দুনিয়া কাঁপানো ইব্রাহিম ট্রাওরে: পশ্চিমা বিশ্বের চোখ রাঙানি আর আফ্রিকার ত্রাতা

প্রকাশিত: ৪:২৬ অপরাহ্ণ, জুন ৬, ২০২৫

দুনিয়া কাঁপানো ইব্রাহিম ট্রাওরে: পশ্চিমা বিশ্বের চোখ রাঙানি আর আফ্রিকার ত্রাতা

Manual7 Ad Code

সাইরুল ইসলাম |

গত মাসের মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ল, আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোতে জিহাদি গোষ্ঠী ও সরকারি বাহিনীর আলাদা গোলাগুলির ঘটনায় শত শত মানুষ মারা গেছে। বুরকিনা ফাসোতে ক্ষমতায় থাকা তরুণ নেতা ইব্রাহিম ট্রাওরে তখন রাশিয়ায়। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তাঁর আলাপচারিতার ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এ ছাড়া আফ্রিকা ও সেখানকার তরুণদের স্বপ্নের গল্প বলে রুশ সংবাদমাধ্যমে তখন নতুন এক ‘আফ্রিকান হিরো’ বনে গেছেন তিনি। কিন্তু নিজ দেশে বেসামরিক নাগরিকদের এমন মৃত্যু তাঁকে পরদেশে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইনডিপেনডেন্ট বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির পরাজয়ের ৮০তম বার্ষিকীতে গত মাসে মস্কোয় থাকা ৩৭ বছর বয়সী ট্রাওরে হলেন আফ্রিকার সবচেয়ে কমবয়সী নেতা। এই মহাদেশ সব সময় প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও তাঁদের কঠোর শাসন দেখে অভ্যস্ত। এমতাবস্থায় ভিন্ন এক আবেদন নিয়ে এসেছেন ইব্রাহিম।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসেন ইব্রাহিম। এরপর থেকে তিনি পশ্চিমাদের, বিশেষ করে সাবেক ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের কাছ থেকে বেরিয়ে নিজেদের স্বনির্ভরতা ও স্বাধীনতার ওপর একের পর এক বক্তৃতা দিয়ে আসছেন। সেসব বক্তৃতা এখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচিত। পশ্চিমাদের মুখে চপেটাঘাত করা সেসব বক্তৃতা খুব সহজ এবং স্পষ্ট বার্তা দেয়। আর সেই বার্তা হলো, ‘বুরকিনা ফাসো আর পশ্চিমাদের পা চাটবে না।’

ইব্রাহিমকে নিয়ে এত আলোচনা কেন

সম্প্রতি আবারও অভ্যুত্থানের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে বুরকিনা ফাসোতে। এ ছাড়া আফ্রিকায় মার্কিন সামরিক শাখার প্রধান জেনারেল মাইকেল ল্যাংলে বলেন, ক্ষমতায় এসে ইব্রাহিম ট্রাওরে সোনার মজুত নিয়ে টালবাহানা করছেন। এরপরই গত এপ্রিলে রাস্তায় নামে জনতা। ওই সময় রাজধানীর ওয়াগাডুগুতে সেই জনতার ঢল আসলে তাদের দেশের সর্বোচ্চ নেতা ইব্রাহিম ট্রাওরেকে নিয়েই। তারা তখন জানিয়ে দেন, ‘কোনো কিছু তোয়াক্কা না করে ইব্রাহিম তুমি এগিয়ে যাও। আমরা তোমার সঙ্গে আছি।’

২০২২ সালের অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় এসে ট্রাওরে দেশটির কয়েক দশক ধরে চলা মারাত্মক নিরাপত্তা সংকটের অবসান ঘটানোর এবং এর সমৃদ্ধ খনিজ সম্পদকে ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষের জন্য কাজে লাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অভ্যুত্থানে জর্জরিত দেশ নাইজার ও মালির মতো আঞ্চলিক জোট ইসিওডব্লিউএএস থেকে বেরিয়ে আসে বুরকিনা ফাসো। অনেক তরুণ সমালোচনা করে বলছেন, এই জোট আফ্রিকান নাগরিকদের নয় বরং নেতাদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী। সেই সাথে ফ্রান্সের মতো দীর্ঘস্থায়ী পশ্চিমা মিত্রের পক্ষ হয়ে কাজ করে।

Manual7 Ad Code

বিশ্লেষক ও স্থানীয়রা বলছে, এই পশ্চিমাবিরোধী মনোভাব ও তারুণ্য ইব্রাহিমকে তরুণদের নেতায় পরিণত করেছে। বুরকিনা ফাসো সীমান্তের কাছে বসবাসকারী ঘানার রিচার্ড আলানডু বলছেন, ‘দেশ-বিদেশে আফ্রিকান তরুণদের মধ্যে এই চেতনা ক্রমেই বাড়ছে যে, তাদের মহাদেশের অগ্রগতিতে বাধা সম্পর্কে কিছু করা দরকার। মনে হচ্ছে ট্রাওরে সেই চেতনার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন।’

ইব্রাহিম ট্রাওরের অবস্থান এখন কেমন

Manual6 Ad Code

গবেষকদের বিভিন্ন তথ্যের বরাতে সংবাদ সংস্থা এপি বলছে, যে নিরাপত্তা সংকটের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি ট্রাওরে দিয়েছিলেন, তা আরও ভয়াবহতার দিকে যাচ্ছে। আর সেটি প্রভাব ফেলছে দেশের অর্থনীতিতে। এখনো বুরকিনা ফাসোর বেশির ভাগ নাগরিক খনিজ সম্পদ থেকে কোনো লাভই পাচ্ছে না। পশ্চিম আফ্রিকা নিয়ে কাজ করা নাইজেরিয়ার বেজ ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং নিরাপত্তা অধ্যয়নের অধ্যাপক গাবারা আওয়ানেন বলেন, ‘বুরকিনা ফাসোতে আসলে উন্নতি এখনো হয়নি। চারপাশে যা বলা হচ্ছে, তা কেবল প্রচারণার অংশ।’

আমেরিকাভিত্তিক আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্ট এসিএলইডির তথ্য থেকে দেখা যায়, ২০২২ সালের অভ্যুত্থানের আগের বছরে সরকার এবং সশস্ত্র গোষ্ঠী উভয়ের হাতেই ২ হাজার ৮৯৪ জন নিহত হয়েছিল। গত বছরে এই সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়ে কমপক্ষে ৭ হাজার ২০০ জনে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, হামলার তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে, ওয়াগাডুগু এখন ক্রমেই হুমকির মুখে।

Manual5 Ad Code

পরিসংখ্যান বলছে, দেশটির ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সহিংসতার ফলে কমপক্ষে ২১ লাখ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে এবং প্রায় ৬৫ ​​লাখ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। সেনেগালভিত্তিক টিমবুকতু ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো বাবাকার এনডিয়ায়ে বলছেন, ‘রুশ প্রচারণার অংশ হিসেবে ত্রাউরেকে এভাবে প্রশংসায় ভাসানো হচ্ছে। বুরকিনা ফাসোর ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকট সত্ত্বেও ট্রাওরে এখনও কেবলমাত্র প্রচারণার কারণে জনমনে এত আগ্রহ তৈরি করছেন এবং আলোড়ন তুলে যাচ্ছেন। আফ্রিকাতে বিভিন্ন নেতৃত্বের প্রতি গভীর হতাশা রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব এখন বলির পাঁঠা। সেই অবস্থায় আলোচনা ট্রাওরেকে নিয়ে হওয়াটাই স্বাভাবিক।’

পশ্চিম আফ্রিকায় তরুণদের ক্ষমতা দখলের ইতিহাস রয়েছে। যেমনটি ১৯৮০-এর দশকে ঘানায় জন জেরি রাওলিংস, লাইবেরিয়ার স্যামুয়েল ডো এবং বুরকিনা ফাসোতে থমাস সাঙ্কারাকে দেখা যায়। আফ্রিকায় পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্রের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সেই ইতিহাস ট্রাওরের মতো ব্যক্তিদের ‘আদর্শ’ হিসেবে গড়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি করে। তবুও, আফ্রিকার কনিষ্ঠ শাসককে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তাকে কেবল ‘প্রচারণার ম্যাজিক’ বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। আফ্রিকার বিশ্লেষক এবং টাফ্টস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চিডি ওডিনকালুর মতে, ‘ট্রাওরে একটি বিপ্লবী বার্তা প্রকাশ করেছেন, যা তাদের দেশে গণতন্ত্র হারিয়ে যাওয়ার কারণে হতাশ তরুণ জনগোষ্ঠীর কাছে বেশ আগ্রহ তৈরি করেছে।’

পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট দেশ বুরকিনা ফাসো গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক সংকট, নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পটভূমিতেই উঠে আসেন তরুণ সাহসী নেতা ইব্রাহিম ট্রাওরে। বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, তিনি দেশের তরুণদের আশার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

Manual1 Ad Code

বুরকিনা ফাসোর সেনাবাহিনীর ছোট একটি বিদ্রোহী অংশের নেতৃত্ব দেওয়া ট্রাওরে দেশটির সাবেক জান্তা শাসক লে. কর্নেল পল–হেনরি সান্দাওগো দামিবাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশটির ক্ষমতা দখল করেন। পল–হেনরি সান্দাওগোও অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বুরকিনা ফাসোর ক্ষমতা দখল করেন। অভ্যুত্থানের পর নিজেকে বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন ত্রাউরে। তিনি ওই ঘোষণায় দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং রাষ্ট্রীয় বিধি–বিধান জারি রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।

ট্রাওরের কথা শুধু বুরকিনা ফাসোতেই নয়, ছড়িয়ে পড়েছে গোটা আফ্রিকায়, এমনকি আফ্রিকার বাইরেও। অনেকেই মনে করেন, তিনি আফ্রিকার বীরদের পথেই হাঁটছেন। ভক্তরা তাঁকে তুলনা করেন বুরকিনা ফাসোরই আরেক কিংবদন্তি নেতা টমাস সাঙ্কারার সঙ্গে, যিনি ছিলেন একজন মার্কসবাদী বিপ্লবী এবং অনেকের চোখে ‘আফ্রিকার চে গুয়েভারা’।

আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কন্ট্রোল রিস্কসের জ্যেষ্ঠ গবেষক বেভারলি ওচেং ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, ‘ত্রাউরের প্রভাব অনেক। আমি এমনকি কেনিয়া থেকেও রাজনীতিক ও লেখকদের বলতে শুনেছি—এই তো সেই মানুষ, যাকে আমরা খুঁজছিলাম।’

২০২২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর ক্যাপ্টেন ত্রাউরে ফ্রান্সের সঙ্গে পুরোনো ঔপনিবেশিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এর বদলে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জোট গড়ে তোলেন—যার অংশ হিসেবে একটি রুশ প্যারামিলিটারি বাহিনীও বুরকিনা ফাসোতে মোতায়েন করা হয়। একইসঙ্গে তাঁর সরকার বাম ঘরানার অর্থনৈতিক নীতির পথে হাঁটে। এই নীতির আওতায় গঠন করা হয় রাষ্ট্রায়ত্ত খনি প্রতিষ্ঠান। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, দেশটিতে ব্যবসা করতে চাইলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারকে ১৫ শতাংশ অংশীদারত্ব দিতে হবে। শুধু তাই নয়, তাদের শিখিয়ে দিতে হবে সেসব প্রযুক্তি ও দক্ষতা, যাতে দেশের লোকজন নিজেরাই একদিন সবকিছু পরিচালনা করতে পারে।

দক্ষিণ আফ্রিকার ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক এনোক র‍্যান্ডি আইকিনস বিবিসিকে বলেন, ত্রাউরের এই সংস্কার আফ্রিকাজুড়ে তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়েছে। তাঁর মতে, ত্রাউরে এখন সম্ভবত আফ্রিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রপ্রধান। তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। এতে অবশ্য অনেক ভুয়া তথ্য বা পোস্ট ছড়ানো হচ্ছে। এসব পোস্ট মূলত তাঁর বিপ্লবী ইমেজকে শক্তিশালী করার জন্যই তৈরি।

বক্তব্য দিতে বেশ পটু ট্রাওরে। তাঁর এই গুণের কারণে সমর্থনও বাড়ছে। বক্তৃতায় পশ্চিমাদের তুলোধুনো করেন এই তরুণ নেতা, যা জনমনে এক ধরনের মানসিক শান্তি দেয়। তারা ভাবতে থাকে, এই বুঝি আফ্রিকার ত্রাণকর্তা ধরায় এসে পড়েছেন।

তবে ২০২২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত বড় কোনো অগ্রগতির খবর শুনাতে পারেননি ত্রাউরে। ক্রমেই দেশটিতে রুশ প্রভাব বাড়ছে। ইব্রাহিম এখন পুরোপুরি রুশ বলয়ে রয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে। তবে যে বলয়েই থাকুক না কেন, বুরকিনা ফাসোর জনগণ তাকিয়ে আছেন দাসত্ব থেকে পুরোপুরি মুক্তির পথের দিকে। অপেক্ষা করে আছেন সেই দিনের জন্য, যখন রাস্তায় বের হতে পারবেন নিরাপদে। ইব্রাহিম ট্রাওরে কি তাদেরকে সেই সুদিন এনে দিতে পারবেন?

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ