সাম্রাজ্যবাদ দিয়ে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ মোকাবেলা করা যাবে না: সমাজ গবেষণা কেন্দ্রের সম্মেলনে বক্তারা

প্রকাশিত: ১১:৩০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩০, ২০২৬

সাম্রাজ্যবাদ দিয়ে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ মোকাবেলা করা যাবে না: সমাজ গবেষণা কেন্দ্রের সম্মেলনে বক্তারা

Manual5 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ : পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মানুষের প্রগতিশীলতাকে ব্যাহত করছে, বিকশিত করছে প্রতিক্রিয়াশীলতাকে। সাম্রাজ্যবাদের সহযোগিতা নিয়ে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ ও মৌলবাদকে মোকাবেলা করা যাবে না। সমাজে বৈষম্য দূর করতে ব্যক্তিমালিকানার জায়গায় সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক বিপ্লব।

কেবল প্রগতিশীলতার আদর্শ নিয়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমেই সামাজিক বিপ্লবকে সংগঠিত করা সম্ভব।

Manual6 Ad Code

শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি ২০২৬) রাজধানীর এশিয়াটিক সোসাইটি মিলনায়তনে সমাজ গবেষণা কেন্দ্রের বার্ষিক সম্মেলনে দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও রাজনীতিকরা এসব কথা বলেন।

সম্মেলনে প্রগতিশীল বাংলাদেশ, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন তাঁরা।

সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে ‘প্রগতিশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণে সমাজ গবেষণা কেন্দ্রের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ধারণকৃত বক্তব্য দেখানো হয়।

তিনি বলেন, ‘সমাজে ইহজাগতিকতা ও রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষতা—এটাই হচ্ছে প্রগতিশীলতার নির্ভরযোগ্য নিরিখ। এর প্রতিবন্ধকতা পুঁজিবাদ এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। পুঁজিবাদ মানুষকে বিচ্ছিন্ন করছে। যত উন্নতি ঘটছে, ততই বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মানুষের প্রগতিশীলতাকে ব্যাহত করছে, প্রতিক্রিয়াশীলতাকে বিকশিত করছে। আমরা যে ধরনের রাষ্ট্র ও সমাজ চাই, সেটা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দারুণ বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’

এসব সমস্যা থেকে বের হওয়ার উপায় সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘ব্যক্তিমালিকানার জায়গায় সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সামাজিক মালিকানার ব্যবস্থা প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। সামাজিক মালিকানার জন্য দরকার সামাজিক বিপ্লবের।

Manual3 Ad Code

ব্যক্তিমালিকানাকে হটিয়ে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা এবং এর মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে বিদায় করা যাবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে বিদায় না করলে আমরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে এগোতে পারব না। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি আমাদের জব্দ করবে, আচ্ছন্ন করে রাখবে। পৃথিবীব্যাপী এই সমস্যাটা আজকে দেখা দিয়েছে, বাংলাদেশেও দেখা দিয়েছে। সাংস্কৃতিক মুক্তির মাধ্যমেই সামাজিক বিপ্লবকে সংগঠিত করা যেতে পারে, যাবে।’

গণতান্ত্রিকব্যবস্থাকেও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলা যায় উল্লেখ করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘সমাজতন্ত্র বলতে আমরা এ রকমেরই একটা ব্যবস্থা বুঝি, যেখানে মালিকানা থাকবে সামাজিক এবং গণতান্ত্রিকব্যবস্থার এই শর্তগুলো পূরণ করবে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর কোথাও এখন প্রকৃত গণতন্ত্র নেই।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে ইসলামপন্থীদের দাপট দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনে তারা বিজয় লাভ করছে। তার মানে সমাজের মধ্যে তাদের বড় একটা সমর্থন তৈরি হয়েছে। অনেকে বলতে চান, এটা ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের কারণে হয়েছে। ৫ আগস্টের পরে তো হঠাৎ করে এরা আকাশ থেকে পড়েনি। এরা সমাজের মধ্যে ছিল।’

Manual2 Ad Code

ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ মোকাবেলা প্রসঙ্গে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আপনি যদি মনে করেন যে, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ ও মৌলবাদকে আমরা মোকাবেলা করব সাম্রাজ্যবাদের সহযোগিতা নিয়ে, এর থেকে বড় ভ্রান্তি আর কিছু হবে না।’

ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের উদ্ভব প্রসঙ্গে আনু মুহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে গণশিক্ষা ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মতো জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করার কথা, সেগুলো না করার কারণে যে অসংগতি, বৈষম্য ও বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা সমাজে তৈরি হয়েছে, এর ফাঁক-ফোকরেই বিভিন্নভাবে এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের উদ্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি ও বর্তমান সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘আমাদের দেশে বিকল্পের কোনো বিকল্প নেই। হয় উগ্র সাম্প্রদায়িক বিকল্প—জামায়াত, এনসিপি, ইউনূস ইত্যাদি সব মিলেই যেটা নেক্সাস (বন্ধন) হয়েছে। অথবা আরেকদিকে রয়েছে বাম বিকল্প।’

নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনে দ্বিধা রয়েছে জানিয়ে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘মানুষ বিশ্বাস করার এবং ভরসা করার জায়গা পাচ্ছে না। জামায়াতে ইসলাম সেই সুযোগটা নিয়েছে, আমরা নিতে পারিনি। তারা মিথ্যাচার করে বলেছে, আমরা খুব ভালো লোক, সৎ লোক, সৎ লোকের শাসনকে কায়েম করব, দুর্নীতি নির্বাসনে ছুড়ে দেব। জামায়াত বলছে, আমাদের জীবনে কোনো দিন সুযোগ পাই নাই সরকার গঠন করার। একটু সরকারের যাওয়ার সুযোগ দিন আমাদের। সুযোগ পাননি আপনারা? ১৯৭১ সালে সরকারে ছিলেন না?’

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রধান উপদেষ্টা কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, ‘খাদ্য ভাণ্ডারে টান পড়লে মানুষের স্বাস্থ্যহানি হয়। আর জ্ঞান ও সংস্কৃতির ভাণ্ডারে টান পড়লে মানুষের মানবিক চেতনা এবং সংস্কৃতিবোধ ও মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে যায়। ভাবগত, চেতনাগত, সংস্কৃতিগত ও চিন্তাগত ক্ষেত্রে যে দৈন্য, তা গোটা সমাজের মধ্যে একটা আদিম পাশবিকতা ও হিংস্র চেহারাকে সামনে নিয়ে আসতে সাহায্য করছে।’

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে খালেকুজ্জামান বলেন, ‘নির্বাচনের আর ১১-১২ দিন বাকি আছে। যদি নির্বাচন হয়, তা হবে একটা দুর্ঘটনা। আর যদি নির্বাচন না হয়, তা হবে বহুকালীন একটা দুর্ভাবনা। বারেবারেই আমাদের মানুষের প্রত্যাশা জাগ্রত হয় এবং তা পরাভূত হয়। জনতার উত্থান-পতন এবং তার পরম পরাজয়—এটাই হলো আমাদের ৫৪ বছরের ইতিহাস।’

সম্মেলনে ধারণকৃত ভিডিও বার্তায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. রওনক জাহান বলেন, গবেষণা ও সমাজের বিভিন্ন আলোচনায় নারী সংখালঘুদের প্রবেশাধিকার বাড়াতে হবে।

Manual2 Ad Code

সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বামপন্থীদের ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে বলেন, মতাদর্শগত কিছু পার্থক্য থাকলেও প্রকৃত লড়াইয়ে সবাইকে একসঙ্গে লড়তে হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ