বরেণ্য ছড়াকার ও সাংবাদিক রফিকুল হক দাদুভাই: শিশুপ্রাণ এক যুগপুরুষ

প্রকাশিত: ১১:২৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০২৬

বরেণ্য ছড়াকার ও সাংবাদিক রফিকুল হক দাদুভাই: শিশুপ্রাণ এক যুগপুরুষ

Manual3 Ad Code
  • শিশুসাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অনন্য অবদান রাখা এক বিরলপ্রজ মানুষ, যাঁর জীবন ও কর্মে মিশে আছে শিশুর নির্মল হাসি, সৃজনশীলতার দীপ্তি এবং প্রজন্ম গড়ে তোলার নিরন্তর সাধনা

বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা, ১০ অক্টোবর ২০২৬ : বাংলা শিশুসাহিত্য, ছড়া, সাংবাদিকতা ও শিশু-কিশোর সংগঠনের ইতিহাসে রফিকুল হক দাদুভাই একটি শ্রদ্ধেয় ও স্মরণীয় নাম। তিনি কেবল একজন ছড়াকার ছিলেন না; ছিলেন শিশুদের আপনজন, নবীন লেখকদের আশ্রয়, সাংবাদিকতার নিবেদিতপ্রাণ কর্মী এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক নিরলস সংগঠক। তাঁর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল শিশুর প্রতি গভীর ভালোবাসা, তার কল্পনাশক্তির প্রতি আস্থা এবং নতুন প্রজন্মকে সৃজনশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার আন্তরিক প্রয়াস। সেই কারণেই ‘দাদুভাই’ নামটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত পরিচিতি হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের কাছে স্নেহ, সাহস, প্রেরণা ও সৃষ্টিশীলতার এক আপন ঠিকানা।

২০২১ সালের ১০ অক্টোবর রাজধানীর মুগদায় নিজ বাসভবনে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই বরেণ্য ছড়াকার ও সাংবাদিক। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। ২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর তাঁর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। পাঁচ বছর আগে তাঁর শারীরিক অনুপস্থিতি তৈরি করেছিল যে শূন্যতা, সময়ের ব্যবধানে তা আরও গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। কারণ, দাদুভাইয়ের মতো মানুষকে শুধু তাঁর প্রকাশিত বই, পত্রিকার পাতা কিংবা পুরস্কারের তালিকা দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। তাঁর প্রকৃত কৃতিত্ব ছড়িয়ে আছে অসংখ্য শিশুর আনন্দে, নবীন লেখকের প্রথম লেখায়, সাংবাদিকতার কর্মমুখর দিনগুলোতে এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গড়ে ওঠা মানুষের স্মৃতিতে।

Manual4 Ad Code

রংপুর জেলার কামালকাচনা গ্রামে ১৯৩৭ সালের ৮ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন রফিকুল হক। দীর্ঘ জীবনে তিনি ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক, কবি, নাট্যকার, সম্পাদক, সাংবাদিক ও শিশু সংগঠক হিসেবে বহুমাত্রিক পরিচয় নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর জীবনপ্রবাহের দিকে তাকালে বোঝা যায়, সাহিত্য ও সাংবাদিকতা তাঁর কাছে নিছক পেশা কিংবা আত্মপ্রকাশের মাধ্যম ছিল না; ছিল মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকার, সমাজকে বোঝার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণের এক নিরন্তর প্রচেষ্টা।

ছড়ার ছন্দে শিশুমনের কাছে পৌঁছানো

শিশুর জগৎ বড়দের জগতের অনুকরণমাত্র নয়। সেখানে রয়েছে নিজস্ব কল্পনা, বিস্ময়, আনন্দ, প্রশ্ন এবং প্রতিবাদের ভাষা। শিশুসাহিত্য রচনার জন্য তাই শুধু সহজ শব্দ ও ছন্দের ব্যবহার যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিশুমনের গভীর পরিচয়, তার অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীলতা এবং তার সঙ্গে সমমর্যাদার সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতা। রফিকুল হক দাদুভাইয়ের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যের অন্যতম দিক ছিল এই সহজাত উপলব্ধি।

ছড়া বাংলা সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় ও শক্তিশালী শাখা। ছড়ার ছন্দ শিশুকে আনন্দ দেয়, শব্দের সঙ্গে পরিচিত করে এবং ভাষার প্রতি আগ্রহী করে তোলে। একই সঙ্গে ছড়ার ভেতর দিয়ে সমাজের অসংগতি, মানুষের স্বপ্ন, জাতীয় চেতনা ও জীবনবোধের কথাও বলা সম্ভব। দাদুভাই এই সম্ভাবনাকে আপন করে নিয়েছিলেন। তাঁর লেখার সহজবোধ্যতা ছিল পাঠকের কাছে পৌঁছানোর শক্তি; আর সেই সরলতার অন্তরালে ছিল সমাজ, সময় ও মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা।

শিশুরা যাতে সাহিত্যের কাছে আনন্দের টানে আসে, সে বিষয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। তাঁর কাছে শিশুসাহিত্য ছিল না কেবল উপদেশ দেওয়ার মাধ্যম। বরং আনন্দ, কৌতূহল, কল্পনা ও মূল্যবোধের সমন্বয়ে শিশুর মানসিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। শিশুকে আনন্দ দিতে দিতে তাকে মানুষ, সমাজ ও দেশ সম্পর্কে ভাবতে শেখানোই ছিল এ ধারার অন্যতম তাৎপর্য।

দাদুভাইয়ের সাহিত্যচর্চার এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। তাঁর রচনায় শিশুর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার পরিবর্তে তার কাছাকাছি যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এই আন্তরিকতাই তাঁকে প্রচলিত অর্থে একজন লেখকের সীমা অতিক্রম করে শিশুদের আপনজনের মর্যাদা দিয়েছে।

‘দাদুভাই’ হয়ে ওঠার পেছনের ইতিহাস

একজন সাহিত্যিকের নাম যখন তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে পরিণত হয়, তখন তার পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, কাজ এবং মানুষের ভালোবাসা। রফিকুল হক থেকে ‘দাদুভাই’ হয়ে ওঠার ইতিহাসও তেমনই।

সত্তরের দশকে দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় শিশুদের জন্য ‘চাঁদের হাট’ নামে একটি সাপ্তাহিক পাতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর এই পরিচিতি বিশেষভাবে বিস্তার লাভ করে। পত্রিকার পাতাটি শিশু-কিশোরদের জন্য সৃজনশীলতার একটি আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। সেখানে শিশুদের কল্পনা, লেখালেখির আগ্রহ এবং নিজেদের প্রকাশ করার সুযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই পরিসর থেকেই তিনি শিশুদের কাছে হয়ে ওঠেন প্রিয় ‘দাদুভাই’।

‘দাদুভাই’ সম্বোধনের মধ্যে যে স্নেহ ও আন্তরিকতা রয়েছে, তা তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে মিলে গিয়েছিল। তিনি শিশুদের সামনে নিজেকে দূরবর্তী কোনো সাহিত্যিক কিংবা কর্তৃত্বপরায়ণ শিক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেননি। বরং তাঁদের কাছে যাওয়ার, তাঁদের কথা শোনার এবং তাঁদের সৃষ্টিশীলতাকে উৎসাহিত করার মধ্য দিয়েই তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন।

এই সম্পর্কের তাৎপর্য বুঝতে হলে সেই সময়ের গণমাধ্যম ও শিশুসাহিত্যের পরিবেশের কথাও মনে রাখতে হবে। সংবাদপত্র ছিল পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। শিশুদের জন্য নিয়মিত সাহিত্যপাতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাদের হাতে লেখা তুলে দেওয়া, নতুন লেখক তৈরি করা এবং সাহিত্যকে পরিবার ও সমাজের আলোচনার অংশ করে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। ‘চাঁদের হাট’ সেই সুযোগকে অর্থবহ করে তুলেছিল।

দাদুভাইয়ের কৃতিত্ব এখানেই যে তিনি শিশুদের শুধু পাঠক হিসেবে বিবেচনা করেননি; তাঁদের সম্ভাবনাময় সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবেও দেখতে চেয়েছেন। শিশুদের লেখা প্রকাশের সুযোগ দেওয়া, তাদের উৎসাহিত করা এবং তাদের প্রতিভাকে পরিচর্যা করার মধ্য দিয়ে তিনি একটি প্রজন্মের সাংস্কৃতিক বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন।

‘চাঁদের হাট’: একটি সংগঠন, একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন

১৯৭৪ সালে রফিকুল হক দাদুভাই প্রতিষ্ঠা করেন শিশু-কিশোর সংগঠন ‘চাঁদের হাট’। তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন এই সংগঠন। কারণ, একটি সাহিত্যপাতার মাধ্যমে যে সৃজনশীল যোগাযোগের সূচনা হয়েছিল, সংগঠন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তা আরও বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তাকে বই পড়তে উৎসাহিত করা, নিজের লেখা প্রকাশের সাহস জোগানো, অন্যের সৃষ্টিকে সম্মান করতে শেখানো এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। ‘চাঁদের হাট’ এই বৃহত্তর লক্ষ্যকে সামনে রেখে শিশু-কিশোরদের জন্য একটি সৃজনশীল পরিসর নির্মাণের প্রয়াস ছিল।

সংগঠনটির মাধ্যমে শিশুদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। নবীনদের প্রতিভা বিকাশের পাশাপাশি তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, বন্ধুত্ব ও সাংস্কৃতিক চেতনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রও প্রস্তুত হয়। এভাবে ‘চাঁদের হাট’ একটি নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; শিশুদের প্রতিভা আবিষ্কার ও বিকাশের একটি স্মরণীয় উদ্যোগে পরিণত হয়েছিল।

Manual8 Ad Code

দাদুভাইয়ের এই উদ্যোগের তাৎপর্য বর্তমান সময়েও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। এখনকার শিশুরা একদিকে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও তথ্যের বিপুল জগতে প্রবেশ করছে, অন্যদিকে বই পড়ার অভ্যাস, মনোযোগ ধরে রাখা, সৃজনশীলভাবে চিন্তা করা এবং সহমর্মিতার চর্চার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় শিশুদের জন্য আনন্দময় সাহিত্যচর্চা, পাঠচক্র, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও নিজস্ব সৃষ্টিকর্ম প্রকাশের সুযোগ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

দাদুভাইয়ের ‘চাঁদের হাট’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশুদের বিকাশের জন্য শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিবার, সংবাদমাধ্যম, লেখক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ। শিশুদের কল্পনাশক্তি ও প্রতিভাকে সম্মান করতে পারলে তারাই একদিন সমাজের সৃজনশীল শক্তিতে পরিণত হবে।

একসময় ‘চাঁদের হাট’-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া বহু শিশু পরবর্তী জীবনে লেখক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন বলে সংগঠনটির ঐতিহ্য বিশেষভাবে আলোচিত। তাঁদের ব্যক্তিগত সাফল্যের পেছনে দাদুভাইয়ের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার ভূমিকা স্মরণযোগ্য। একজন সংগঠকের সাফল্য শুধু তাঁর নিজের অর্জনে সীমাবদ্ধ থাকে না; তাঁর হাতে তৈরি মানুষদের সাফল্যের মধ্য দিয়েও তা বিকশিত হয়। এই বিবেচনায় দাদুভাইয়ের উত্তরাধিকার তাঁর ব্যক্তিগত সাহিত্যকীর্তির চেয়েও বিস্তৃত।

সাংবাদিকতায় দীর্ঘ পথচলা

রফিকুল হক দাদুভাইয়ের পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর সাংবাদিকতা। ষাটের দশকে সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা করে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দেশের সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর কর্মজীবনে আজাদ, লাল-সবুজ, বাংলাদেশ অবজারভার, জনতা, রূপালী ও যুগান্তরসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করার অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছিল।

দৈনিক রূপালী ও দৈনিক জনতা পত্রিকায় নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পরবর্তী সময়ে দৈনিক যুগান্তরের ফিচার এডিটর হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেন তিনি। সংবাদপত্রের ফিচার বিভাগ সাধারণত সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ, মানবিক অভিজ্ঞতা ও জীবনঘনিষ্ঠ নানা বিষয়ের সঙ্গে পাঠকের যোগাযোগ তৈরি করে। এই বিভাগকে সমৃদ্ধ করার কাজ ছিল তাঁর সাংবাদিকতার অন্যতম ক্ষেত্র।

সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের পেশা নয়; এটি সমাজের নানা অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকে মানুষের সামনে তুলে ধরার দায়িত্বও। বিশেষ করে সংবাদপত্রের সাহিত্য ও ফিচার বিভাগ নতুন লেখক, চিন্তাশীল মানুষ এবং সাংস্কৃতিক উদ্যোগের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটাতে পারে। দাদুভাইয়ের কর্মজীবনে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার এই পারস্পরিক সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

তিনি একদিকে সাহিত্য রচনা করেছেন, অন্যদিকে সংবাদপত্রের সম্পাদনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে সাহিত্যিক সৃষ্টিশীলতা এবং সংবাদমাধ্যমের বাস্তব কর্মপ্রবাহ—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছিল। এই দ্বৈত অভিজ্ঞতা তাঁকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে সাংবাদিকতার কার্যকর সেতুবন্ধ নির্মাণের সুযোগ করে দেয়।

তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের আরেকটি তাৎপর্য ছিল দীর্ঘ সময় ধরে পেশাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা। সংবাদপত্রের কর্মপরিবেশ, সম্পাদকীয় দায়িত্ব এবং প্রকাশনার নিয়মিত চাপের মধ্যেও সাহিত্য ও শিশুদের জন্য কাজ চালিয়ে যাওয়া সহজ বিষয় নয়। কিন্তু দাদুভাইয়ের বহুমাত্রিক কর্মজীবন দেখায়, তিনি তাঁর আগ্রহ ও দায়িত্বকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখেননি। বরং সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সংগঠনকে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

তাঁর কর্মজীবনের মূল্যায়নে তাই শুধু কোন কোন পত্রিকায় তিনি কাজ করেছেন, তা উল্লেখ করাই যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, সংবাদপত্রকে তিনি কীভাবে সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রসারের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং নতুন প্রজন্মের জন্য সৃজনশীলতার দরজা খোলার প্রয়াসে কী ভূমিকা রেখেছেন।

‘ঘরে ফিরা আইসো বন্ধু’: জাতীয় আবেগের এক স্মরণীয় প্রকাশ

রফিকুল হক দাদুভাইয়ের সাহিত্যিক জীবনের উল্লেখযোগ্য রচনা ‘ঘরে ফিরা আইসো বন্ধু’। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লন্ডন থেকে দেশে প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এই কবিতা সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী সময় ছিল জাতীয় আবেগ, প্রত্যাশা, পুনর্গঠন ও নতুন করে পথচলার সময়। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা পেরিয়ে সদ্য স্বাধীন দেশে মানুষের মনে ছিল প্রিয় নেতার প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে গভীর আবেগ। এমন একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তকে সাহিত্যিক ভাষায় ধারণ করা ছিল সময়ের দাবি। ‘ঘরে ফিরা আইসো বন্ধু’ শিরোনামেই রয়েছে ঘরে ফেরার আকুতি, আপনজনের প্রতি টান এবং জাতীয় অনুভূতির মানবিক প্রকাশ।

এই রচনার তাৎপর্য শুধু এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, সাহিত্য অনেক সময় জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মানুষের অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হয়ে ওঠে। ইতিহাসের ঘটনা তথ্য ও তারিখে সংরক্ষিত থাকে; কিন্তু সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত মানুষের আনন্দ, অপেক্ষা, বেদনা ও ভালোবাসাকে ধারণ করে সাহিত্য। দাদুভাইয়ের এই রচনা সেই বৃহত্তর সাহিত্যিক ভূমিকার একটি স্মরণীয় উদাহরণ।

তাঁর সাহিত্যচর্চায় শিশুদের জন্য লেখার পাশাপাশি সমকালীন জাতীয় জীবন ও সামাজিক অনুভূতির প্রতিফলনও ছিল। ফলে তাঁকে শুধু শিশুসাহিত্যের নির্দিষ্ট পরিসরে আবদ্ধ করে দেখলে তাঁর সৃষ্টিশীলতার পূর্ণতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। তাঁর লেখালেখির পরিসর ছিল বিস্তৃত; সেখানে শিশুমনের আনন্দের পাশাপাশি সময়ের আবেগও জায়গা পেয়েছে।

নাট্যকার হিসেবেও স্বতন্ত্র পরিচয়

ছড়া ও শিশুসাহিত্যের পাশাপাশি নাট্যকার হিসেবেও রফিকুল হক দাদুভাইয়ের পরিচিতি ছিল। আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য তাঁর লেখা ‘নিধুয়া পাথার কান্দে’ নাটকটি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে বলে তাঁর কর্মজীবনের বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়।

টেলিভিশন নাটক মানুষের কাছে গল্প, চরিত্র ও জীবনের নানা অভিজ্ঞতা পৌঁছে দেওয়ার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। বিশেষত বাংলাদেশের টেলিভিশন সংস্কৃতির বিকাশপর্বে নাটক ছিল পারিবারিক বিনোদন এবং সামাজিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সে সময় টেলিভিশনের জন্য নাটক রচনা করা মানে ছিল একটি বৃহত্তর দর্শকসমাজের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করা।

দাদুভাইয়ের নাট্যচর্চা তাঁর সৃষ্টিশীলতার বহুমুখী চরিত্রের পরিচয় দেয়। ছড়ার সংক্ষিপ্ত পরিসরে ভাব প্রকাশ, শিশুসাহিত্যের উপযোগী ভাষা নির্মাণ এবং নাটকের কাহিনি ও চরিত্রের মধ্য দিয়ে জীবনকে তুলে ধরা—এই ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত থাকা তাঁর সাহিত্যিক অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছিল।

Manual2 Ad Code

একজন সৃষ্টিশীল মানুষের প্রকৃত শক্তি অনেক সময় প্রকাশ পায় তাঁর মাধ্যম বদলে কাজ করার সামর্থ্যে। দাদুভাইয়ের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। তিনি একটি নির্দিষ্ট সাহিত্যধারায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং নিজের অভিজ্ঞতা ও আগ্রহকে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশের চেষ্টা করেছেন।

গ্রন্থ ও সাহিত্যিক উত্তরাধিকার

রফিকুল হক দাদুভাইয়ের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা সাতটি বলে তাঁর জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘বর্গি এলো দেশে’ এবং ‘চাঁদের হাটের ছড়া’। এই গ্রন্থগুলোর নামই তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়—একদিকে ইতিহাস ও জাতীয় অভিজ্ঞতার অনুষঙ্গ, অন্যদিকে শিশুদের পরিচিত জগৎ, আনন্দ ও ছড়ার ভাষা।

একজন লেখকের বইয়ের সংখ্যা দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক অবদান পুরোপুরি পরিমাপ করা যায় না। বিশেষ করে যাঁরা সংবাদপত্রে নিয়মিত লিখেছেন, সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সংগঠন পরিচালনার মধ্য দিয়ে অন্যদের সৃষ্টিশীলতার বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের কর্মপরিসর বইয়ের প্রচলিত হিসাবের চেয়ে অনেক বড়। দাদুভাইয়ের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারকে তাই তিনটি পরিসরে দেখা যায়। প্রথমত, তাঁর নিজস্ব রচনা, যা বাংলা শিশুসাহিত্য ও ছড়ার ভান্ডারে স্থান করে নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, সংবাদপত্রের সাহিত্যপাতা ও ফিচার বিভাগের সঙ্গে যুক্ত থেকে সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রসারে তাঁর ভূমিকা। তৃতীয়ত, শিশু-কিশোরদের সংগঠিত করা এবং নতুন প্রজন্মের লেখালেখির আগ্রহকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে তাঁর তৈরি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল।

এই তিনটি ক্ষেত্র একে অন্যের পরিপূরক। তাঁর নিজের লেখা শিশুদের কাছে সাহিত্যকে আকর্ষণীয় করেছে; সংবাদপত্রের কাজ সাহিত্যকে বৃহত্তর পাঠকসমাজে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে; আর ‘চাঁদের হাট’ নতুন লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের বিকাশের পরিসর তৈরি করেছে। একজন সাহিত্যিকের অবদান কীভাবে ব্যক্তিগত সৃষ্টির সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকারে রূপ নিতে পারে, দাদুভাইয়ের জীবন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি: স্বীকৃতির আড়ালে যে সাধনা

বাংলা শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রফিকুল হক দাদুভাই ২০০৯ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। একই বছর বাংলাদেশ শিশু একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, চন্দ্রাবতী একাডেমি পুরস্কার ও নিখিল ভারত শিশুসাহিত্য পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা অর্জনের কথাও তাঁর জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে।

পুরস্কার একজন লেখকের কাজকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের গুরুত্ব বৃহত্তর সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে কোনো সাহিত্যিকের প্রকৃত সাফল্য কেবল পুরস্কারের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তাঁর লেখা পাঠকের মনে কতটা জায়গা করে নিয়েছে, নতুন প্রজন্মকে কতটা অনুপ্রাণিত করেছে এবং সমাজে সৃজনশীলতার বিকাশে কতটা অবদান রেখেছে—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দাদুভাইয়ের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির পাশাপাশি মানুষের ভালোবাসা ছিল তাঁর পরিচয়ের বড় অংশ। শিশুদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা, নবীনদের উৎসাহিত করার ভূমিকা এবং সাংবাদিকতা ও সংগঠনের জগতে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা তাঁর জীবনকর্মকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে।

তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্তি তাই কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের বিষয় নয়; এটি বাংলা শিশুসাহিত্যের গুরুত্বেরও স্বীকৃতি। যে সাহিত্য একটি শিশুর কল্পনা, ভাষা, অনুভূতি ও মনন গড়ে তুলতে সাহায্য করে, তার সামাজিক মূল্য অপরিসীম। দাদুভাইয়ের স্বীকৃতি আমাদের সেই সত্যটিও স্মরণ করিয়ে দেয়।

ব্যক্তি রফিকুল হক: স্নেহ, সরলতা ও মানবিকতার প্রতীক

একজন সৃষ্টিশীল মানুষের সাহিত্যিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিত্বও মানুষের মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। দাদুভাই সম্পর্কে স্মৃতিচারণে তাঁর অনাড়ম্বর জীবনযাপন, বিনয়ী স্বভাব এবং শিশুসুলভ প্রাণবন্ততার কথা উঠে আসে। তাঁর ‘দাদুভাই’ পরিচয়টি তাই শুধু শিশুদের জন্য কাজ করার ফল ছিল না; তাঁর আচরণ ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গেও এই পরিচয় গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল।

শিশুদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে হয়। তাদের প্রশ্নকে অবহেলা না করা, ভুল করলে নিরুৎসাহিত না করা এবং ছোট অর্জনকেও মূল্য দেওয়া প্রয়োজন। একজন ভালো শিশু সংগঠকের মধ্যে এসব গুণ থাকা জরুরি। দাদুভাইয়ের প্রতি শিশু-কিশোর ও নবীন লেখকদের আকর্ষণের পেছনে তাঁর আন্তরিকতা ও উৎসাহ দেওয়ার প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

তাঁর পারিবারিক জীবনেও রয়েছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অধ্যায়। তিনি দুই পুত্র ও এক কন্যার জনক ছিলেন। তবে তাঁর জীবনের বিস্তৃত সামাজিক পরিসরে তিনি আরও বহু মানুষের কাছে পরিবারের সদস্যের মতো হয়ে উঠেছিলেন। যাঁরা তাঁর কাছ থেকে উৎসাহ পেয়েছেন, যাঁরা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন কিংবা তাঁর স্নেহের পরশ অনুভব করেছেন, তাঁদের স্মৃতিতে তিনি ছিলেন আপনজনের মতো।

এখানেই ‘দাদুভাই’ নামটির বিশেষত্ব। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক উপাধি নয়; মানুষের ভালোবাসায় প্রতিষ্ঠিত একটি পরিচয়। যে পরিচয় অর্জন করতে হয় দীর্ঘদিনের আচরণ, দায়িত্ববোধ ও আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর এই পরিচয়ই তাঁকে সাধারণ পরিচিতির সীমা অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দিয়েছে।

শিশুসাহিত্যের বর্তমান সংকট ও দাদুভাইয়ের প্রাসঙ্গিকতা

দাদুভাইকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন গুণী মানুষকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; তাঁর কাজ থেকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করাও জরুরি। আজকের শিশুদের জীবনযাত্রায় প্রযুক্তির প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ভিডিও ও ডিজিটাল গেম তাদের বিনোদনের বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে। প্রযুক্তির ইতিবাচক সম্ভাবনা অস্বীকার করার উপায় নেই; কিন্তু এর পাশাপাশি বই পড়া, মনোযোগ দিয়ে শোনা, কল্পনা করা এবং নিজের ভাষায় ভাব প্রকাশের অভ্যাসও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুদের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে হলে তাদের জন্য মানসম্মত ও আনন্দদায়ক বই সহজলভ্য করতে হবে। বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের বাইরেও গল্প, ছড়া, কবিতা, নাটক ও বিজ্ঞানভিত্তিক বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। পরিবারে বই পড়ার পরিবেশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠচক্র এবং সংবাদমাধ্যমে শিশুদের সৃজনশীল কাজ প্রকাশের উদ্যোগ প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে দাদুভাইয়ের কর্মপদ্ধতি থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। তিনি শিশুদের জন্য সাহিত্য রচনা করেছেন, তাদের লেখার জায়গা তৈরি করেছেন এবং সংগঠনের মাধ্যমে তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ করে দিয়েছেন। এই সমন্বিত উদ্যোগ আজও কার্যকর হতে পারে। শিশুদের কেবল পাঠক হিসেবে নয়, লেখক, আবৃত্তিকার, নাট্যকর্মী ও সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণকারী হিসেবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।

একই সঙ্গে শিশুসাহিত্যের মান ও বৈচিত্র্য নিয়েও ভাবতে হবে। শিশুরা শুধু আনন্দের গল্প চায় না; তারা জানতে চায় প্রকৃতি, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজ, মানুষ ও পৃথিবী সম্পর্কে। তাদের উপযোগী ভাষায় জ্ঞান, কল্পনা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটাতে হবে। শিশুর স্বাভাবিক প্রশ্ন করার প্রবণতা এবং স্বাধীন চিন্তাকে উৎসাহিত করতে হবে।

দাদুভাইয়ের স্মৃতির প্রতি যথার্থ সম্মান জানাতে হলে তাঁর নামে অনুষ্ঠান আয়োজনের পাশাপাশি শিশুদের জন্য বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিদ্যালয় ও গ্রন্থাগারে শিশুতোষ বইয়ের সংগ্রহ বাড়ানো, শিশু-কিশোর সাহিত্য উৎসব আয়োজন, নবীন লেখকদের জন্য কর্মশালা, ছড়া ও গল্প লেখার প্রতিযোগিতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে ‘চাঁদের হাট’-এর মতো সৃজনশীল সংগঠন গড়ে তোলা যেতে পারে।

এ ধরনের উদ্যোগ তাঁর কাজকে স্মরণ করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর আদর্শকে কার্যকরভাবে পৌঁছে দেবে। কারণ, একজন মানুষের উত্তরাধিকার সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে ওঠে তখনই, যখন তাঁর কাজ পরবর্তী প্রজন্মের জীবন ও চিন্তায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে।

সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধ

দাদুভাইয়ের জীবন থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতি পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। সংবাদপত্র শুধু রাজনৈতিক ঘটনা, অর্থনীতি কিংবা দৈনন্দিন সংবাদ প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি একটি সমাজের সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি ও মননচর্চারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

সংবাদপত্রের সাহিত্যপাতা নতুন লেখককে পাঠকের সামনে পরিচিত করতে পারে। ফিচার বিভাগ মানুষের অজানা জীবন, সামাজিক উদ্যোগ ও সাংস্কৃতিক অর্জন তুলে ধরতে পারে। শিশুদের জন্য নির্ধারিত পাতা নতুন প্রজন্মকে পাঠাভ্যাসে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। এসব ক্ষেত্রের যথাযথ বিকাশ একটি সমাজের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করে।

রফিকুল হক দাদুভাইয়ের দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন এবং ‘চাঁদের হাট’ প্রতিষ্ঠার অভিজ্ঞতা এই দুই ক্ষেত্রের পারস্পরিক সম্পর্ককে সামনে নিয়ে আসে। সংবাদমাধ্যমের পেশাগত দায়িত্ব পালন করেও তিনি শিশুদের সৃজনশীলতার জন্য কাজ করেছেন। এই সমন্বয় বর্তমান সাংবাদিকতার জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।

আজ সংবাদমাধ্যম দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অনলাইন প্রকাশনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং তাৎক্ষণিক সংবাদপ্রবাহের যুগে পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে। তবু সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিশুদের জন্য মানসম্মত বিষয়বস্তুর প্রয়োজন কমেনি; বরং আরও বেড়েছে। শিশুদের জন্য নির্ভরযোগ্য, বয়সোপযোগী ও সৃজনশীল বিষয়বস্তু তৈরি করা সংবাদমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব হতে পারে।

দাদুভাইয়ের জীবন ও কর্ম সেই দায়িত্বের কথাই মনে করিয়ে দেয়। একজন সাংবাদিক তাঁর পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি সমাজের সাংস্কৃতিক বিকাশেও অবদান রাখতে পারেন। একজন সম্পাদক কেবল প্রকাশনার মান রক্ষা করেন না; নতুন প্রতিভাকে জায়গা দেওয়ার মধ্য দিয়েও ভবিষ্যতের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তুলতে পারেন।

পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা ও স্মরণ

রফিকুল হক দাদুভাইয়ের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষ তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নূর আহমদ বকুল যৌথ বিবৃতিতে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জ্ঞাপন করেছেন।

Manual2 Ad Code

যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও দৈনিক যুগান্তরের প্রকাশক অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এবং যুগান্তরের সম্পাদক আব্দুল হাই শিকদারও বিবৃতির মাধ্যমে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। এ ছাড়া দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথার বিশেষ প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান তাঁকে স্মরণ করে বলেছেন, “রফিকুল হক দাদুভাই ছিলেন শিশুপ্রাণ এক যুগপুরুষ, যাঁর ছড়ায় ও কর্মে বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য পেয়েছে নতুন দিকনির্দেশনা।”

এই শ্রদ্ধা ও স্মরণ কেবল একজন প্রয়াত ব্যক্তিত্বের প্রতি আনুষ্ঠানিক সম্মান নয়; এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর অবদানের কথাও নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে।

তবে দাদুভাইকে স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় হবে তাঁর কাজের ধারাকে সচল রাখা। তাঁর লেখা নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া, তাঁর কর্মজীবন নিয়ে গবেষণা করা, ‘চাঁদের হাট’-এর ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণ করা এবং শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে তাঁর আদর্শকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। তাঁর জীবন ও কর্মের ওপর প্রামাণ্য গ্রন্থ, তথ্যচিত্র কিংবা সংরক্ষণাগার তৈরি করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁর অবদান সম্পর্কে আরও পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভ করতে পারবে।

বিশেষ করে যাঁরা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁর কাছ থেকে উৎসাহ পেয়েছেন কিংবা ‘চাঁদের হাট’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের স্মৃতিচারণ সংগ্রহ করা জরুরি। ব্যক্তিগত স্মৃতি অনেক সময় ইতিহাসের এমন সব দিক তুলে ধরে, যা আনুষ্ঠানিক নথিতে পাওয়া যায় না। এসব স্মৃতি সংরক্ষণের মাধ্যমে দাদুভাইয়ের জীবন ও সময়কে আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে।

মানুষ চলে যান, থেকে যায় তাঁর আলোকিত পথ

মানুষের জীবন সীমিত, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীলতা ও মানবিক অবদানের প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। কেউ তাঁর রচনার মাধ্যমে, কেউ তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের মাধ্যমে, কেউ আবার তাঁর উৎসাহে গড়ে ওঠা মানুষের সাফল্যের মধ্যে বেঁচে থাকেন। রফিকুল হক দাদুভাইয়ের জীবন এই সত্যেরই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

তিনি ছড়া লিখেছেন, সাহিত্যচর্চা করেছেন, নাটক রচনা করেছেন, সংবাদপত্রে সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতার জন্য একটি সংগঠিত পরিসর নির্মাণ করেছেন। তাঁর কর্মজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের মধ্যে একটি অভিন্ন সূত্র ছিল—মানুষের সঙ্গে সংযোগ এবং নতুন প্রজন্মের জন্য সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া।

দাদুভাইয়ের অবদানকে শুধু অতীতের স্মৃতির মধ্যে আটকে রাখলে তাঁর প্রতি যথার্থ সম্মান জানানো হবে না। বরং তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে শিশুদের জন্য আরও সমৃদ্ধ সাহিত্যভান্ডার তৈরি করতে হবে, সংবাদপত্রে শিশুসাহিত্যের জায়গা বাড়াতে হবে, নবীন লেখকদের উৎসাহ দিতে হবে এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে শিশুদের সৃজনশীল বিকাশের উপযোগী করে তুলতে হবে।

একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া, তার লেখা মন দিয়ে পড়া, তার প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সুযোগ দেওয়া কিংবা তার প্রথম সৃষ্টিকে উৎসাহিত করা—এসব কাজের মধ্য দিয়েই দাদুভাইয়ের আদর্শকে জীবন্ত রাখা সম্ভব। কারণ, শিশুদের প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি একটি সমাজের ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্ববোধেরও প্রকাশ।

রফিকুল হক দাদুভাই আজ আমাদের মধ্যে সশরীরে নেই। কিন্তু তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য স্মৃতি, তাঁর সাহিত্যকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাঠকের ভালোবাসা, আর ‘চাঁদের হাট’-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি প্রজন্মের সৃজনশীল হয়ে ওঠার ইতিহাস। তাঁর জীবন আমাদের শিখিয়েছে, শিশুদের ভালোবাসা মানে ভবিষ্যৎকে ভালোবাসা; তাদের কল্পনাকে সম্মান করা মানে আগামী দিনের সম্ভাবনাকে সম্মান করা।

পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। বাংলা শিশুসাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ইতিহাসে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর ছড়ার ছন্দ, তাঁর সৃষ্টিশীলতা, তাঁর কর্মনিষ্ঠা এবং শিশুদের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করুক।

চাঁদের হাটের দাদুভাই, আপনি থাকবেন শিশুদের হাসিতে, নবীন লেখকের প্রথম শব্দে, বইয়ের পাতায় এবং সৃজনশীল বাংলাদেশের স্বপ্নে।

বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি শিশুপ্রাণ এই যুগপুরুষকে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ