আজ জাতীয় গণিত দিবস

প্রকাশিত: ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ২২, ২০২৫

আজ জাতীয় গণিত দিবস

Manual3 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ : আজ জাতীয় গণিত দিবস। গণিতের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাতে প্রতি বছর ২২ ডিসেম্বর এই দিনটি পালিত হয় ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। দিনটি উৎসর্গ করা হয়েছে আধুনিক গণিতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা শ্রীনিবাস রামানুজনের স্মরণে, যিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৮৭ সালের এই দিনে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও যিনি নিজের প্রতিভা, সাধনা ও অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে গণিতকে পৌঁছে দিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়।

শৈশব থেকেই গণিতের প্রতি অদম্য আকর্ষণ

ভারতের তামিলনাড়ুর কুম্ভকোনামে শ্রীনিবাস আইয়েঙ্গার ও কোমলতাম্মালের ঘরে জন্ম নেন শ্রীনিবাস রামানুজন। ছোটবেলা থেকেই গণিতের প্রতি ছিল তাঁর অদম্য আকর্ষণ। নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার পরিবর্তে প্রায়ই তাঁকে দেখা যেত মন্দিরের মণ্ডপে বসে জটিল অঙ্ক কষতে। প্রচলিত পাঠ্যবইয়ের বাইরেই ছিল তাঁর আগ্রহ। কথিত আছে, কোনও সমস্যার সমাধান খুঁজে না পেলে তিনি স্বপ্নের মধ্যেই তার উত্তর পেতেন।
গণিতের প্রতি এই নিবিড় অনুরাগের ফলে অন্যান্য বিষয়গুলিতে তিনি প্রায়ই অকৃতকার্য হতেন। তবে মাত্র তেরো বছর বয়সেই তিনি জটিল উপপাদ্য আবিষ্কার করতে শুরু করেন। কাগজের অভাবে স্লেটে করতেন অধিকাংশ গণনা, আর খাতায় লিখে রাখতেন কেবল গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল ও সারসংক্ষেপ।

জীবিকার সংগ্রাম ও প্রতিভার স্বীকৃতি

Manual4 Ad Code

১৯০৯ সালে জানকীঅম্মলের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রামানুজন। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে জীবিকার সন্ধানে চাকরি খুঁজতে শুরু করেন তিনি। এই সময় তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় ভারতীয় গণিত সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ভি. রামস্বামী আয়ারের। রাজস্ব দফতরে চাকরির আবেদন করতে গিয়ে রামানুজন তাঁর লেখা খাতা দেখান আয়ারকে। খাতার বিষয়বস্তু দেখে বিস্মিত হন তিনি এবং তরুণ রামানুজনের অসাধারণ প্রতিভা অনুধাবন করেন।

Manual1 Ad Code

রামস্বামী আয়ারের উদ্যোগে রামানুজনের সঙ্গে মাদ্রাজের একাধিক গণিতবিদের পরিচয় হয়। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯১২ সালের ১ মার্চ তিনি মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্টে প্রধান হিসাবরক্ষকের দফতরে চাকরি পান। সেখানে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্যার ফ্রান্সিস স্প্রিং এবং সহকর্মী নারায়ণ আয়ার তাঁকে গণিতচর্চা অব্যাহত রাখতে উৎসাহ জোগান।

কেমব্রিজ যাত্রা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

১৯১৩ সালের জানুয়ারিতে রামানুজন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ জি. এইচ. হার্ডিকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠির সঙ্গে পাঠানো ৯ পৃষ্ঠার পাণ্ডুলিপিতে ছিল অসংখ্য মৌলিক সূত্র ও উপপাদ্য। প্রথমে হার্ডি কিছুটা সংশয় প্রকাশ করলেও গভীরভাবে অধ্যয়নের পর নিশ্চিত হন—এগুলো কল্পনা নয়, বরং এক অনন্য প্রতিভার সৃষ্টি।

Manual1 Ad Code

বহু দ্বিধা ও পারিবারিক বাধা অতিক্রম করে অবশেষে ১৯১৪ সালে রামানুজন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান। সেখানে হার্ডির সঙ্গে যৌথ গবেষণায় তিনি গণিত জগতে একের পর এক যুগান্তকারী অবদান রাখেন।

রয়্যাল সোসাইটি ও ট্রিনিটি কলেজের ফেলো

বিদেশে থাকাকালীন রামানুজনের প্রতিভার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসে। ১৯১৮ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন—দ্বিতীয় ভারতীয় হিসেবে এবং সর্বকনিষ্ঠদের অন্যতম হিসেবে। একই বছরের ১৩ অক্টোবর তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজের ফেলো নির্বাচিত হওয়া প্রথম ভারতীয় হন।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই সাফল্যের মাঝেই যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন তিনি। স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতি ঘটায় ১৯১৯ সালে তাঁকে ভারতে ফিরতে হয়। মাত্র ৩২ বছর বয়সে, ১৯২০ সালে এই বিস্ময় প্রতিভার জীবনাবসান ঘটে।

গাণিতিক অবদান ও চিরস্থায়ী প্রভাব

রামানুজনের গাণিতিক অবদান আজও গণিত ও পদার্থবিদ্যার গবেষণায় গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে। সংখ্যা তত্ত্ব, অনন্ত ধারা, কন্টিনিউড ফ্র্যাকশন এবং পাই-এর মান নির্ণয়ে তাঁর সূত্রগুলো যুগান্তকারী। প্রায় কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তিনি যে গভীরতা ও মৌলিকতা দেখিয়েছেন, তা আজও গবেষকদের বিস্মিত করে।

একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দু হিসেবে রামানুজন তাঁর সমস্ত আবিষ্কারের কৃতিত্ব দিতেন পারিবারিক আরাধ্য দেবী নামগিরি মহালক্ষ্মীকে। তাঁর কথায়, “আমার কাছে কোনও সমীকরণের কোনও অর্থ নেই, যদি তা ঈশ্বরের কোনও ভাবনার প্রকাশ না হয়।”

জাতীয় গণিত দিবস ও উত্তরাধিকার

Manual7 Ad Code

বর্তমানে কুম্ভকোনামের সরঙ্গপাণি সন্নিধি স্ট্রিটে অবস্থিত তাঁর পৈতৃক বাড়িটি একটি জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে। তাঁর জন্মদিন ২২ ডিসেম্বর ভারত সরকার কর্তৃক ঘোষিত ‘জাতীয় গণিত দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।

শুধু ভারত নয়, সুইডেন, জার্মানি-সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও প্রতিবছর রামানুজনের স্মরণে আন্তর্জাতিক গাণিতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। আর্যভট্ট ও বরাহমিহিরের উত্তরাধিকার বহন করে রামানুজন যে আজও বিশ্ব গণিতকে পথ দেখিয়ে চলেছেন, তা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।

অসীমকে যিনি শুধু বুঝেছিলেন তা নয়, বরং অসীমের সঙ্গেই যিনি একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন—জাতীয় গণিত দিবসে সেই শ্রীনিবাস রামানুজনকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে গণিত জগৎ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ