বাংলাদেশের চা শিল্প পুনর্গঠন: চা শ্রমিকের ওপর এর প্রভাব নিয়ে পরামর্শসভা

প্রকাশিত: ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৮, ২০২৬

বাংলাদেশের চা শিল্প পুনর্গঠন: চা শ্রমিকের ওপর এর প্রভাব নিয়ে পরামর্শসভা

Manual7 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৮ অক্টোবর ২০২৬ : “আজকের আলোচনা কেবল শ্রমিকের স্বার্থের জন্য নয়, বরং পুরো চা খাতের সার্বিক বিকাশের জন্য। খাতটির উন্নয়নের একটি অংশ যেমন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, তেমনি আরেকটি অংশ হলো শ্রমিকের অবস্থার উন্নতি—এটা ভুলে গেলে চলবে না।“

রাজধানীর প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত চা শিল্পের পুনর্গঠন ও চা শ্রমিকদের উপর এর সম্ভাব্য প্রভাব বিষয়ক পরামর্শ সভায় বুধবার (৭ অক্টোবর ২০২৬) এ মন্তব্য করেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)’র নির্বাহী পরিচালক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

সভার আয়োজক সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড), পিপিআরসি ও ব্রাত্যজন রিসোর্স সেন্টার (বিআরসি)।

পরামর্শ সভায় ‘বাংলাদেশের চা শিল্প পুনর্গঠন: চা শ্রমিকের ওপর এর প্রভাব’ শীর্ষক আলোচনাপত্র বা অবস্থানপত্র উপস্থাপন করেন সেড-এর পরিচালক ফিলিপ গাইন।

পরামর্শ সভার পটভূমি ও আলোচনাপত্র উপস্থাপন করার সময় তিনি বলেন, ‘সরকার চা শিল্প পুনর্গঠনে যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে তার মধ্যে চা শ্রমিক বা তাদের প্রতিনিধিত্বকারী ট্রেড ইউনিয়ন-এর কোনো প্রতিনিধিত্ব বা অংশগ্রহণ নেই। বাণিজ্যিক মন্ত্রণালয়ের যে টাস্কফোর্স এবং পরবর্তীতে যে মনিটরিং ও এডভাইজরি কমিটি গঠন করেছে তার মধ্যে সরকারের বাইরে কেবল চা বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদের প্রতিনিধি আছে।’

ফিলিপ গাইন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালে এসেও চা খাতকে ‘কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক খাত’ বা ‘কৃষি-শিল্প খাত’ হিসাবে চিহ্নিত করলেও চা বাগান মালিকদের প্রভাবে চা-কে শতভাগ কৃষিপণ্য হিসাবে স্বীকৃতি দেবার উদ্যোগ চা শ্রমিকদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

তিনি অ্যারো বলেন, ‘সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬০টি চা বাগানের মধ্যে ৭০-এর অধিক চা বাগান দুর্বল ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিতার সমস্যা, দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম, কারখানা চালানোর অদক্ষতা ইত্যাদি কারণে লোকসানে চলে ও মাঝেমধ্যে বন্ধ থাকে। এজন্য অনেক সময় শ্রমিকের বেতন পরিশোধে অনিয়ম দেখা যায়।’

Manual8 Ad Code

শ্রম আইনে চা শ্রমিকদের প্রতি বৈষম্য ও চা বাগানে শ্রম আইনের গুরুত্বপূর্ণ ধারার লঙ্ঘন পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সামনে আসতে হবে বলে তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, ‘চা খাত পুনর্গঠনের সময় এসব বিষয় ঠিক কীভাবে এবং কী মাত্রায় মূল্যায়ন হচ্ছে তা কিন্তু চা শ্রমিকদের একমাত্র ইউনিয়ন এবং অন্য বেসরকারি অংশীজন ও গবেষক মহলের অজানা। যে শ্রমিকের শ্রম-ঘামে চা শিল্প বিকশিত হয়েছে তার পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় চা শ্রমিকের সমস্যা, তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং চা শিল্পের পুনর্গঠন তাদের উপর কী প্রভাব ফেলবে সেসব বিষয় আলোচানায় আসতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধান এবং শ্রম আইন উৎপাদনশীলতা, উৎপাদন খরচ, অপচয়, গুণগতমান, কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিকের কল্যাণ বিষয়ে শ্রমিকের সরাসরি অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ, মতবিনিময় এবং সুপারিশ করার আইনগত ভিত্তি চা শ্রমিকদের দিয়েছে।’

Manual3 Ad Code

কাজেই পরামর্শ সভায় চা-কে কৃষি হিসেবে বিবেচনা করার যৌক্তিকতা এবং সত্যিকারের পুনর্গঠন কীভাবে চা শিল্পকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই-এর পাশাপাশি শ্রমিকবান্ধব করবে তার উপর সবাইকে পরামর্শ দেবার আহবান জানান ফিলিপ গাইন।

সভায় বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন (বিসিএসইউ)-এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পঙ্কজ এ. কন্দ চা শিল্পকে কৃষিতে রূপান্তরের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে তাদের আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, চা কে শিল্প খাত থেকে কৃষি খাতে রূপান্তরের ফলে চা শ্রমিকের আইনি মর্যাদা এবং শিল্প শ্রমিক হিসেবে বিদ্যমান অধিকার রোহিত হতে পারে। মজুরি ও পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে শিল্প খাতের নির্ধারিত কাঠামোতে পরিবর্তন আসবে; কর্মঘন্টা ও ওভারটাইম যা শিল্প শ্রমিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, কৃষি খাতে এ ধরণের সুবিধা নাও থাকতে পারে। এছাড়া, সামাজিক নিরাপত্তা, পেনশন, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, চিকিৎসা, চাকরির স্থায়ীত্ব কেমন হবে বিষয়টি এখনো পরিস্কার নয়। স্থায়ী শ্রমিক ও অস্থায়ী কৃষি শ্রমিকের মধ্যে আইনি প্রাতিষ্ঠানিক পার্থক্য তৈরি হতে পারে; শ্রমিকের দরকষাকষির ক্ষমতা, শিল্প ভিত্তিক ইউনিয়ন কার্যক্রম কমে যেতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা করছেন।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন (বিসিএসইউ)-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন “যে সিদ্ধান্তের প্রভাব সরাসরি আমাদের উপর পড়বে সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের সম্পৃক্ত করতে হবে, অন্যথায় আমরা সেই সিদ্ধান্ত মানবো না।“

সেড-এর চেয়ারপারসন এবং নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, চা শিল্পকে অন্য শিল্পের মতো চিন্তা করার সুযোগ নেই। কারণ চা শ্রমিকরা চা বাগানের ভিতরেই থাকেন। এই শিল্প নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে চা শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। “চা বাগান নিয়ে আলোচনায় উৎপাদন একমাত্র বিষয় নয়। চা বাগানে যেসব পরিবার বাস করে তাদের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, সুযোগ সুবিধা, খুব ভালোভাবে চিন্তা করতে হবে,” বলেন খুশি কবির।

টাস্কফোর্স কমিটিকে “বনিকতান্ত্রিক” কমিটি হিসেবে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজিমউদ্দিন খান প্রশ্ন করেন, “কমিটির বেশির ভাগ সদস্য কোন বিবেচনায় নির্বাচিত হলো? বিষয়টা খতিয়ে দেখা উচিত।“

তিনি আরো প্রশ্ন তুলেন, কেনো বাকি ৪৯টি সুপারিশ প্রকাশ করা হলো না। “ইস্পাহানির জেরিন চা বাগানের মতো ভালো ব্যবস্থাপনার কিছু শিক্ষণীয় বিষয় সুপারিশের আওতায় আনা উচিত ছিল,“ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

Manual1 Ad Code

“টাস্কফোর্সে শ্রমিক প্রতিনিধি বা শ্রম মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিনিধি নেই,” টাস্কফোর্সের গঠন নিয়ে এমন মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ।

তিনি আরো বলেন, “চা শ্রমিকের মতো ভূমিহীন জনগোষ্ঠীর বেলায় জমির মালিকানার মতো মৌলিক বিষয় উপেক্ষা করে চা শিল্পের যে পুনর্গঠণ, তা মানা যায় না।“

Manual2 Ad Code

চা শ্রমিক খায়রুন আকতার বলেন, আগের সরকারের আমলে কেবল মালিকপক্ষের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সরকার চা শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারন করে। এখনকার সরকারও কেবল মালিকপক্ষের সাথে কথা বলে চা খাত নিয়ে এতো বড় সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “আমি নিজেকে চা শ্রমিক বলতে গর্ব বোধ করি। আমি কখনোই নিজেকে কৃষি শ্রমিক বলতে রাজি নই।“

চা শ্রমিকদের আরেক প্রতিনিধি পরেশ কালিন্দি বলেন, “চা শিল্পকে কৃষি শিল্পে রূপান্তর করা হলে আমরা কিছুটা দ্বিধায় পড়ে যাবো। আমরা চাই এই শিল্প টেকসই হোক, কারণ এই শিল্প টেকসই না হলে আমরা কোথায় যাবো? কিন্তু কৃষি খাত করার দরকার কি?

কৃষি খাতে রূপান্তরের ব্যাপারে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, “ঋণ সুবিধা পেতে পুরো খাতকে কৃষিতে রূপান্তর—এটা খুবই সংকীর্ণ যুক্তি। যেখানে সরকার নিজেই কৃষিভিত্তিক শিল্পের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রিকে আরো সামনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, এমন অবস্থায় চা শিল্পকে কৃষি খাতে রূপান্তর সরকারের জন্য নিজ নীতি-বিরোধী একটি পদক্ষেপ হবে।“

টাস্কফোর্সের শ্রমিক বিষয়ক সুপারিশের ব্যাপারে ড. রহমান বলেন, “দশটি সুপারিশের মাঝে একমাত্র শ্রমিকের ব্যাপারে যে সুপারিশ, তা দেখা যাচ্ছে সরকারি দায়িত্বে ফেলা হয়েছে। এভাবে রাজস্বের ওপর চাপ (Fiscal Burden) বাড়ানোটা সরকারের জন্য যৌক্তিক হবে বলে মনে করি না।“

সরকারের সৃজনশীল অর্থনীতি (Creative Economy) পরিকল্পনায় চা জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জোর দেন ড. রহমান। পাশাপাশি কৃষি-ভিত্তিক এ শিল্পখাতে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি এবং চা ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণে সরকারের মনোযোগ বাড়াতে পরামর্শ দেন তিনি।

সবশেষে তিনি মন্তব্য করেন, “চা শিল্পের পুনর্গঠনের আগে অ্যাডভাইজরি ও মনিটরিং কমিটির পুনর্গঠন হওয়া প্রয়োজন; অন্তত ২ জন শ্রমিক প্রতিনিধিকে এ কমিটির সদস্য করা দরকার।“

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ এম. হাসেমী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদুল ওয়াজেদ, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন (বিসিএসইউ) ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল, চট্টগ্রাম জেলার বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি তপন দত্ত, ও বাংলাদেশের কম্যুনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল কাফি রতন। এছাড়া চা বাগানের ২০ জন প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে অংশ নেন।