সিলেট ৩১শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৯:২৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩০, ২০২৬
পিরোজপুরে তিন নারীর কবর খোঁড়ার ছবিটা এই দেশের ইতিহাস পাল্টে দেবে। তার আগে আপনাদেরকে একাত্তর সালের একটা ঘটনা বলি।
শেরপুরের নলিতাবাড়ি উপজেলার একটা গ্রামের নাম সোহাগপুর। ৭১ সালের ২৫ জুলাই সকালের দিকে স্থানীয় রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনী ওই গ্রামের ১৮৭ জন নিরীহ পুরুষকে হত্যা করেছিল, ধর্ষণ করেছিল ১৪ নারীকে। শুধু এক সকালে!
ওয়েল, ঘটনাটা একটু খুলে বলি। বলার পেছনে কারণ আছে।
সেদিন সকালে হঠাৎ খবর চাউর হয় যে, সোহাগপুর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নিয়েছে! ব্যস, স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় গ্রামের প্রফুল্ল দীঘি থেকে সাধুর আশ্রম পর্যন্ত ঘিরে ফেলল পাকিস্তানি বাহিনী। তিন চার ঘন্টা ধরে চলল তল্লাশি।
কিন্তু বাইরের কাউকে না পেয়ে শুরু করল তান্ডব। রমেন রিছিল, চটপাথাং, সিরিল গাব্রিয়েল, আনসার আলী, লতিফ মিয়া, ছফর উদ্দিন, শহর আলী, হযরত আলী, রিয়াজ আহমেদ, রহম আলী, সাহেব আলী, বাবর আলী, উমেদ আলী, আছমত আলী, মহেজ উদ্দিন, সিরাজ আলী, আবুল হোসেন। না সেদিন কেউ বাদ যায়নি। একে একে হত্যা করা হয় সেই গ্রামের ১৮৭ জন পুরুষকে। একটা গ্রামে তখন মানুষই ছিল কয়জন?
কেউ লাঙ্গল-জোয়াল নিয়ে ক্ষেতে আমন রোপনের জন্য যাচ্ছিলেন, কেউ কাজ করছিলেন বাড়িতে। সিরাজ আলী বসেছিলেন ক্ষেতের আইলে। মুহূর্তেই হানাদার বাহিনী পাখির মতো গুলি করে হত্যা করেছিল তাকে এবং আরও অনেক অনেক পুরুষকে। রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল আমনের মাঠ। পাঁচটি গুলি লাগার পরও মুমূর্ষু অবস্থায় পড়েছিল রহম আলীর ছেলে সিরাজুল। আর্তনাদ থামছে না দেখে ধারালো বেয়নেটের খোঁচায় তাকে স্তব্ধ করেছিল চিরদিনের জন্য।
এক পর্যায়ে দেখা গেল, আর কোনো পুরুষ মানুষ বেঁচে নাই ওই গ্রামে। গুণে দেখা গেল, ৬৭ জন নারী তাদের স্বামীকে হারিয়েছে! বাকিরা কেউ হারিয়েছে ভাই, কারো সন্তান। এরপর শুরু হলো ধর্ষণ। ১৪ নারীকে সবার সামনে ধর্ষণ করলো পাকিস্তানি বাহিনী। চারদিকে তখন কান্নার রোল। শুধু নারীকণ্ঠের আর্তচিৎকার।
কিছু মানুষকে মাটিচাপা দিয়ে হানাদার বাহিনীতো চলে গেলো। চারদিকে পড়ে থাকা বাকি মরদেহ দাফন করবে কে? এগিয়ে আসলো বেঁচে যাওয়া মানুষ, ওখানে থাকা নারীরা।
কেউ কলাপাতা নিয়ে আসলো, কেউ আনলো ছেঁড়া শাড়ি। মশারি দিয়ে কাফন পরিয়ে চার থেকে সাতটি করে লাশ এক একটি কবরে শুইয়ে দিয়েছে সেইসব নারীরা, যারা মাত্র কিছুক্ষণ আগে ধর্ষিত হয়েছে। সাথে স্বজন হারানোর গগন বিদারী চিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল সোহাগপুরের। পরে স্বামীহীন নারীদের সেই গ্রামের নাম পড়ে যায় “বিধবাপল্লী”।
২০১৮ সাল পর্যন্ত সেই ১৪ ধর্ষিতা নারীর ১২ জন বেঁচে ছিলেন, এখন আর কতজন আছেন জানিনা, সে বছর তারা সবাই পেয়েছিলেন বীরাঙ্গনার খেতাব! সেদিন আল বদর বাহিনীর যে কয়জন এই হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের একজন কামারুজ্জামান। যুদ্ধাপরাধে শাস্তি হওয়া জামাত নেতা। আরেকজনের নাম ডাক্তার কাদের। এই নারীরাই তাদেরকে চিহ্নিত করেছে।
তুই আজকের মেয়ে, স্বাধীন দেশে জন্ম নিয়ে প্রিভিলেজড, ঢাকা শহরের মাঝখানে রোকেয়া হলে বসে শিবির করিস না? যা সোহাগপুর, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে বেশি দূর না তো, ঘন্টাতিনেকের পথ। শুনে আয় তোর দাদী/নানীর বয়সী নারীর গল্প। কিসের বিনিময়ে এই দেশ নিয়ে এসেছেন তারা।
….
এই গল্প কেনো লিখলাম? রাজাকার সাঈদীর মামলার সাক্ষীর কবর খুঁড়তে দেয়নি জামাত।। এই ২৬ সালে৷ দুই বোন ও স্ত্রী মোবাইলের লাইট জ্বালিয়ে রাতের অন্ধকারে আধখোড়া কবরে মাটিচাপা দিয়েছে সেই মুক্তিযোদ্ধাকে! ৭১ এর ২৫ জুলাইও একই ঘটনা ঘটেছিল। নারীরা কবর খুঁড়েছিল ১৮৬ জন পুরুষের।
৭১ এ তোদের কি হাল হয়েছিল মনে আছে? সেই একই হাল হবে তোদের। আবার।
পিরোজপুরে তিন নারীর কবর খোঁড়ার দৃশ্য এই দেশের ইতিহাস পাল্টে দেবে। লিখে রাখেন।
#
(ছবি: সোহাগপুরের বিধবা নারীরা, যারা বীরাঙ্গনা খেতাব পেয়েছিলেন)।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি