শ্রীমঙ্গলে রিসোর্টে হামলা, লুটপাট ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ; পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশিত: ২:৩৪ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩১, ২০২৬

শ্রীমঙ্গলে রিসোর্টে হামলা, লুটপাট ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ; পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

Manual6 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ : মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের এক পর্যটন রিসোর্টে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, নারী উদ্যোক্তাকে শ্লীলতাহানি এবং মালিক ও কর্মচারীদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ঘটনায় সহায়তা না করে শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশের রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী এক নারী উদ্দোক্তা ও তার স্বামী।

শনিবার (৩১ জানুয়ারি ২০২৬) দুপুর ১২টায় শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন রিসোর্টটির অংশীদার, নারী উদ্যোক্তা ও ঢাকার মহাখালী নিবাসী মোছা. লাবনী ইয়াছমিন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মোছা. লাবনী ইয়াছমিন জানান, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ও তাঁর স্বামী কামরুজ্জামান শ্রীমঙ্গলের মোহাজিরাবাদ এলাকায় অবস্থিত ৮৬ শতাংশ জমি ২০ বছরের জন্য লিজ নেন। জমির মালিক স্থানীয় বাসিন্দা ইউসুফ খা। লিজ চুক্তি অনুযায়ী মোট ৩০ লাখ টাকা নির্ধারিত হয় এবং প্রতি পাঁচ বছর পরপর লিজের টাকা পরিশোধের শর্তে একটি লিখিত চুক্তিও সম্পাদিত হয়।

Manual1 Ad Code

চুক্তির পর প্রায় ৬০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে তারা সেখানে ‘অরণ্যবাস ইকো রিসোর্ট’ নামে একটি পর্যটন রিসোর্ট গড়ে তোলেন এবং নিয়মিতভাবে পর্যটকদের কাছে ভাড়া দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, তৃতীয় দফায় নির্ধারিত ১০ লাখ টাকার মধ্যে নির্ধারিত সময়ের দুই মাস পর স্থানীয়দের মধ্যস্থতায় ৬ লাখ টাকা এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানাসহ পরিশোধ করা হয়। পরে অবশিষ্ট ৪ লাখ টাকা দিতে গেলে জমির মালিক ইউসুফ খা শর্তভঙ্গের অজুহাতে টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং রিসোর্ট খালি করে দিতে চাপ সৃষ্টি করেন।

লাবনী ইয়াছমিন জানান, এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৬ নভেম্বর ইউসুফ খা তার সহযোগী রাজেস, মানুনসহ কয়েকজনকে নিয়ে রিসোর্টে প্রবেশ করে রিসোর্ট খালি করার জন্য চাপ দেন। এতে তারা অস্বীকৃতি জানালে হামলা চালানো হয়। ওই সময় রিসোর্টে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয় এবং তাকে ও তার স্বামীকে মারধর করে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয়।

Manual7 Ad Code

ঘটনার পর শ্রীমঙ্গল থানায় অভিযোগ দায়ের করলে পুলিশের সহায়তায় তারা পুনরায় রিসোর্টে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। পরে তৎকালীন ওসি আমিনুল ইসলাম এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামলা হোসেনের মধ্যস্থতায় বকেয়া কিস্তির টাকা পরিশোধের চেষ্টা করা হলেও ইউসুফ খা টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং পুনরায় রিসোর্ট খালি করার দাবি করেন।

লাবনী ইয়াছমিন আরও অভিযোগ করেন, গত ২৪ জানুয়ারি শনিবার শ্রীমঙ্গল থানা থেকে ফোন করে তার স্বামী কামরুজ্জামানকে থানায় ডেকে নেওয়া হয়। পরে তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে মৌলভীবাজার আদালতে পাঠানো হয় এবং আদালত তাকে জেলহাজতে প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে তারা জানতে পারেন, জমির মালিক তাদের দুজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন। পরদিন জামিনে তারা মুক্তি পান।

সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ উঠে আসে ২৯ জানুয়ারির ঘটনার বিষয়ে। লাবনী ইয়াছমিন বলেন, ওই দিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ইউসুফ খা ২৮ থেকে ৩০ জন লোক নিয়ে পুনরায় রিসোর্টে হামলা চালান। এতে প্রায় ৩০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। হামলার সময় তার জামা ধরে টানাহেঁচড়া করে তাকে মাটিতে ফেলে পেটে ও শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে লাথি, কিল ও ঘুষি মারা হয়। তিনি শ্লীলতাহানির শিকার হন বলে অভিযোগ করেন। এছাড়া রিসোর্টের কর্মচারী সিয়ামকে বেধড়ক মারধর করে গুরুতর আহত করা হয়।

হামলাকারীরা রিসোর্ট থেকে নগদ ৫ লাখ টাকা ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিনিয়ে নেয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে সবাইকে জোরপূর্বক রিসোর্ট থেকে বের করে দেয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ঘটনার পর ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশি সহায়তা চাইলে পুলিশের নির্দেশনায় তারা শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন এবং পরে থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করতে যান। তবে অভিযোগ গ্রহণ না করে পুলিশ বিভিন্ন অজুহাতে তালবাহানা করছে বলে দাবি করেন লাবনী ইয়াছমিন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, পুলিশ ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করেনি।

সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে লাবনী ইয়াছমিন বলেন, “রিসোর্টে প্রায় ৬০ লাখ টাকার বিনিয়োগ করেছি। সব হারিয়ে তিন দিন ধরে এক কাপড়ে বিচার চেয়ে ঘুরছি। থানা পুলিশ কোনো সহায়তা করছে না। এএসপি সার্কেল, এসপি, এমনকি ইউএনও পর্যন্ত গিয়েও কোনো সহযোগিতা পাইনি।”

একদিকে নিজের অভিযোগ আমলে না নেওয়া, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের অভিযোগ দ্রুততার সঙ্গে গ্রহণ করে স্বামীকে কারাগারে পাঠানোয় শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রীমঙ্গল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শেখ জহিরুল ইসলাম মুন্না বলেন, “মারধরের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে রিসোর্টের মালিকানা সংক্রান্ত বিষয় আদালতের এখতিয়ারভুক্ত। আদালতই এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।”

Manual2 Ad Code

অন্যদিকে জমির মালিক ইউসুফ খা তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই। আমার কাছে বৈধ কাগজপত্র আছে। থানায় ও আদালতে মামলা করেছি। আদালতই এর সমাধান দেবে।”

Manual3 Ad Code

ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নারী উদ্যোক্তার নিরাপত্তা, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ