কমরেড লুলা দা সিলভা: কারখানার শ্রমিক থেকে ব্রাজিলের রাষ্ট্রপ্রধান

প্রকাশিত: ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২৬

কমরেড লুলা দা সিলভা: কারখানার শ্রমিক থেকে ব্রাজিলের রাষ্ট্রপ্রধান

Manual5 Ad Code

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

দারিদ্র্য, শ্রমিক আন্দোলন, সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, নির্বাচনী পরাজয়, কারাবাস ও রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন—কমরেড লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার জীবন কেবল একজন ব্যক্তির উত্থানের কাহিনি নয়; এটি ব্রাজিলের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং বামপন্থী রাজনীতির সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ইতিহাসে কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থাকেন, যাঁদের জীবনকে কেবল নির্বাচনী সাফল্য কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাঁদের রাজনৈতিক যাত্রা একটি দেশের সামাজিক পরিবর্তন, শ্রেণি সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। ব্রাজিলের বাম রাজনীতিক লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব।

দারিদ্র্যের কারণে শৈশবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়া, জীবিকার তাগিদে অল্প বয়সে শ্রমবাজারে প্রবেশ, কারখানার কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হওয়া, সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে পৌঁছানো—লুলার জীবন এক অসাধারণ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। তিনি দেখিয়েছেন, শ্রমজীবী মানুষের লড়াই সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে নতুন অভিজ্ঞতা থেকেও জাতীয় নেতৃত্বের উত্থান সম্ভব। একই সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক জীবন প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন এবং সমাজের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ক্ষমতাকাঠামো পরিবর্তন করা এক বিষয় নয়।

ব্রাজিলের ওয়ার্কার্স পার্টি বা পার্তিদো দোস ত্রাবালিয়াদোরেসের (পিটি) এই নেতা প্রথমবার ২০০৩ সালে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে দেশ পরিচালনার পর ২০২২ সালের নির্বাচনে আবার জয়ী হয়ে ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ছিল লাতিন আমেরিকার সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা।

লুলাকে বুঝতে হলে তাই তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রামের পাশাপাশি ব্রাজিলের শ্রমিক আন্দোলন, সামরিক শাসনের ইতিহাস, সামাজিক বৈষম্য, নির্বাচনী গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক সমঝোতার বাস্তবতাও বুঝতে হবে।

দারিদ্র্যের শৈশব থেকে শিল্পশ্রমিক

১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পারনামবুকো রাজ্যের গারানইউসে জন্মগ্রহণ করেন লুইজ ইনাসিও দা সিলভা। আট সন্তানের পরিবারে তিনি ছিলেন সপ্তম। তাঁর বাবা আরিস্তিদেস ইনাসিও দা সিলভা এবং মা ইউরিদিস ফেরেইরা দে মেলো। পরবর্তী সময়ে লুলা নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।

ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ঐতিহাসিকভাবেই দারিদ্র্য, ভূমির অসম মালিকানা, সীমিত কর্মসংস্থান এবং সামাজিক বৈষম্যের জন্য পরিচিত। কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল বহু পরিবারের জন্য সেখানে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন ছিল। কাজের সন্ধানে বিপুলসংখ্যক মানুষ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শিল্পনগরীগুলোতে পাড়ি জমাতেন। লুলার পরিবারও সেই বৃহত্তর অভিবাসনপ্রবাহের অংশ হয়ে ওঠে।

১৯৫২ সালে মায়ের সঙ্গে সাও পাওলোর উদ্দেশে যাত্রা করেন শিশু লুলা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শিল্পায়নকেন্দ্রিক এই অঞ্চলে পৌঁছানোর পরও তাঁদের দারিদ্র্য দূর হয়নি। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে অল্প বয়সেই তাঁকে কাজ করতে হয়। কখনো জুতা পালিশ, কখনো দোকান ও অফিসের ছোটখাটো কাজ, আবার কখনো কারখানায় শ্রম বিক্রি করে পরিবারের জীবিকা নির্বাহে ভূমিকা রাখতে হয়েছে তাঁকে।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকলেও কারিগরি দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যান লুলা। কিশোর বয়সে তিনি শিল্প প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান সেনাইতে (SENAI) ধাতব কাজের প্রশিক্ষণ নেন। পরে ধাতুশিল্পের কারখানায় দক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কারখানায় কর্মরত অবস্থায় এক দুর্ঘটনায় বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুল হারান।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনকে শুধু ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবিত করেনি; শ্রমিকের জীবন ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধিও গভীর করেছে। শিল্পশ্রমিক হিসেবে তিনি জানতেন, শ্রমিকের কাছে মজুরি কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়—এটি পরিবারের খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা এবং বেঁচে থাকার নিশ্চয়তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

পরবর্তী সময়ে লুলা যখন শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন, তখন তাঁর বক্তব্যে এই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা গেছে। তিনি শ্রমিকদের কাছে একজন দূরের রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তাঁদের মতোই কারখানায় কাজ করা, মজুরি নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকা এবং পরিবারের জন্য সংগ্রাম করার অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল।

শ্রমিক ইউনিয়ন ও স্বৈরশাসনবিরোধী সংগ্রাম

লুলার রাজনৈতিক উত্থানের পটভূমি বুঝতে হলে ১৯৬৪ সালের সামরিক অভ্যুত্থান-পরবর্তী ব্রাজিলের দিকে তাকাতে হয়। ওই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশটিতে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী দুই দশকে রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন, সংবাদমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ, শ্রমিক সংগঠনের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সীমিত করার ঘটনা ঘটে।

দ্রুত শিল্পায়নের ফলে সাও পাওলো ও আশপাশের অঞ্চল ব্রাজিলের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে সাও বেরনার্দো দো কাম্পো, সাও কায়েতানো দো সুল এবং দিয়াদেমাসহ এবিসি শিল্পাঞ্চলে গাড়ি ও ধাতুশিল্পের বিস্তার ঘটে। বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এসব কারখানায় কর্মরত ছিলেন। কিন্তু শিল্পোৎপাদন বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি, কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিক অধিকার নিয়ে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়তে থাকে।

এই পরিস্থিতিতে লুলা শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। তাঁর ভাই ফ্রেই চিকোর মাধ্যমেও শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়। ইউনিয়নের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে করতে তিনি সংগঠক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন।

১৯৭৫ সালে সাও বেরনার্দো দো কাম্পো ও দিয়াদেমার ধাতুশ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন লুলা। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৯ বছর। শ্রমিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, সহজ ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার ক্ষমতা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তাঁকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।

সত্তরের দশকের শেষ দিকে ব্রাজিলে মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত মজুরি হ্রাস এবং শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৭৮ সাল থেকে এবিসি শিল্পাঞ্চলে বড় ধরনের শ্রমিক ধর্মঘট শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। বিপুলসংখ্যক ধাতুশ্রমিক এসব ধর্মঘটে অংশ নেন।

এই আন্দোলন কেবল মজুরি বৃদ্ধির দাবি ছিল না। সামরিক শাসনের অধীনে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া, প্রকাশ্যে দাবি উত্থাপন করা এবং বৃহৎ সমাবেশ গড়ে তোলা ছিল রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। শ্রমিক আন্দোলন তখন স্বৈরশাসনের নিয়ন্ত্রিত জনপরিসরে গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হচ্ছিল।

লুলার নেতৃত্বের বিশেষত্ব ছিল, তিনি শ্রমিকদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছিলেন। মজুরি, কর্মঘণ্টা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং শ্রমিকের মর্যাদার প্রশ্ন তাঁর বক্তব্যে কেন্দ্রীয় স্থান পেত। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সংগঠিত শক্তি যে রাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে, সে ধারণা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে।

Manual3 Ad Code

১৯৮০ সালে ধর্মঘটের ধারাবাহিকতায় সামরিক সরকার লুলাসহ কয়েকজন শ্রমিকনেতাকে গ্রেপ্তার করে। জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় তিনি ৩১ দিন কারাবন্দি ছিলেন। তাঁর গ্রেপ্তার শ্রমিক আন্দোলনকে দমন করার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এর বিপরীত প্রতিক্রিয়াও দেখা দেয়। লুলা ক্রমে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত শ্রমিকনেতা হয়ে ওঠেন।

Manual6 Ad Code

এই অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন, শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা আরও জরুরি।

ওয়ার্কার্স পার্টির জন্ম: শ্রমিক আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক সংগঠন

১৯৮০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিটি। দলটি গঠনে লুলার পাশাপাশি ভূমিকা রাখেন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, বামপন্থী বুদ্ধিজীবী, ছাত্র আন্দোলনের কর্মী, গ্রামীণ সংগঠক এবং প্রগতিশীল খ্রিষ্টান আন্দোলনের প্রতিনিধিরা।

এই দল গঠনের পেছনে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপলব্ধি: শ্রমিকেরা যদি কেবল উৎপাদনক্ষেত্রে নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য সংগঠিত থাকেন, তবে অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার বৃহত্তর সিদ্ধান্তে তাঁদের প্রভাব সীমিত থেকে যাবে। তাই শ্রমিক আন্দোলনের শক্তিকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে রূপান্তর করা প্রয়োজন।

পিটির জন্ম ব্রাজিলের প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরে একটি নতুন সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তৈরি করে। দলটির ভিত্তি ছিল শ্রমিক সংগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন। গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, শ্রমিক অধিকার এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শ এর প্রাথমিক কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়।

তবে পিটি কোনো একক মতাদর্শের কঠোর কাঠামোয় আবদ্ধ ছিল না। মার্ক্সবাদী, সমাজতান্ত্রিক, শ্রমিক আন্দোলনের নেতা, গণতান্ত্রিক বামপন্থী এবং সামাজিক আন্দোলনের বিভিন্ন ধারার মানুষ এতে যুক্ত হন। এই বৈচিত্র্য দলটিকে বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি দেয়; একই সঙ্গে ভবিষ্যতে দলটির রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রও তৈরি করে।

১৯৮৩ সালে ব্রাজিলের বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন সেন্ট্রাল উনিকা দোস ত্রাবালিয়াদোরেসের (সিইউটি) প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াতেও লুলা ও তাঁর রাজনৈতিক সহযাত্রীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এর মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের সংগঠিত শক্তি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।

১৯৮৪ সালে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দাবিতে গড়ে ওঠা দিরেতাস জা আন্দোলনেও লুলা সক্রিয় ছিলেন। এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। আন্দোলনটি ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক উত্তরণের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে।

১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষের সদস্য নির্বাচিত হন লুলা। শ্রমিক আন্দোলনের একজন নেতা হিসেবে শুরু হওয়া তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা তখন জাতীয় আইনসভায় পৌঁছে গেছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি শুধু শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি নন, বরং দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক বিশ্লেষন ও আলোচনার বিতর্কেরও একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠেন।

পরাজয়ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিপক্কতা

১৯৮৯ সালে দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর ব্রাজিলে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পিটির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন লুলা। দ্বিতীয় দফায় ফের্নান্দো কলোর দে মেলোর কাছে পরাজিত হন তিনি।

১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের নির্বাচনেও অংশ নেন লুলা। দুইবারই ফের্নান্দো এনরিকে কারদোসোর কাছে পরাজিত হন। পরপর তিনটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্যর্থতা তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছিল। কিন্তু তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াননি।

এই সময়ে পিটি স্থানীয় সরকার, শ্রমিক সংগঠন এবং সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নিজেদের ভিত্তি বিস্তৃত করে। দলটি পৌরসভা ও বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তরে সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করে। লুলাও বুঝতে পারেন, কেবল শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহ্য কিংবা বামপন্থী আদর্শের প্রতি আনুগত্য দিয়ে একটি বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারকে আকৃষ্ট করা কঠিন।

ব্রাজিলের নির্বাচনী রাজনীতিতে জয়ী হতে হলে শিল্পশ্রমিকের পাশাপাশি কৃষক, নিম্ন আয়ের শহুরে জনগোষ্ঠী, মধ্যবিত্ত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সামাজিক গোষ্ঠীর সমর্থন প্রয়োজন। এই বাস্তবতা পিটি ও লুলার রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন আনে।

২০০২ সালের নির্বাচনের আগে লুলা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, চুক্তিগত দায়বদ্ধতা রক্ষা এবং ব্যবসায়ী ও আর্থিক মহলের উদ্বেগ কমানোর বার্তা দেন। তাঁর প্রচারণা আগের তুলনায় বেশি মধ্যপন্থী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির কাঠামোর মধ্যেও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি গুরুত্ব পায়।

এই কৌশল নিয়ে বামপন্থী মহলে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়। একাংশের মতে, রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছাতে বৃহত্তর সামাজিক জোট গঠন অপরিহার্য। অন্য অংশের আশঙ্কা ছিল, নির্বাচনী সাফল্যের জন্য রাজনৈতিক অবস্থান নরম করতে গিয়ে পিটি তার মৌলিক সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যেতে পারে।

২০০২ সালের নির্বাচনে লুলার বিজয় দেখিয়ে দেয়, শ্রমিক আন্দোলন থেকে উঠে আসা একটি রাজনৈতিক দল বৃহত্তর সামাজিক জোটের মাধ্যমে জাতীয় ক্ষমতায় পৌঁছাতে পারে।

প্রথম দুই মেয়াদ: সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা

২০০৩ সালের ১ জানুয়ারি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন লুলা। তাঁর ক্ষমতায় আরোহণ ছিল প্রতীকী অর্থে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, শ্রেণিগত বিভাজন এবং রাজনৈতিক বঞ্চনার ইতিহাস বহনকারী একটি দেশে একজন সাবেক শিল্পশ্রমিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে বসেন।

তবে প্রতীকী তাৎপর্যের বাইরে তাঁর সরকারের সামনে ছিল বাস্তব অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। ব্রাজিল তখনও গভীর বৈষম্য, দারিদ্র্য, ভূমির অসম মালিকানা, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান এবং জনসেবার সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়ছিল।

লুলা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র্য কমানো। ফোমে জিরো বা ‘শূন্য ক্ষুধা’ কর্মসূচি এবং বোলসা ফামিলিয়া নামে পরিচিত নগদ সহায়তা কর্মসূচি এই নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। বোলসা ফামিলিয়ার মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়, যার সঙ্গে শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো কিছু শর্ত যুক্ত ছিল।

এই কর্মসূচিগুলোর উদ্দেশ্য ছিল তাৎক্ষণিক দারিদ্র্য মোকাবিলার পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো। দরিদ্র পরিবারের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছানোর ফলে খাদ্য, পোশাক, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করার সুযোগ বৃদ্ধি পায়।

লুলার দুই মেয়াদে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশ্ববাজারে ব্রাজিলের পণ্য, বিশেষত কৃষিপণ্য ও খনিজ সম্পদের চাহিদা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও সরকারের সামাজিক নীতিগুলো বাস্তবায়নে সহায়তা করে।

তবে দারিদ্র্য হ্রাসের কৃতিত্বকে কেবল একটি সরকারের একক অর্জন হিসেবে দেখা যথার্থ নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শ্রমবাজারের পরিবর্তন, ন্যূনতম মজুরির নীতি, সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি—সব মিলিয়েই এই পরিবর্তন ঘটেছিল।

লুলার সমর্থকদের মতে, তাঁর সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা। তাঁদের দৃষ্টিতে, সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি শুধু দারিদ্র্য কমায়নি, বরং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে দরিদ্র মানুষের জীবনকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

অন্যদিকে বামপন্থী সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল, সামাজিক সহায়তা ও মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পদের মালিকানা, ভূমি সংস্কার, আর্থিক খাতের ক্ষমতা এবং উৎপাদনব্যবস্থার ওপর পুঁজির নিয়ন্ত্রণে কতটা পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছে।

এই আলোচনা ও বিতর্ক লুলার প্রথম দুই মেয়াদের মূল্যায়নের কেন্দ্রে রয়েছে। তাঁর সরকার পুঁজিবাদী অর্থনীতির কাঠামো ভেঙে নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেনি। বরং বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সামাজিক সংস্কার, আয় পুনর্বণ্টন এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের পথ অনুসরণ করেছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি: ব্রাজিলের প্রভাব

দেশীয় সামাজিক নীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্রাজিলের ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করেন লুলা। তাঁর সরকার লাতিন আমেরিকার আঞ্চলিক সহযোগিতা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার ধারণাকে গুরুত্ব দেয়।

বিশ্ব বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে ব্রাজিলের কণ্ঠস্বর জোরালো করার চেষ্টা ছিল তাঁর কূটনীতির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য।

ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ব্রিকসের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্রাজিলের অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে এই জোটের বিস্তারে দেশটির ভূমিকা লুলার আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর কূটনীতির মূল লক্ষ্য ছিল, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তির প্রভাবের পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরও বেশি পরিসর তৈরি করা।

তবে তাঁর পররাষ্ট্রনীতিও আলোচনা ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাত, কর্তৃত্ববাদী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং মানবাধিকার প্রশ্নে ব্রাজিলের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। বাস্তববাদী কূটনীতি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা তাঁর সরকারের জন্য একটি জটিল চ্যালেঞ্জ ছিল।

দুর্নীতির অভিযোগ, কারাবাস ও বিচারিক প্রত্যাবর্তন

লুলার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হলো দুর্নীতির মামলা এবং কারাবাস। তাঁর সরকারের সময় এবং পরবর্তী বছরগুলোতে ব্রাজিলের রাজনীতিতে একাধিক দুর্নীতির কেলেঙ্কারি সামনে আসে।

২০০৫ সালে মেনসালাও কেলেঙ্কারি ও পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেত্রোব্রাসকে কেন্দ্র করে অপারেশন কার ওয়াশ তদন্ত দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এসব তদন্তে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ঘুষ, অর্থ পাচার এবং সরকারি চুক্তিতে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

লুলাও বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন। ২০১৭ সালে একটি দুর্নীতির মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং পরবর্তী আপিলপ্রক্রিয়ায় দণ্ড বহাল থাকায় ২০১৮ সালে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় ৫৮০ দিন কারাবন্দি ছিলেন তিনি।

লুলা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর সমর্থকেরা বলেছেন, বিচারপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে এবং তাঁকে নির্বাচনের বাইরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে তাঁর বিরোধীরা মনে করতেন, দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর জবাবদিহি হওয়া জরুরি।

এই আলোচনা ও বিতর্ককে বোঝার জন্য বিচারিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম ফেডারেল কোর্ট লুলার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর দণ্ডাদেশ বাতিলের পথ উন্মুক্ত করে। এর মধ্যে বিচারিক এখতিয়ারসংক্রান্ত ত্রুটি এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আদালতের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে তাঁর রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম হন।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি: দণ্ডাদেশ বাতিল হওয়া, বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা এবং কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা—এগুলো এক বিষয় নয়। আদালতের সিদ্ধান্তের আইনগত তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে হলে সংশ্লিষ্ট মামলার নির্দিষ্ট রায় ও তার পরিধি বিবেচনা করতে হয়।

লুলার প্রত্যাবর্তন ব্রাজিলের বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি করে। তাঁর সমর্থকেরা একে রাজনৈতিকভাবে অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হিসেবে দেখেন। সমালোচকেরা আবার তাঁর রাজনৈতিক জোট, অতীতের দুর্নীতি কেলেঙ্কারি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

এই অভিজ্ঞতা দেখায়, গণতন্ত্রে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিচারিক জবাবদিহির সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিচারব্যবস্থাকে দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হয়; একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোও অপরিহার্য।

২০২২ সালের নির্বাচন: রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে প্রত্যাবর্তন

২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছিল ব্রাজিলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো। একদিকে ছিল লুলার নেতৃত্বাধীন বামপন্থী ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক জোট; অন্যদিকে বলসোনারোর সমর্থনে সংগঠিত ছিল রক্ষণশীল, ডানপন্থী এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠী।

নির্বাচনের কেন্দ্রীয় প্রশ্নগুলোর মধ্যে ছিল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক বৈষম্য, ক্ষুধা, অর্থনীতি, পরিবেশনীতি এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা। নির্বাচনের আগে ব্রাজিলের রাজনীতিতে তীব্র মেরুকরণ তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি অবিশ্বাস এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।

প্রথম দফায় কোনো প্রার্থী প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দ্বিতীয় দফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৩০ অক্টোবর ২০২২-এর দ্বিতীয় দফায় লুলা ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ ভোট পেয়ে জাইর বলসোনারোকে পরাজিত করেন। বলসোনারো পান ৪৯ দশমিক ১০ শতাংশ ভোট। ব্যবধান ছিল খুবই সামান্য।

এই বিজয়ের মাধ্যমে লুলা তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি তিনি নতুন মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

লুলার প্রত্যাবর্তনকে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ফল হিসেবে দেখলে নির্বাচনের সামাজিক তাৎপর্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এটি ছিল বলসোনারোর শাসনকালে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক মেরুকরণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক, বামপন্থী ও মধ্যপন্থী শক্তির একটি বিস্তৃত নির্বাচনী জোটের সাফল্য।

তবে নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরও বলসোনারোর রাজনৈতিক সমর্থন উল্লেখযোগ্য ছিল। অল্প ব্যবধানের ফলাফল দেখিয়ে দেয়, ব্রাজিলের সমাজে ডানপন্থী রাজনীতির সামাজিক ভিত্তিও কম নয়। ফলে লুলার জন্য রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসাই একমাত্র চ্যালেঞ্জ ছিল না; বরং বিভক্ত সমাজে কার্যকর সরকার পরিচালনা করাও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ।

Manual7 Ad Code

তৃতীয় মেয়াদ: প্রত্যাশা, সীমাবদ্ধতা ও নতুন চ্যালেঞ্জ

তৃতীয় মেয়াদে লুলার সামনে ছিল একাধিক জটিল সমস্যা। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মোকাবিলা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, পরিবেশ ও আমাজন বন সংরক্ষণ, জনসেবার মান উন্নয়ন, সরকারি অর্থব্যবস্থার ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ কমানোর মতো বিষয়গুলো তাঁর সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে ছিল।

একই সঙ্গে তাঁর সরকারকে এমন একটি সংসদীয় বাস্তবতার মধ্যে কাজ করতে হয়েছে, যেখানে রক্ষণশীল ও মধ্য-ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা থাকলেও সংসদে আইন পাস, বাজেট অনুমোদন এবং সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দলের সঙ্গে সমঝোতা প্রয়োজন হয়।

এ কারণে লুলার রাজনৈতিক জোট কেবল আদর্শগতভাবে একমত শক্তিগুলোর সমন্বয়ে গঠিত নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থে তাঁকে এমন দল ও গোষ্ঠীর সঙ্গেও কাজ করতে হয়, যাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পিটির সংগ্রামী ও ঐতিহ্যগত কর্মসূচির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

এখানেই লুলার রাজনৈতিক কৌশলের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়। তিনি সংগ্রামের পাশাপাশি সমঝোতাকেও রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন ও ধরে রাখার উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন। এই কৌশল তাঁকে নির্বাচনী জোট সম্প্রসারণে সাহায্য করেছে; কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর সরকারের সংস্কারের পরিধি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ব্রাজিলের মতো বৃহৎ ও বৈষম্যপূর্ণ সমাজে সামাজিক পরিবর্তন বাস্তবায়নের জন্য শুধু প্রেসিডেন্টের সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়। সংসদীয় সমর্থন, প্রশাসনিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক আন্দোলনের শক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।

তাই লুলার তৃতীয় মেয়াদের মূল্যায়নে প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তবায়নের ফলাফল, সামাজিক সূচক, সরকারি নীতি এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের ওপর তার প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।

লুলার রাজনীতি: সংস্কার, আপস ও বামপন্থী বিতর্ক

লুলার রাজনৈতিক জীবনকে ঘিরে বামপন্থী মহলে দীর্ঘদিনের একটি আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে: শ্রমিক আন্দোলন থেকে উঠে আসা একজন নেতা রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে কতটা কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারেন?

লুলার সমর্থকেরা মনে করেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার বাস্তব সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে তিনি দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সামাজিক সহায়তা, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকারের মতো ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের উদ্যোগ বহু মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

তাঁদের যুক্তি, একটি বৈষম্যপূর্ণ সমাজে সব পরিবর্তন একসঙ্গে সম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন অর্জন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সামাজিক কর্মসূচির জন্য সম্পদ সংগ্রহ করাও গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে লুলার রাজনীতি বাস্তববাদী সামাজিক রূপান্তর ও সংস্কারের উদাহরণ।

Manual2 Ad Code

অন্যদিকে বামপন্থী সমালোচকদের মতে, দরিদ্র মানুষের জন্য সহায়তা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ হলেও অর্থনৈতিক ক্ষমতার মূল কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে বৈষম্যের উৎস দূর করা যায় না। ভূমির মালিকানা, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের প্রভাব, বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর ক্ষমতা এবং উৎপাদনের উপায়ের ব্যক্তিগত মালিকানা—এসব প্রশ্নে মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব নয়।

এই সমালোচকেরা মনে করেন, পিটি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যে বিস্তৃত রাজনৈতিক জোট গঠন করেছে, তার কারণে দলটিকে অনেক ক্ষেত্রেই বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আপস করতে হয়েছে। ফলে শ্রমিক আন্দোলনের প্রাথমিক কর্মসূচির কিছু অংশ বাস্তবায়নের বাইরে থেকে গেছে।

তবে এই আলোচনা ও বিতর্কের মূল্যায়নে লুলার রাজনৈতিক বিকল্পগুলোও বিবেচনা করতে হবে। ব্রাজিলের সংবিধান, সংসদীয় ভারসাম্য, বিচারব্যবস্থা, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক পুঁজির প্রভাবের মধ্যে সরকার পরিচালনা করা সহজ কাজ নয়। রাজনৈতিক আপস কখনো সংস্কারের সুযোগ সৃষ্টি করে, আবার কখনো সেই সংস্কারের সীমা নির্ধারণ করে দেয়।

লুলার অভিজ্ঞতা তাই একদিকে সামাজিক গণতন্ত্র ও কল্যাণমূলক নীতির সম্ভাবনা দেখায়; অন্যদিকে বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে সংস্কারমূলক রাজনীতির সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করে।

ব্যক্তিগত নেতৃত্বের বাইরে শ্রমিক আন্দোলনের ভূমিকা

লুলার জীবনকে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের উত্থানের গল্প হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ। কিন্তু তাতে শ্রমিক আন্দোলনের সম্মিলিত ভূমিকা আড়াল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

লুলার রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে ছিল হাজার হাজার শ্রমিকের সংগঠিত প্রচেষ্টা, ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ড, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের অবদান। তাঁর নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু সেই নেতৃত্ব বিকশিত হয়েছিল একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।

১৯৭০-এর দশকের ধর্মঘট, ১৯৮০ সালে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৮০-এর দশকের গণতান্ত্রিক আন্দোলন দেখিয়েছে, সংগঠিত শ্রমিকশক্তি শুধু কর্মক্ষেত্রের দাবি আদায়ের জন্য নয়, জাতীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই অভিজ্ঞতা অন্য দেশগুলোর শ্রমিক আন্দোলনের জন্যও প্রাসঙ্গিক। শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দাবি ও রাজনৈতিক অধিকার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। মজুরি, কর্মঘণ্টা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা এবং সংগঠনের স্বাধীনতার প্রশ্ন বৃহত্তর গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।

তবে শ্রমিক আন্দোলনের রাজনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত করতে শুধু নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা যথেষ্ট নয়। দীর্ঘস্থায়ী সাংগঠনিক ভিত্তি, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা, কর্মসূচির ধারাবাহিকতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি।

লুলার অভিজ্ঞতা একই সঙ্গে এই সম্ভাবনা এবং সতর্কবার্তা সামনে আনে। শ্রমিক আন্দোলন রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছাতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার পর শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে সংগঠনের সম্পর্ক কীভাবে বজায় থাকবে, সেটিও একটি মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্ন।

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য শিক্ষা

ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। যদিও দুই দেশের ইতিহাস, রাজনৈতিক কাঠামো, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং সামাজিক বাস্তবতা এক নয়, তবু শ্রমিক অধিকার, দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক সুরক্ষা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের প্রশ্নে তুলনামূলক আলোচনা প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পোৎপাদন, রপ্তানি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শ্রমিকদের অবদান থাকলেও ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে।

ব্রাজিলের শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা দেখায়, শ্রমিকদের দাবি কার্যকরভাবে তুলে ধরতে স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক শ্রমিক সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ। তবে সংগঠনকে কেবল মজুরি নিয়ে দরকষাকষির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে বৃহত্তর সামাজিক নীতিতে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ সীমিত থেকে যেতে পারে।

দারিদ্র্য মোকাবিলায় সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এসব কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের বিকল্প নয়। মানসম্মত শিক্ষা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ন্যায্য শ্রমনীতি এবং সম্পদের সুযোগে অধিকতর ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।

আরেকটি শিক্ষা হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের বিভিন্ন স্তরে কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, তা উন্নয়নের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মোট দেশজ উৎপাদন বা রপ্তানি বৃদ্ধির হিসাব দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনমানের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। প্রকৃত মজুরি, দারিদ্র্যের হার, আয়ের বৈষম্য, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং সামাজিক সেবায় প্রবেশাধিকারের মতো সূচকও বিবেচনা করতে হয়।

তবে ব্রাজিলের কোনো একটি নীতি সরাসরি বাংলাদেশের ওপর প্রয়োগ করলেই একই ফল পাওয়া যাবে—এমন ধারণাও সঠিক নয়। প্রতিটি দেশের জন্য নিজস্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সামাজিক চাহিদা অনুযায়ী নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

অসমাপ্ত রাজনৈতিক যাত্রা

লুলা দা সিলভার জীবনকে এক বাক্যে সংক্ষেপ করা কঠিন। তিনি দরিদ্র পরিবারের সন্তান, শিল্পশ্রমিক, শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, সামরিক স্বৈরশাসনের বিরোধী, রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা, নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী, প্রেসিডেন্ট এবং কারাবন্দি রাজনীতিক—একাধিক পরিচয়ের মধ্য দিয়ে গেছেন।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হয়তো এই যে, তিনি ব্রাজিলের শ্রমজীবী মানুষের অভিজ্ঞতাকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। শ্রমিকের জীবন, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, মজুরি এবং সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নকে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেন।

তাঁর শাসনামলে সামাজিক উন্নয়নের কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগ, রাজনৈতিক সমঝোতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো এবং বামপন্থী কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। তাঁকে মূল্যায়ন করতে হলে তাই একদিকে তাঁর অর্জন, অন্যদিকে তাঁর সীমাবদ্ধতা—দুই দিকই বিবেচনা করতে হবে।

লুলার রাজনৈতিক যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন শ্রমিকের রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে ওঠা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত নিশ্চয়তা নয়। রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোয় পরিবর্তনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

একটি সমাজে দরিদ্র মানুষের জন্য নীতি গ্রহণ, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রমিকের অধিকার, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, কার্যকর গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হয়।

কারখানার শ্রমিক থেকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার মধ্য দিয়ে লুলা ইতিহাসে নিজের স্থান তৈরি করেছেন। তাঁর জীবন যেমন প্রমাণ করে, সংগঠিত মানুষের রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার দরজা খুলে দিতে পারে, তেমনি এটিও মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছানো সংগ্রামের শেষ নয়।

বরং সেখান থেকেই শুরু হয় আরও কঠিন প্রশ্ন: ক্ষমতা কার স্বার্থে ব্যবহৃত হবে, উন্নয়নের সুফল কারা পাবে, এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন কতটা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্থায়ী রূপান্তর ঘটাতে পারবে?

লুলা দা সিলভার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন এই প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর দেয় না। বরং ব্রাজিলের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং বামপন্থী রাজনীতির সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে প্রশ্নগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। এই কারণেই তাঁর জীবন কেবল ব্রাজিলের ইতিহাসের অংশ নয়; বিশ্বজুড়ে শ্রমিক আন্দোলন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান, এলএল.বি
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি; ’৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য;
বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য;
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি; বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশনের প্রাক্তন সভাপতি।

ই-মেইল: syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : +8801716599589

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ