কমরেড মূনীর: কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক অনন্য বিপ্লবী

প্রকাশিত: ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১০, ২০২৬

কমরেড মূনীর: কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক অনন্য বিপ্লবী

Manual2 Ad Code

খবীর শিকদার |

(২৪তম প্রয়াণ দিবস : ১০ জানুয়ারি ২০২৬)

১০ জানুয়ারি ২০২৬—বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক উজ্জ্বল, আপসহীন ও সংগ্রামী অধ্যায়ের ২৪তম প্রয়াণ দিবস। এই দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি কৃষক–শ্রমিকের নেতা, বিপ্লবী কমিউনিস্ট আন্দোলনের অনন্য সংগঠক কমরেড আব্দুল মতিন মূনীরকে—যাঁর জীবন ছিল মার্কসবাদ, লেনিনবাদ ও মাওবাদের বাস্তব প্রয়োগ।

কমরেড মূনীর ১৯৪০ সালে ঝিনাইদহ জেলার রঘুনাথপুর ইউনিয়নের নিজতলা গ্রামে এক ধনী কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক নাম ছিল আবুল বাশার। কিন্তু তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন শ্রেণির মানুষ হিসেবে—আর তাই ইতিহাস তাঁকে চিনেছে কমরেড মূনীর নামে।

শিক্ষা, ছাত্ররাজনীতি ও শ্রেণিচেতনার বিকাশ

গ্রামের বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি যশোরের ঐতিহ্যবাহী মুসলিম একাডেমি হাই স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৭ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে যশোর কলেজে (বর্তমান এম এম কলেজ) অধ্যয়ন শুরু করেন। আইএসসি পাসের পর বিএসসিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি কারাবরণ করেন এবং কারাগার থেকেই বিএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হন—যা তাঁর অদম্য মানসিক দৃঢ়তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সারির নেতায় পরিণত হন। ১৯৬৪ সালে তিনি এম এম কলেজ ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এই পর্যায়ে তাঁর মধ্যে মার্কসবাদী শ্রেণিচেতনা সুসংহত রূপ লাভ করে—যেখানে ছাত্র আন্দোলনকে ভবিষ্যৎ শ্রমিক ও গণআন্দোলনের প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কমিউনিস্ট আন্দোলনে প্রবেশ: মার্কসবাদ থেকে লেনিনবাদ

১৯৬৪ সালেই তিনি নিষিদ্ধ পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৭ সালে দেশরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার হন। মুক্তির পর ন্যাপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ’৬৮–’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। একই সময়ে নোওয়াপাড়া বেঙ্গল টেক্সটাইল মিলের শ্রমিকদের সংগঠিত করে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।

এই পর্যায়ে তাঁর রাজনীতি কেবল বিশ্লেষণনির্ভর না থেকে লেনিনবাদী সংগঠন, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের প্রশ্নে উন্নীত হয়। তিনি স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেন—ঘরকেন্দ্রিক আলোচনা বা বিচ্ছিন্ন কথার রাজনীতি বিপ্লব ঘটাতে পারে না; প্রয়োজন সংগঠিত শক্তি ও রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সুস্পষ্ট লক্ষ্য।

মুক্তিযুদ্ধ ও জনগণভিত্তিক সশস্ত্র সংগ্রাম

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনগণের সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে কমরেড তোজো, আসাদ, শান্তি, মানিক ও ফজলুকে নিয়ে গঠিত বিপ্লবী বাহিনী কেশবপুর–মনিরামপুর এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনা করে।

এই সংগ্রাম ছিল জনগণের মধ্য থেকেই সংগ্রাম গড়ে তোলার রাজনীতির বাস্তব প্রয়োগ। ২৩ অক্টোবর ১৯৭১ মনিরামপুরের চিনেটোলায় তাঁর সহযোদ্ধাদের শহীদ হওয়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে এক গভীর বেদনাবিধুর অধ্যায়।

পার্টি পুনর্গঠন ও মতাদর্শিক লড়াই

১৯৭২ সালে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে গঠিত কমিটিতে তিনি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালের গোলা ও ফসল দখলের কৃষক সংগ্রামে তিনি নেতৃত্বের অগ্রভাগে ছিলেন। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ প্রশ্নে পার্টির ভেতরে মতাদর্শিক বিতর্কের সূচনা করেন।

Manual5 Ad Code

শ্রেণিশত্রু খতমের সীমাবদ্ধ কৌশলের পরিবর্তে তিনি সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক লাইন সামনে আনেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮০ সালের প্লেনামে তিনি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল)-এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তিনি হয়ে ওঠেন এক অপ্রতিরোধ্য বিপ্লবী নেতৃত্ব।

Manual4 Ad Code

আপসহীন রাজনৈতিক নৈতিকতা

জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় যোগদানের প্রস্তাব এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আহ্বান—সবই তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল দ্ব্যর্থহীন—
বল প্রয়োগের মাধ্যমেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে হবে, আপোস বা মাঝামাঝি পথে নয়।
এটি ছিল তাঁর বিপ্লবী রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রতিফলন।

Manual3 Ad Code

কর্মীবান্ধব মানুষ, আদর্শিক কমিউনিস্ট

কমরেড মূনীর ছিলেন গভীরভাবে কর্মীবান্ধব নেতা। পার্টির সিদ্ধান্তে ১৯৭৩ সালে তিনি মনোওয়ারা সিদ্দিকীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া প্রায় ২৫০ বিঘা জমির সিংহভাগ তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করেন।

Manual6 Ad Code

ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে বিযুক্ত হওয়ার পরও পার্টিশৃঙ্খলার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল অনন্য। অফিসে প্রবেশ না করেও তিনি রাজনৈতিক শালীনতা ও নৈতিকতার সীমা কখনো অতিক্রম করেননি।

শেষ যাত্রা ও বিপ্লবীর মৃত্যু

২০০২ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে এক আলোচনাসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেদিনই রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের কোলে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন—যেমনটি একজন প্রকৃত কমিউনিস্টের জীবন ও মৃত্যুর প্রতীক।

শিক্ষা ও উত্তরাধিকার: তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান

কমরেড আব্দুল মতিন মূনীরের জীবন আমাদের শেখায়—

মার্কসবাদ ছাড়া শ্রেণিচেতনা গড়ে ওঠে না
লেনিনবাদ ছাড়া সংগঠন ও নেতৃত্ব সম্ভব নয়
জনগণের বাস্তব সংগ্রাম ছাড়া বিপ্লব কেবল ধারণায় সীমাবদ্ধ থাকে
আজকের তরুণ প্রজন্ম যদি কথার রাজনীতি, সুবিধাবাদ ও সংগ্রামবিমুখ পথ পরিহার করে ছাত্র, কৃষক ও শ্রমিক সংগ্রামে যুক্ত হয়—তবেই কমরেড মূনীরের জীবন ও রাজনীতি সত্যিকার অর্থে উত্তরাধিকার পাবে।

২৪তম প্রয়াণ দিবসে তাঁর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
লাল সালাম কমরেড আব্দুল মতিন মূনীর।
আপনি আমাদের সংগ্রামে চিরন্তন প্রেরণা।
#

লেখক: খবির শিকদার

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ