সিলেট ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬
গ্রন্থ রিভিউ বিষয়ক প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : ইলা মিত্র : বিদ্রোহ, স্মৃতি ও নারীর সংগ্রামের এক অবিনাশী দলিল।
— নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রীকে ঘিরে মালেকা বেগমের গ্রন্থ পাঠ।
বাংলার কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে ‘ইলা মিত্র’ নামটি উচ্চারণমাত্রই এক অবিস্মরণীয় বিদ্রোহ, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের স্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন—তিনি এক ইতিহাস, এক প্রতীক, এক অনিবার্য রাজনৈতিক ও মানবিক বিবেক। মালেকা বেগম রচিত ‘ইলা মিত্র : নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী’ গ্রন্থটি সেই ইতিহাসকে নিবিড় গবেষণা, সংবেদনশীল ভাষা ও দায়বদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে পাঠকের সামনে উপস্থিত করেছে।
১৯৮৯ সালে প্রথম প্রকাশিত এই গ্রন্থটি কেবল একটি জীবনী নয়; এটি বাংলার কৃষক আন্দোলন, নারী রাজনীতি, আদিবাসী সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এক মূল্যবান দলিল। প্রচ্ছদ ও অলংকরণে কাইয়ূম চৌধুরীর শিল্পিত স্পর্শ এবং কৃতজ্ঞতায় কামরুল হাসানের নাম গ্রন্থটির সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে আরও সুদৃঢ় করে।
শহুরে শিক্ষিত নারী থেকে কৃষক আন্দোলনের নেত্রী
ইলা মিত্রের জীবনপথে রয়েছে এক গভীর রূপান্তরের ইতিহাস। যশোরের ঝিনাইদহের বাগুটিয়া গ্রামের সন্তান ইলা সেন, বেঙ্গলের ডেপুটি অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল নগেন্দ্রনাথ সেনের কন্যা হিসেবে কলকাতায় বেড়ে ওঠেন। বেথুন স্কুল, বেথুন কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের পাশাপাশি খেলাধুলায় তাঁর অসাধারণ কৃতিত্ব—সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স, বাস্কেটবল, ব্যাডমিন্টনে সারা বাংলায় পরিচিত নাম—তাঁকে এক আত্মবিশ্বাসী, শক্তিমান ব্যক্তিত্বে গড়ে তোলে।
কিন্তু এই সাফল্যপূর্ণ মধ্যবিত্ত–উচ্চবিত্ত জীবন তাঁকে আবদ্ধ করে রাখেনি। ১৯৪৩ সালে বেথুন কলেজে বাংলা সাহিত্যে বিএ সম্মান শ্রেণির ছাত্রী থাকাকালীন মহিলা আত্মরক্ষা সমিতিতে যুক্ত হওয়া এবং হিন্দু কোড বিলের পক্ষে আন্দোলনে অংশগ্রহণ তাঁর রাজনৈতিক চেতনার সূচনা নির্দেশ করে।
নাচোল ও তেভাগা : শ্রেণি ও জাতিগত সংগ্রামের মেলবন্ধন
১৯৪৫ সালে রমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে বিবাহসূত্রে রাজশাহীর রামচন্দ্রপুরে আগমন ইলা সেনকে পরিণত করে ইলা মিত্রে। দেশভাগের অভিঘাতে পরিচিত শহুরে জগত পেছনে পড়ে থাকে সীমান্তের ওপারে; তিনি থেকে যান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের এক অস্থির কৃষিভূমিতে।
এই প্রেক্ষাপটেই নাচোলের তেভাগা আন্দোলন তাঁর জীবনের কেন্দ্রে এসে দাঁড়ায়। মালেকা বেগম অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দেখিয়েছেন—তেভাগা আন্দোলন কেবল ফসলের ভাগ নিয়ে দাবি নয়, বরং তা ছিল শোষণের বিরুদ্ধে সাঁওতাল আদিবাসী কৃষকদের অস্তিত্বের লড়াই। উনিশ শতকের সাঁওতাল বিদ্রোহের উত্তরাধিকার বহনকারী এই জনগোষ্ঠী বর্গাচাষি হিসেবে জোতদার–জমিদারদের চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছিল।
গ্রন্থে তেভাগা আন্দোলনের বিস্তৃত সামাজিক পরিসর তুলে ধরা হয়েছে—নাচোল ছাড়াও ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি, যশোর অঞ্চলে রাজবংশী ও অন্যান্য কৃষাণিদের সাহসী ভূমিকার বর্ণনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দীপেশ্বরী, জয়মণি, বুড়ো মা কিংবা সরলাবালা পালের ঝাঁটাবাহিনীর কাহিনি প্রমাণ করে যে তেভাগা ছিল নারীর নেতৃত্বে সংগঠিত এক গণআন্দোলনও।
রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও প্রতীকে উত্তরণ
নাচোল তেভাগা আন্দোলনের অবিসংবাদী নেত্রী হিসেবে ইলা মিত্রের ভূমিকা গ্রন্থের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। শহরের উচ্চশিক্ষিত নারী, জমিদার পরিবারের বধূ হয়েও তিনি সাঁওতাল কৃষকদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে দাঁড়ান—এটি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এক গভীর নৈতিক অবস্থান।
১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তাঁর ওপর চালানো নির্মম নির্যাতনের বিবরণ পাঠককে স্তব্ধ করে দেয়। কারাগারে অমানবিক নির্যাতন, শারীরিক ভাঙন এবং শেষ পর্যন্ত প্যারোলে মুক্তি—এই অধ্যায়গুলোতে মালেকা বেগম সংযত ভাষায় রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নগ্ন চিত্র তুলে ধরেছেন।
ইতিহাস, দলিল ও দায়বদ্ধতা
এই গ্রন্থের অন্যতম বড় শক্তি হলো—ইলা মিত্রকে একক নায়িকা হিসেবে না তুলে ধরে তাঁকে একটি বৃহত্তর শ্রেণি আন্দোলনের প্রতীকে রূপ দেওয়া। শেখ আজাহার হোসেন, অনিমেষ লাহিড়ী, মাতলা মাজি, মংলা মাজি, টুটু হেম্ভ্রম, চিতোর মাঝি, সাগারাম মাঝি প্রমুখ সংগঠক ও কর্মীদের সংগ্রামী জীবন উল্লেখ করে লেখক দেখিয়েছেন, তেভাগা আন্দোলন ছিল সম্মিলিত আত্মত্যাগের ইতিহাস।
একই সঙ্গে গ্রন্থটি একটি নীরব আহ্বানও—এই সব সংগ্রামী মানুষের জীবনের কথাও আরও বিস্তৃতভাবে লিপিবদ্ধ করা প্রয়োজন। ইতিহাসের মূলস্রোতে যাঁরা প্রায়ই উপেক্ষিত, এই বই তাঁদের স্মরণে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
উপসংহার
‘ইলা মিত্র : নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী’ গ্রন্থটি কেবল একটি জীবনী বা আন্দোলনের বিবরণ নয়; এটি নারী নেতৃত্ব, শ্রেণি সংগ্রাম ও মানবিক দায়বদ্ধতার এক শক্তিশালী পাঠ। আজকের সময়ে, যখন কৃষক প্রশ্ন, আদিবাসী অধিকার ও নারীর রাজনৈতিক ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় আসছে, তখন এই গ্রন্থের গুরুত্ব আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
ইলা মিত্র ইতিহাসে চিরস্থায়ী—একজন কমিউনিস্ট নেত্রী হিসেবে, একজন মা হিসেবে, একজন সাহসী নারী বিপ্লবী হিসেবে এবং সর্বোপরি শোষিত মানুষের পক্ষে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকা এক মানবিক প্রতীক হিসেবে। মালেকা বেগমের এই গ্রন্থ সেই চিরস্থায়িত্বকে পাঠযোগ্য, স্মরণযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।
ইলা মিত্র : নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী
মালেকা বেগম।
প্রথম প্রকাশ: ১৯৮৯
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: কাইয়ূম চৌধুরী।
কৃতজ্ঞতা : কামরুল হাসান।
কমরেড ইলা মিত্রকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা —
ইলা মিত্র—
একটি নাম উচ্চারণ করলেই
ধানের শীষে রক্ত ঝরে,
নাচোলের মাঠে কাঁপে বাতাস,
সাঁওতাল ঘরের চালে ওঠে
বিদ্রোহী ঢোলের তীব্র আওয়াজ।
ইলা—
একটি নাম নয়,
একটি দীর্ঘ হাঁটা ইতিহাস,
একটি নারীর শরীরে জেগে ওঠা
অজস্র কৃষকের ক্ষুধা ও ক্রোধ,
একটি যুগের অসামাপ্ত বাক্য।
কলকাতার আলোছায়া ভেদ করে
বেথুনের উঠোনে
যে মেয়েটি বই খুলে বসেছিল,
সে কি জানত—
তার পড়া অক্ষর একদিন
মাঠে নামবে লাঙলের পাশে?
বাবার সরকারি ঘর,
নগেন্দ্রনাথ সেনের কন্যা,
অ্যাকাউন্টের হিসাবের বাইরে
একটি মেয়ের হিসাব ছিল—
মানুষ কীভাবে মানুষ থাকে।
সাঁতার জানত সে,
ডুব দিত গভীর জলে,
অ্যাথলেটিক ট্র্যাকে দৌড়ত,
বাস্কেটবলে ছুড়ত বল,
কিন্তু ইতিহাস তাকে শিখিয়েছিল
আরও বড় দৌড়—
অন্যায়ের বিপরীতে।
ইলা সেন—
বেথুন কলেজের ক্লাসঘরে
বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী,
রবীন্দ্রনাথের পঙ্ক্তির ভেতর
খুঁজে নিত প্রতিরোধের ইশারা,
মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সভায়
শিখে নিত সংগঠনের ভাষা।
হিন্দু কোড বিলের দাবিতে
কলকাতার রাজপথে
তার কণ্ঠ ছিল দৃঢ়,
কারণ সে জানত—
আইন বদলালে
নারীর শ্বাস বদলায়।
১৯৪৫—
রমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে বিয়ে,
রামচন্দ্রপুর গ্রাম,
ইলা সেন থেকে ইলা মিত্র—
নাম বদলাল,
কিন্তু চেতনা বদলায়নি।
দেশ ভাগ হলো,
মানচিত্রে টানা হলো রেখা,
কিন্তু তার জীবনে
সীমান্ত কাঁটা দিয়ে আঁকা,
চেনা শহর রইল ওপারে,
সে রইল পূর্ব পাকিস্তানে—
ইতিহাসের কঠিন পাশে।
নাচোল—
একটি নাম,
যেখানে ধান ফলত,
কিন্তু কৃষকের পেটে উঠত না ভাত।
জোতদারের গোলা ভরত,
সাঁওতালের চোখ ভরত জলে।
সাঁওতাল—
এই শব্দের ভেতরে
শতাব্দীর ক্ষুধা জমে,
পরগনা থেকে উৎখাত,
বিদ্রোহ দমন,
নতুন বসতি,
নতুন শোষণ—
চক্রাকারে ঘোরে জীবন।
বর্গাচাষির ভয়—
যদি আজ জমি কেড়ে নেয়,
তবে কাল সন্তান খাবে কী?
এই প্রশ্নে জন্ম নেয় তেভাগা,
দুই ভাগ নয়—
তিন ভাগের ন্যায়।
ইলা মিত্র
শহরের শিক্ষিত বধূ হয়েও
মাঠে নামলেন,
সাঁওতাল নারীর পাশে বসে
শুনলেন মাটির ভাষা,
শিখলেন ক্ষুধার ব্যাকরণ।
নাচোলের মাঠে
তার কণ্ঠ বলল—
ধান যে ফলায়,
সে-ই পাবে ধান,
এই কথাই বিপ্লব।
নারীরা নামল সামনে—
রাজবংশী কৃষাণি দীপেশ্বরী,
ঝাঁটার মতো দৃঢ় হাত,
পুলিশের চোখে চোখ রেখে
ধান কাটার গান।
জয়মণি লড়ল,
বুড়ো মা লাঠি ধরল,
সরলাবালা পাল
ঝাঁটাবাহিনী গড়ল সাহসে—
নারীর শরীর তখন
ঢাল ও তরবারি।
নাচোলে আগুন জ্বলল,
পুলিশ এলো বন্দুক হাতে,
ইলা মিত্র ছদ্মবেশে চললেন,
কিন্তু ৭ জানুয়ারি
১৯৫০—
ইতিহাস তাকে ধরল।
কারাগার—
লোহার দরজা,
নির্যাতনের রাত,
শরীর ভাঙে,
কিন্তু চেতনা ভাঙে না।
চার বছর—
যন্ত্রণা, চিকিৎসা, প্যারোল,
একটি শিশুর মা
রাষ্ট্রের কাছে অপরাধী,
কারণ সে বলেছিল—
কৃষক মানুষ।
শেখ আজাহার,
অনিমেষ লাহিড়ী,
মাতলা মাজি,
মংলা মাজি,
টুটু হেম্ভ্রম—
নামগুলো ইতিহাসের
অপ্রকাশিত অধ্যায়।
তাদের জীবন ছিন্নভিন্ন,
তাদের ত্যাগ অদৃশ্য নয়,
ইলা মিত্র
তাদের মুখের প্রতীক,
তাদের কণ্ঠের সংহতি।
তেভাগা তখন জয় পায়নি,
কিন্তু জন্ম দিয়েছিল
দক্ষ বিপ্লবীর,
কারণ প্রতিটি ব্যর্থতা
ইতিহাসের প্রস্তুতি।
কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যা,
জমিদারবাড়ির বধূ,
শিশুর মা—
এই তিন পরিচয়ের ভেতর
সে বেছে নিয়েছিল
মানুষের পরিচয়।
মালেকা বেগমের কলমে
ইলা মিত্র ফিরে আসে,
কাইয়ূম চৌধুরীর রেখায়
তার চোখে জ্বলে আগুন,
কামরুল হাসানের স্মৃতিতে
নীরব শ্রদ্ধা।
ইলা মিত্রের ইতি নেই—
কারণ যতদিন মাঠে
ধান ফলবে অন্যের পেটে,
যতদিন নারী
ন্যায় চাইবে কণ্ঠ তুলে,
ততদিন নাচোল ডাকবে—
ইলা,
তোমার নামেই
আমরা শিখেছি
ভয় কীভাবে হার মানে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি