সিলেট ১৮ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৫:২২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৮, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | কালিহাতি (টাঙ্গাইল), ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ : সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনসহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত হলেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য, বাংলাদেশ নারীমুক্তি সংসদের সভাপতি, জাতীয় সাপ্তাহিক নতুন কথা সম্পাদক, রণাঙ্গনের বীরমুক্তিযোদ্ধা কমরেড হাজেরা সুলতানা।
এর আগে কমরেড হাজেরা সুলতানার মরদেহে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শ্রেণি পেশার মানুষ, শুভ্যানুধায়ী, শুভাকাঙ্খীদের শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ চলে ৩০ তোপখানা রোডস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয় চত্বরে সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত।
গণমানুষের নেতা কমরেড হাজেরা সুলতানা গত ১৫ জানুয়ারি রাত ১০টায় ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও কেন্দ্রীয় মিডিয়া বিভাগের আহবায়ক কমরেড মোস্তফা আলমগীর রতন কর্তৃক স্বাক্ষরিত এবং প্রেরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “ছাত্র রাজনীতির মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠা কমরেড হাজেরা সুলতানা নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন, গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলনকে সংগঠিত ও নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেন। পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সংসদীয় ককেসাসেও ভূমিকা রেখেছেন। নারীনীতির ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও নারীনীতি প্রণয়নেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।”
শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ অনুষ্ঠানের শুরুতেই পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নুর আহমদ বকুল পার্টির পতাকা দিয়ে তার মরদেহ আচ্ছাদিত করে।
কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদুল হাসান মানিক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নুর আহমদ বকুলের নেতৃত্বে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য কমরেড আনিসুর রহমান মল্লিক, কমরেড সুশান্ত দাস, কমরেড কামরূল আহসান, কমরেড নজরুল হক নীলু, কেন্দ্রীয় নেতা কমরেড তপন দত্ত, কমরেড আবুল হোসাইন, কমরেড করম আলী, কমরেড দীপংকর সাহা দিপু, কমরেড মোস্তফা আলমগীর রতন, কমরেড এড. জোবায়েদা পারভিন, কমরেড সাব্বাহ আলী খান কলিন্স, কমরেড মিজানুর রহমান, কমরেড এড. ফিরোজ আলম, কমরেড শাহানা ফেরদৌসী লাকী, কমরেড মুর্শিদা আখতার নাহার, কমরেড তৌহিদুর রহমান, কমরেড সাদাকাত হোসেন খান বাবুল, বেনজির আহমেদ, কমরেড মোতাসিম বিল্লাহ সানি, কমরেড নাসির মিয়া প্রমুখ।
এরপর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য বীরমুক্তিযোদ্ধা শফি উদ্দিন মোল্লা, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ, ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, আজাহার উদ্দিনের নেতৃত্বে সাম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ঢাকা জেলা, নাটোর জেলা, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ, ঢাকা মহানগর উত্তর, শেরপুর জেলা, গাজীপুর জেলা, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন, জাতীয় কৃষক সমিতি, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন, বাংলাদেশ নারী মুক্তি সংসদ, বাংলাদেশ যুব মৈত্রী, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, টেক্সটাইল গামেন্টর্স ওয়ার্কার্স ফেডারেশন, সাপ্তাহিক নতুন কথা, কেন্দ্রীয় অফিস, জাতীয় গার্হস্থ্য নারী শ্রমিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস), ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রসহ বাংলাদেশের প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক বিভিন্ন শ্রেণী পেশার নেতৃবৃন্দ গণসংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্ব শেষ হয় উপস্থিত সকলের আগুনের পরশমণি ও জাগো জাগো সর্বহারা আন্তজার্তিক এই সংগীত, পার্টির শ্লোগান ও লাও জানানোর মধ্যদিয়ে। উপস্থিত সকলেই শোকাহত ও অশ্রুসিক্ত ছিল।
বেলা ১১.৪৫ মিনিটে মরদেহ নিয়ে ফ্রিজিং গাড়ি ছাড়ার সময় সমবেত সকলে শ্লোগানে শ্লোগানে তাদের প্রিয় নেতাকে স্মরণ করেন। কমরেড হাজেরা সুলতানা লও লও লাল সালাম, লও লও লাল সালাম কমরেড হাজেরা সুলতানা। আমরা তোমায় ভুলবো না।
ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নুর আহমদ বকুলের নেতৃত্বে মরদেহের গাড়িসহ তার একমাত্র কন্যা রানা সুলতানাসহ পার্টির কমরেডগণ, আত্মীয় স্বজন টাঙ্গাইল কালিহাতির উদ্দ্যেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের আগে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান ও বাদ আছর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা কমরেড আবুল হোসাইন, কমরেড মিজানুর রহমান মিজান, বাংলাদেশ নারীমুক্তি সংসদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শিউলি শিকদার, সহ-সাধারণ সম্পাদক শাহানা ফেরদৌসি লাকি, বাংলদেশ যুবমৈত্রীর সভাপতি মোহাম্মদ তৌহিদুর রহমান, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি অতুলান দাস আলোসহ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
আজীবন সংগ্রামের প্রতীক
কমরেড হাজেরা সুলতানা ছিলেন বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির এক নির্ভীক ও আপসহীন মুখ। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলন, নারী অধিকার ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং স্বাধীনতার পরও আজীবন সাম্য, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের আদর্শে অবিচল ছিলেন।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি জাতীয় সংসদে শ্রমজীবী মানুষ, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা রাখেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নারী মুক্তি সংসদের সভাপতি হিসেবে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা ও পিতৃতান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রণী সংগঠক।
সম্পাদক ও চিন্তাশীল রাজনীতিক
পার্টির রাজনৈতিক মুখপত্র সাপ্তাহিক নতুন কথা–এর সম্পাদক হিসেবে কমরেড হাজেরা সুলতানা প্রগতিশীল রাজনীতির তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর লেখনী ও সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি বামপন্থি রাজনীতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে স্পষ্ট ও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরতে সহায়ক হয়েছে।
ওয়ার্কার্স পার্টির শোক
কমরেড হাজেরা সুলতানার মৃত্যুতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নূর আহমেদ বকুল গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক যৌথ শোকবার্তায় তাঁরা বলেন, “কমরেড হাজেরা সুলতানা ছিলেন দলের পরীক্ষিত নেতা, জনগণের সংগ্রামের বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা ও নারী মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক। তাঁর মৃত্যুতে পার্টি এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হলো।”
নেতৃবৃন্দ শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
#
কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের শোক
কমরেড হাজেরা সুলতানার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান। তিনি শোকবার্তায় বলেন, “কমরেড হাজেরা সুলতানা ছিলেন সাহসী, সৎ ও আদর্শনিষ্ঠ এক বিপ্লবী নারী। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও মানবিক নেতৃত্ব আমাদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।”
তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
শেষ বিদায়
কমরেড হাজেরা সুলতানার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নারী সংগঠন ও সামাজিক সংগঠন তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে।
সংগ্রামী এই নেত্রীর মৃত্যুতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। আদর্শ, সংগ্রাম ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে তিনি যে পথ দেখিয়ে গেছেন, সেটিই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
#
আরেকটি দীপ নিভে গেল নীরব রাতে,
অন্ধকার ভারী হলো দেশের প্রান্তে।
ঢাকার আকাশ স্তব্ধ হয়ে কাঁদে আজ,
কমরেড হাজেরা আর নেই—হায় সমাজ!
যে নারী এসেছিলেন আগুন বুকে,
শোষণের শিকল ভাঙার দৃপ্ত ঝোঁকে,
ছাত্রাবস্থায় পথে নামা সেই কণ্ঠ,
আজ নিস্তব্ধ—তবু রেখে গেল মন্ত্র।
মুক্তির স্বপ্নে বোনা ছিল তার দিন,
রক্ত-মাটি-মানুষে গাঁথা ঋণ।
একাত্তরের রণাঙ্গনে যোদ্ধা তিনি,
নারী-পুরুষে ভেদ জানেনি চিনি।
গুলি আর ভয় করেনি কখনো পথ,
আপসহীন ছিল তার দৃঢ় শপথ।
রাষ্ট্র যখন পিছিয়েছিল বহুবার,
তিনি বলেছিলেন—মানুষই দরকার।
সংসদের মেঝেতে দাঁড়িয়ে নির্ভীক,
শ্রমিকের ভাষা করলেন তিনি ঠিক।
নারী, প্রান্তিক, কৃষক আর মজুর,
তাঁর কণ্ঠে পেতো দাবি, পেতো জোর।
নারী মুক্তি সংসদের অগ্রদূত,
পিতৃতন্ত্রে আঘাত ছিল অব্যাহত।
ঘরের শেকল ভাঙার যে লড়াই,
তার অগ্রভাগে ছিলেন তিনি তাই।
কলম ধরলে কম্পিত হতো সময়,
“নতুন কথা” হতো নতুন সংগ্রয়।
সম্পাদকীয়তে জ্বলে উঠতো প্রশ্ন,
কীভাবে গড়ব শোষণহীন স্বপ্ন?
দলের ভেতর পরীক্ষিত সহযোদ্ধা,
বাইরে জনগণের নির্ভরতা।
নেতৃত্ব মানে সুবিধার আসন নয়,
তিনি শিখিয়েছেন—এ এক দায়।
আজ সেই কণ্ঠ থেমে গেল হঠাৎ,
রাত দশটায় স্তব্ধ হলো প্রতিবাদ।
হাসপাতালের দেয়াল জানে সেই ব্যথা,
দেশ হারালো এক সংগ্রামী নেতা।
রানা আজ কন্যার চোখে নীরব জল,
সহযোদ্ধার বুকে ভারী শোকদল।
কিন্তু তুমি তো শুধু রক্তের নও,
তুমি আছো লড়াইয়ের প্রতিটি ছোঁয়াও।
ওয়ার্কার্স পার্টি আজ শোকে নত,
এক অপূরণীয় ক্ষতি স্বীকারত।
মানিক–বকুলের কণ্ঠে সেই কথা,
“এ শূন্যতা পূরণ হবে না ব্যথাহীনতা।”
রাজনীতি আজও কঠিন ও কুটিল,
মিথ্যার ভিড়ে সত্য বড়ই দুর্বল।
তবু তোমার রেখে যাওয়া পথচিহ্ন,
ভবিষ্যৎ যোদ্ধাদের দেবে দিশা চিরদিন।
তুমি নেই—এই কথা সত্য হলেও,
তুমি আছো সংগ্রামের প্রতিটি ঢেউয়ে।
লাল পতাকা যখন উঠবে আবার,
তোমার নামেই শপথ নেবে হাজার।
হে কমরেড, বিদায় নয়—এ এক অঙ্গীকার,
তোমার অসমাপ্ত স্বপ্ন হবে আমাদের ভার।
মাটির গভীরে তুমি বিশ্রামে থাকো,
উপরের পৃথিবী লড়াই চালাক অবিরত।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি