বাজেট আলোচনায় স্বাস্থ্য খাতের কঠোর সমালোচনাসহ দেশে করোনার টিকা আসার অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরলেন মেনন

প্রকাশিত: ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৫, ২০২১

বাজেট আলোচনায় স্বাস্থ্য খাতের কঠোর সমালোচনাসহ দেশে করোনার টিকা আসার অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরলেন মেনন

Manual6 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা, ১৫ জুন ২০২১ : সংসদে প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি জননেতা কমরেড রাশেদ খান মেনন স্বাস্থ্য খাতের কঠোর সমালোচনা করেছেন। দেশে করোনার টিকা আসার অনিশ্চয়তার কথাও বলেন ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ এই নেতা।

তিনি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করলেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়িত না হওয়ার জন্য আক্ষেপ করেন। বাজেট আলোচনায় তিনি হেফাজতেরও কঠোর সমালোচনা করেন।

সোমবার (১৪ জুন ২০২১) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কমরেড রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, ‘কোভিড ১৯ মোকাবিলায় জীবন ও জীবিকা রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী যে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা বিশ্বে প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিন্তু দেশে অতিধনী সামরিক-বেসামরিক আমলাগোষ্ঠী ও দুর্নীতিবাজদের পাকচক্রে প্রধানমন্ত্রীর সেই প্রয়াস অনেকখানিই নিষ্ফল হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘মানুষের জীবন রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, আমলাতান্ত্রিক খবরদারিত্বে বাস্তবে রূপ নিতে পারেনি। করোনা রোধে স্বাস্থ্য খাত বিশেষজ্ঞদের পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিক নির্দেশে পরিচালিত হওয়ায় কী ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল, তা আমরা দেখেছি।  চোখের সামনে দেখেছি মাস্ক,পিপিই, করোনা টেস্ট নিয়ে জাল-জালিয়াতি। একজন শাহেদ, একজন সাবরিনা গ্রেফতার হয়েছে, কিন্তু যারা সচিত্র চুক্তি সই করলো, কাজ দিলো তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে।’

কমরেড মেনন বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রথমেই টিকা সংগ্রহ করে সফলভাবে গণটিকা কার্যক্রম শুরু করেছিল। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে টিকা সরবরাহের পরিণতি আমরা দেখছি। টিকা নিয়ে আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছি। আগামী মাসগুলোতে টিকা আসবে তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। দেশের ১২ কোটি মানুষের জন্য টিকা ব্যবস্থা করতে না পারলে করোনা সংক্রমণ রোধ হবে না। এই টিকা সরকারকেই সংগ্রহ করতে হবে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী অথবা বাণিজ্যিকীকরণের জায়গা নাই। দেশে টিকা উৎপাদনের যে সক্ষমতা আছে, তাকে কাজে লাগাতে হবে।’ অর্থমন্ত্রী বাজেটে টিকাদানের কোনও রোডম্যাপ দেননি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

কমরেড রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, ‘করোনাকালে আড়াইকোটি মানুষ যারা দরিদ্র হয়ে গেলেন, বাজেট তাদের জন্য কিছু করেনি। করোনায় প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্রস্তাবের ৩৫% অর্থ বিতরণ হয়নি। যে গরিব মানুষের জন্য দুই দফায় ২৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে, তার এক তৃতীয়াংশ অব্যয়িত, তারা পায়নি।’

Manual3 Ad Code

তিনি বলেন, অর্থনীতির ড্রাইভিং সিটে ব্যক্তি খাতকে বসাবেন বলে যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা সংবিধানবিরোধী।

Manual3 Ad Code

কমরেড রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, ‘জিয়া-এরশাদ যা করতে পারেনি, অর্থমন্ত্রী সে কথাই জোরগলায় বললেন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে অর্থনীতি সংবিধানের উল্টো পথে চলছে। তাহলে বরং খোলামেলাই ঘোষণা দিন— বঙ্গবন্ধু প্রবর্তিত এই সংবিধান অচল।’

Manual3 Ad Code

কমরেড মেনন বলেন, ‘করোনাকালে ভারতের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ যেখানে ১৩৩% ভাগ বাড়ানো হয়েছে, আমাদের বাজেটে বাড়ান হয়েছে ১৩% ভাগ— যা জিডিপির ১% শতাংশের কিছু বেশি। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় যেখানে বেশি, সেখানে মাথাপিছু স্বাস্থ্যব্যয়ে বাংলাদেশ পাকিস্তানেরও পেছনে। বর্তমান বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের ৩৫% ব্যয় হয়নি। গবেষণার ১০০ কোটি টাকা পুরোটাই রয়ে গেছে। স্বাস্থ্য খাতে ক্রয়ে দুর্নীতির কথা বলে সংসদকে ভারাক্রান্ত করতে চাই না।’

Manual3 Ad Code

কমরেড মেনন তার বক্তব্যে বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে ৫ লাখ ছেলেমেয়ের লেখাপড়া করাচ্ছে, তাদের ওপর ১৫% কর চাপানো হয়েছে, যা শেষ বিচারে শিক্ষার্থীদের ওপরে পরবে।’

তিনি বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বর্ধিত বরাদ্দের একটা বড় অংশ সরকারি কর্মচারীদের পেনশন। বাজেটে আদিবাসী, দলিত, ভূমিহীন, প্রান্তিক চাষি উপেক্ষিত তাদের কথা নাই।’

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা হেফাজতের তাণ্ডব দেখেছি। দেখেছি কীভাবে তারা কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের ব্যবহার করে একটা অভ্যুত্থান ঘটাতে চেয়েছিল। তারা যে বিএনপির সমর্থন পেয়েছিল, এটা এখন দলের মহাসচিবের কথায় স্পষ্ট।’

তিনি বলেন, ‘‘কওমি মাদ্রাসাকে শিক্ষার মূল ধারায় নিয়ে আসার বিষয়ে সংসদে বলেছিলাম— আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, আমরা ‘বিষবৃক্ষ’ লালন করছি কিনা। তার প্রতিক্রিয়ায় হেফাজত মিছিল করে আমার ফাঁসি চেয়েছে। এই সংসদে জাতীয় পার্টির এমপি আমি ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ গেয়েছি বলে উপহাস করেছিলেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী হেফাজতের সমর্থনে তাদের ভারতের দেওবন্দের অনুসারী বলে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা বলে— বাবুনগরী পাকিস্তানি মাদ্রাসার ছাত্র।  ইজাহার হুজির সদস্য ‘আফগান যুদ্ধ ফেরত তালেবান’ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তাণ্ডবের নায়ক সাজাদ্দুর রহমান, মোবারক মোল্লা সবাই তালেবান অনুসারী। আমরা বাংলাদেশে আরেকটি তালেবানি অভ্যুত্থান দেখতে চাই কিনা, সেটা দেখার বিষয়।’’

পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মার্কিন অথবা অন্য কারও নেতৃত্বধীন জোটে যোগদান, আমাদের সংবিধান সমর্থন করে না। আর যুক্তরাষ্ট্র যার বন্ধু, তার শত্রুর প্রয়োজন নাই। বাংলাদেশের পাসপোর্ট থেকে ইসরাইল ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি প্যালেস্টইন সম্পর্কে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু আমল থেকে অনুসৃত নীতির বিপরীত। ভুল বার্তা দেয়। পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, সেই ব্যাখ্যা তাদের দিতে হবে। ওয়ার্কার্স পার্টির তরফ থেকে প্যালেস্টাইনের স্বাধীন অস্তিত্বের পক্ষে অবস্থান পুনরুক্তি করছি।’

‘গার্ড অব অনার’ নিয়ে নারী ইউএনওদের বিরোধিতার বিষয়ে  সংসদীয় কমিটির বিরোধিতার সমালোচনা করে মেনন বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সংসদীয় কমিটি মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনার দেওয়ায় নারী কর্মকর্তাদের না রাখতে বলেছেন। এটা নাকি ধর্মবিরোধী কাজ। জানাজায় মাহিলারা অংশগ্রহণ করতে পারেন না বলে ফতোয়াও দিয়েছে। এই ফতোয়া দেওয়ার যোগ্যতা তারা রাখেন না। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীকে বলবো— এই বিষয়ে যেন কোনোরকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা না হয়। এটা হলে তা হবে মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কাজ।’

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ