শিবিরের ‘অরাজনৈতিক রাজনীতি’ এবং ডাকসু বিজয়

প্রকাশিত: ১১:৪৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৫

শিবিরের ‘অরাজনৈতিক রাজনীতি’ এবং ডাকসু বিজয়

Manual2 Ad Code

পাভেল রহমান |

কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক আমাকে বলেছিলেন- তাদের ক্যাম্পাসে অন্তত ২৭টা সংগঠন আছে; যেগুলো ছাত্রশিবিরের লোকজন পরিচালনা করছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই সংগঠনগুলোকে ‘অরাজনৈতিক’ প্লাটফর্ম হিসেবেই চেনে। তবে এগুলো মূলত ক্যাম্পাসে শিবিরের রাজনীতির ভিত্তি। এখান থেকে শিবির তাদের সক্রিয় কর্মী বের করে আনে।
ডাকসু নির্বাচনের পর ওই শিক্ষকের কথাগুলোকে কিছুটা সত্যই মনে হচ্ছে। ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন থেকেই মূলত শিবির বেশ কয়েক বছর ধরে ঢাবিতে রাজনীতি করে চলেছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও শিবির এসব ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠনের মাধ্যমে তাদের রাজনীতি চলমান রেখেছিল।

রাজনীতি বা মতাদর্শিক লড়াই কখনো আমলাতন্ত্রের দালিলিক কাগজে নিষিদ্ধ করা যায় না। শিবিরকে নিষিদ্ধ করার কারণে তারা এক শিবির সংগঠন থেকে ২৭টা অরাজনৈতিক সংগঠনে রূপ নিয়েছে, যা মূলত ক্যাম্পাসে শিবিরের রাজনীতিরই ভিত্তি তৈরি করেছে।
জুলাই পরবর্তী সময়ে ছাত্রদল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে কমিটি দিতে চেয়েছে; তখন ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি চাই না’ বলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে রাস্তায় নেমেছিল, তা মূলত শিবির পরিচালিত ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠনের মুভমেন্ট।

Manual5 Ad Code

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে শিবিরের দখলে গেল, তার গোড়াটা আরেকটু পেছনে। বুয়েটের আবরার ফাহাদকে যখন নির্মমভাবে মারা হলো। তখন থেকেই ছাত্রলীগের পতন শুরু।
তারও আগে শিবিরের যারা ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠনগুলো পরিচালিত করতো। তাদের যেন সন্দেহ করা না হয়। তারা ছাত্রলীগের কমিটিতে ঢুকেছে এবং নিজেদের নিরাপদ করেছে।

রাজনীতিতে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স’ বা ‘গুপ্ত রাজনীতি’ বলে একটা বিষয় আছে। বিশ্বব্যাপি অনেকেই এমন ‘গুপ্ত রাজনীতি’ করেছে। শিবিরই প্রথম এই গুপ্ত রাজনীতি করেনি।
শিবিরকে যখন প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে দেওয়া হয়নি, তারা গুপ্ত রাজনীতি বেছে নিয়েছে এবং একে একে ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন তৈরি করেছে। সেসব সংগঠনের মাধ্যমে তারা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রবেশ করেছে।

বুয়েটে আবরার ফাহাদকে যখন নির্যাতন করে মারা হল। সেই খুনিদের মধ্যেও ছাত্রলীগের কর্মী সেজে কয়েকজন শিবিরকর্মী ছিল বলে কেউ কেউ মনে করেন।
জামায়াতের ব্যারিস্টার শিশির মনির যখন আবরার ফাহাদের খুনিদের তালিকা থেকে কয়েকজনকে মুক্ত করার জন্য আদালতে মুভ করলেন, তখন কেউ কেউ মনে করেছেন- শিশির মনির মূলত শিবিরের কর্মীদের ছাড়াতে মুভ করছেন।
আবরার ফাহাদের ঘটনার আবেগকে কাজে লাগিয়ে জামায়াত পন্থীরা বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীরা শিবিরের অরাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে ঠিকই শিবিরের সাথে যুক্ত থেকেছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের দালালী করতে করতে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনে পরিণত হয়েছিল। এমনকি সাংস্কৃতিক জোট, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদও আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনে পরিণত হয়। ফলে সংস্কৃতিকর্মীদের বড় অংশই তখন নিরপেক্ষতা হারায়, মানুষের আস্থা হারায়।

আবরার ফাহাদের ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে বুয়েট থেকে ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করেছে শিবির। কিন্তু ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠনের নামে নিজেরা আরো সক্রিয় হয়েছে।
বছর দুয়েক আগে ছাত্রলীগ যখন বুয়েট দখল করার ঘোষনা দেয়; তখন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দামের দাম্ভিক বক্তব্যের কথা মনে আছে? তিনি বলেছিলেন- তারা বুয়েটে জোর করে প্রবেশ করবেন। অথচ সাদ্দাম বুঝতে পারেননি, সেই লড়াইটা যতটা না রাজনীতির ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল সাংস্কৃতিক। ফলে শিবির সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানার দিয়ে ছাত্রলীগকে রুখে দেয়।

একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অরাজনীতি’র নামে রাজনেতিক কর্মকান্ড বাড়াতে থাকে শিবির। ছাত্রলীগের ভেতরে থেকে ছাত্রলীগকেও ‘মিসগাইড’ করতে থাকে শিবিরের অরাজনৈতিক রাজনীতি।

গত বছরের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে মূলত শিবিরই সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায় বলে অনেকের ধারণা। সাধারণ শিক্ষার্থীরা হয়তো বুঝতেও পারে নাই; তারা কিভাবে ‘অরাজনীতির’ নামে ‘শিবিরের রাজনীতির’ সাথে জড়িয়ে গেছে।

Manual5 Ad Code

আওয়ামী লীগের পতনের পর ‘গুপ্ত শিবির’ কিছুটা প্রকাশ্য হতে শুরু করলেও তাদের একটা বড় অংশ এখনো আড়ালেই রয়েছে; যা দিয়ে তারা ছাত্রদল এবং বামপন্থীদের দলীয় রাজনীতিকে ঘায়েল করে চলেছে।
ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতির নিপীড়নের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশই এখনও ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতি চায় না। শিবির সেটা বুঝেছে এবং তারা দলীয় রাজনীতির চেয়ে ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠনকে বেশি সক্রিয় রেখেছে।

শিবিরের কাউন্টার হতে পারতো যেসব সাংস্কৃতিক সংগঠন, আওয়ামী লীগের দালালী করতে গিয়ে তাদের হারিয়ে যাওয়া এবং ক্যাম্পাসে সক্রিয় শিবিরবিরোধী সংগঠনগুলো বহু ভাগে বিভক্ত থাকায় শিবিরের বিজয় ঠেকানো যায়নি ডাকসুতে।

আমি মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো ৭০ ভাগ শিক্ষার্থীই শিবিরবিরোধী। তাহলে ৩০ ভাগ নিয়ে শিবির কিভাবে ডাকসুতে জিতলো?
তার কারণ বিভক্তি;
উমামা-মেঘমল্লার মিলে একটা প্যানেলে আসতে পারতো, তারা সেটা পারে নি। শিবিরের গুপ্ত রাজনীতির কারণে গত এক বছরেও হলগুলোতে সক্রিয় হতে পারেনি ছাত্রদল।
ছাত্রলীগের সময় গণরুম-গেস্টরুম নিপীড়নের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখন ছাত্রদলকেও মনে করেছে ছাত্রলীগের মতোই আচরণ করবে। যদিও এবার ছাত্রদলের প্যানেলে পরিচ্ছন্ন ইমেজের প্রার্থী ছিল। তবুও দেশজুড়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের দখলবাজির কারণে ছাত্রদলে আস্থা রাখেনি ‘দলীয় রাজনীতির’র উপর বিরক্ত সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

আর ছাত্রলীগ এখন গুপ্ত থাকায়, তারা কোন পক্ষে ছিল ঠিক বোঝা যায়নি। কেউ কেউ মনে করেন ছাত্রলীগ সমর্থকদের ভোট শিবিরকে দিয়েছে, এটা বোঝানোর জন্য- ‘যে দ্যাখ আমরা না থাকলে কি হয়?’

Manual8 Ad Code

শিবিরবিরোধীরা সংখ্যায় বেশি হয়েও হেরেছে বিভক্তির কারণে। উমামা-মেঘমল্লার প্যানেল হলে শিবিরের জয়টা এত সহজ হতো না। আর উমামা-মেঘমল্লার যদি শামীমকেও তাদের প্যানেলে এনে দলীয় রাজনীতির বাইরে একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্যানেল দিত; তাহলেও ডাকসুর ফলাফল আরেক রকম হতে পারতো।

অন্যদিকে শিবির- তাদের প্যানেলে ‘হিজাবহীন’ একজন ছাত্রীকে এবং একজন আদিবাসীকেও যুক্ত করেছে; যা শিবিরের কর্মকান্ডের সঙ্গে যায় না। তবুও তারা এটা করে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ একটা ন্যারেটিভ তৈরি করেছে।

৩০% ভোট নিয়েও শিবির জিতেছে ঐক্য, প্রচার কৌশল ‘অরাজনৈতিক রাজনীতির’ ন্যারেটিভ তৈরি করে। আর শিবিরবিরোধীরা ৭০% ভোট নিয়েও হেরেছে নিজেদের মধ্যে ‘বিভক্তি’, ‘অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস’ আর ‘দাম্ভিকতার’ কারণে।
#
– পাভেল রহমান
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫

Manual6 Ad Code

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ