারসম্মত। একই সঙ্গে তরুণদের ইউনিয়ন ও শ্রমিক সংগঠনে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো, কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্বে আনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, নারী শ্রমিকের নিরাপত্তা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।
শোভন কাজের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুধু শ্রমিকের প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক সমাজের প্রশ্ন। তরুণ শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে তারা শুধু নিজেদের কর্মপরিবেশই বদলাবে না, দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
এ কারণেই এবারের বিশ্ব শোভন কর্ম দিবসের বার্তা—‘ভবিষ্যতের জন্য তরুণ কর্মীদের সংগঠিত করা’—বাংলাদেশের জন্যও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তরুণদের জন্য শোভন কাজ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই শ্রমবাজার গড়ে তোলার পথ তৈরি হতে পারে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি