বিপ্লবী পারুল মুখার্জি: ইতিহাসের নীরব পাতায় এক অদম্য নাম

প্রকাশিত: ২:৫৪ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৩, ২০২৬

বিপ্লবী পারুল মুখার্জি: ইতিহাসের নীরব পাতায় এক অদম্য নাম

Manual1 Ad Code

বিশেষ প্রতিবেদন | ঢাকা, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ : ব্রিটিশ বিরোধী ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এমন বহু নাম আছে, যাদের অবদান গভীর, অথচ স্মৃতির আলোয় তারা প্রায় অনুপস্থিত। পাঠ্যপুস্তকের পাতায় তাঁদের উপস্থিতি ক্ষীণ—এক লাইন, দু’ লাইন, কিংবা নিঃশব্দ ফাঁকা জায়গা। টিটাগড় ষড়যন্ত্র মামলা ও তার সঙ্গে যুক্ত বিপ্লবী পারুল মুখার্জি তেমনই এক বিস্মৃত অধ্যায়। ইতিহাসের মূল স্রোতে যাঁদের নাম উচ্চারিত হয় না, অথচ যাঁদের আত্মত্যাগ ছাড়া সেই ইতিহাসই অসম্পূর্ণ থেকে যেত।

প্রেক্ষাপট: অগ্নিযুগ ও বিপ্লবের সময়কাল

সময়টা উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের প্রথমার্ধ—ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারত জুড়ে তীব্র অসন্তোষ ও প্রতিরোধের কাল। একদিকে কংগ্রেসের নেতৃত্বে সাংবিধানিক ও আপোশমূলক রাজনীতি, অন্যদিকে তরুণদের এক বড় অংশ ঝুঁকে পড়ছিল সশস্ত্র বিপ্লবের পথে।

১৯২০–৩০-এর দশকে এই বিপ্লবী আবহ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। যতীন দাসের অনশন-মৃত্যু ও তাঁর দেহকে কেন্দ্র করে কলকাতার বিশাল মিছিল, লাহোর জেলে ভগত সিং, সুখদেব ও রাজগুরুর বিপ্লবী ঘোষণা, সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন—সব মিলিয়ে ব্রিটিশ শাসনের ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছিল এই অগ্নিযুগ। একই সময় চট্টগ্রামে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে যুব অভ্যুত্থান নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এই উত্তাল সময়েই বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল গোপন বিপ্লবী ডেরা ও অস্ত্রাগার। টিটাগড় ছিল তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

পারুল মুখার্জি: পরিচয়ের আড়ালে বিপ্লব

পারুল মুখার্জি—এ নামটিও ছিল ছদ্মনাম। অগ্নিযুগের গোপন বিপ্লবী সংগঠনের রীতিই ছিল ছদ্মনাম গ্রহণ করা। তাঁর আসল নাম জানতেন সম্ভবত শুধু সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব—পূর্ণানন্দ দাশগুপ্ত ও শ্যামবিনোদ পালচৌধুরী।

Manual7 Ad Code

নীহার, শান্তি, আরতি, রানী, খুকি, শোভারানী, সুরমাদেবী—এমন বহু নামেই তাঁকে ডাকা হয়েছে। বিপ্লবীদের কাছে নাম ছিল গৌণ; মুখ্য ছিল কাজ ও আদর্শ। পারুলের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

১৯২৯ সালে পূর্ণানন্দ দাশগুপ্তের হাত ধরে তিনি বিপ্লবী সংগঠনে যোগ দেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর দৃঢ়তা, শৃঙ্খলাবোধ ও আত্মত্যাগ সংগঠনের ভেতরে তাঁকে বিশেষ সম্মানের জায়গায় পৌঁছে দেয়।

টিটাগড়ের বিপ্লবী ডেরা ও পারুলের ভূমিকা

টিটাগড়ের গোয়ালপাড়ায় অবস্থিত বিপ্লবী ডেরা ছিল একই সঙ্গে গোপন আশ্রয়স্থল ও অস্ত্রের ঘাঁটি। এই ডেরার দেখভালের গুরুদায়িত্ব ছিল পারুলের ওপর।

তিনি কেবল একজন সংগঠকই ছিলেন না, ছিলেন প্রশিক্ষিত বিপ্লবী যোদ্ধা।

আগ্নেয়াস্ত্র চালানো,

Manual3 Ad Code

বিস্ফোরক দিয়ে বোমা প্রস্তুত,

সালফিউরিক ও নাইট্রিক অ্যাসিডের ব্যবহার,

বিপ্লবী আখড়ার লাঠিখেলা ও শারীরিক কসরত।

সব ক্ষেত্রেই পারুল ছিলেন দক্ষ। পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতেন তিনি। তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণ, কঠোর শৃঙ্খলা ও বিপ্লবের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য তাঁকে সংগঠনের ভেতরে এক অনন্য অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছিল।

Manual7 Ad Code

গ্রেপ্তার ও টিটাগড় ষড়যন্ত্র মামলা

১৯৩৫ সালে হঠাৎ পুলিশি হানায় টিটাগড়ের বিপ্লবী ডেরা ধরা পড়ে যায়। পারুল মুখার্জির সঙ্গে উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক সামগ্রী—সালফিউরিক অ্যাসিড, নাইট্রিক অ্যাসিড, মেটা নাইট্রানিলিন প্রভৃতি। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার হন বিপ্লবী নেতা শ্যামবিনোদ পালচৌধুরী।

ব্রিটিশ সরকার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করে কুখ্যাত টিটাগড় ষড়যন্ত্র মামলা। পারুলসহ মোট ৩১ জন বিপ্লবীর বিচার শুরু হয় ১৯৩৫ সালের ৩১ অক্টোবর, বিশেষ ট্রাইবুনালে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনের ৫ নম্বর ধারাসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়।

আদালতে পারুল: ভাঙেনি মাথা, নত হয়নি আদর্শ

গ্রেপ্তারের পরেও পারুল এক মুহূর্তের জন্যও ভেঙে পড়েননি। পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে কাঠগড়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থেকেছেন দিনের পর দিন। আদালতের প্রতিটি শুনানির দিন উপচে পড়ত মানুষের ভিড়।

একজন নারী বিপ্লবী—যিনি সংসার, পরিবার ও সামাজিক নিরাপত্তা ত্যাগ করে সশস্ত্র আন্দোলনের পথে নেমেছেন—তাঁকে এক নজর দেখার জন্য মানুষের কৌতূহল ও শ্রদ্ধা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।

পুলিশ পারুলকে ভাঙতে নানা কৌশল নেয়। তাঁর নামে জোর করে আদায় করা মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদালতে পেশ করার চেষ্টা করা হয়, যাতে তাঁকে বিশ্বাসঘাতক প্রমাণ করা যায়। কিন্তু পারুল আদালতে স্পষ্টভাবে সেই দাবি অস্বীকার করেন। তিনি ঘোষণা করেন, কোনো স্বীকারোক্তি তিনি স্বেচ্ছায় দেননি।

বিপ্লবের আদর্শ ও শহীদদের রক্তকে ছোট করার প্রশ্নই ওঠে না—এই ছিল তাঁর অবস্থান।

নারী ও বিপ্লব: এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত

হাজার বছর ধরে নারীদের ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি করে রাখার যে সামাজিক কাঠামো, পারুল মুখার্জির মতো নারীরা তার ভিত নড়িয়ে দিয়েছিলেন। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মতো বিপ্লবীদের ধারাবাহিকতায় পারুল ছিলেন আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সে সময় পুলিশের চোখ এড়িয়ে, সামাজিক বাধা অগ্রাহ্য করে, পরিবার ত্যাগ করে সশস্ত্র বিপ্লবে যুক্ত হওয়া নারীর সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। পারুল সেই বিরল পথিকৃৎদের একজন।

ইতিহাসে অনুপস্থিতি ও প্রকৃত মূল্যায়ন

পারুল মুখার্জির নাম হয়তো ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে নেই, কিংবা থাকলেও এক-দু’ লাইনের বেশি নয়। কিন্তু ইতিহাস কেবল নামের তালিকা নয়—ইতিহাস গড়ে ওঠে অসংখ্য ছোট ছোট আত্মত্যাগে।

দেশভাগের রাজনীতি, ক্ষমতার লড়াই ও আপোশের খেলায় যাঁরা স্বাধীনতা আন্দোলনের আদর্শকে ক্ষুদ্র করেছিলেন, পারুল তাঁদের পথ অনুসরণ করেননি। তাঁর কাছে আদর্শই ছিল শেষ কথা। নাম থাক বা না থাক—তা নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ ছিল না।

এই নীরব আত্মত্যাগগুলিই একত্রিত হয়ে এগিয়ে নিয়েছে মানুষের ইতিহাসকে। পারুল মুখার্জির পায়ের ছোট ছাপ মিশে গেছে হাজার হাজার অচেনা নারী-পুরুষ কমরেডের সঙ্গে, যাঁরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন এক স্বাধীন, শোষণমুক্ত ভারতের স্বপ্নে।

উপসংহার

হারিয়ে যাওয়া এই ‘আগুন পাখি’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার ইতিহাস কেবল কয়েকজন মহান নেতার কাহিনি নয়। এটি অসংখ্য বিস্মৃত বিপ্লবীর রক্ত, ঘাম ও নীরব ত্যাগের সমষ্টি। পারুল মুখার্জি তাঁদেরই একজন, যাঁর জীবন আজও আমাদের প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—আমরা কি তাঁদের যথার্থভাবে স্মরণ করেছি?
#

তথ্যসুত্র:
স্বাধীনতা আন্দোলনে সশস্ত্র বিপ্লবী নারী, চিন্ময় চৌধুরী, দে’জ পাবলিশিং

Manual1 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ