বাংলাদেশের এনজিও সেক্টরের সংকট: কর্মীদের ক্ষোভ, সুশাসনের অভাব ও পরিবর্তনের দাবি

প্রকাশিত: ১২:৫০ অপরাহ্ণ, মে ৮, ২০২৬

বাংলাদেশের এনজিও সেক্টরের সংকট: কর্মীদের ক্ষোভ, সুশাসনের অভাব ও পরিবর্তনের দাবি

Manual8 Ad Code

পারভেজ কৈরী |

বাংলাদেশের এনজিও সেক্টর দীর্ঘদিন ধরে দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানবাধিকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, এই সেক্টরের অভ্যন্তরে বছরের পর বছর ধরে নানা ধরনের অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কর্মীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ চলে আসছে। সম্প্রতি এসডিএফ কর্মীদের চেয়ারম্যান ও এমডির পদত্যাগ দাবিতে প্রকাশ্য আন্দোলন সেই দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।

Manual1 Ad Code

এনজিও সেক্টরের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, এখানে কর্মীরা সাধারণত সংগঠিত হতে পারেন না। সরকারি চাকরিজীবীদের মতো শক্তিশালী কোনো সার্ভিস কাঠামো নেই, শ্রমিকদের মতো কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন নেই, আবার কর্পোরেট খাতের মতো জব সিকিউরিটিও নেই। ফলে অধিকাংশ কর্মী চাকরি হারানোর ভয়ে অন্যায় দেখেও নীরব থাকেন। বছরের পর বছর অনিয়ম সহ্য করতে করতে যখন পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখনই মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। এসডিএফের আন্দোলন সেটাই প্রমাণ করেছে।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান। সাধারণত এনজিও কর্মীদের মধ্যে বিভাজন, ভয় ও অনিশ্চয়তা কাজ করে। কিন্তু যখন শত শত কর্মী একসাথে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়, বরং পুরো সেক্টরের গভীর অসুস্থতার বার্তা দেয়।
বর্তমানে দেশের অনেক এনজিও ও মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠান কার্যত ব্যক্তি কেন্দ্রিক বা পরিবার কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কাগজে-কলমে বোর্ড, নীতিমালা, মানবসম্পদ বিভাগ ও জবাবদিহিতা থাকলেও বাস্তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বজনপ্রীতি, ব্যক্তিগত আনুগত্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার প্রবলভাবে দেখা যায়। কর্মীদের দক্ষতা বা যোগ্যতার চেয়ে “কার লোক” সেটাই অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার ডোনারদের দেখানোর জন্য সুন্দর সুন্দর পলিসি তৈরি হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন খুব কম দেখা যায়।

Manual1 Ad Code

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক স্বচ্ছতার পরিবর্তে কাগজপত্র ঠিক রেখে অনিয়মকে আড়াল করার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রকল্পের অর্থের অপচয়, অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয়, ভুয়া বিল-ভাউচার, নিয়োগ বাণিজ্য কিংবা পদোন্নতিতে অনিয়ম এখন অনেক ক্ষেত্রেই “ওপেন সিক্রেট”। সবাই জানে, কিন্তু খুব কম মানুষ প্রকাশ্যে বলতে সাহস করে।

Manual5 Ad Code

এখানে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। এনজিও বিষয়ক ব্যুরো কিংবা মাঠ প্রশাসনের কিছু অংশে দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন অনুমোদন, প্রত্যয়নপত্র বা ফাইল প্রসেসিংয়ের ক্ষেত্রে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। ফলে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত চক্র তৈরি হয়েছে যেখানে প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং কিছু অসাধু কর্মকর্তা পারস্পরিক স্বার্থে নীরব থাকে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ কর্মীরা এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা।

এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থার ওপর। অনেক ডোনার সংস্থা এখন বাংলাদেশে ফান্ডিং কমিয়ে দিয়েছে বা কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। কারণ তারা সুশাসন, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। এর ফলে পুরো সেক্টরে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে এবং লাখ লাখ দক্ষ কর্মী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছেন।
তবে ইতিবাচক দিক হলো, এখন অন্তত কর্মীরা কথা বলতে শুরু করেছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মানে প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা নয়, বরং প্রতিষ্ঠানকে সুস্থ ও জবাবদিহিমূলক করা। যে প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের মত প্রকাশের সুযোগ থাকে না, সেখানে টেকসই উন্নয়নও সম্ভব নয়।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজনঃ

Manual7 Ad Code

১. এনজিও সেক্টরের জন্য শক্তিশালী ও স্বাধীন মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
২. কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর নীতিমালা ও অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৩. স্বজনপ্রীতি ও একক কর্তৃত্ব কমিয়ে বোর্ড পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. আর্থিক অডিটের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও মানবসম্পদ অডিট বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৫. এনজিও বিষয়ক ব্যুরো ও সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিসগুলোতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৬. কর্মীদের জন্য একটি স্বাধীন পেশাজীবী প্ল্যাটফর্ম বা ফোরাম গঠন করা প্রয়োজন, যেখানে তারা নিরাপদভাবে নিজেদের সমস্যার কথা বলতে পারবেন।
৭. ডোনারদেরও শুধু রিপোর্ট নয়, মাঠপর্যায়ে বাস্তব জবাবদিহিতা ও কর্মপরিবেশ মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশের এনজিও সেক্টর দেশের উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই সেক্টরকে ব্যক্তি স্বার্থ, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বের করে এনে সত্যিকারের সুশাসন, জবাবদিহিতা ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কারণ উন্নয়নের কথা বলে যদি উন্নয়নকর্মীদেরই ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা না যায়, তবে সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না।

লেখক:
পারভেজ কৈরী
জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়নকর্মী।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ