কারফিউর মাঝে ছেলেকে নিয়ে এক স্নায়ুক্ষয়ী যাত্রা!

প্রকাশিত: ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২০, ২০২৫

কারফিউর মাঝে ছেলেকে নিয়ে এক স্নায়ুক্ষয়ী যাত্রা!

Manual4 Ad Code

এম এ রকিব |

কারফিউর মাঝে ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তায় ছেলেকে নিয়ে এক স্নায়ুক্ষয়ী যাত্রা-

Manual8 Ad Code

২০ জুলাই ২০২৪, শনিবার। জীবনের অন্যতম কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল আমাকে। এদিন আমার একমাত্র ছেলেকে শ্রীমঙ্গল থেকে রাজধানী ঢাকা পৌঁছে দিতে হবে। কারণ, পরদিন ২১ জুলাই তার নিউইয়র্কগামী ফ্লাইট, কুয়েত এয়ারওয়েজে আকাশযাত্রা। সে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে, মেডিকেল সায়েন্সে পড়াশোনা করতে। কিন্তু এমন এক সময়ে, যখন দেশজুড়ে চলছে ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা আর মৃত্যুপুরী পরিবেশ।

এদিন রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশত মানুষ। তার আগের দিন (১৯জুলাই) একই সংখ্যা প্রাণ হারিয়েছেন। সংঘর্ষের সময় আহত হয়েছেন কয়েক হাজার ছাত্র-জনতা। সেদিন সহকর্মী সিলেটের সাংবাদিক এটিএম তুরাব পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যায় এক হাজারের বেশি কয়েদি। ঢাকার যাত্রাবাড়ি-শনিরআখড়া এলাকায় পুলিশ-আন্দোলনকারীদের মাঝে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, এতে বহু লোক নিহত ও আহত হন। এছাড়া সারা দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতেও ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনী নামানো হয় মাঠে, জারি করা হয় কারফিউ।

Manual7 Ad Code

সারা দেশের ন্যায় শ্রীমঙ্গলের রাস্তাঘাট ফাঁকা, দোকানপাট বন্ধ। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হননি। যারা বের হয়েছেন, তাদের চোখেমুখে আতঙ্ক। আমি একজন ক্ষুদ্র গণমাধ্যমকর্মী, তাই কারফিউতে চলাচলে বাধা না থাকায় বাইরে বেরিয়ে এসব দৃশ্য আরও গভীরভাবে অনুভব করেছি।

ছেলেকে নিয়ে ঢাকা যেতে হবে এই তাগিদে কাছের বন্ধুদের অনুরোধ করলাম সঙ্গে যাওয়ার জন্য। কেউ রাজী হলো না। কারও পারিবারিক নিষেধাজ্ঞা, কারও স্পষ্ট জবাব ‘এই অবস্থায় যাওয়া অসম্ভব।’ পরিচিত গাড়িচালকদের ফোন করলাম। তাদেরও একই কথা।

Manual7 Ad Code

শেষ ভরসা ছিল বন্ধু বিণয়, তখন সে শ্রীমঙ্গল থানার অফিসার ইনচার্জ। তার সাথে আলাপ করলে সে সাহস দিয়ে বলল, ‘প্রেস কার্ড সঙ্গে রাখিছ, ছেলের পাসপোর্ট-টিকিট-তো আছেই, সমস্যা হলে ফোন দিস।’ কিছুটা ভরসা পেয়ে প্রেসক্লাব সভাপতির সঙ্গে পরামর্শ করলাম, তিনিও সাহস জুগিয়ে বললেন, ‘সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রেখে চলে যাও।’

একজন বিশ্বস্ত প্রাইভেট চালকের কথা মনে পড়লো, উনাকে ফোন করে আমার জরুরী ঢাকা যাওয়ার বিষয়টি বুঝিয়ে বললাম। তিনি কিছু সময় নিলেন। পরে নিজ থেকে ফোন করে বললেন, ‘রকিব ভাই, আপনি সঙ্গে থাকলে আমি ভাতিজাকে নিয়ে ঢাকা যেতে রাজী, যা হবার হবে।’

আছরের নামাজের পর তিনি গাড়ি নিয়ে চলে আসলেন বাসার গেইটে। আগে থেকেই লাগেজ গোছানো থাকায় দ্রুত বাসা থেকে নেমে পড়ি। গেইটে বিদায় জানাতে বাড়ির সবাই। আবেগ, দুশ্চিন্তা, আতঙ্ক আর কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আল্লাহর নামে রওনা হলাম।

শহর অতিক্রম করে সকিনা সিএনজি স্টেশন থেকে গাড়ির জ্বালানি গ্যাস ও অকটেন নিয়ে যাত্রা শুরু করি। অন্ধকার নামে শায়েস্তাগঞ্জে পৌঁছার আগেই। প্রায় যান ও জনমানব শূন্য মহাসড়ক, বন্ধ দোকানপাট। মনে হচ্ছে ভূতের রাজ্যে গাড়ি চলছে। আমি আর ছেলে দোয়া-দুরুদ পড়ছি নিরব শব্দে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিশ্বরোড মোড়ে কিছু মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করলাম। ভৈরব ব্রিজে উঠার আগে আশুগঞ্জ এলাকায় প্রথম যৌথ বাহিনীকে চোখে পড়লো। ব্রিজ পার হয়ে কয়েকটি প্রাইভেট গাড়ি একসাথে চলতে দেখে কিছুটা সাহস বাড়ে।

কিন্তু নরসিংদী ঢুকে মনে হলো যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদ দিয়ে যাচ্ছি। বিদ্যুৎবিহীন একটা থমথমে পরিবেশ। সড়কের অনেক স্থানে আগুন জ্বলছে। পাচদোনা মোড়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে আছেন এক টং দোকানদার। গাড়ি থামিয়ে পানি কিনতে গেলাম। সড়কের ভয়াবহ অবস্থার ব্যাপারে কিছু বলতে চাইলে, তিনি শুধু ইশারায় বলে দিলেন দ্রুত চলে যেতে।

সেখান থেকে হাইওয়ে সড়ক ধরে মাধবধী’র দিকে সামান্য অগ্রসর হতেই সামনে ভয়ঙ্কর কিছু দেখে গা শিউরে উঠল। ড্রাইভারকে বললাম, এক সেকেন্ডও থামবেন না। দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে আবার পাচদোনা মোড়। সেখান থেকে ডাঙ্গার দিকে এগিয়ে গ্রামীণ রাস্তা ধরে গাড়ি চলছে।

এর’ইমধ্যে গাড়ির জালানি গ্যাস শেষ হয়ে গেছে। অকটেনে কনভার্ট করে সামনের দিকে এগোতে থাকি। গ্রামীণ এই সড়কেও মানুষের দেখা মিলছেনা। ভীতিকর পথটি পাড়ি দিয়ে আবার মহাসড়কে উঠলাম। মালবাহী ট্রাকের লম্বা সারি সড়কের পাশে। কিন্তু আমাদের সাথে যাওয়ার মতো একটি ট্রান্সপোর্টও নেই। চেনা-জানা মহাসড়কটি অচেনা মনে হচ্ছে। অনেকটা পথ একা চলার পর রূপগঞ্জে একটা সিএনজি স্টেশন খোলা দেখে স্বস্তি ফিরে আসে। সেখানে কিছু প্রাইভেট কার দেখে সাহসও পাই। কিছুক্ষণ থেমে রিফ্রেশ হয়ে গ্যাস নিয়ে আবার রওনা।

কাঞ্চন ব্রিজ পার হয়ে ৩০০ ফিট ধরে বসুন্ধরা গেট। সেখানে একটা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে গাড়িতে গাড়িতে তল্লাশি চলছে। আমরা সোজা চলে যাই কুড়িল বিশ্বরোড। ফ্লাইওভার পার হয়ে রাত দের’টা নাগাদ এয়ারপোর্ট রোডে পৌঁছাই। সামনে র‌্যাবের একটি গাড়ি দেখে পিছু নিই। বিমানবন্দরের সামনের মোড়ে অনেক মানুষের ভিড়। বিদেশগামী যাত্রীদের বিদায় জানাচ্ছেন স্বজনরা। যাত্রী ছাড়া কাউকেই বিমানবন্দর এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

আশকোনার প্রবেশ পথ বন্ধ। তবে র‌্যাবের গাড়ির পেছনে থাকায় আমরা তাদের সাথে ভেতরে ঢুকে পড়ি। হজ ক্যাম্পের পাশে র‌্যাব ক্যাম্পে সেনাবাহিনীর অস্থায়ী কার্যালয় অতিক্রম করে হোটেলের লবিতে আশ্রয় নিই।

লবিতে বসে জরুরী প্রয়োজনে বের হওয়া লোকজনসহ ফ্লাইট বাতিল হওয়া বিদেশ যাত্রীদের সাথে কথা হয়। এসময় ওই রাতে দুষ্কৃতকারীদের হাতে হেনস্তার শিকার ক্ষতিগ্রস্থদের কাছ থেকে জানতে পারি তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। আমরা ভাগ্যবান, সালামতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছি।

শেষ করতে চাই এইভাবে, এই যাত্রাটি শুধু একটা গন্তব্যে পৌঁছানোর গল্প’ই নয়। এটা ছিল এক বাবার দায়িত্ব, সাহস আর ভালোবাসাসহ এক স্নায়ুক্ষয়কর যাত্রা। একটা ভয়ংকর রাতের অনিশ্চয়তার মাঝেও যে একজন বাবা তার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করে না তার একটা উদাহরণ। আজ ২০শে জুলাই আমাকে নতুন করে মনে করিয়ে দিল গত বছরের সেই ভয়ঙ্কর রজনীর কথা।

Manual4 Ad Code

✍️ এম এ রকিব
গণমাধ্যমকর্মী, শ্রীমঙ্গল।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ