দ্রুত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের পরামর্শ বাংলাদেশ ব্যাংকের

প্রকাশিত: ৫:৫৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৮, ২০২০

দ্রুত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের পরামর্শ বাংলাদেশ ব্যাংকের

ঢাকা, ১৮ জুলাই ২০২০: মহামারীতে বিশ্ব অর্থনীতির মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ‘বড় ধরনের’ সংকট দেখা দেওয়ার তথ্য তুলে ধরে এ থেকে উত্তরণে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

দেশের অর্থনীতির হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বৃহস্পতিবার ত্রৈমাসিক (জানুয়ারি-মার্চ) যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেখানে এই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাস মহামারীতে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে ক্ষতি হচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতে বেশ সময় লাগবে। বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে দ্রুত প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।

দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর মহামারীর প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে উদ্ধারে গত মার্চ থেকে কয়েক দফায় সরকার এক লাখ চার হাজার কোটি টাকার ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে।

প্রণোদনার এই অর্থ ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ হিসেবে পাবেন শিল্পোদ্যোক্তারা, ওই ঋণের সুদের অর্ধেক সরকার পরিশোধ করবে।

প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পর ব্যাংকগুলো অর্থ সঙ্কটের কথা তুললে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে তহবিল যোগানের উদ্যোগও নেওয়া হয়।

তবে এরপরও ঋণ দিতে ব্যাংকগুলো ধীর গতিতে চলছে বলে এফবিসিসিআইসহ ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠন অভিযোগ করে আসছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে।

মহামারী থেকে অর্থনীতি উদ্ধারে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ ছাড়ে ব্যাংকগুলোর গড়িমসি দেখে সময় বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত ২ জুলাই সব ব্যাংকের নির্বাহী প্রধানদের সঙ্গে গভর্নর ফজলে কবিরের এক বৈঠকের আলোকে ব্যাংকগুলোকে এই সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠানো হয়।

তাতে বলা হয়, প্রণোদনা প্যাকেজের বেশিরভাগ ঋণ চলতি জুলাই মাসের মধ্যে বিতরণ করতে হবে, অবশিষ্ট অংশ বিতরণ অগাস্ট মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে।

প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, “যে উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তেমন প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। সে কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বার বার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন থেকেও হতাশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
“সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, ব্যাংকগুলো বড় উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করলেও ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে চাচ্ছে না। অথচ এই মহামারীকালে এরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ব্যাংকগুলো যাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ঋণ দেয় সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।”

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, “ব্যাংকিং খাতের অবস্থা কিন্তু ভালো ছিল না। কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে আরও খারাপ হয়েছে। চলতি বছরে অধিকাংশ ব্যাংক মুনাফা করতে পারবে না। কিছু ব্যাংক লাভ করলেও খুব সামান্য হবে।

“আমাদের অতীত ইতিহাস মোটেই সুখকর নয়। বড়দের ঋণ দিলে সেই ঋণ ফেরত পাওয়া যায় না, খেলাপি হয়। এমনিতেই লাখ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আটকে আছে। প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণও যদি আটকে যায় তাহলে ব্যাংকগুলো আরও বিপদের মধ্যে পড়বে।”
সে কারণে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণ ব্যবস্থা কঠোর তদারকির মধ্যে রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন

বাংলাদেশ ব্যাংকের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের প্রতিবেদনে মহামারীকালের এই কঠিন পরিস্থিতিতে সরকারের আর্থিক ও রাজস্ব নীতি ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি কমাতে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়, করোনাভাইরাসের আগে দেশের সার্বিক অর্থনীতির পরিস্থিতি স্থিতিশীল ছিল। স্বাভাবিক গতিতেই এগোচ্ছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারীতে বিশ্ব অর্থনীতির গতি যেমন থমকে গেছে, তেমনই দেশের অর্থনীতিও স্লথ হয়ে পড়েছে। এতে পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

“সব মিলে মানুষের চলাচল সীমিত হয়ে পড়ার কারণে টাকার চলাচলও স্তিমিত হয়ে পড়েছে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি থেমে গেছে।”

অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির বিভিন্ন সূচকের হিসাব রাখার স্বার্থে পুরো অর্থবছরকে তিন মাস করে চার ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটি ভাগকে বলা হয় কোয়ার্টার বা প্রান্তিক।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ডিসেম্বর প্রান্তিকে অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে এগোচ্ছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে চীনে করোনাভাইরাসের বিস্তার ব্যাপক হওয়ায় বাংলাদেশেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। মার্চে এর প্রভাব আরও প্রকট হয়। যে কারণে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকেই দেশের অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) অর্থনীতির সূচকগুলোর তথ্য পাওয়া গেলে দেখা যাবে করোনাভাইরাসের আঘাত আরও কঠিন হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনাভাইরাসের প্রভাবে চলতি বছরের এপ্রিল-মে মাসে রপ্তানি আয় ও আমদানি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধিতে মন্দা দেখা দেয়। দেশব্যাপী লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বড় ধরনের হোঁচট খায়। এই অবস্থায় বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

বিশ্বব্যাপী অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম পড়ে যায়। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম অর্ধেকে নেমে যায়। এতে মধ্যপ্রাচ্যের তেলনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে মারাত্মক ধস নামে। তেল কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোর আয় কমে যায়। ফলে অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে প্রতিবেদনে আভাস দেওয়া হয়।

এতে বলা হয়, গত অর্থবছরের শুরুর প্রান্তিক অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়েই শিল্প উৎপাদনের গতি ছিল নিম্নমুখী। পরের দুই প্রান্তিকে অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে সামান্য বেড়েছে।

গত অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে যোগাযোগ খাতের কার্যক্রম ২৫ শতাংশ থেকে কমে ১০ শতাংশে নেমেছে। কমেছে অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যও।

প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনাভাইরাসের প্রভাবে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে মূল্যস্ফীতির হার সামান্য বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে খাদ্য বহির্ভূত খাতের মূল্যস্ফীতির হার। খাদ্য খাতের মূল্যস্ফীতির হারও বেড়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, করোনাভাইরাসে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি স্তিমিত হয়ে পড়ায় বাজারে টাকার চাহিদা কমে যায়। ফলে টাকার প্রবাহও কমে যায়। টাকার প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ শতাংশ। সেটি গত প্রান্তিকে বেড়েছে ১২ শতাংশ। ওই সময়ে সরকারি খাতে টাকার প্রবাহ বেড়েছে এ খাতের ঋণের চাহিদা বাড়ায়।

সরকারের রাজস্ব আয় কম হওয়ার কারণে ঋণের চাহিদা বেড়েছে। ফলে গত অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি ঋণ নিতে হয়েছে। এদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের কর্মকাণ্ডের গতি কমে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে।