শালবৃক্ষের মতন সিনা টান করে সে মানুষ হয়ে বাঁচতে পীরেন জান দিয়েছে

প্রকাশিত: ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১০, ২০২১

শালবৃক্ষের মতন সিনা টান করে সে মানুষ হয়ে বাঁচতে পীরেন জান দিয়েছে

Manual6 Ad Code

| মোহাম্মদ রফিক | ঢাকা, ১০ ডিসেম্বর ২০২১ :

শালবৃক্ষের মতন সিনা টান করে সে
মানুষ হয়ে বাঁচতে পীরেন জান দিয়েছে

Manual2 Ad Code

মাদলের গান

“১৯৬২ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভণর আজম খান মধুপুর বনে ৪০ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে ন্যাশনাল পার্ক বা জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠার প্রকাশ্য ঘোষণা করে এবং এই ঘোষণার প্রেক্ষিতে প্রায় ২১ হাজার একর এলাকায় যেখানে হাজার হাজার মান্দিরা বসবাস করছে সেখানে কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়।

Manual5 Ad Code

১৯৬৮ সালে গভর্ণর ও বনমন্ত্রী কোন রকম ক্ষতিপূরণের আশ্বাস ব্যতিরেকেই চুনিয়া গ্রামের মান্দিদের প্রথম উচ্ছেদ নোটিশ এবং ১৯৬৯ সালে জাতীয় উদ্যান প্রকল্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক চুনিয়া গ্রামে দ্বিতীয় উচ্ছেদ নোটিশ জারি করে।

Manual4 Ad Code

১৯৭১ সালে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামে শালবনের বাসিন্দারাও ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকসেনাদের বিরুদ্ধে। হাতে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র, লড়েছিল জীবন বাজি রেখে। শহীদ হয়েছিলেন অনেক আদিবাসী নারী-পুুরুষ। কিন্তু স্বাধীসতা সংগ্রামের পরেও শালবনের আদিবাসীদের উপর রাষ্ট্রীয় আচরনের তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। বনের অধিবাসীদের বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী আমলের সমস্ত কালাকানুনই থেকে যায় অপরিবর্তিত। ১৯২৭ সালের`The colonial Forest Act’ পাল্টায় না, চরিত্র বদল হয় না বনবিভাগের, বনমন্ত্রীর বা রাষ্ট্রযন্ত্রের। মাঝে মাত্র তিনবছর বাদ দিয়ে ১৯৭৪ সাল থেকেই আবার পুরোদমে শুরু হয়ে যায় বনবাসীদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদের রকমারি সব কৌশলাদির বহুমাত্রিক প্রয়োগ। মাঝে মধ্যেই নানান অজুহাতে ফলবাগান, ধানীজমি সবকিছুই তছনছ করে দিয়ে যেত বনকর্মকর্তাদের নেতৃত্বে বনরক্ষীরা। বনের অধিবাসীরা স্থানীয় থানায় মামলা করতে গেলেও সেই মামলা গ্রহণ করা হত না।

১৯৭৭ সালে বনবিভাগ কর্তৃক শালবনের ভিতর কৃত্রিম লেক তৈরির নামে কোচ-মান্দিদের উচ্ছেদ প্রক্রিয়া, ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ন্যাশনাল পার্ক প্রকল্পের আওতাধীন এলাকায় হাজার হাজার বছর ধরে বসবাসরত অধিবাসীদের উচ্ছেদ নোটিশ জারি করে। একই বছর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কর্তৃক ভেড়া চড়ানোর নাম করে শালবন এলাকার চাপাইদ গ্রামে আদিবাসীদের ভূমি দখল করে নেয়।

১৯৮১ সালে ময়মনসিংহ বিভাগীয় বনকর্মকর্তার বিট অফিস প্রতিষ্ঠা ও তুঁত গাছ রোপনের নামে শালবনের মান্দিদের ১০৮ একর জমি দখল করে নেয় বনবিভাগ। আর এই দখল কার্যের জন্য বনবিভাগ প্রায় দুইশত বাঙালি মুসলমানকে জয়নাগাছা, বন্দেরিয়চলা, কেজাই গ্রামে নিয়ে আসে।

Manual5 Ad Code

১৯৬২ সালের তৎকালীন গভর্ণর আজম খান কর্তৃক ঘোষিত ন্যাশনাল পার্ক প্রকল্পের সার্থক বাস্তবায়ন ঘটে ১৯৮২ সালে স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনামলে। সরকারি ভাবেই তখন মধুপুর গড়ের ২০,৮৩৭.২৩ একর বনভূমি নিয়ে মধুপুর জাতীয় উদ্যান ঘোষণা দেওয়া হয়।

১৯৮৪ সালে আবার শালবন দখল হয় নতুন নামে নতুন ভাবে। শালবনের পরিবেশ-প্রতিবেশের কথা বিন্দুমাত্র না ভেবেই টেলকীপাড়া ও নয়াপাড়া গ্রামে বনকে ধ্বংস করে মান্দিদের নিজ জমিতে বিমান বাহিনীর জন্য ফায়ারিং রেঞ্জ প্রতিষ্ঠা করা হয়। মান্দিরা সাথে সাথেই এর বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিল তাদের নিয়মতানিত্রক প্রতিরোধ। কিন্তু এই প্রতিরোধে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেনি বন রক্ষার প্রতিষ্ঠান বনবিভাগ বা রাষ্ট্রযন্ত্র।

১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে তদানীন্তন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৯৭.৩ মিলিয়ন টাকার মধুপুর জাতীয় উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্পের (Modhupur National Park Development Project) আওতায় ফরেষ্ট কনজারভেশন ও ইকোটুরিজম স্কীমের সরকারী অনুমোদন লাভ করে। পরবর্তীতে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়।

২৩ ডিসেম্বর ২০০৩ সালে গায়রাতে অনুষ্ঠিতব্য সমাবেশ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় ৩ জানুয়ারি ২০০৪ সালে ইকোপার্ক বিরোধী মিছিলের। মিছিলটি কিছুদুর অগ্রসর হওয়ার পরপরই পুলিশ ও বনরক্ষীদের নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু হলে ঘটনা স্থলেই নিহত হন জয়নাগাছা গ্রামের বিশ বছরের যুবক পীরেন স্নাল”

-মৃত্তিকা

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ