যানজট কমাতে ৪ হাজার নতুন বাস চালুর প্রস্তাব রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের

প্রকাশিত: ১২:৪১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

যানজট কমাতে ৪ হাজার নতুন বাস চালুর প্রস্তাব রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের

Manual7 Ad Code
  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব বাস বাধ্যতামূলক, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন অপসারণ ও পরিবহন খাতে সংস্কারের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ : রাজধানীর যানজট কমানো, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চার হাজার আধুনিক বাস ফ্র্যাঞ্চাইজভিত্তিক পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব বাস সার্ভিস বাধ্যতামূলক করা, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে অপসারণ, পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং রেল ও নৌপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

Manual4 Ad Code

বুধবার (১৪ অক্টোবর ২০২৬) প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া এক খোলা চিঠিতে এসব প্রস্তাব তুলে ধরে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, রাজধানীর যানজট নিরসন ও সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত, টেকসই ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

চিঠিতে বলা হয়, রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে রুট রেশনালাইজেশনের আওতায় আধুনিক নতুন বাস চালু করা জরুরি। পুরোনো বাস দিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থা চালু করা হলে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীদের গণপরিবহনে আকৃষ্ট করা কঠিন হবে। এতে যানবাহন ব্যবহারের ধরনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না এবং যানজট কমানোর লক্ষ্যও ব্যাহত হতে পারে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, রাজধানীতে চার হাজার আধুনিক বাস ফ্র্যাঞ্চাইজভিত্তিক পরিচালনা করতে সর্বোচ্চ আট হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। সংগঠনটির দাবি, মানসম্মত বাসসেবা চালু হলে ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর নির্ভরতা কমবে, বাসের গতি ও দৈনিক ট্রিপের সংখ্যা বাড়বে এবং যাত্রীরা স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারবেন।

খোলা চিঠিতে রাজধানীর সড়ক ব্যবহারের ভারসাম্যহীনতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। ফাউন্ডেশনের দাবি, ব্যক্তিগত যানবাহন সড়কের প্রায় ৭০ শতাংশ জায়গা দখল করে মাত্র ১১ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করে। অন্যদিকে গণপরিবহন ৫৩ শতাংশ যাত্রী বহন করে। এ পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করে গণপরিবহনকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব বাসের প্রস্তাব

রাজধানীর যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়ার জন্য বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহারকে চিহ্নিত করেছে সংগঠনটি। বিশেষ করে সকালে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া এবং দুপুরে ছুটির সময় সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়।

এ সমস্যা সমাধানে রাজধানীর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব বাস সার্ভিস বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে বাস কেনার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দেওয়ার কথাও বলেছে ফাউন্ডেশন। সংগঠনটির মতে, শিক্ষার্থীদের গণপরিবহনে যাতায়াতের সুযোগ বাড়লে যানজট কমার পাশাপাশি তাদের মধ্যে সমতাভিত্তিক মানসিকতার বিকাশ ঘটবে।

বিআরটিসির বাস ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের তাগিদ

চিঠিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বাস ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ফাউন্ডেশনের মতে, সরকারি এ পরিবহন সংস্থার অনেক বাস বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ইজারা দেওয়ায় সেগুলো দিনের বড় একটি সময় অব্যবহৃত থাকে। অথচ নগরীর সাধারণ যাত্রীদের একটি বড় অংশকে জরাজীর্ণ বেসরকারি বাসে যাতায়াত করতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় বিআরটিসির প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে বাস পরিচালনায় লোকসান কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। যেসব প্রতিষ্ঠান বিআরটিসির বাস ইজারা নেয়, তাদের বিকল্প উৎস থেকে বাস ভাড়া নেওয়া অথবা নিজস্ব অর্থায়নে ও সরকারি ঋণে বাস কেনার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে চিঠিতে।

পরিবেশবান্ধব পরিবহন হিসেবে ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগকে ইতিবাচক উল্লেখ করে ফাউন্ডেশন বলেছে, এসব বাস পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। অতীতে বিআরটিসির কেনা উন্নতমানের বাস রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল হয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইলেকট্রিক বাস পরিচালনায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে তথ্যভিত্তিক নিবন্ধনের দাবি

Manual8 Ad Code

রাজধানীসহ দেশের শহরাঞ্চলে অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার যানজট ও সড়ক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। পর্যাপ্ত গণপরিবহনের অভাবে মানুষ এসব যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লেও অনিয়ন্ত্রিত সংখ্যা বৃদ্ধি, অনিরাপদ কাঠামো এবং চালকদের অদক্ষতা সড়কে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে দাবি করেছে ফাউন্ডেশন।

এ সমস্যা সমাধানে সড়ক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যায়ক্রমিক, তথ্যভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর নিবন্ধনব্যবস্থা চালু এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজধানীতে এসে অটোরিকশা চালানোর অবাধ সুযোগ সীমিত করা এবং গ্রাম ও শহরকেন্দ্রিক কৃষি-শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর সুপারিশও রয়েছে।

পরিবহন সংস্থায় বিশেষজ্ঞ নিয়োগের সুপারিশ

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বিআরটিসি এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) শীর্ষ পদে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

সংগঠনটির মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। পাশাপাশি প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক পূর্ণাঙ্গ মডিউল অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, দেশে পাঁচ লাখের বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন রয়েছে। এসব যানবাহন দ্রুত সড়ক থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে ফাউন্ডেশন। মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের কারণে সড়ক দুর্ঘটনার যে উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

রেল ও নৌপরিবহনে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান

সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে রেল ও নৌপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সম্প্রসারণের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। চিঠিতে বলা হয়, এ দুই মাধ্যমে তুলনামূলক কম খরচে অধিকসংখ্যক যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করা সম্ভব। রেল ও নৌপথে পণ্য পরিবহন বাড়লে সড়কে পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ কমবে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয় কমার মাধ্যমে বাজারে দ্রব্যমূল্য কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

Manual4 Ad Code

এ লক্ষ্য অর্জনে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনা এবং প্রয়োজনে তিনটি খাতকে একীভূত করে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে ফাউন্ডেশন।

সড়ক নিরাপত্তায় বাড়তি বরাদ্দের আহ্বান

খোলা চিঠির শেষাংশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি, পঙ্গুত্ব এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আর্থিক ও সামাজিক দুরবস্থার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। ফাউন্ডেশনের মতে, সড়ক অবকাঠামোর ত্রুটি, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন, চালকদের অদক্ষতা ও অসুস্থতা এবং যাত্রী ও পথচারীদের অসচেতনতার মতো বিষয়গুলো সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।

দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অধিকাংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের হওয়ায় এসব দুর্ঘটনা অনেক ক্ষেত্রে পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলে দেয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি সড়ক ব্যবহারকারীদের দক্ষতা ও সচেতনতা বাড়াতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অর্থ বরাদ্দের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে সাইদুর রহমান বলেন, দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে যৌক্তিক ব্যয়ে টেকসই সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, দেশের অর্থনীতি গতিশীল করা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থার বিকল্প নেই।

Manual4 Ad Code