সিলেট ২৪শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০:২১ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৬, ২০২৬
রাশেদ খান মেনন। ৩৬ দিনের বিপ্লবী নন, কিংবা বানের জলে ভেসে আসা নামও নন। তিনি এদেশ বিনির্মাণের রাজনৈতিক মানচিত্রে লড়াই-সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল। ছয় দশকের রাজনৈতিক পরিক্রমায় সুস্থ ধারার রাজনীতির আইকন। নীতি ও আদর্শের এক জ্বলন্ত প্রদীপ। চক্রান্ত আর মিথ্যা মামলার আবরণে এই প্রদীপের আলোকে অন্ধকারে ঢেকে ফেলা সম্ভব নয়। সময়ের সাহসী কণ্ঠস্বর বারবার জ্বলে উঠতে জানে, জ্বলে উঠবে।
’৬২-র ছাত্র আন্দোলন থেকে এ পর্যন্ত-প্রতিটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে তিনি ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা।
রাজপথ থেকে রণাঙ্গন: এক অনন্য রাজনৈতিক অভিযাত্রা;
শরীফ কমিশনের গণবিরোধী শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে তিনি আইয়ুব খানের মসনদ কাঁপিছিলেন, যা ছিল ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তিপ্রস্তর। ছিলেন ডাকসুর ভিপি। ‘৬৪-র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে তার ছিল অনন্য ভূমিকা। ‘৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানের নায়ক ছিলেন মেহনতীপ্রাণ রাশেদ খান মেনন।
’৭০-এর ২২ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে তিনিই প্রথম প্রকাশ্য সমাবেশে ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার’ ডাক দিয়েছিলেন। তাতে তার ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডও হয়েছিল। হুলিয়া মাথায় নিয়ে ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ‘জাতীয় মুক্তি সমন্বয় কমিটি’ গঠনের মাধ্যমে নরসিংদীর শিবপুরে তিনি ছিলেন রণাঙ্গনের অকুতোভয় যোদ্ধা ও সংগঠক।
স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসনবিরোধী লড়াই থেকে ‘৯০-এর গণঅভ্যুত্থান-সবখানে তার অবদান সূর্যের আলোর মত পরিস্কার। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের ঐতিহাসিক ‘তিন জোটের রূপরেখা’ তার হাত ধরেই প্রণীত হয়েছিল। এমনকি ২০০৭ সালের ১/১১ পরবর্তী ‘মাইনাস-টু’ ফর্মুলার কঠিন সময়ে যখন অনেক জাঁদরেল রাজনৈতিক ব্যক্তিরা নীরব ছিলেন, তখন সেনাশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া-উভয় নেত্রীর মুক্তির দাবিতে প্রথম সরব হয়েছিলেন এই রাশেদ খান মেননই।
জুলাই অভ্যুত্থান ও রাশেদ খান মেনন: মিথ্যার আড়ালে সত্য
আজ যে কিংবদন্তিকে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি রাখা হয়েছে, প্রশ্ন জাগে-আসলে কি ব্যক্তি মেনন বন্দি; নাকি বন্দি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও গণমানুষের অকুতোভয় কণ্ঠস্বর?
কেন আজ তার মুক্তি সময়ের দাবি? এর পেছনে রয়েছে অকাট্য কিছু যুক্তি:
১। সরকারে থেকেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন কণ্ঠস্বর:
সরকারে থেকেও তিনি আমলাতন্ত্র ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, “করোনার চেয়েও আমলাতন্ত্র ভয়ঙ্কর”। ২০১৯ সালে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, দুর্নীতি এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে এবং ওপর তলার দুর্নীতি ধরাছোঁয়ার বাইরে। ব্যাংক খাতের লুটপাট ও অর্থপাচার নিয়ে তার কঠোর সমালোচনা সংসদীয় রেকর্ডে আজও বিদ্যমান।
ওই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত তার বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, “দুর্নীতি এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, ওপর তলার দুর্নীতি ধরাছোঁয়ার বাইরে।”
সংসদীয় রেকর্ড: ৩০ জানুয়ারি ২০২৩ এবং পরবর্তীতে ২০২৪-এর বাজেট অধিবেশনে তিনি ব্যাংক খাতের লুটপাট, খেলাপি ঋণ এবং অর্থপাচার নিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন।
২. শিক্ষার্থীদের পক্ষে মেননের অবস্থানের দালিলিক প্রমাণ:
জুলাই আন্দোলনে মেনন নীরব ছিলেন না। জোটের শরিক হয়েও তিনি সত্য বলতে দ্বিধা করেননি। শিক্ষার্থীদের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন-
* ৯ জুলাই ’২৪ সংসদীয় বক্তব্য যা ১০ জুলাই ’২৪-এ প্রথম আলো সহ বিভিন্ন জাতীয় ও অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “আদালতের ওপর দায় না চাপিয়ে কোটা সমস্যার যৌক্তিক সমাধান করুন।”
* ১৪ জুলাই প্রথম আলোতে অভিমত প্রকাশ করতে গিয়ে মেনন বলেন,“ কোটা সংস্কার আন্দোলন সমাধানের দায়িত্ব সরকারের।”
* রক্তপাতের প্রতিবাদ: ১৬ জুলাইয়ের পর যখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও প্রাণহানি শুরু হয়, তখন তিনি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তীব্র নিন্দা জানান এবং বলেছিলেন, “ছাত্রদের ওপর বলপ্রয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” দৈনিক প্রথম আলো ও সংবাদ-এর পাতায় তার সেই প্রতিবাদী কণ্ঠ আজও সাক্ষী হয়ে আছে। তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, “ছাত্রদের ওপর বলপ্রয়োগ কোনো সমাধান নয়।”
* ১৭ জুলাই বাংলা নিউজ এবং ১৮ জুলাই প্রথম আলোতে প্রকাশিত সংবাদ-“মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধানের আলোকে সমাধানে পৌঁছানোই যুক্তিযুক্ত পথ।”
* ২০ জুলাই বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত হয়-“শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বলপ্রয়োগে বিরত থাকুন।”
* ২৮ জুলাই ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সভায় কোটা আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
* সরকার পতনের ঠিক আগের দিন ৪ আগস্ট ২০২৪ প্রথম আলো সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আলোচনা ছাড়া এই সংকটের সমাধান নেই।” তিনি আন্দোলনকে কেবল ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখার সরকারি বয়ানের সাথে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন।
* ৩ আগস্ট প্রথম আলো, বাংলা নিউজ, সময় নিউজ এবং ৪ আগস্ট আমাদের সময়ে প্রকাশিত হয়।
“ছাত্রদের ৯ দফা দাবি মেনে নিন।” অর্থাৎ, যে আন্দোলনের মামলায় তাকে জড়ানো হয়েছে, সেই আন্দোলনের দাবির পক্ষেই ছিল তার বলিষ্ঠ অবস্থান।
৩. প্রশাসনিক ক্ষমতার অনুপস্থিতি:
জুলাই হত্যাকাণ্ডগুলোর সময় রাশেদ খান মেনন কোনো মন্ত্রী বা নির্বাহী দায়িত্বে ছিলেন না। এমনকি তিনি ঢাকার সংসদ সদস্যও ছিলেন না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়ার মতো কোনো প্রশাসনিক কর্তৃত্ব তার ছিল না। ফলে মাঠপর্যায়ের সহিংসতার দায় একজন নির্বাহী ক্ষমতাহীন রাজনীতিবিদের ওপর চাপানো আইনি ও নৈতিকভাবে ভিত্তিহীন।
৪. বয়োজ্যেষ্ঠতা ও মানবিক বিবেচনা:
৮৩ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছেন। একজন আজীবন সংগ্রামী মুক্তিযোদ্ধা ও মেহনতি মানুষের নেতাকে এই বয়সে বিনা প্রমাণে কারাবন্দি রাখা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
পরিশেষে বলতে চাই, রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবেই, কিন্তু রাশেদ খান মেননের মতো একজন জীবন্ত কিংবদন্তিকে মিথ্যা মামলায় বন্দি রাখা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। যিনি নিজে আন্দোলনের যৌক্তিকতা স্বীকার করেছেন এবং সহিংসতার প্রতিবাদ করেছেন, তাকেই সেই সহিংসতার পরিকল্পনাকারী সাজানো একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি।
ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। সত্য ও তথ্যের ভিত্তিতে তাকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, আমরা কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, বরং বাংলাদেশের সংগ্রামী রাজনৈতিক ইতিহাসকেই অবমূল্যায়ন করব।
মনে রাখা প্রয়োজন, রাশেদ খান মেননের মতো ক্ষণজন্মা পুরুষ বারবার জন্মায় না।
#
লেখক-গণপথিক

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি