বাঙালির সংস্কৃতি বহুত্ববাদী

প্রকাশিত: ২:৫৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৩, ২০২৬

বাঙালির সংস্কৃতি বহুত্ববাদী

Manual3 Ad Code

ড. মাসুদুজ্জামান |

বাঙালি সংস্কৃতি অনেক সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। পৃথিবীতে এরকম সমৃদ্ধ সংস্কৃতি খুব কমই আছে। বাঙালির সংস্কৃতি মূলত বহুত্ববাদী বা বহুমুখী সংস্কৃতি। বহু জাতি, বহু ধর্ম, বহু সম্প্রদায়, বহু নৃগোষ্ঠী, বহু ভাষা এর সঙ্গে মিলেমিশে আছে বলেই আমরা এর বহুমুখী চমৎকার প্রকাশ লক্ষ করি। এককথায় বললে, বাঙালি সংস্কৃতি হচ্ছে মিশ্র সংস্কৃতি। এটাই এর সৌন্দর্য।

ঐতিহাসিক কাল থেকে যদি দেখি, এখানকার আদি বাশিন্দারা ছিলেন নিম্নবর্গের মানুষ। পৃথিবীর অন্যান্য এলাকার মানুষের মতোই এই আদিম মানুষদের – যারা বাঙালিদের পূর্বসুরি – কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্ম ছিল না। কারণ, তখনও আধুনিক কোনো ধর্মের আবির্ভাব পৃথিবীতে ঘটেনি। পরে এদেরই একটা বড় অংশ প্রথমে বৌদ্ধ এবং আরও পরে আরেকটা অংশ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। কীভাবে এটা ঘটেছিল, কীভাবে এই অঞ্চলের নিম্নবর্গের মানুষেরা নানান ধর্মের অধীনে এসেছিলেন, বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব সম্পর্কে চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন আকবর আলী খান ও আহমদ শরীফ।

বাংলাদেশের সংস্কৃতির সমৃদ্ধ হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের প্রকৃতি এত বিচিত্র আর এত দ্রুত রূপ বদল করে যে, এখানে যা কিছু পুরাতন তা দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারে না। যেমন ঋতু-পরিক্রমের কথাই বলি। এদেশে বার মাসে ছয়-ছয়টা ঋতু। মরু-অঞ্চলে একটাই ঋতু – গ্রীষ্ম। ইউরোপে শীত জাঁকিয়ে বসে থাকে প্রায় নয় মাস, গ্রীষ্ম-বসন্তের আয়ু মাত্র তিন-চার মাসের। ঋতু সেই দুটি। কিন্তু বাংলাদেশে ঘন ঘন ঋতু পরিবর্তনের কারণে গাছ-লতা-গুল্ম নিত্য নবীন হয়ে ওঠে। সৃষ্টির মধ্যে সবসময়ই নতুনের আবির্ভাব ঘটে। এই নতুনত্বের প্রভাবে মানুষের মনও সজীব হয়ে ওঠে। তার জীবনে জাগে আনন্দ। এই যে নব নব লীলার প্রকাশ, এর সবই হচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতির ঐশ্বর্য, বৈভব – ‘নব নবরে নিতুই নব নব’।

বাঙালি সবসময় তাই তার জীবনকে বিচিত্র রাগিনীতে ভরিয়ে তোলে, সেই নতুনকে সাদরে বরণ করে নেয়। আর বরণ মানেই তো উদযাপন। এই উদযাপনেরও আছে বিচিত্র প্রকাশ। এরই অংশ হিসেবে বাঙালিরা নানান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষকে বরণ করবার ঐতিহ্য এভাবেই চলে আসছে আমাদের এই জনপদ ও জনজীবনে। বাঙালি জানে জীবনকে কীভাবে উপভোগ করতে হয়।

আজ বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে বছরের শেষ দিন, অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তি। ঋতুরাজ বসন্তেরও শেষ দিন। লক্ষণীয়, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাবে উৎসবও। বসন্তে ছিল বসন্ত উৎসব, এবার হবে নববর্ষকে বরণ করে নেয়ার উৎসব। বাংলা সনটি শেষ রাগিনীর বিষাদ বিধুর সুর আর আসন্ন নববর্ষের আনন্দগীতে ভরে উঠবে। আবার ঋতুচক্রের পরিক্রমায় শুরু হবে গ্রীষ্মকাল। কিন্তু চৈত্র সংক্রান্তি পালন করা হয় পুরানো বছরকে শুধু বিদায় জানাবার জন্য নয়, বরং আগের বছরের সঙ্গে পরের বছরের যোগসূত্র রচনা করবার জন্য। কী চমৎকার ভাবনা। দিনটি পালিত হবে মানুষের শরীর ও প্রকৃতির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের লক্ষ্যে। প্রকৃতির দাক্ষিণ্যে পাওয়া মৌসুমী শাক-সব্জি কুড়িয়ে এনে পাতা-মুড়া ইত্যাদি খেয়ে চৈত্র সংক্রান্তি পালনের রীতি এদেশের মানুষ – ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে – পালন করে আসছে যুগ যুগ ধরে। এই ধরিত্রী, এই প্রকৃতি, তার সহজ-সরল জীবনযাপনই মানুষকে এটা শিখিয়েছে। এর সঙ্গে ধর্মের কোনো যোগ নেই। যোগ আছে প্রাকৃত জীবনের। নও-মুসলমানরা এই ইতিহাস জানেন না। তারা যা কিছু শিখেছেন, তা শুধু পশ্চিম এশিয়ার মরু-অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে পাওয়া। ধর্মের নামে তারা জানেন না বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির শিকড়টা কোথায়।
ঢাকাসহ সারা দেশে, সমস্ত বাঙালি জনপদে, সাধারণ মানুষ আজ চৈত্র সংক্রান্তি পালন করবে, সেই সঙ্গে প্রস্তুতিও চলবে নববর্ষ বরণের।

রাত পোহালেই গাজনের উৎসবে গ্রাম বাংলা উদ্বেল হয়ে উঠবে। এই উৎসব মূলত হাড়ি, বাগদি, বাউড়ি, ডোম, মুচি প্রভৃতি ‘নিম্নবর্ণের’ মানুষের উৎসব। এরা কারা? এরাই তো আমাদের এখানকার আদি বাশিন্দা। এরাই তো বাঙালি মুসলমানের পূর্বপুরুষ। নৃতত্ব আমাদের সেকথাই বলে। এই নিম্নবর্গের মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, সদগোপ প্রভৃতি শ্রেণিও এই উৎসবে সক্রিয়ভাবে যোগ দেবে।
কিন্তু ‘ধর্মান্তরিত’ বাঙালি মুসলমান? তারা কি বাদ পড়বেন? না, নিজের ঐতিহ্য থেকে তো মানুষ বিচ্যুত হতে পারে না। তাদের পূর্ব-পুরুষেরা যে উৎসব পালন করে এসেছেন, তারাও সেই ধারাবাহিকতায় পালন করবেন চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব। অন্তত সেটাই চলে আসছে বহুকাল ধরে। চৈত্র সংক্রান্তি এখন তাই সর্বধর্মের, সর্বশ্রেণির মানুষের উৎসব। এই উৎসবের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে প্রাকৃত জীবন ও প্রকৃতির। এরই প্রভাবে নববর্ষ উদযাপন করে সব ধর্মের বাঙালিরা। ‘হালখাতা’র ঐতিহ্য এভাবেই এখনও বহমান রয়েছে। যা কিছু পুরাতন, যা কিছু জীর্ণ, ক্লিষ্ট করেছে বিগত দিনগুলোকে, তাকে অতিক্রম করে ঐশ্বর্য়মণ্ডিত দিনের আশায় বাঙালি বরণ করবে নতুন বছরকে। ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হচ্ছে এরই প্রতীকী বরণোৎসব।

মহাকাল আদি-অন্তহীন। এক একটা দিন, মাস, বছর ক্রমশ মহাকালের গহ্বরে বিলীন হয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের দৃষ্টি থাকে ভবিষ্যতের দিকে। আগামীকালের নতুন সূর্য কী নতুন বার্তা বয়ে আনবে, তারই অপেক্ষায় থাকে মানুষ। নববর্ষের এটাই হচ্ছে দার্শনিক দিক, জীবনের সঙ্গে যার গভীর সম্পর্ক। ধর্মের সঙ্গে নয়। কাজেই যারা ইসলাম ধর্মাবলম্বী, তাদের এই উৎসব পালনের জন্যে দ্বিধা থাকার কোনো কারণ নেই। চৈত্র সংক্রান্তিই বলি আর নববর্ষ, এই উৎসব বাঙালির উৎসব, এই অঞ্চলের মানুষের যুগ যুগ ধরে পালিত উৎসব। আসুন, আমরা উৎসব পালন করি। বরণ করে নিই নতুন আরেকটি বছরকে।

Manual8 Ad Code

আমি এ উপলক্ষে সবাইকে চৈত্র সংক্রান্তি আর নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। মঙ্গল হোক সবার।

#
ড. মাসুদুজ্জামান
#

বহুত্বের বর্ণিল বয়ন
—সৈয়দ আমিরুজ্জামান

বহু স্রোতের মিলনধারা, এই যে বাঙালির প্রাণ,
নদীর মতো বয়ে চলে যুগে যুগে অজস্র জ্ঞান।
ধর্ম-জাতি-ভাষা-গোত্রে ভিন্নতার রঙিন ঢেউ,
একই তটে এসে মেশে—সেখানে নেই ভেদ কেউ।

প্রাচীন কালের আদি মানুষ, মাটির সঙ্গে মিশে ছিল,
বনের মাঝে জীবন গড়ে, প্রকৃতিরই দীক্ষা নিল।
ছিল না কোনো বাঁধাধরা ধর্মের কঠোর বিধান,
সূর্য, নদী, বৃক্ষ, আকাশ—এই ছিল তাদের জ্ঞান।

তারই পরে সময় বয়ে বৌদ্ধধর্ম এলো ধীরে,
মানবতার বাণী নিয়ে শান্তির অমল নীড়ে।
আরো পরে ইসলামের ডাক ভেসে এল দূর মরুতে,
মানুষ তখন গ্রহণ করল নিজস্বতার সুর মিশাতে।

Manual7 Ad Code

এই যে মিলন, এই যে রীতি, এই যে বহুরূপী সুর,
এটাই বাঙালির সংস্কৃতি—অম্লান, অক্ষয়, ভরপুর।
একটি ধারা নয়কো শুধু, হাজার নদীর সম্মিলন,
এতেই গড়ে উঠেছে এই বাংলার চিরচেনা মন।

বাংলার মাটি ঋতুর ছোঁয়ায় বদলায় রঙ বারোমাস,
ছয় ঋতুর এই খেলাঘরে নবীনতার অবিরাম বাস।
শীতের কুয়াশা, গ্রীষ্মের দাহ, বর্ষার গর্জনধ্বনি,
শরৎ-হেমন্ত-বসন্তে মেলে রঙিন স্বপ্নখানি।

এই পরিবর্তন, এই নবত্ব প্রাণে আনে উল্লাস,
জীবন জুড়ে উৎসব ছড়িয়ে করে অন্তর উদাস।
বাঙালি তাই বাঁচতে জানে রঙে-রসে গান গেয়ে,
দুঃখকেও উৎসবে বদলায় আনন্দের সুর বেয়ে।

চৈত্র শেষে বিষণ্ণ সুরে ঝরে পড়ে বছরের গান,
পুরোনো সব ক্লান্তি মুছে নতুন দিনের আহ্বান।
সংক্রান্তির সেই প্রভাতে মাটির গন্ধ মিশে যায়,
শাক-সবজি, পাতা-মুড়ায় প্রাচীন রীতি বেঁচে রয়।

ধর্ম সেখানে দেয় না বাঁধা, দেয় না কোনো প্রাচীর তোলা,
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর যোগের কথা বলা।
এই উৎসব সকলেরই—ধনী, গরিব, সবই এক,
এখানে নেই বিভেদরেখা, নেই কোনো সংকীর্ণ রেখ।

গাজনের ঢাক বাজে তখন গ্রামবাংলার মাঠে ঘাটে,
নিম্নবর্গের মানুষগুলি আনন্দে যায় নেচে-গেয়ে।
হাড়ি-বাগদি-ডোম-মুচিরা ইতিহাসের প্রাচীন ধ্বনি,
তাদের সাথেই যুক্ত হয়েছে বাঙালির এই চিরজানি।

Manual6 Ad Code

উচ্চবর্ণ আর নিম্নবর্ণ মিশে যায় এক স্রোতের ঢেউ,
সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন ভাঙতে পারে না কভু কেউ।
ধর্মান্তরিত মানুষেরাও ভুলে না তাদের শিকড়,
পুরোনো সেই উৎসব ধারা বয়ে চলে অবিরত।

Manual2 Ad Code

নববর্ষের প্রভাত আসে আলোর রথে চড়ে,
নতুন দিনের প্রত্যাশা নিয়ে হৃদয় তখন ভরে।
হালখাতার সেই প্রথা আজও স্মৃতিতে জাগে নতুন,
পুরোনো দেনা মুছে ফেলে শুরু হয় জীবনের গুণ।

মঙ্গল শোভাযাত্রা তখন রঙিন স্বপ্নের প্রতীক,
বহুত্বেরই গর্ব নিয়ে এগিয়ে চলে অদম্য দিক।
মুখোশ, রঙ, আলপনায় আঁকা ইতিহাসের বর্ণনা,
মানুষ সেখানে খুঁজে পায় নিজের চিরপরিচয়খানা।

সময়ের স্রোত থেমে থাকে না, বিলীন হয় দিন মাস বছর,
তবুও মানুষ তাকিয়ে থাকে আগামীরই উজ্জ্বল প্রহর।
নতুন সূর্য কী বার্তা আনে, সেই আশাতেই পথচলা,
জীবন মানে সামনে যাওয়া, অতীত পেরিয়ে গড়া ভেলা।

এই নববর্ষ সেই আহ্বান—ভাঙো সব জীর্ণতা,
মুছে ফেলো ক্লান্ত দিনের বিষাদময় স্মৃতিচিহ্নতা।
আসুক নতুন প্রাণের স্রোত, আসুক নতুন গান,
বহুত্বেরই ঐক্যবাণী হোক আমাদের পরিচয়দান।

বাঙালি তাই চিরদিনই বহুরূপের সন্তান,
ভিন্নতায় সে খুঁজে পায় ঐক্যেরই মহান জ্ঞান।
সংস্কৃতির এই মহিমা রাখুক বিশ্বমাঝে স্থান,
এই হোক আমাদের শপথ, এই হোক চিরগান।

চৈত্র সংক্রান্তির প্রভাতে আর নববর্ষের ডাকে,
সব বিভেদ ভুলে যাই আমরা একসাথে হাতে হাতে।
মানুষ হোক মানুষেরই, এই হোক সত্য বাণী,
বাঙালির এই বহুত্বেই লুকিয়ে তার প্রাণখানি।

মঙ্গল হোক সকলেরই, এই প্রার্থনা আজ করি,
নতুন দিনের সূর্যোদয়ে সুখের আলো ভরি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ